একটা কথায় এত - বাংলাদেশের লোককাহিনী

     জামাই শ্বশুরবাড়ি যাইয়া কোনো কথা বলে না। শালীরা-শালারা কত ঠাট্টা-তামাসা করিতে আসে ; সে কোনো উচ্চবাচ্য করে না। শ্বশুর যাইয়া জামাইয়ের বাপকে বলে, “দেখুন, আপনার ছেলে আমাদের বাড়ি আসিয়া চুপ করিয়া বসিয়া থাকে। কোনো কথাবার্তা বলে না। এটা যেন কেমন কেমন লাগে। সবাই বলে জামাই বোকা।" 
     বাপ বলিল, “আমার ছেলে তো বাড়িতে বেশ ভালোমতো কথাবার্তা বলে! আচ্ছা, তাকে আমি বেশ করিয়া ধমকাইয়া দিব।" 
     বাড়ি আসিয়া বাপ ছেলেকে ডাকিয়া বলিল, “কিরে শ্বশুরবাড়ি যাইয়া কথাবার্তা বলিস না কেন? সেখানে যাইয়া সকলের সঙ্গে আলাপ-সালাপ করবি। শালা-শালীদের সঙ্গে হাসি-তামাসা করবি। তবেই না লোকে বলিবে, বেশ ভালো জামাই!" 
     ছেলে মাথা নত করিয়া রহিল। বাপ বুঝিল, এবার ছেলে শ্বশুর বাড়ি যাইয়া তাহার উপদেশ মতো কাজ করিবে। ঈদের ছুটিতে জামাই শ্বশুরবাড়ি আসিয়াছে। আসিয়া বৈঠকখানার এক কোণে চুপ করিয়া বসিয়া আছে। শ্বশুর আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কি বাবাজী! চুপ করিয়া বসিয়া আছ কেন ? বাড়িতে সবাই ভালো আছে তো?" 
     জামাই উত্তর করিল, “ভালো আর আছে কই? কয়দিন হইল আমার বাপের মাথা খারাপ হইয়া গিয়াছে। হাতে একখানা লাঠি লইয়া যাকে দেখেন তাকেই মারিতে আসেন।"
     শ্বশুর বলিল, “তবে তো খুব খারাপ কথা! আমি কালই তোমার বাবাকে দেখিতে যাইব ।"
     জামাই বলিল, “শ্বশুর সাহেব! যাইবেন যে, খুব সাবধানে যাইবেন। একখানা লাঠি হাতে লইয়া ঘুরাইতে ঘুরাইতে যাইবেন। আমার বাবা যদি আপনাকে মারিতে আসেন, লাঠি উঠাইয়া তাহাকে মারিতে যাইবেন! দুই একটা লাঠির ঘা মাথায় পড়িলে বাবা শান্ত হইয়া যাইবেন। তারপর আর কিছু বলিবেন না।"
     শ্বশুর বলিল, “আচ্ছা, তাহাই করিব। কাল সকালে তোমার বাবাকে দেখিতে যাইব ।"
    জামাই শ্বশুরবাড়ি হইতে ফিরিয়া আসিল। বাপ জিজ্ঞাসা করিল, “কি রে, শ্বশুর বাড়ি যাইয়া এত তাড়াতাড়ি ফিরিয়া আসলি কেন?"
     ছেলে বলিল, “ফিরিয়া না আসিয়া উপায় কি ? আমার শ্বশুরের মাথা খারাপ হইয়াছে। যাকে দেখেন তাকেই লাঠি ঘুরাইয়া মারিতে আসেন।"
     বাপ বলিল, “তবে তো খুব খারাপ খবর! কাল সকালে তোর শ্বশুরকে দেখিতে যাইব ।"
     ছেলে বলিল, “আপনি যে যাইবেন, খুব সাবধানে যাইবেন। একখানা লাঠি ঘুরাইতে ঘুরাইতে যাইবেন। আমার শ্বশুর যদি আপনাকে মারিতে আসেন, লাঠির কায়েক ঘা তাহার গায়ে মারিবেন, তিনি তখনই থামিয়া যাইবেন । কিন্তু কয়েক ঘা না মারিলে তিনি আপনাকে মারিতেই থাকিবেন। সাবধান! সঙ্গে লাঠি না লইয়া যাইবেন না ।"
     পরদিন সকালে দুই গ্রাম হইতে বাপ আর শ্বশুর লাঠি ঘুরাইতে ঘুরাইতে বাহির হইল। মাঝপথে আসিয়া দুই বিয়াইয়ের সাথে দেখা। শ্বশুর লাঠি উঁচাইয়া বলিল, “এই!” তারপর দুই বিয়াইতে লাঠি পেটাপেটি আরম্ভ হইল। সে কি যেমন তেমন মারামারি! পাড়ার লোকেরা ছুটিয়ািআসিয়া দুই বিয়াইকে আলাদা করিয়া ধরিয়া রাখিল । তারপর বলিল, “তোমাদের হইল কি ?
     দুই বিয়াইয়ের মধ্যে এমন ভাব-মহব্বত। এখন এইভাবে তোমাদের মারামারি করার কারণ কি ?"
     শ্বশুর তখন বলিল, “কাল জামাইয়ের মুখে শুনিলাম বিয়াই পাগল হইয়া গিয়াছে। যাকে দেখে তাকেই মারিতে আসে। আর লাঠি দিয়া দুই এক ঘা মারিলেই নীরব হইয়া যায়।”
     বাপ বলিল, “ওই শয়তান ছেলে বিয়াইয়ের বিষয়েও এমনি কথা আমাকে বাড়ি আসিয়া বলিয়াছে।"
     এখন এ-বিয়াই ও-বিয়াই একে অপরের সঙ্গে আলাপ করিয়া সমস্ত জানিতে পারিল । বাপ বাড়ি ফিরিয়া ছেলেকে ধমক দিয়া বলিল, "ওরে বেল্লিক, বেহায়া! তোর শ্বশুর সম্বন্ধে এমন মিথ্যাকথা আমাকে বলিয়াছিলি কেন ?"
     ছেলে বিনীতভাবে উত্তর করিল, “আপনি আমাকে শ্বশুরবাড়ি যাইয়া কথাবার্তা বলিতে উপদেশ দিয়াছিলেন, আমি সেখানে যাইয়া একটি মাত্র কথা বলিয়াছি, তাহাতেই এত! অনেক কথা বলিলে না জানি কি হইত ?"
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য