চৈত্রমাসের বক্তৃতা পৌষ মাসে - বাংলাদেশের লোককাহিনী

     মৌলবী সাহেবের তালেব এলেম (ছাত্র) সবে মৌলবী হইয়াছেন। ছাত্র অবস্থায় ওস্তাদের বক্তৃতায় যে যে কথা শুনিয়াছেন, তাহারই মতো সুর করিয়া সেই সব কথা বলেন। নূতন মৌলবীর গলার সুর আরও সুন্দর বলিয়া ঘন ঘন তিনি দাওয়াত পান।
সেবার পৌষ মাসে এক গৃহস্থ বাড়ি তাহার দাওয়াত হইয়াছে। বক্তৃতা করিতে করিতে মৌলবী সাহেব বলিয়া ফেলিলেন, “মেয়ে লোকের ব্যবহার করা কোনো কাপড়-পোষাক আলেম ওস্তাদকে দিতে নাই। ইহাতে খুব গুনাহ হয়।"
     পাড়াগাঁয়ের চাষী মুসলমানদের বাড়িতে মেয়েদের পরার কাপড় দিয়াই সাধারণত শীতকালের কাথা তৈরি হয়। কারণ পুরুষদের চাইতে মেয়েদের কাপড় পুরু। 
বাড়ির কর্তা গরীব মানুষ, লেপ কিনিবার পয়সা নাই। শীত নিবারণের জন্য কয়েকখানা মাত্র কাথা আছে। তাহাও মেয়েদের শাড়ী কাপড় দিয়া তৈরি। তাই রাত্রের আহারের পরে সে মৌলবী সাহেবকে শীত নিবারণের জন্য কিছুই দিতে পারিল না। কারণ মৌলবী সাহেব ওয়াজের সময় বলিয়াছেন, মেয়েলোকের কাপড়ের তৈরি কাঁথা মৌলবী-মাওলানাদের দিতে নাই। দিলে খুব গুনাহ হইবে। 
     শূন্য মাদুরের উপর বসিয়া মৌলবী সাহেব সারারাত শীতে ঠির ঠির করিয়া কাঁপিয়া কাটাইলেন। একটুকুও ঘুমাইতে পারিলেন না। শুধু কি এই বাড়িতে ? ইহার পর মৌলবী সাহেব যেখানেই দাওয়াত খাইতে যান, কেহই মৌলবী সাহেবকে রাত্রে শুইবার জন্য কাথা কাপড় দেয় না। কারণ তাহারা আগের সেই চাষীর বাড়িতে মৌলবী সাহেবের ওয়াজ শুনিয়া আসিয়াছে।
     শীতের কষ্ট আর কত দিন সহ্য করা যায় ? সারারাত শীতের কাঁপুনীতে না ঘুমাইয়া মৌলবী সাহেবের চোখ দুটি লাল জবাফুল, তার উপর আবার সর্দি-কাশি ।
     একদিন তিনি তাঁর ওস্তাদ মৌলবী সাহেবের সঙ্গে দেখা করিয়া বলিলেন, “হুজুর! আপনার শিক্ষা মতো আমি সব জায়গায়ই ওয়াজ করিয়া বেড়াই। কিন্তু এক জায়গায় যাইয়া বড়ই মুস্কিলে পড়িয়াছি।" 
     ওস্তাদ জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি মুস্কিল, খোলাসা করিয়া বলো!" তখন মৌলবী সাহেব জবাব দিলেন, “এক চাষীর বাড়িতে আমি বক্তৃতায় বলিলাম, “স্ত্রীলোকের ব্যবহার করা কোনো কাপড় মৌলবী-, মাওলানাদের দিতে নাই। তাহাতে খুব গুনাহ হয়।" সেই হইতে যে বাড়িতেই আমি দাওয়াত পাই, বাড়ির কর্তা শীতের রাতে আমাকে কোনো কাঁথা-কাপড় দেয় না। এই দেখুন, শীতের রাত্র জাগিতে জাগিতে আমার কি হাল হইয়াছে।" 
     ওস্তাদ খানিকটা চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন, “আরে বেয়াক্কেল। চৈত্র মাসের বক্তৃতা তুমি পৌষ মাসে করিয়াছ। তোমার মতো গাধা আর নাই। কাঁথা-কাপড়ের বক্তৃতা গরমকালের জন্য মূলতবী রাখিবে। আমি কি শীতকালে তোমাকে এরূপ ওয়াজ করিতে বলিয়াছিলাম ?"
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য