বিকলাঙ্গ বালকের গল্প -- তিব্বতের লোককাহিনী

ছিল এক গরিব লোক, ও তার গরিব বউ। সহায় সম্বল বলতে তাদের তেমন কিছু ছিল না। তাদের ঘরে জন্ম নিল একটি বালক। তার মাথা ছিল বিকলাঙ্গ । মাথার সামনের ও পেছনের দিকটা ছিল উচু। দেখতে ছিল খুব খারাপ। মা-বাবার এই নিয়ে খুব দুঃখ । তবুও তারা খুব আদর-যত্নে তাকে বড় করে তুলতে লাগল। একটু বড় হতেই সে বাড়ির চমরী গরু চরাতে যেত পাহাড়ের পাশে বনের ধারে । সারা দিন সে গরু চরাত সেখানে। গরুগুলোকে সে খুব ভালোবাসত। এতেই সে ছিল খুব সুখী। পনেরো বছর বয়স পর্যন্ত সে এরকম সুখীই ছিল।
এই বয়সে তাদের গ্রামের ছেলেরা বিয়ে করে ঘর-সংসারী হত। সেও তখন সকলের মতো টুকটুকে একটি মেয়েকে বিয়ের কথা ভাবতে লাগল। কিন্তু তার বিশ্রী মাথার জন্য কোনো মেয়ে তাকে বিয়ে করতে চাইবে না বলে খুব চিন্তা হল । গ্রামের কোনো তরুণী মেয়েই তার দিকে কখনো তাকাত না । এজন্য তার খুব দুঃখ । 

এই করে তার দিন কাটতে লাগল। একদিন সে বনের পাশে বড় হদের ধারে গরু চরাতে গেল। গরুগুলোকে চরতে দিয়ে সে হ্রদের কূলে বসে রইল। এমন সময় এক অবাক কাণ্ড ঘটল । সে দেখল আকাশ থেকে ঘুরতে ঘুরতে একটি বড় পাতিহাস বিশাল পাখা-দুটি মেলে হদে নেমে এল । এভাবে সে কয়েকদিন ধরে ব্যাপারটি ভালোভাবে লক্ষ করল । 

শেষে ভাবতে ভাবতে সে ঠিক করল পাখিটাকে তার চাই । এই ভেবে সে তার চমরী গরুর লোম দিয়ে লম্বা একটি দড়ি বানাতে লাগল। দড়িটি লম্বা হতে হতে পুরোহ্রদটি এক চক্কর দেওয়ার মতো হল। দড়িটি সে হ্রদের কূলে রাখল। তারপর ঘাড়ের সবচেয়ে ভালো কেশ দিয়ে বানাল অনেকগুলো ফাঁস। 

ফাঁসগুলোর মাথা সে হ্রদে পেতে রাখল এবং তার আরেক মাথা বেঁধে রাখল দড়ির সঙ্গে । 

প্রতিদিনের মতো পাখিটি যথাসময়ে এসে হ্রদে নামল । কিন্তু আজ সে সাতার কেটে বেশিদূর যেতে পারে নি। একটি ফাসকলে তার পা আটকে গেল। আমনি বালকটি দড়ি ধরে টান দিল এবং ফাসের দড়ি পায়ের সঙ্গে ভালো করে আটকে গেল। 

বালকটি তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে হাসটিকে ধরে ফেলল এবং দুই পা ভালো করে বেঁধে তার পাশে রেখে দিল । তখন বালকটি আপন মনে বলতে লাগল, ‘এখন এই চমৎকার হাসটিকে নিয়ে কী করব? আমি একে ঘরে নিয়ে যাব। তারপর চমৎকার করে রান্না করব। মা-বাবা ও আমি মিলে পেট ভরে খাব।” এই বলে সে হাসটিকে তুলে ধরে কত ওজন হবে দেখতে লাগল। 

এমন সময় সে অবাক হয়ে শুনল হাসটি তাকে বলছে, আমি তোমার কাছে অনুনয় করছি, আমাকে তুমি মেরো না।’ বালকটি অবাক হয়ে বলল, ‘কেন?
 হাসটি বলল, তুমি তো জানো না, আসলে আমি হাঁস নই। হাসের মতো দেখতে হলেও আমি আসলে পরী রাজ্যের রাজা। পরীরাজ্য থেকে আমি এখানে হাঁস হয়ে এসে সাঁতার কাটি মনের আনন্দে । এই হ্রদে সাঁতার কাটতে আমার খুব ভালো লাগে । এখন তুমি যদি আমাকে ছেড়ে দাও তাহলে আমি যেতে পারি। তোমার এই দয়ার জন্য আমি খুশি হয়ে তোমাকে অনেক উপহার দেব। সোনা, রুপো, রত্ন, মানিক যত চাও তোমাকে দেব। আর খাওয়ার ভাবনা ভাবতে হবে না ।" 

শুনে বালকটি হেসে উঠল এবং বলল, “তোমার পরীর রাজ্যের গল্প আর বলো না। আমি কী করে বুঝব যে তুমি সত্যিই পরীদের রাজা? তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি শুধু তোমার কয়েকটা পালক ছাড়া আর কিছুই দিতে পারবে না।’ 

‘আমার কথায় অবিশ্বাস করো না। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, আমি যা যা বলেছি সব করব। আর আমাকে মুক্ত করে দিলে এর চেয়েও বেশি দেয়ার ক্ষমতা আমার আছে।”

ঠিক আছে, আমি তোমার কথা বিশ্বাস করলাম। তবে দেয়া-থোয়ার বিষয়ে তোমার সঙ্গে একটা চুক্তিতে আসা যেতে পারে। তুমি আমাকে যা যা দেবে বলছ সে-সব কিছুই আমি চাই না । তোমার সোনা-দানা তোমার থাক ।


আমি চাই একটি টুকটুকে বউ । তুমি যদি আমার জন্য একটি বউ জোগাড় করে দিতে পার তাহলে তোমাকে যেতে দিতে পারি।’ 

পরীদের রাজা হাসটি তখন বলল, শুধু এই? সে তো খুব সহজ। আমার নিজেরই তিনটি অবিবাহিতা কন্যা আছে। বড়, মেজ ও ছোট। তার থেকে যে-কোনো একটি মেয়েকে আমি দিতে পারি। তুমি কি আমার বড় মেয়েকে বিয়ে করতে চাও, নাকি ছোটকে পছন্দ করবে, অথবা মেজকে? 

এই কথা শুনে বালকটি খুব খুশি । সে তখন ভাবতে লাগল, আমি বড়কে বিয়ে করব না, কারণ তার বয়স বেশি হতে পারে। ছোটকেও না, কারণ সে যদি খুব ছোট হয়? তার চেয়ে মেজই ভালো হবে, সে বেশি বড়ও হবে না, আবার একেবারে ছোটও হবে না।’ এই ভেবে সে বলল মেজ রাজকন্যাকেই সে বিয়ে করবে। 

পরীর রাজা শুনে বলল, ঠিক আছে। তোমার ইচ্ছে অনুযায়ী আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি। আগামী কাল ঠিক একই সময়ে মেজ রাজকন্যাকে নিয়ে আমি এখানে আসব। কিন্তু আমার একটি শর্ত আছে। আর বলতে গেলে এটা শর্তও নয়। তুমি জানো পরীরা অমর, আর তোমরা মরণশীল। এজন্য পরী রাজকন্যা তোমাকে বিয়ে করে মাত্র নয় বছর তোমার সঙ্গে থাকতে পারবে। তারপর সে আবার পরীরাজ্যে চলে যাবে। নয় বছর পরে স্বর্গে চলে যেতে সে বাধ্য। এটিই স্বর্গের পরীরাজ্যের কানুন । 

বালকটি এই শর্তে রাজি হল । কাজেই সবকিছু যখন ভালোয় ভালোয় এবং তার পছন্দমাফিক হল তখন সে পরীরাজার পায়ের বাধন খুলে দিল, তাকে স্বৰ্গরাজ্যে চলে যাবার অনুমতি দিল। হাসটি তখন তার বিশাল পাখা-দুটি মেলে আকাশে উড়াল দিল। আকাশে কিছুক্ষণ চক্কর দিয়ে সে সোজা উপরের দিকে উঠতে লাগল। তারপর এক সময় একটি বিন্দুর মতো হয়ে আকাশে অদৃশ্য হয়ে গেল। 

বিকেলে বালকটিও তার চমরী গরু নিয়ে মা-বাবার কাছে ফিরে এল । পাতিহাঁস নীল আকাশ পাড়ি দিয়ে স্বৰ্গরাজ্যে গিয়ে পৌছল। সেখানে গিয়ে সে তার হাঁসের পোশাক খুলে পরীদের রাজা হয়ে গেল। সিংহাসনে গিয়ে বসল। তারপর তিন রাজকন্যাকে ডেকে পাঠাল। ওরা এলে সে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল ওদের । তারপর মেজ রাজকন্যাকে আদেশ দিল মর্ত্যের মানুষকে বিয়ে করার প্রস্তুতি নিতে । শুনে রাজকন্যা খুব কাঁদল। কিন্তু রাজার আদেশ তাকে পালন করতেই হবে। তখন সে তার বিবাহের উপযোগী প্রচুর পোশাক, সোনা, রুপো এবং মনিরত্ন গুছিয়ে নিতে শুরু করল ।

পরদিন ঠিক একই সময়ে বালকটি হদের তীরে উপস্থিত হল এবং তার নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে বসল। একটু পরেই সে দেখতে পেল দুটি হাঁস আকাশ থেকে উড়ে তার দিকে আসতে লাগল। মাটিতে নামার সঙ্গে সঙ্গে তারা পরীর রাজা ও রাজকন্যা হয়ে গেল। সুন্দরী রাজকন্যাকে দেখে বালকটি মুগ্ধ হয়ে গেল। কিন্তু রাজকন্যা তার বিকলাঙ্গ মাথা দেখে ভয়ে চোখ বুজে ফেলল। 

তারপর চোখ খুলে তার বাবাকে বলল তাকে যেন এখুনি পরীর দেশে নিয়ে যায়। কিন্তু রাজা তো তা করতে পারে না, সে বালকটিকে কথা দিয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী তাকে বালকের হাতে তুলে দিতে হবে বিয়ের জন্য। হয়ে আকাশে উড়াল দিল এবং স্বৰ্গরাজ্যে ফিরে গেল। 

বালকটি তখন তার হবু পত্নী রাজকন্যাকে নিয়ে মা-বাবার কাছে ফিরে গিয়ে সব কথা খুলে বলল। পরদিন ধুমধাম করে তাদের বিয়ে হয়ে গেল। এদিকে পরী রাজকন্যা তার অলৌকিক ক্ষমতা বলে একটি চমৎকার রাজপ্রাসাদ তৈরি করল । মনের মতো দামী দামী আসবাবপত্র দিয়ে প্রাসাদ সাজিয়ে নিল। এমন বিলাসবহুল বাড়ি বালকটি কখনো দেখে নি এবং কল্পনাও করে নি। তাছাড়া রাজকন্যা হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, দারোয়ান, চাকর-চাকরানি ইত্যাদি যা যা দরকার সব ব্যবস্থা করল। এভাবে তারা সুখের জীবন শুরু করল। 

বুড়ো মা-বাবাকে নিয়ে তারা পরম সুখে কয়েক বছর কাটিয়ে দিল । আর যতই দিন যেতে লাগল রাজকন্যা তার বিকলাঙ্গ স্বামীর সঙ্গে ঘর করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠল। দিনে দিনে রাজকন্যাও তার স্বামীর প্রতি অনুরক্ত হয়ে যেতে লাগল। তাকে ভালোবেসে ফেলল ।
এভাবে দিন, মাস, বছর গড়িয়ে নয়টি বছর শেষ হয়ে এল। সেই তরুণ বালক এখন পরিপূর্ণ যুবক। সে তার পত্নীর সঙ্গে এতগুলো বছর সুখে কাটাতে কাটাতে পরীর রাজার কথা যে অক্ষরে অক্ষরে সত্য হবে তা ভুলে গেল। আর এরি মধ্যে কখন শেষ রাতটি এসে গেল তাও তার হিসেবের মধ্যে রইল না। অন্যান্য রাতগুলোর মতো শেষ রাতটিতেও সে নিয়মমাফিক চমৎকার পোশাক পরে শুতে গেল। সুসজ্জিত তাদের শোবার ঘর। সোনার কারুকাজ করা রেশমী পোশাক তার গায়ে । চারদিকে অঢেল সম্পদ ও বিলাসবহুল আসবাবপত্র। ওরা ঘুমিয়ে পড়ল ।

সে রাতে তার খুব ভালো ঘুম হল । কিন্তু সকালে ঘুম থেকে জেগেই সে চারদিক দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল। সে ভীষণ ভয় পেয়ে বসে পড়ল! কোথায় তার সেই চমৎকার বিলাসবহুল পালঙ্ক! কোথায় গেল দাস-দাসিরা, যারা তার ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে ফরমাস খাটতে ছুটে আসত। তার বদলে সে মাটির উপরে বসে আছে। সেই প্রথমবার যেখানে পরীর রাজার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, কথা বলেছিল, সেই পাহাড়ের নিচে সে একা বসে আছে। 

বিস্ময়ের ঘোর কাটতেই চাইছে না। তার রাজপ্রাসাদ, নফর-দারোয়ান, ঘোড়া, মূল্যবান আসবাব এবং সবচেয়ে দুঃখের বিষয় তার সুন্দর বউটি কই? এক রাতের মধ্যে সব হঠাৎ উধাও? স্মৃতি ছাড়া অন্য সবকিছু এভাবে বিলীন হয়ে গেল? অর্ধ-বিমূঢ় ও অর্ধ-বিরক্তি নিয়ে সে দৌড় শুরু করল, যেন সুখ কোন দিকে পালিয়ে গেছে ধরতে ছুটছে! কিছুদিন ধরে সে ঠিক মতো বুঝতে পারছিল না কী সে খুঁজছে বা কী করছে! শেষে একদিন সে বিশাল এক হ্রদের সামনে এসে পৌছল। 
হ্রদের জায়গায় একটি ছোট চূড়া। সেখানে সে একটি বড় বাসা দেখতে পেল। সেই বাসায় কয়েকটি অদ্ভুত পাখির ছানা বসে আছে, সেগুলো আবার অস্বাভাবিক বড়। প্রথমে সে বুঝতে পারল সেগুলো গ্রিফিন পাখির ছানা। তাদের মাথা ও পাখা ঈগলের মতো কিন্তু শরীর হল সিংহের মতো। সে বুঝতে পারল ওদের মা-বাবা খাবার আনতে গেছে । হ্রদের কূলে দাঁড়িয়ে সে পাখির বাচ্চাগুলোকে দেখতে লাগল। 

এমন সময় ওরা হঠাৎ ভয় পেয়ে চেচামেচি শুরু করে দিল । একে অন্যকে পাখার ঝাপটা মারতে লাগল, মরণ ভয়ে ডাকতে লাগল, কিন্তু উড়তে জানে না বলে বাসার মধ্যে দাপাদাপি করছিল। এর কারণ জানার জন্য সে পাহাড়ে কিছু দেখতে না পেয়ে হ্রদের দিকে চোখ ফেরাল। তখন সে দেখতে পেল একটা বিশাল ড্রাগন হ্রদ থেকে মাথা তুলে গ্রিফিন পাখির বাসার দিকে ছুটে আসছে। সে বুঝতে পারল ড্রাগনটির লক্ষ পাখির বাচ্চাগুলো খাওয়া। সে সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করল পাখির বাচ্চাগুলোকে ড্রাগনের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। সে তখন কোমর থেকে তলোয়ার খুলে দাড়িয়ে রইল ড্রাগনটির কূলে ওঠার অপেক্ষায় । তারপর ড্রাগনটি কূলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সে তড়িৎ গতিতে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রচণ্ড লড়াই হল তাদের মধ্যে। শেষে যুবকটি জয়ী হল, বিদ্যুৎ গতিতে তলোয়ারের এক প্রচণ্ড কোপে সে ড্রাগনের শরীর থেকে মাথাটি বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। ড্রাগনটি মরে কূলের উপর পড়ে রইল।

 ড্রাগনটি মরার একটু পরেই আকাশ কালো করে দুটি পাখি তার মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল । সে দেখল বাচ্চাগুলোর মা ও বাবা বাসায় গিয়ে বসেছে। বসার সঙ্গে বাচ্চাগুলো তাদের মা-বাবাকে একটু আগে ঘটে যাওয়া ভীষণ যুদ্ধের কথা বলতে লাগল। ড্রাগনটি কেমন করে হ্রদ থেকে ছুটে এসে তাদের খাওয়ার জন্য কূলে উঠল এবং কূলের ওপর যুবকটি তলোয়ার দিয়ে কী অসীম সাহসে লড়াই করল সব একে একে বলল। 

এই কাহিনী শুনে গ্রিফিন মা-বাবা যুবকটির দিকে তাকাল। যুবকটিও তখন কৌতুহল নিয়ে দেখছিল গ্রিফিন বাচ্চা ও মা-বাবার কাণ্ড । তারা কী করছে এবং তারপর কী করে দেখার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল । 

বাবা গ্রিফিন তখন বলল, শোনো আমার ছানাপোনার মা, তুমি কি কখনো হ্রদের কূলে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাণীটির মতো কাউকে আগে দেখেছ? 

মা গ্রিফিন উত্তরে বলল, 'না, আমার ছানাপোনার বাবাটি। তবে দেখে মনে হচ্ছে সে খুব সাহসী এবং ভালো। তাছাড়া আমি আরও দেখতে পাচ্ছি তার কোনো চক্ষু নেই আর আমাদের মতো তীক্ষ্ণ বাকা নোখও নেই। কাজেই আমার মনে হয় ওকে আমাদের বাসায় আমন্ত্রণ করা যায়। আমাদের বাচ্চাদের রক্ষা করার জন্য তাকে আমাদের অতিথি হতে বলা উচিত এবং তখন তাকে আমরা ধন্যবাদ জানাতে পারব |" 

বাবা গ্রিফিন একথায় রাজি হল আর সঙ্গে সঙ্গে পাখা মেলে যুবকের সামনে এসে নামল । তখন সে যুবককে তার বাসায় আসার জন্য নিমন্ত্রণ জানাল। যুবকও তার আমন্ত্রণ গ্রহণ করল । তারপর বাবা গ্রিফিন যখন জানতে পারল যে যুবক উড়তে পারে না তখন সে তাকে তার পিঠে নিয়ে বাসায় ফিরে এল। সেখানে যুবকটি চমৎকার নৈশভোজ শেষ করল । 

তারপর যুবক তার সমস্ত কাহিনী প্রথম থেকে বলে গ্রিফিনদের শোনাল। তার সুখের কাহিনী ও পরী রাজকন্যাকে হারানোর দুঃখের কাহিনী শুনে গ্রিফিনরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল । 

বাবা গ্রিফিন প্রথমে মুখ খুলল। সে বলল, “তোমার জীবনের ঘটনা বড় করুণ। আমার মনে হয় তোমার প্রতি সুবিচার হয় নি। তবে তুমি যদি ইচ্ছা করো আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি। আমি বলব, তুমি আমার পিঠে চড়ে বসো, আমি তোমাকে পরীর দেশে উড়িয়ে নিয়ে যাব। সেখানে তুমি তোমার ফরিয়াদ নিজের মুখে পরীর রাজাকে জানাতে পারবে। এমনকি তোমার স্ত্রীকে তোমার সঙ্গে আসার জন্য বলার সুযোগও পাবে, তোমার যুক্তিও নিজের মুখে তাকে জানাতে পারবে। আর তোমার সঙ্গে তাকে নিয়েও আসতে পারবে ।”

গ্রিফিনের কথা শুনে যুবক রাজি হল । সে গ্রিফিনের পিঠে চড়ে বসল। বিশাল গ্রিফিন তার পাখা-দুটি মেলে সোজা নীল আকাশে ছুটে চলল। 

আস্তে আস্তে পৃথিবী ছোট হতে হতে যুবকের চোখ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। তারপরও গ্রিফিন উড়ে চলল। কতক্ষণ চলল কে জানে, একসময় তারা স্বৰ্গ-রাজ্যে পৌছে গেল। তারা সোনার তোরণ দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল এবং সোজা রাজসভায় গিয়ে নামল । 

সেখানে তখন কয়েকজন দেবতা, পরী এবং আকাশবাসী বসে আছে। দেবতারা যখন তাদের মাঝখানে একজন মানুষকে দেখতে পেল তখন তারা ভীষণ রেগে গেল। তারা গ্রিফিনকে ভৎসনা করে বলল কেন সে এই কাজটি করল । 

তারা বলল, তুমি কোন সাহসে আমাদের সামনে পৃথিবীর বাসিন্দাকে নিয়ে এলে? তুমি জানো যে মানুষ আমাদের তুলনায় কত নিকৃষ্ট প্রাণী । মানুষ আমাদের কাছে অত্যন্ত বিরক্তিকর এবং ঘূণ্য। তুমি এই স্বর্গভূমিতে তাকে আনার এত সাহস পেলে কী করে? 

গ্রিফিন তাদের কথায় একটুও ভয় পেল না। বরং সে তাদের কথার জবাব দিল অত্যন্ত সাহসিকতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে। সে বলল, এই যুবক মানুষটি অত্যন্ত সাহসী ও দয়ালু। সে আমার ছেলেদের ড্রাগনের হাত থেকে বাঁচিয়েছে নিজের জীবনের মায়া না করে। 

তারপর সে যুবকের সমস্ত কাহিনী প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বলল। নয় বছর সে যার সঙ্গে সুখে ঘর করেছে সে এখন কেন বউয়ের সঙ্গে ঘর করতে পারবে না? তার বউ, ঘরবাড়ি, ধন-সম্পদ এবং অন্যান্য সবকিছু পেয়েছে পরীরাজার ইচ্ছায়। তাহলে এখন কেন সে সেসব থেকে বঞ্চিত হবে? এটা তার জন্য অপমানজনক এবং তার প্রতি অবিচার করা হয়েছে বলা যায়। এজন্যই আমি তাকে এখানে নিয়ে এসেছি, তার জন্য ওকালতি করছি, ন্যায় বিচারের স্বার্থে আমি তার অধিকার দাবি করছি।’ 

এসব কথা যখন চলছিল তখন যুবকের স্ত্রী আড়াল থেকে সব শুনছিল। কিন্তু স্বামীর কাছে ছুটে যাওয়ার সাহস পাচ্ছিল না দেবতাদের ভয়ে। কিন্তু আর বেশিক্ষণ সে নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে আমনি তার স্বামীর কাছে ছুটে গিয়ে তার বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গেল। তারপর কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল সে তার স্বামীকে কত ভালোবাসে । এখন সে তার স্বামীর সঙ্গে মর্ত্যে ফিরে যেতে চায়। তার বাবা, পরীদের রাজা যখন এসব কথা শুনল তখন সে ঠিক করতে পারছিল না কী করবে। তবে এরি মধ্যে ঠিক হয়ে গেল যে, এই বিষয়টি নিয়ে দেবতাদের একটি বৈঠক হবে এবং সেখানে এই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। 

কাজেই স্বৰ্গরাজ্যের মহারথীদের সভা বসল। সমস্ত বিষয় নিয়ে আদ্যোপান্ত আলোচনা হল । শেষ পর্যন্ত স্থির হল যে, পরী রাজনক্যা যেহেতু নিজেই মর্ত্যে যেতে আগ্রহী তখন তার স্বাধীন ইচ্ছায় বাধা দেওয়া উচিত নয়। তবে সে যদি মর্ত্যে যায় তাহলে তাকে তার কাজের পরিণামে যা আসে তা ভোগ করতে হবে। আর সে যেহেতু মরণশীল মানুষের ঘরে যাবে তখন সেও হবে মরণশীল, পরীদের মতো সে আর অমর থাকবে না।

শুনে পরী রাজকন্যা আনন্দে তার সম্মতি জানিয়ে দিল । সঙ্গে সঙ্গে সে ও তার স্বামী গ্রিফিনের পিঠের উপর উঠে বসল। গ্রিফিন তার বিশাল পাখা বিস্তার করে স্বৰ্গরাজ্যের সোনার তোরণ দিয়ে, সুনীল স্বর্গ ও নীল আকাশ পথে পৃথিবীতে নেমে এল। গ্রিফিন তাদের দু'জনকে তাদের পুরনো বাড়ির সামনে নামিয়ে দিল । তারপর তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের নীড়ে ফিরে এল ।

পরী রাজকন্যা তার স্বগীয় শক্তি হারিয়ে ফেললেও তারা দু জনে সুখে সংসার করেছিল দীর্ঘকাল। সেই সুখের কাহিনী এজন্যই এখনও লোকের মুখে জীবন্ত হয়ে আছে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য