কৃতজ্ঞ, অকৃতজ্ঞ

সম্রাট আকবর একদিন হঠাৎ বীরবলকে ডেকে পাঠালেন দূত মারফত। শাসন ব্যাপারের গুরুতর কার্যে বীরবল বিশেষ ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও হস্তদন্ত হয়ে এসে দাঁড়ালেন। বীরবলের বিরুদ্ধে নানা দুষ্ট লোকের কথা বাদশার কানে উঠেছিল। তিনি ডেকে পাঠিয়েছি, তোমার সঙ্গে বিশেষ কথা আছে।’ 
তমুখে বীরবল বললেন, “আদেশ করুন প্রভু, কী কথা?”
‘দুটি এমন জন্তুকে তুমি আমার সামনে এনে হাজির করবে, তার মধ্যে একটি হবে স্বভাবকৃতজ্ঞ, আরেকটি হবে জাত-কৃতজ্ঞ! যাও— শীঘ্ৰ নিয়ে এসো।’
বীরবল তবু দাঁড়িয়ে। বাদশ ক্রুদ্ধকষ্ঠে পুনরায় বললেন, শুনতে পেয়েছ? আগামীকালই দুটি জন্তুকে তুমি ধরে আনবে মনে থাকে যেন। 

মুখ তুলে বীরবল, এ আমার পক্ষে সম্ভব নয় হুজুর, আমি অপারগ।" 
‘সে-কথা আজ শুনতে চাই না। কাল যদি না আনতে পারো, তবে মৃত্যুদণ্ডের জন্য তুমি প্রস্তুত হয়ে এসো। বাদশা এ-কথা বলে হনহন করে সেখান থেকে চলে গেলেন, অন্দরমহলের দিকে। তৎক্ষণাৎ খবর রটে গেল চারদিকে। রাজদরবারে বীরবলের ওপর যত বিদ্বেষপরায়ণ জেনে খুশি হলেন মনে মনে। বীরবল তাদের পথের কাঁটা। অনেকে বাড়ি ফিরে আনন্দ উৎসবে মত্ত হলেন। বীরবলের আর রক্ষা নেই। এবার বীরবল কুপোকাত হবেনই। বাদশা যা আদেশ দিয়েছেন তা জোগাড় করা অসম্ভব! বীরবল নিশ্চয়ই পারবেন না।’ এই বলে সভাসদরা পরস্পরের মুখের পানে চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলেন ও মনে মনে আনন্দিত হয়ে সভা ত্যাগ করে চলে গেলেন। 

বীরবল রাজসভা থেকে বেরিয়ে সোজা বাড়ি না গিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। অবশেষে কোনও সুরাহা করতে না পেরে বাড়ি ফিরে না খেয়ে সমস্ত রাত জেগে অসীম দুশ্চিন্তা নিয়ে কাটালেন। সেদিন ছিল জামাইষষ্ঠী। বীরবলের জামাই এসেছে, ভাল ভূরিভোজের আয়োজন হয়েছে তার ঘরে, অনেক উপহার আর পরিচ্ছদ আনা হয়েছে জামাইয়ের জন্য বাড়িতে এত উৎসব-আয়োজন কিন্তু বীরবলের মনে কোনও আনন্দ নেই। কেবল দুশ্চিন্তা আর দুশ্চিন্তা

অনেক ভেবেচিন্তে পরদিন রাজদরবারে যাওয়ার সময় বীরবল জামাইকে ডেকে বললেন,‘ বাবাজি, একবার আমার সঙ্গে চলো তো যাই।’ 
জামাই সেজেগুজে সঙ্গে চলল। যাওয়ার সময় বীরবল তার পোষা কুকুরটিকেও সঙ্গে নিতে ভুল করলেন না। বাদশার খাস দরবার আজ লোকে লোকারণ্য। বীরবলের পরাজয় এবং মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা স্বচক্ষে দেখবার জন্য অনেক ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি উদগ্রীব হয়ে প্রতীক্ষা করছিলেন। 
এমন সময় দরবারে এসে প্রবেশ করলেন বীরবল। সিংহাসনে বাদশা বসে ছিলেন। কুকুরটা এসে ঢুকতেই তিনি অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে বীরবলের কাছে কৈফিয়ত তলব করলেন, “এ কী, এ কী বীরবল!' 
দূর থেকে বীরবল তার উদ্দেশ্যে লম্বা কুর্নিশ জানিয়ে বললেন, ‘হুজুর আপনার আদেশমতো এই দুটি জন্তুকে এনে হাজির করেছি আপনার এই রাজসভায়।’ “জন্তু!—বাদশা উচ্চকণ্ঠে বললেন, “আমার সঙ্গে এমন বেয়াড়া তামাশা? আমাকে অপমান করার স্পর্ধা তোমার কী করে হল ?’ 
বীরবল বললেন, ‘প্রসন্ন হন জাঁহাপনা—এ আমার তামাশা নয়। আপনাকে অপমান করার স্পর্ধা সত্যিই নেই আমার। সত্যিই বলছি, দয়া করে শুনুন। এই দুটি জন্তুর একটি হল আমার জামাই। পৃথিবীতে যা কিছু শ্রেষ্ঠ উপহার, শ্রেষ্ঠ
খাদ্য, শ্রেষ্ঠ পরিচ্ছদ ওকে দিন, তবু ওর লোভ মিটবে না, তবু কৃতজ্ঞ থাকবে না কোনওদিন। এত বড় জাত-অকৃতজ্ঞ জন্তু পৃথিবীতে আর, কেউ কি আছে সম্রাট? কিন্তু এই কুকুরটির দিকে চেয়ে দেখুন—মূর্তিমান কৃতজ্ঞতা। আপদেবিপদে, সম্পদে, সমানে প্রভুর পাশে দাঁড়িয়ে আছে আকাশ ভেঙে পড়ুক, ঝড়-বৃষ্টি হোক, ভূমিকম্প হােক, যদি ও বেঁচে থাকে সমস্ত বাঁধা-বিপত্তি মাথায় নিয়ে ও আপনার কাছ থেকে যাবেই না, বা সঙ্গ ছাড়বে না প্রভুর কোনওদিন। । সামান্য একটু আহার হলেই ও খুশি থাকবে।’ 
সম্রাট আকবরের মুখ প্রসন্ন হল। রাজসভা একেবারে স্তব্ধ। দুষ্ট ব্যক্তিদের মুখ মলিন হয়ে গেল, কী হতে কী হল! বাদশা তখন জল্লাদকে হুকুম করলেন, অকৃতজ্ঞ ব্যক্তির ঠাঁই এ রাজ্যে নেই। তুমি বীরবলের জামাইকে নিয়ে যাও, ওকে কোতল করে ওর ছিন্ন মুণ্ড নিয়ে এসো।’ 
‘দাঁড়ান সম্রাট!—হেসে বীরবল সভয়ে বলে উঠলেন, আপনি পৃথিবীর ঈশ্বর, আপনার হুকুম পৃথিবীর সকল অকৃতজ্ঞ ব্যক্তিরই জন্য। কিন্তু জাঁহাপনা, আমরা যে প্রত্যেকেই কারও না কারওর জামাই, সে-কথা ভুললে চলবে কেন? সম্রাট উচ্চহাস্যে এই কৌতুকরস উপভোগ করলেন এবং বীরবল প্রচুর পরিমাণে পারিতোষিক পেয়ে বাড়ি ফিরলেন সেদিন। সম্রাট যারপরনাই খুশি হয়ে বীরবলকে বাহবা দিলেন। জামাইয়ের মুখও প্রসন্ন হল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য