জীবরামের ঘোড়াই ভ্রমণ-- হিমানীশ গোস্বামী

বাংলা বিহার সীমান্তে ঘোড়াই গ্রাম, সেখানে কলেজে গরমের ছুটিতে জীবরাম তার বন্ধু পর্বতের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। সপ্তাহ তিনেক পর ফিরে এলে মা জিজ্ঞেস করলেন “ঘোড়াই কেমন লাগল ?’ 

“ঘোরাই সার হল।” বলল জীবরাম। 
“ঘোরাই সার হল, মানে ?” 
জীবরাম বলল, “মা, ঘোড়াই জায়গাটা খারাপ নয়, তবে খুব সাপ সেখানে।” 
মা শিউরে উঠে বললেন, “তোকে কামড়ায়নি তো?” জীবরাম বলল, “ওখানে যে সাপ বেশি আছে সে হল ময়াল। ওরা কামড়ায় না, গেলে।” 
“গেলে ? সে কীরকম?”
“সে মা তুমি না গেলে বুঝতে পারবে না। ঘোড়াই গ্রামের আশপাশে জঙ্গল আছে ভালই। ময়াল সাপ সেখানে প্রচুর। ময়াল অধুষিতও বলা যায়। ময়ালরা ওই অঞ্চলকে যেন দূষিত করে রেখেছে। গ্রামের লোকেরা মাঠে ছাগল চরায়, তা ছাড়া চড়ায়ও ছাগল চরায়।” 
“মানে ? চড়ায়ও ছাগল চরায় মানে কী?” 
“ঘোড়াইয়ের পাশে একটা নদী আছে, বর্ষায় জল থইথই করে কিন্তু এখন মধ্যে মধ্যে চড়া, গ্রামের লোকেরা সেখানেই ছাগল চরায়। প্রচুর তরমুজ হয় ওই চড়ায় আর কচি ঘাস। মা কী চমৎকার সবুজ ঘাস!” 
“চড়ায় গিয়েছিলি নাকি তুই?”
“তা গিয়েছিলাম, কিন্তু বেশিক্ষণ থাকা যায়নি চড়ায়। সকালে গিয়েছিলাম, কিন্তু একটু পরেই চড়া রোদুরে এসে যেন ফটাফট চড় বসিয়ে দেয়। মা এই চরাচরে যে কতরকম সব আছে ভেবে অবাক হই। মা, ওই ঘোড়াই গ্রামে প্রায়ই দেখা যায় লোকেরা সাপমোচনে ব্যস্ত।” 
“শাপমোচনে ব্যস্ত ? সেটা আবার কী রে?” 
“শাপমোচন নয়, সাপ মোচন। দন্ত্য স-এর ব্যাপার। ময়ালরা জঙ্গলের হরিণ খরগোশ সব খেয়ে শেষ করে এখন নজর দিয়েছে গ্রামের ছাগলদের ওপর। ময়ালরা গ্রামে ঢুকে ছাগলদের পেঁচাতে থাকে। পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে তাদের খতম করার পর গিলতে থাকে। ওই সময়, মানে ছাগল বেঁচে থাকতে থাকতেই গ্রামের লোকেরা সাপ মোচন করার চেষ্টা করে। এমন দৃশ্য আকছার দেখা যায়।” 

মা শঙ্কিত হন। বলেন, “সর্বনাশ!” 
জীবরাম বলে, “লোকেরা ছাগল উদ্ধার করে। বেঁচে থাকলে তো ভালই, না বেঁচে থাকলে তাদের আনন্দ আরও বাড়ে।” 
কেন, আনন্দ বাড়ে কেন?”
“মা, সেটা বোঝা কঠিন নয়। যে মুহুর্তে ছাগলটাকে দেখে সেটা মারা গেছে, সঙ্গে-সঙ্গে গ্রামবাসীরা সেটাকে কেটে টুকরো টুকরো করে রান্নাবান্না করে খায়।”

 “তা হলে তো সাঙ্ঘাতিক গ্রাম তো ওই ঘোড়াই গ্রাম। তা আর কী দেখলি সব বল।” 

“মা, সব কথা তোমাকে বললে তোমার ভয় করবে। আমি থাকতে থাকতেই দেখলাম অন্তত কুড়িপঁচিশ জন ভেকধারী।” 

“সে আর এমন কথা কী জীবরাম, ভেকধারীতে দেশ ভরে গেল। জানিস তো আমার বোন এক সাধুর পাল্লায় পড়েছিল—দশ হাজার টাকা গচ্চা দেওয়ার পর বোঝা গেল লোকটা আসল সাধু নয়, ভেকধারী। যতসব বাজে লোক আজকাল ভেক ধরে সাধু হচ্ছে!” 

জীবরাম বলল, “ঘোড়াইয়ের ভেকধারীরা কিন্তু বাজে লোক নয়। বড় গরিব। তারা পুকুরে পুকুরে ঘোরে আর কেউ পঁচিশটা কেউ ত্রিশটা করে ভেক ধরে। ধরে ওদিকে পাটনা এদিকে কলকাতায় চালান দেয়। এক-একটা ভেক বিক্রি করে দু-তিন টাকা পায়।” 

“ও মা! তুই ভেকধারীর কথা বলছিলি তো। এ আবার কী কথা, ভেক কী রে?” 
জীবরাম হাসল। বলল, “বাঙ!” 

জীবরামের মা বলেন, “তোকে নিয়ে আর পারি না। তা তুই বলছিলি যে ঘোড়াইয়ে যা সব দেখেছিস তা শুনলে আমার ভয় করবে? তা পর্বতদের বাড়ি কেমন, লোকজন ভাল তো?”

“ভাল, খুব ভাল। তবে পর্বতের বাবা সরোবরমেসোর মনমেজাজ খুব খারাপ ছিল, কেননা সম্প্রতি তিনি গুরুত্ব হারিয়েছিলেন।”

“গুরুত্ব হারিয়েছিলেন সরোবরমেসো? কী ব্যাপার?”
“মা, সরোবরমেসো ঘোড়াইয়ের একটা ইস্কুলে কাজ করতেন। হেডমাস্টারের সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় তাকে ইস্কুলের কাজ ছেড়ে দিতে হয়। অর্থাৎ তিনি গুরুত্ব হারান।”

“সে আবার কী!” মায়ের প্রশ্ন।

“বুঝলে না মা, উনি আর গুরুর কাজে বহাল রইলেন না, কিন্তু তাতে কিছু অবশ্য এসে যায় না পয়সার দিক দিয়ে। সরোবরমেসো এর পর ছাত্র না চরিয়ে গোরু চরানো স্থির করলেন। প্রথমে মনখারাপ হলেও পরে দেখলেন ছাত্র চরানোর চেয়ে গরু চরানো অনেক সহজ। তা ছাড়া ছাত্র চরাতে গেলে কিছু চড়ানো না হলে ছাত্র মানুষ হয় না, এদিকে ছাত্রকে চড়াতে গেলেই ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। হেডমাস্টার এসে বলেন ছাত্র চরানো ঠিক আছে, কিন্তু চড়ানো চলবে না। চড়া কণ্ঠে হেডমাস্টারমশাই সরোবরমেসোকে বলেন। আজকাল নাকি দিনকাল বদলেছে, আগে ইস্কুলে চড়চাপড় মারার একটা সুষ্ঠু ব্যবস্থা ছিল, কিন্তু এখন সেই সুব্যবস্থা উঠে গেছে। শুনে সরোবরমেসোর মেজাজ চড়া হয়ে উঠল, তিনিও বললেন বিদ্যাচর্চার মূল কথা হচ্ছে চড়চাপড়, তা না হলে বিদ্যার বিস্তার বা বিকাশ ঘটে না। ছাত্রদের মূর্খ করে রাখতে হলে অবশ্য আলাদা কথা। এর পর তার মন খুবই খারাপ হয় গুরুত্ব হারিয়ে, কিন্তু তারপরই ছাত্র চরানোর বদলে গরু চরানো শুরু করেন, এবং আশ্চর্য হয়ে দেখেন এতে পরিশ্রম অনেক কম, গোরুদের সহ্যশক্তিও ভাল, তাদের চড়চাপড় মারলে খুব দুঃখিত বা অপমানিতও হয় না, সবচেয়ে বড় কথা এই যে, দুশো ছাত্র পড়িয়ে তিনি যা উপার্জন করতেন, পনেরোটা গোরু চরিয়ে তার উপার্জন ছ-সাত গুণ বেড়ে গেল।”

মা বললেন, “বাড়িতে আর কারা আছেন?”
“আর আছেন সর্বময়দা।”
“কী ময়দা ?”
“ময়দা নয় মা, সর্বময়দা। আমরা তাকে সর্বদা বলতাম।”
“সর্বদা কী বলতিস।”
“সর্বদা বলতাম।”
মা বিরক্ত হলেন। বললেন, “সর্বদা কী বলতিস জিজ্ঞাসা করলাম, ঠিকমতো উত্তর না দিয়ে কীসব যা-তা বলছিস। সর্বদা কী বললি ?”
“বাঃ, আমি তো ঠিকই বলছি।” বলল জীবরাম। “সর্বময়দা নামটা বড় বলে কেবল সর্ব বলত সবাই। পর্বত আর আমি ডাকতাম সর্বদা বলে।” বলে জীবরাম ঘোত করে একটু হাসল। এ হচ্ছে তার এক তৃপ্তির হাসি, ঠকিয়ে আনন্দ পাওয়ার হাসি।
মা বললেন, “শুয়োর ছিলি নাকি আগের জন্মে ?”
“কেন মা ?”
“প্রায়শ ঘোত ঘোত আওয়াজ করিস যে বড়।”
জীবরাম বলল, “তা সে দোষ কি আমার নাকি। তোমরাই তো আমার নাম দিয়েছ জীবরাম। ওর মধ্যেই শুয়োর একটা লুকিয়ে আছে যে।”

জীবরাম বলল, “এমনিতে ভালই ছিলাম, কেবল একদিন খুব জলাতঙ্ক হয়েছিল।” 
“তার মানেটা কী? জলাতঙ্ক কি একদিনের অসুখ নাকি? তা ছাড়া জলাতঙ্ক হলে কেউ কি বাঁচে? যতসব আজেবাজে কথা।” 

জীবরাম বলল, “আমি আজেবাজে কথা বললাম কোথায় ? কখনওই বাজে কথা বলিনি। কেবল আমার নয়, ওই অঞ্চলের চার-পাঁচ হাজার লোকের জলাতঙ্ক হয়েছিল।” 

মা এবারে হা হা করে হাসলেন। বললেন, “চুপ কর জিবু। আমাকে আর ভয় দেখাতে হবে না।” 

জীবরাম বলল, “আমার কথা শোনো তা হলেই বুঝতে পারবে। ঘোড়াই থেকে পনেরো কিলোমিটার দূরে একটা বাঁধ আছে। একদিন বিকেলে সেটাতে বড় একটা ফাটল দেখা দিল, হুড়মুড় করে জল বেরোতে লাগল। সে জলের বেগ খুব বেশি। কত গ্রাম জলে ভেসে গেল। ঘোড়াইতেও বেশ জল এল, লোকেরা ভাবল এবারে সব ডুববে। জলের ভয়ে আমার সব অস্থির! লোকেরা সব আতঙ্কিত! হাজার হাজার লোক আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে গেল উচু জায়গার সন্ধানে। তবে এটা ভাল যে, ওই বাঁধে খুব বেশি জল না-থাকায় জলের বেগ গেল কমে, আস্তে আস্তে জল সরে গেল, আর আমরাও সব জলাতঙ্ক থেকে বেঁচে গেলাম। বুঝলে মা?” 

“একেবারে জলের মতো!” তারপর একটু থেমে বললেন, “নে, অনেক বেলা হয়েছে, খেয়ে নে।” 

জীবরাম বলল, “মা, আমার তোমার তৈরি ফুডবল খেতে ইচ্ছে করে খুব। কতদিন খাই না!” 
মা বললেন, “ফুটবল খাবি কী রে?” 
জীবরাম বলল, “ফুটবল নয় মা, ফুডবল। ওই যে তুমি ভাত মেখে গোল গোল দলা করে খাওয়াতে, সেই ফুডবল!” মা হেসে বললেন, “ভাত মেখে গোল গোল দলা করে খাওয়াব, সে আর এমন বেশি কথা কী! খেতে বসবি আয়!” 
“মা তুমি যে বলো দলাদলি খুব খারাপ ? কিন্তু তোমার হাতের ভাতের দলাদলি খুব ভাল।” 
“খুব হয়েছে কথা, এখন চুপচাপ খেতে বসে যা।” জীবরাম হাসিমুখে খেতে বসল।


[--হিমানীশ গোস্বামী]
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য