সত্যকার আলসে - বাংলাদেশের লোককাহিনী

     আগেকার দিনে রাজা-বাদশাদের নানারকমের অদ্ভুত খেয়াল থাকিত। এখনকার মতো দেশের অর্থ ব্যয় করিতে তাহাদের কাহারও কাছে কোনো জবাবদিহি করিতে হইত না । তাই খেয়াল খুশিমতো তাহারা টাকা-পয়সা খরচ করিতেন। এখনকার রাজারা কিন্তু এরূপ পারে না । 
     তখন প্রত্যেক রাজবাড়িতে কতকগুলি অলস লোক থাকিত । প্রতিযোগিতাও হইত। রাজারা আলসেখানায় সেই অলস লোকগুলিকে দেখিয়া বড়ই আমোদ পাইতেন।অলস লোকদের লইয়া রাজায় রাজায় আবার প্রতিযোগীতাও হইত। কোনো রাজার আলসে খানায়  যদি সবচাইতে খুব নামকরা আলসে থাকিত, সেই রাজার খুব সুনাম হইত।
     সেবার দেখা গেল, রাজার রাজ্যের যত লোক কেহ কাজ করে না। সকলে আসিয়া জুটিয়াছে রাজার আলসেখানায়। কারণ সেখানে আসিলেই যত খুশি ভাতমাছ দুধ-মাখন খাইতে পাওয়া যায়। কে আর কাজ করে! রাজা মুশকিলে পড়িলেন। 
     তিনি মন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “দেখরে মন্ত্রী ! আমার রাজ্যে কেহই কাজ করে না । সকলেই আলসেখানায় আসিয়া জুটিয়াছে। আলসেদের খাওয়াইতেই রাজস্বের সব খরচ হইয়া যায়। তুমি ইহার কোনো উপায় বলিতে পার ?” 
     মন্ত্রী হাতজোড় করিয়া কহিলেন, “মহারাজ! কোন চিন্তা করিবেন না। আমি ইহার প্রতিকার করিতেছি ।" 
     সেদিন দুপুরবেলা রাজার আলসেখানায় সকল অলস ব্যক্তি বিছানায় গড়াগড়ি যাইতেছে, এমন সময় মন্ত্রীর আদেশে আলসেখানার ঘরে আগুন দেওয়া হইল। আগুনের আঁচ পাইয়া একে একে সকল আলসে পালাইয়া গেল । 
     কিন্তু দুইজন আলসে যেমন শুইয়া ছিল, তেমনি শুইয়া রহিল, আগুন যখন তাদের মাথার উপর আসিয়াছে, তখন একজন আলসে গা মোড়ামুড়ি দিয়া দ্বিতীয় আলসেকে বলিল, “কত রবি জ্বলে!” (কেমন সূর্য জুলিতেছে !)



     দ্বিতীয় অলস ব্যক্তি যেমন শুইয়া ছিল, তেমনিভাবে শুইয়াই উত্তর করিল, “কেবা আঁখি মেলে।" (সূর্য উঠিয়াছে তাহাতে কি হইয়াছে ? কে চোখ মেলিয়া চাহিয়া দেখে ?)
     রাজা তখন বুঝিতে পারিলেন এই দুইজনই সত্যিকার আলসে। রাজার লোকেরা তখন ধরাধরি করিয়া সেই দুইজন অলস ব্যক্তিকে আগুনের হাত হইতে বাঁচাইল । সেই হইতে তাহারা দুইজনই মাত্র রাজার আলসেখানায় রহিল।
     পরে সব আলসে যার যার বাড়ি যাইয়া কাজকর্ম করিতে লাগিল ।

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য