বীরবলের উপস্থিত বুদ্ধি

একবার পারস্যের রাজা তাঁর দেশের পরিব্রাজক ও সওদাগরদের কাছ থেকে মোগল সাম্রাজ্যের কাহিনী শুনলেন। সন্দেহ নিরসনের জন্য আকবরের কাছে একজন দূত মারফত তিনি আকবরের এক মন্ত্রীকে তার রাজ্য পরিদর্শন করতে আমন্ত্রণ জানালেন এই ভেবে যে, তার কাছ থেকে মোগল সাম্রাজ্য সম্পর্কে বিস্তারিত খবর তিনি পাবেন। আকবর এই আমন্ত্রণে বীরবলকেই উপযুক্ত মনে হওয়ায় তাকেই পারস্যের রাজার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। 

তিনি জানতেন কেন পারস্যরাজ মন্ত্রী পাঠাতে চেয়েছেন। নিশ্চয়ই তার রাজ্যের সমৃদ্ধির কথা মন্ত্রীর মুখ থেকে শুনতে চান। একমাত্র বীরবলই এর উপযুক্ত। তিনি কোনও ভাবনাচিস্তা না করেই বীরবলকে পাঠালেন।

বীরবল পারস্যে আসার পর সে রাজ্যে মহা ধুমধাম পড়ে গেল ওই আমোদ-প্রমোদের আয়োজনও হল রাজ্যে। পারস্যরাজের অতিথি হয়ে বীরবল সারা দেশ ভ্রমণ করলেন। পারস্যের রাজা একদিন কথায় কথায় বীরবলকে প্রশ্ন করলেন, আপনি তো বিভিন্ন দেশ ঘুরেছেন। আপনি কি বলতে পারেন, অন্যান্য রাজার তুলনায় আমি কীরূপ? বিশেষ করে বাদশা আকবরের তুলনায়? 

বীরবল উত্তর দিলেন, “মহামান্য রাজন, আপনি পূর্ণ চন্দ্র অন্যান্যরা আপনার কাছে জোনাকি মাত্র। আকবর অর্ধচন্দ্রের মতো।’ পারস্যের রাজার প্রতি বীরবলের এই প্রশস্তিমূলক কথাটি অচিরেই বীরবল দিল্লি যাওয়ার আগেই আকবরের কানে উঠল লোকপরম্পরায়। তিনি মনে মনে বিরূপ না হয়ে পারলেন না বীরবলের প্রতি।

বীরবল যখন দেশে ফিরলেন প্রচুর উপঢৌকন নিয়ে, তখন আকবর পারস্যের রাজার দেওয়া উপহার সামগ্রীর দিকে নজরই দিলেন না। রাজাকে পূর্ণচন্দ্র এবং আমাকে অর্ধচন্দ্রের সঙ্গে তুলনা করে তুমি কী ইঙ্গিত করতে চাও? এর ফলে কি তুমি আমার অবমাননা ও আমার সঙ্গে বেইমানি করোনি বলতে চাও? তোমাকে কে অধিকার দিয়েছে আমাকে অর্ধচন্দ্রের সঙ্গে তুলনা করতে? 

বীরবল জানতেন যে, অতিথি হিসেবে পারস্যের রাজার এইরকম প্রশস্তি করা উপযুক্তই হয়েছে ; কিন্তু বাদশা তার মর্ম বুঝবেন না। সভাসদগণের ঈর্ষায় বীরবলের ওপর তাতিয়ে দেওয়ায় তিনি এত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন যে, বীরবলের যুক্তি শুনতেও রাজি ছিলেন না। তখন কিন্তু বীরবলের উপস্থিত বুদ্ধি সে যাত্রা বীরবলকে বাঁচাবার পথ দেখিয়ে দিল। তিনি বললেন,
শাহেনশা, আমি আপনাকে কী করে অপমান করতে পারি—আপনি আমার অন্নদাতা। পূর্ণচন্দ্র দিনে দিনে হ্রাস পায় কিন্তু অর্ধচন্দ্র দিনে দিনে বৃদ্ধিলাভ করে। এ-কথা কি আপনি জানেন না, আপনার জন্যই আমি এমন কথা বলেছি। আকবর বাদশা বললেন, চালাকি করার জায়গা পাও না? তুমি আমাকে বোকা পেয়েছ, যা বুঝিয়ে দিলে আমি তাই বুঝে গেলাম!' 

তবে শুনুন, আপনার খ্যাতি দিনে দিনে বাড়ছে, এবং আপনার তুলনায় পারস্যের রাজার খ্যাতি দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে, এ-কথা কি আপনি জানতে চান না? না, আমি মিথ্যে কথা বলিনি।’ 

বীরবলের উত্তর শুনে তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও বিচারশক্তির ওপর আস্থা আরও দৃঢ় হল আকবরের। জল হয়ে গেল বাদশার রাগ। তিনি বীরবলের ওপর যেমন ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন সে রাগ আর রইল না। তখনই বীরবলকে বহু পুরস্কার দিয়ে বিদায় দিলেন। সভাসদদের মুখে চুনকালি। কোথায় হেয় হবে বীরবল তা না, পেয়ে গেল একেবারে দ্বিগুণ পুরস্কার।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য