ছোটো জলকন্যার কথা-- ১ম অংশ হ্যান্স অ্যান্ডারসন

অনেক অনেক দূরে বিশাল সাগরের মাঝখানে, যেখানে জলের রঙ সুন্দরী অতসী ফুলের মতো নীল আর স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ, সমুদ্র সেখানে এত গভীর যে জলের তলা থেকে উপরে পৌছতে হলে, একটার উপরে একটা অনেকগুলো গির্জার চুড়ো চাপাতে হয়। সেইখানে জল-মানুষরা থাকে।
যেখানে সবচাইতে গভীর জল, সেইখানে জল-রাজের প্রাসাদ। তার দেওয়ালগুলো প্রবালের, সরু খিলান দেওয়া জানলা হলুদ স্ফটিকের। ছাদ আস্ত-আস্ত ঝিনুক দিয়ে তৈরি, তার উপর দিয়ে ঢেউ বয়ে গেলে সেগুলি একবার খোলে একবার বন্ধ হয়। ঝিনুকের মধ্যে মুক্তে জ্বলজ্বল করে, তাতে আরো সুন্দর দেখায়। ঐ মুক্তোর একটিকে তুলে যদি মাটির জগতের কোনো রাজার মুকুটে বসান যেত, তার কাছে আর-সব মণিমাণিক্যকে তুচ্ছ মনে হত।

ঐ প্রাসাদে জল-রাজ থাকতেন। অনেকদিন আগেই তাঁর রাণী মারা গেছেন, বুড়ি মা সংসার দেখেন। মোটের ওপর বুড়ি ভারি বুদ্ধিমতী, তবে বংশ আর উঁচু পদ নিয়ে বড়ো অহংকার। বুড়ি রানীর ল্যাজে বারোটা ঝিনুক শোভা পেত, সমুদ্রের তলার আর কোনো অধিবাসী ছটার বেশি পরার অনুমতি পেত না।
এটুকু ছাড়া বুড়ি রানীর অশেষ প্রশংসা করা উচিত। ছয় নাতনিকে তিনি কতই-না ভালোবাসতেন। তারা দেখতে বড়ো সুন্দর। তাদের মধ্যে সবার ছোটোটি সবচাইতে রূপসী। গোলাপের পাপড়ির মতো মোলায়েম তার গায়ের চামড়া, মাঝসমুদ্রের মতো গাঢ় নীল তার চোখ। তবে অন্যান্য জলকন্যাদের মতো তারও পা ছিল না ; তার বদলে শরীরের তলার দিকে ছিল মাছের মতো ল্যাজ। সারাদিন রাজকুমারীরা রাজবাড়ির মস্ত-মস্ত ঘরে খেলা করে বেড়াত। ওদের ঘিরে দেয়াল জুড়ে কি সুন্দর সব ফুল ফুটত। হলদে স্ফটিকের জানলা খুলে দিলে, মাছগুলো সাঁতরিয়ে ঘরে যেত, ঠিক যেমন করেেআমাদের জগতে পাখিরা উড়ে এসে ঘরে ঢোকে। মাছরা সোজা রাজকুমারীদের কাছে যেত, তাদের হাত থেকে খাবার খেত, তাদের আদর করলে কিছু বলত না। 

রাজবাড়ির সামনে সে যে কী চমৎকার বাগান ছিল ! সেখানে টকটকে লাল আর গাঢ় নীল গাছ ছিল, সে গাছের ফল সোনার মতো ঝকঝকে, আর ফুল দেখলে উজ্জ্বল সূর্যের কথা মনে হত। বাগানেই মাটির বদলে ছিল চকচকে নীল বালি, গন্ধকে আগুন ধরলে যেমন রঙ দেখায়। সব কিছুর উপরে অপূর্ব একটা নীল আভা ছড়িয়ে থাকত, তাই দেখে হঠাৎ কেমন মনে হত এ তে সাগরের তলা নয়, এ যেন শূন্যে অনেক উঁচুতে উঠেছি, উপরে আকাশ, নীচেতে আকাশ ! জল যখন নিথর হয়ে থাকত, সূর্যকে মনে হত মস্ত একটা বেগনি ফুল তার গোল পাত্রটির মধ্যে থেকে রশ্মি করে সমস্ত পৃথিবীতে আলো দিচ্ছে! 

বাগানের মধ্যে প্রত্যেক রাজকন্যের নিজের একটুখানি জায়গা ছিল, সেখানে তারা ইচ্ছামতো চারা লাগাতে, বীজ বুনতে পারত। একজনের জায়গাটি ছিল ঠিক একটা তিমিমাছের আকারে, আরেকজনেরটি জলকন্যার মতো ; কিন্তু সবার ছোটো যে রাজকুমারী তার বাগানটি ছিল সূর্যের মতো গোল আর তাতে যত ফুল ছিল, তাদের রঙ লাল, রাজকুমারীর চোখে সূর্য যেমন লাল । 

ছোটো রাজকুমারী অন্যদের চাইতে একটু আলাদা রকম ছিল, খুব শান্ত, সব সময় কি যেন ভাবত। ডুবো-জাহাজ থেকে নানারকম ঝকঝকে চকচকে জিনিস এনে একবার বোনেরা যখন সাজগোজ করতে ব্যস্ত হয়ে উঠল, ছোটে রাজকুমারী তখন ভবে-জাহাজে পাওয়া, শ্বেত পাথরে খোদাই করা সুন্দর একটি ছেলের মূর্তি ছাড়া আর কিছু নিল না। মূর্তিটি সে তার নিজের বাগানে রাখল ; তার পাশে লাল একটা গাছ পুঁতল, তার ঝোলা পাতা দেখে মনে হত গাছটি যেন কঁদছে। দেখতে দেখতে গাছ বেড়ে উঠল, উজ্জ্বল নীল মাটির উপর তার ডালপালা নুইয়ে পড়ল। সেখানকার ছায়াগুলো সদাই নড়ত-চড়ত আর বেগুনি রঙের খেলা দেখাত, দেখে মনে হত ডালপালা আর শিকড়গুলো যেন এ ওকে আদর করছে।

সমুদ্রের উপরে ডাঙার জগতের মানুদের কথা শুনতে ছোটো রাজকন্যে যেমন ভালোবাসত, তেমন আর কিছু নয়। জাহাজ, শহর, মানুষ আর ডাঙার জন্তু-জানোয়ার সম্বন্ধে বুড়ি ঠাকুমা যা কিছু জানতেন, সব তাকে বলতে হত। রাজকন্যে যখন শুনল যে উপরের জগতে যে-সব ফুল ফোটে তাদের সে কি সুগন্ধ, তখন সে কী খুশিই-না হল । সমুদ্রের নীচেকার ফুলের তো গন্ধই নেই। তার উপর পৃথিবীর বনের রঙ নাকি সবুজ, সেখানকার গাছের ডালপালার মধ্যে যে-সব মাছ ধড়ফড় করে উঠে বেড়ায়, কি তাদের রঙের বাহার আর কী মিষ্টি সুরে জোরে জোরে তারা গান গায়! আসলে ঠাকুমা পাখির কথা বলে ছিলেন, কিন্তু পাখিকে বলেছিলেন মাছ, কারণ নাতনিরা তো কখনো পাখি দেখে নি, তার কথা বুঝবে কি করে ?
ঠাকুমা বললেন, “তোর যখন পনেরো বছর বয়স হবে, তখন তুই সাগরের উপরে ভেসে উঠবার অনুমতি পাবি। তখন চাঁদের আলোতে, সাগরতীরের পাথরের ধাপে বসে দেখবি জাহাজ কেমন ভেসে যায়, কাকে বলে শহর, কাকে বলে মানুষ।”

পরের সালে বড়ো রাজকুমারীর পনেরো বছর বয়স হল। সে বোনদের কাছে কথা দিল যা দেখবে শুনবে, সব কথা ফিরে এসে তাদের বলবে। ঠাকুমা আর কতটুকু বলেন, আরো তো কত কি আছে, বোনেরা সে-সব শুনতে চায়।

কিন্তু ছোটো বোনের মতো আর কেউ সেই সুখের বয়সের জন্য আমন আগ্রহে অধীর হয়ে বসে থাকে নি। তাকেই সবচাইতে বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে তার সেই ছিল সবচাইতে শান্ত তার ভাবুক প্রকৃতির। রাতে সে অনেক সময় খোলা জানলার ধারে দাড়িয়ে নির্মল নীল জলের ভিতর দিয়ে চেয়ে দেখত। মাথার উপর দিয়ে ছায়া ভেসে গেলে, রাজকন্যে জানত ওটা হয় তিমিমাছ, নয়তো মানুষ বোঝাই জাহাজ । সে মানুষরা কেউ জানত না যে অনেক নীচে জলের তলায়, ছোটো এক জলকন্যা আকুল হয়ে তাদের জাহাজের খোলের দিকে সাদা সাদা হাত দুখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। 

সবার বড়ো বোন প্রথম বার সাগরের উপর থেকে ঘুরে এসে হাজাররকম গল্প করল। তার সবচাইতে ভালো লেগেছিল চাঁদের আলোয় বালির চরে বসে, সমুদ্র-তীরের শহরটিকে দেখতে। সেখানকার আলোগুলো তারার মতো জ্বলজ্বল করছিল, বাজনা বাজছিল। দূর থেকে লোকজন গাড়িঘোড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল, গির্জার উঁচু চুড়োগুলি দেখা যাচ্ছিল, ঘণ্টার শব্দ কানে আসছিল । ওখানে যাবার কোনো উপায় ছিল না বলেই ঐ সব জিনিসের জন্য জলকন্যার আগ্রহ বেড়ে যাচ্ছিল। কি মনোযোগ দিয়েই না ছোটো জলকন্যা দিদির কথাগুলো শুনেছিল। তার পরে যখন আবার রাতে খোলা জানলার ধারে দাঁড়িয়ে, নীল জলের ভিতর দিয়ে সে উপরে তাকিয়ে দেখল, সেই মস্ত গমগম করা শহরটার কথা তার এত বেশি করে মনে পড়ল যে, মনে হল যেন গির্জার ঘণ্টার শব্দ তার কানে আসছে। 

তার পরের বছর মেজো বোন ইচ্ছামতো সাঁতরে বেড়াবার অনুমতি পেল। সূর্য যেই ডুবুডুবু, সে জলের উপরে উঠে এল।

সূর্য ডোবা দেখে সে এমনি মুগ্ধ হল যে ফিরে গিয়ে বোনদের বলল যে, জলের উপরে উঠে ঐ সূর্য ডোবার চাইতে সুন্দর কিছু তার চোখে পড়ে নি। মেজো রাজকুমারী বলল, “সমস্ত আকাশের গায়ে সোনার রঙের ছোয়া লাগল, মেঘের সে রূপের কথা বলবার আমার সাধ্য নেই। এই লাল, এই ফিকে বেগুনি, মাথার ওপর দিয়ে মেঘেরা ভেসে চলল। তার চাইতেও বেগে জলের ওপর দিয়ে ঠিক যেখানে সূর্য পাটে নামছে, সেই দিকে উড়ে গেল এক ঝাঁক বুনো রাজহাঁস। তাদের দিকে চেয়ে রইলাম, কিন্তু সূর্য দৃষ্টির নীচে নেমে গেল আর সমুদ্রের জলের ওপর থেকে, মেঘের কিনারা থেকে, ঝকঝকে গোলাপি আলোও আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল।” 

তৃতীয় বোনের সাহস এদের চাইতে বেশি। যখন তার পালা এল, সে সাহসে ভর করে একটা নদীর মুখে ঢুকে পড়ল। সেখান থেকে সে দেখতে পেল ছোটো-ছোটো সবুজ পাহাড়, তাদের গায়ে গায়ে বন আর আঙুরের বাগান, তারই মাঝে মাঝে মাথা তুলে রয়েছে কত বাড়ি, কত প্রাসাদ। পাখির গান শুনতে পেল সে। সূর্যের সে কি তেজ ! থেকে থেকেই তাকে জলের তলায় ডুব দিয়ে মাথা মুখ ঠাণ্ড করতে হচ্ছিল। ছোটাে একটা উপসাগরের তীরে দেখল এক দল ছোটো-ছোটো ছেলেমেয়ে স্নান করছে, লাফাচ্ছে ঝাঁপাচ্ছে। রাজকুমারীর ইচ্ছা করছিল ওদের খেলায় যোগ দেয়, কিন্তু ওকে দেখেই ছেলেমেয়েরা বেজায় ভয় পেয়ে ডাঙার দিকে দৌড় দিল আর একটা ছোটো কালো জানোয়ার এমনি খেউ-খেউ করে ডাকতে লাগল যে শেষপর্যন্ত ও নিজেও ভয় পেয়ে, সমুদ্রের দিকে পালিয়ে বাঁচল। তবু ঐ সবুজ বন, গাছে ঢাকা ঐ শ্যামল পাহাড় ঐ ছোটো-ছোটো ছেলেমেয়েদের কথা কিছুতেই সে ভুলতে পারছিল না। যদিও তাদের পাখনা নেই, তবু তারা নদীর জলে কেমন নিৰ্ভয়ে সাঁতরে বেড়াচ্ছিল। 

চতুর্থ বোনের অত সাহস ছিল না , সে খোলা সমুদ্রের উপরেই থেকে গিয়েছিল, তার পর ফিরে গিয়ে বোনদের বলেছিল এর চেয়ে সুন্দর আর কিছু হতে পারে না। দূর দিয়ে জাহাজ ভেসে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন সমুদ্রের পাখি। আর দেখেছিল জলের মধ্যে শুশুকরা কেমন মনের খুশিতে খেলা করছে আর বিশাল বিশাল তিমিমাছরা আকাশে বাতাসে হাজার হাজার ঝলমলে জলের ফোয়ারা ছুঁড়ছে। 

পঞ্চম বোনের জন্মদিন পড়ল শীতকালে। সে যখন জলের উপরে উঠল, দেখল সমুদ্রের রঙ সবুজ, তার উপর বড়ো-বড়ো বরফের চাংড়া ভাসছে। রাজকুমারী বলল, ওগুলো দেখতে মুক্তোর মতে, কিন্তু অনেক বড়ো, মানুষদের গির্জার চুড়োর চেয়েও বেশি উঁচু। রাজকুমারী একটা বরফের চাংড়ার উপর বসে, বাতাসে চুল মেলে দিয়েছিল। কিন্তু তাই-না দেখে, যেখানে যত জাহাজ ছিল সবাই পাল তুলে দিয়ে, যত তাড়াতাড়ি পারল পালিয়ে গেল। সন্ধ্যাবেলায় নৌকোর পালে পালে যেন আকাশ ছেয়ে গেল, প্রকাণ্ড বরফের টুকরোগুলো একবার করে ভুবতে আবার ভাসতে লাগল, তাদের গা থেকে লালচে আভা বেরুতে লাগল, মেঘ থেকে বিদ্যুতের ঝলক দেখা গেল, বাজ বার বার গর্জাতে লাগল। অমনি সব জাহাজ পাল গুটিয়ে ফেলল ; তাদের পাটাতনে যারা ছিল তাদের সে কি ভয়! কিন্তু রাজকুমারী বরফের চাংড়ার উপরে বসে বসে বিদ্যুতের নীল ঝলকানি দেখেছিল। 

প্রথমবার সমুদ্রের উপরে উঠে বোনেরা সবাই এতরকম নতুন নতুন সুন্দর জিনিস দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার পর সে-সব পুরনো হয়ে গেল, তখন জলের তলায় নিজেদের বাড়িটাকেই সবচাইতে ভালো বলে মনে হতে লাগল। কারণ নিজেদের বাড়িই তো মনের মতো জিনিসে ঠাসা থাকে। 

সন্ধেবেলায় অনেক সময় পাঁচটি বোন হাত ধরাধরি করে সমুদ্রের অতল গভীর থেকে উঠে আসত। মানুষের গলার চাইতে তাদের গলার স্বর অনেক বেশি মধুর। ঝড় আসছে দেখলে তারা জাহাজের সামনে গিয়ে সে যে কী মিষ্টি গান গাইত, সে আর কি বলব ! সমুদ্রের তলায় যারা বাস করে তাদের সুখের জীবনের কথা গাইত, নাবিকদের বলত, ভয় পেয়ে না, নেমে এসো নীচে আমাদের কাছে। মাঝিরা ওদের কথার মানে বুঝত না, ভাবত বুঝি বাতাসের শনশন।

 সন্ধেবেলায় বোনেরা যখন সাঁতরিয়ে বেড়াত, ছোটো জলকন্যা তার বাবার প্রাসাদে একলা থাকত, এতটুকু নড়ত-চড়ত না, এক দৃষ্টে দিদিদের যাওয়ার পথে চেয়ে থাকত। যদি পারত, তা হলে হয়তো সে কাঁদত, কিন্তু জলকন্যারা কাঁদতে পারে না, তাই দুঃখ হলে মানুষের চাইতে শতগুণ বেশি কষ্ট পায়। 

দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ছোটা রাজকুমারী বলত, “ইস্, একবার আমার পনেরো বছর হলেই হয় ! আমি ঠিক জানি জলের উপরের জগৎটাকে আর সেখানকার মানুষগুলোকে আমার বড়ো ভালো লাগবে।" অবশেষে সেই বহু প্রতীক্ষিত দিনটি এল। 

ঠাকুমা বললেন, “এই তো এবার তোর পালা। কাছে আয়, তোকেও তোর দিদিদের মতো করে সাজিয়ে দিই।” এই বলে বুড়ি তার চুলে একটা সাদা ফুলের মালা জড়িয়ে দিলেন, সে ফুলের প্রত্যেকটি পাপড়ি আধখানা মুক্তে দিয়ে তৈরি। তার পর বুড়ি আটটি বড়ো-বড়ো ঝিনুককে বললেন

রাজকুমারীর ল্যাজে বুলে থাকতে, তাতেই বোঝা যাবে কন্যার বংশ কত উঁচু। 

ছোটো রাজকুমারী বলল, “কিন্তু ওতে যে বড়োই অস্বস্তি লাগছে ঠাকুমা।” বুড়ি বললেন “আহা, সুন্দর দেখাতে হলে ঐরকম একটুআধটু অসুবিধা সইতেই হয়।” 

রাজকুমারী কিন্তু এই-সব জাকজমক ছেড়ে দিয়ে, ঐ ভারী মুকুটের বদলে তার নিজের বাগানের লাল ফুল পরলেই বেশি খুশি হত আর তাতে তাকে মানাতও ঢের বেশি। কিন্তু অত সাহস কোথায় পাবে ? ওদের কাছে বিদায় নিয়ে, এক টুকরো ফেনার মতো সে ভেসে পড়ল। 

যখন জলের উপরে পৌছল, তখন সূর্য সবে দিগন্তের নীচে নেমেছে, মেঘ থেকে ঝলমলে সোনালি আর গোলাপির ছটা বেরুচ্ছে, পশ্চিমের ফিকে আকাশে সন্ধ্যা-তারা জ্বলছে, কাচের আয়নার মতো নিথর সাগর। স্থির জলের উপরে তিনটি মাস্তুল তুলে প্রকাণ্ড একটা জাহাজ ভাসছিল। মাস্তুল থেকে অগুন্তি নিশান বাতাসে উড়ছিল ; একটিমাত্র পাল তোলা ছিল। কোথাও এতটুকু বাতাস নেই ; জাহাজের তক্তায়, সিঁড়িতে নাবিকরা চুপ করে বসেছিল। পাটাতন থেকে গান বাজনার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। তার পর যেই অন্ধকার ঘনিয়ে এল, অমনি হঠাৎ শত-শত আলো জ্বলে উঠল। 

ছোটো জলকন্যা সাঁতরিয়ে গেল জাহাজের কাপ্তানের ছোটো কুঠরির কাছে। ঢেউয়ের দুলুনির সঙ্গে যখন জাহাজটা একটু উঁচুতে উঠছিল তখন জানলার পরিষ্কার কাচের মধ্যে দিয়ে ঘরের ভিতরটা দেখা যাচ্ছিল। রাজকুমারী দেখল চমৎকার সাজ-পোশাক পরা কয়েকজন মানুষ। তাদের মধ্যে সবচাইতে
যে রূপবান, সে একজন রাজপুত্র, গভীর কালো তার চোখ। সেদিন তার ষোলো বছর পূর্ণ হল, জাহাজের লোকরা তাই মহা ধুমধাম করে তার জন্মদিনের উৎসব করছিল। নাবিকরা পাটাতনের উপরে নাচছিল, সেখানে রাজপুত্র দেখা দিতেই, হু করে আকাশে একশো হাউই উঠল, রাত হল দিন। ভয়ের চোটে জলকন্যা জলের নীচে ডুব দিল। একটু বাদেই ছোটো মাথাটি তুলে দেখে যেন আকাশ থেকে ওর-ই উপর তারা করে পড়ছে। এমন আলোর ফুলকি ঝরা আগে কখনো দেখে নি সে, মানুষরা যে এমন আশ্চর্য ক্ষমতা ধরে, তাও কখনো শোনে নি। মনে হল তার চারদিকে বড়ে-বড়ো সূর্য ঘুরছে, রঙ-চঙে মাছ সব শূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছে, আর সাগরের স্বচ্ছ শান্ত বুকে সব কিছুর ছায়া পড়ছে। জাহাজে এত আলো যে, প্রত্যেকটি জিনিস স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। আহা, রাজপুত্রের আজ কী আনন্দ । নাবিকদের হাত ধরে নাড়ছে, তাদের সঙ্গে গাল-গল্প, ঠাট্টা-তামাসা করছে আর রাতের নৈঃশব্দের সঙ্গে সঙ্গীতের মধুর সুর মিলে একাকার হচ্ছে। 

এদিকে রাত বাড়ছে, কিন্তু জলকন্যা কিছুতেই ঐ আলোয় আলো জাহাজ আর ঐ পরমসুন্দর রাজপুত্রকে ছেড়ে যেতে পারছিল না। ছোটো কুঠরির জানলা দিয়ে সে ভিতরের দিকে তাকিয়েই ছিল, ঢেউয়ের দোলায় তার শরীরটা উঠছিল পড়ছিল। তার পর জাহাজের তলাটা ফেনিয়ে উঠল, ঘড়ঘড়, করে জল পাক দিয়ে উঠল, জাহাজ চলতে আরম্ভ করল। অমনি সব পাল তুলে দেওয়া হল। তার পর উঁচু উঁচু ঢেউ উঠতে লাগল, আকাশে ঘোর কালো মেঘের ঘনঘটা, দূরে বাজ পড়ার শব্দ শোনা গেল। নাবিকরা বুঝল বড় আসছে, অমনি সব পাল নামিয়ে দিল। ঝোড়ো সমুদ্রের বুকে ঐ প্রকাণ্ড জাহাজ একটা হালকা নৌকোর মতো দোল খেতে লাগল। পর্বত প্রমাণ ঢেউ জাহাজের মাথা ছাড়িয়ে উঠতে লাগল আর জাহাজ একবার তার নীচে তলিয়ে যায়, একবার তার মাথায় চড়ে ! ছোটো জলকন্যার কাছে এসব বড়ো আনন্দের ব্যাপার, কিন্তু নাবিকদের কথা আলাদা। বিশাল ঢেউয়ের আঘাতে জাহাজে মড়মড় করে ফাটল ধরল, ঐ মোটা মাস্তুল তাও বেঁকে গেল, হুড় হুড় করে খোলের ভিতরে জল ঢুকে পড়ল। নিমেষের জন্য জাহাজ ধড়ফড় করে উঠল, তার পর নলখাগড়ার বোটার মতো বড়ো মাস্তুলটি ভেঙে পড়ল ; জাহাজও তখুনি উলটিয়ে গেল, গবগব করে খোলটি জলে ভরে গেল । 

এতক্ষণ বাদে ছোটো জলকন্যা বুঝতে পারল জাহাজের মানুষদের এবার সমূহ বিপদ। নিজেকেও সাবধান হতে হয়, জাহাজ থেকে ছিঁড়ে-আসা কড়ি বরগা তক্তা ঢেউয়ের মাথায় ভাসছে।

চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, চোখে কিছু ঠাহর হয় না। খানিক পরে ভয়ংকরভাবে বিদ্যুৎ চমকাল, তার আলোতে জাহাজডুবির সর্বনেশে দৃশ্য দেখা গেল। জলকন্যার দুই চোখ তারই মধ্যে রাজপুত্রকে খুঁজে বেড়াতে লাগল, ঠিক সেই সময় টুপ করে জাহাজটি ডুবে গেল। প্রথমে তার বেজায় আনন্দ হল, ভাবল এবার তাহলে রাজপুত্রকে জলের তলায় তাদের বাড়িতে যেতে হবে। তার পরেই মনে পড়ল জলের নীচে তো মানুষেরা বঁচে না। জল-রাজের প্রাসাদে যদি কখনো রাজপুত্র যায়, শুধু তার মরা দেহটিই যাবে। 

‘মরা! না, না, তাকে মরতে দেব না ? চারদিকে ভাঙা জাহাজের বরগা তক্ত ভাসছে, তারই মধ্যে নিজের প্রাণ তুচ্ছ করে, জলকন্যা রাজপুত্রকে খুঁজতে লাগল। শেষপর্যন্ত পেলও তাকে ; ততক্ষণে রাজপুত্রের সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে এসেছে, অনেক কষ্টে শুধু নিজের মাথাটুকুকে জলের উপরে ভাসিয়ে রেখেছে। চোখদুটি বোজা। ডুবেই যেত নিশ্চয়, যদি-না জলকন্যা তাকে বাঁচাত। জলকন্যা তাকে জড়িয়ে ধরে, জলের উপরে তুলে নিয়ে, স্রোতের সঙ্গে ভেসে চলল। 

খানিক পরেই দেখল শুকনো ডাঙা, পাহাড়ের উপরে বরফ ঝক্‌মক্‌ করছে। সমুদ্রের ধারে ধারে সবুজ বন, বনের কিনারায় একটা মন্দির, কিম্বা আশ্রম, জলকন্যা চিনতে পারল না কি। তার চারদিকে বাগান, সেখানে কলম্বী আর কাগজি লেবুর গাছ ; সদর দরজা অবধি চলে গেছে লম্বা-লম্বা তালগাছের বীথি। ঐখানে একটা ছোটো উপসাগরের মতো হয়েছে, স্থির জল, কিন্তু বড়ো গভীর। উঁচু পাথরের পাড়ির নীচে শুকনো শক্ত বালি। সেইখানে জলকন্যা রাজপুত্রকে নিয়ে এল ; দেখে মনে হয়’বুঝি তার দেহে প্রাণ নেই। জলকন্যা তাকে সামান্য গরম বালির উপর শুইয়ে, মাথাটিকে সাবধানে উঁচু করে রাখল, মুখটি রোদের দিকে ফিরিয়ে দিল । 

সামনের মস্ত সাদা বাড়িতে ঘণ্টা বাজতে লাগল, কয়েকজন অল্প-বয়সী মেয়ে বাগানে বেড়াবে বলে বেরিয়ে এল। জলকন্যা তীর থেকে সরে গিয়ে পাথরের আড়ালে লুকোল, সমুদ্রের ফেনা দিয়ে মাথাটি ঢেকে রাখল, যাতে কেউ তাকে না দেখতে পায়। সেখান থেকে রাজপুত্রকে সে দেখতে লাগল। 

বেশিক্ষণ কাটে নি, এমন সময় একটি মেয়ে কাছে এল ! রাজপুত্রকে ঐভাবে মরার মতো পড়ে থাকতে দেখে সে বেজায় ভয় পেল। তখনই নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে বোনদের ডাকতে ছুটে গেল। ছোটো জলকন্যা দেখল রাজপুত্র ক্রমে সুস্থ হয়ে উঠেছে, তাই দেখে সকলে হাসছে, তাদের মনে যেমন সহানুভূতি, তেমনি আনন্দ। কিন্তু রাজপুত্র একবারও জলকন্যাকে খুঁজল না, সে তো জানেই না যে জলকন্যাই তার প্রাণ বাঁচিয়েছে। তার পর যখন সবাই মিলে রাজপুত্রকে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেল, রাজকুমারীর এমনি মন খারাপ হয়ে গেল যে অমনি সে এক জুবে তার বাবার প্রাসাদে ফিরে এল। 

আগেও ছোটে রাজকুমারী ছিল বড়ো শান্ত আর ভাবুক এখন যেন আরো বেশি হল । বোনেরা জিজ্ঞাসা করত উপরের জগতে সেদিন কি দেখে এসেছিল, ছোটো জলকন্যা কোনো উত্তর দিত না। 

সন্ধ্যাবেলায় অনেক সময় ছোটো রাজকুমারী ভেসে উঠে সেই জায়গাটাতে যেত, যেখানে সে রাজপুত্রকে রেখে এসেছিল। দেখত পাহাড়ের উপরের বরফ গলল, বাগানের ফল পাকল, কিন্তু রাজপুত্রের আর দেখা না পেয়ে, মনের দুঃখে ঘরে ফিরে যেত। একমাত্র আনন্দ ছোটো বাগানে বসে সুন্দর মূর্তিটিকে দেখা ; মূর্তির সঙ্গে রাজপুত্রের আশ্চর্য সাদৃশ্য। আর সে ফুলগাছের যত্ন করত না, গাছগুলি বেড়ে জঙ্গল হয়ে গেল ; সিঁড়ি ঢেকে গেল ; লম্বা বেঁটা আর পাকান শুঁয়োর সাহায্যে গাছের ডালপালার সঙ্গে তারা জড়িয়ে রইল। বাগানটাই হয়ে উঠল একটা কুঞ্জবন।
শেষপর্যন্ত মনের দুঃখ আর মনে গোপন করতে না পেরে, দিদিদের একজনকে একদিন সে সব কথা বলে ফেলল। সে অন্য বোনদের বলল, তারা বন্ধু-বান্ধবদের কাউকে বলল। তাদের মধ্যে ছিল আরেকজন জলকন্যা ; রাজপুত্রকে তার খুব মনে ছিল, ঝড়ের দিনে জাহাজের উৎসব সে-ও নিজের চোখে দেখেছিল। তার উপর সে জানত রাজপুত্রের দেশ কোথায়, সেখানকার রাজার কি নাম । 

রাজকুমারীরা ছোটো বোনকে আদর করে বলল, “আয়, আমাদের সঙ্গে।” এই বলে তারা হাত ধরাধরি করে জল থেকে ভেসে উঠল একেবারে রাজপুত্রের প্রাসাদের সামনে। সে প্রাসাদ হলুদ পাথরে তৈরি। বাড়ি থেকে সমুদ্রের ধার অবধি শ্বেত পাথরের সিঁড়ি। বাড়ির মাথায় সোনালি রঙের গম্বুজ যেন সোনার মুকুট শোভা পাচ্ছে। বাড়ির চারদিকে থামের মাঝে মাঝে শ্বেত পাথরের মূর্তি, দেখে মনে হয় যেন সত্যিকার মানুষ। উঁচু জানলার স্বচ্ছ কাচের ভিতর দিয়ে কেউ যদি দেখত, তার চোখে পড়ত জমকাল সব ঘর, তাতে রেশমী পর্দা ঝুলছে, দেয়ালে সুন্দর করে আঁকা রঙিন ছবি। মানুষ থাকবার এমন চমৎকার বাড়ি দেখে জলবাসিনী রাজকুমারীরা মুগ্ধ। সবচাইতে বড়ো ঘরগুলির একটার জানলা দিয়ে ওরা দেখে ঘরের মধ্যিখানে ফোয়ারা থেকে জল উঠছে একেবারে মাথার উপরে গম্বুজ অবধি। গম্বুজের ফাঁক দিয়ে সূর্যের রশ্মি ঢুকে জলের উপরে নাচছে, জলের চারদিকে স্বন্দর স্বন্দর ফুল ফুটেছে, আলো লেগে তারা ঝলমল করছে।

এতদিন পরে ছোটে রাজকুমারী জানতে পারল তার বড়ো প্রিয় রাজপুত্র কোথায় থাকে। এর পর থেকে প্রায় রোজ সন্ধ্যায় সে সেখানে যেত। বোনের সাহসে ভর করে যতদূর গিয়েছিল, ছোটো জলকন্যা প্রায়ই তার চেয়ে অনেক বেশি কাছে যেত। এমন-কি কখনো কখনো একটা সরু খাড়ি ধরে শ্বেত পাথরের ঝোলান বারান্দার তলায় গিয়ে পৌছত। রাতে যখন চাঁদের আলো ফুটফুট করত, সেখান থেকে সে রাজপুত্রকে দেখত ; রাজপুত্ৰ মনে করত তার কাছে কেউ নেই।


[--হ্যান্স অ্যান্ডারসন]
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য