ইঁদুরীর তিন বাচ্চা--তিব্বতের লোককাহিনী

অনেকদিন আগে, কতদিন আগে তা বলব না। ছিল এক ছোট্ট ইঁদুরী। থাকত তার গর্তে, রাজবাড়ী থেকে তেমন দূরে নয়, খুব কাছেও নয়।
বাচ্চা হওয়ার সময় ইঁদুরী দেবতার কাছে প্রার্থনা করল যেন তার একটি শক্তিমান সন্তান হয়। আর সত্যিই বাচ্চাটি হল নাদুস-নুদুস বাঘিনীর বাচ্চার মতো । তারপর দিনে দিনে সে বাড়তে লাগল। অন্যের যেখানে দশ দিন তার মাত্র এক দিন। অল্প দিনে সে হয়ে উঠল শক্তিমান এক বাঘ ।
তখন সে তার মাকে বলল, মাগো, আমার এখন বনে চলে যাওয়া উচিত। সেখানে আমি বাঘ ভাইদের সঙ্গে থাকব। তবে যখনই তোমার দরকার হবে, কোনো বিপদ-আপদ হলে আমাকে ডাক দিও। 
অদূরে ঘন ঝোপের কাছে গিয়ে কয়েকটা লোম ছেড়ে দিয়ে আমার নাম ধরে তিনবার ডাক দিও। আমি চলে আসব।' এই বলে সে এক মুঠো লোম দিয়ে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বনে চলে গেল । 

কিছু দিন পরে মা ইঁদুরের আবার বাচ্চা দেওয়ার সময় হল । সে তখন দেবতার কাছে প্রার্থনা করল তার যেন খুব সুন্দর একটা বাচ্চা হয়। আর সত্যিই বাচ্চাটি হল একটি ময়ূরছানার মতো। তারপর দিনে দিনে সে বাড়তে লাগল। অন্যের যেখানে দশ দিন তার মাত্র এক দিন, অন্যের যেখানে এক বছর তার মাত্র এক মাস। এভাবে অল্প দিনে সে হয়ে উঠল পূর্ণ বয়স্ক এক ময়ূর। তার পেখম হল দেখার মতো ভারি সুন্দর। 

তখন সে তার মাকে বলল, মাগো, আমার এখন বনে চলে যাওয়া উচিত। সেখানে আমি ময়ূর ভাইদের সঙ্গে থাকব। তবে যখনই তোমার দরকার পড়বে বা কোনো বিপদ-আপদ হলে আমাকে ডাক দিও। পাহাড়ের উপর উঠে আমার একটা পালক ছেড়ে দিয়ে তিনবার ডাক দিও। আমি চলে আসব।' 

এই বলে সে কয়েকটা পালক দিয়ে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বনে চলে গেল । কিছু দিন পরে মা ইদুরের তৃতীয় বাচ্চা দেওয়ার সময় হল । এবার সে দেবতার কাছে বুদ্ধিমান, ধনবান ও শক্তিশালী সন্তান কামনা করল। এবার তার হল এক মানব সন্তান। দিনে দিনে সে বাড়তে লাগল। মা ইঁদুরের তখন ভয় হল এই মানব শিশু তো তার কাছে থাকবে না। বড় হয়ে সে মানুষের মধ্যে চলে যাবে, তার অন্য দু’ ভাই যেমন গেছে। এজন্য সে তার বাচ্চাকে বড় ভাইদের কথা বলে দিল । বলল যে, সে মানব-শিশু হয়ে জন্ম নিয়েছে তার কোলে এবং যেন তার বুক খালি করে চলে না যায়। সে যেন নিজের ঘরের দরজায় বসে খেলা করে। সেও মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করল তাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না বলে। আর প্রতিদিন সে বাড়ির সামনে বসে খেলাধুলো করতে লাগল। 

হয়েছে কি সেই দেশে এক মুসলমান নাপিত ছিল। সে লোকের চুল ও নোখ কেটে দিয়ে জীবিকা পালন করত। লোকটা ছিল ভারি চালাক এবং রাজার চাকরি করত। একদিন সে রাজবাড়িতে যাওয়ার সময় ইদুরের ঘরের সামনে এসে তরুণ বালকটিকে দেখতে পেল। সে তখন তার কাছে গিয়ে বলল, “তুমি কি তোমার চুল ও নোখ কাটবে? 

বালকটি রাজি হল এবং নাপিতও চুল কাটতে শুরু করল । চুল কাটতে কাটতে নাপিত তো ভারি অবাক! সে দেখে কি তার কাটা প্রত্যেকটা চুল মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে একেকটি হীরে, মুক্তো ও অন্যান্য মণিমানিক্য হয়ে যাচ্ছে। তারপর যখন নোখ কাটতে শুরু করল তখন কাটা নোখগুলো হয়ে যাচ্ছে নীলকান্তমণি। 

নাপিত রাজবাড়িতে গিয়ে রাজার চুল কাটার সময় এই অদ্ভুত ছেলেটির কাহিনী বলতে লাগল। সেই রাজা ছিল ভারি লোভী আর ন্যায়নীতিহীন । অমনি রাজা এই বালকটির মালিক হবে বলে ঠিক করে ফেলল। আর সঙ্গে সঙ্গে সে তার পাইক-পেয়াদা পাঠিয়ে বালকটিকে ধরে আনতে আদেশ করল । বালকটিকে এনে রাজার কাছে হাজির করা হল । রাজা তখন গর্জে উঠেবলল, আমার রাজবাড়ির বাগানে তোর মা আমার অনুমতি ছাড়া ঢুকেছে। এর জন্য তোর মায়ের শাস্তি হল মৃত্যুদণ্ড। আর তুই হবি আমার চাকর। তবে তুই যদি আমার রাজপ্রাসাদের চারটি সিংহদরজা পাহারা দেওয়ার জন্য চারটি পূৰ্ণবয়স্ক বাঘ এনে দিতে পারিস তখন পাবি ক্ষমা। রাজকন্যার সঙ্গে হবে বিয়ে আর অর্ধেক রাজত্বের হবি মালিক। 

রাজার কথা শুনে মনের দুঃখে সে ঘরে ফিরল। মাকে সব কথা খুলে বলল। মা তখন বলল, দুঃখ করিস না বাবা, এই নিয়ে যা তোর ভাইয়ের দেওয়া লোম । জঙ্গলের ওই যে ঝোপটি আছে তার কাছে গিয়ে লোমগুলো হাওয়ায় ছেড়ে দিয়ে তোর ভাইকে তিনবার ডাক দিবি, “বাঘভাইয়া, বাঘভাইয়া, বাঘভাইয়া” বলে।’ 

সেখানে গিয়ে তিনবার ডাক দিতেই সে শুনতে পেল বাঘের ঘন ও গম্ভীর ঘরঘর শব্দ । আর কী আশ্চর্য তার পাশেই বিশাল একটি বাঘ দাড়িয়ে জিভ দিয়ে ঠোট চাটছে । 

বাঘ বলল, “এই যে আমি ভাইটি। কী হয়েছে তোর বল? কোনো বিপদআপদ নয় তো?” বিপদ বলতে বিপদ। রাজার আদেশ, এখুনি যদি রাজবাড়ির চারটি সিংহদরজা পাহারা দেওয়ার জন্য চারটি জোয়ান বাঘ দিতে না পারি তাহলে মায়ের যাবে গলা আর আমাকে করে নেবে ক্রীতদাস । 

শুনেই বাঘ হো হো করে হেসে উঠল। আর বলল, ‘এই শুধু? এতো কোনো সমস্যাই নয়। আমি তোর সঙ্গে একশো বাঘ দিচ্ছি।’ বলে সে আকাশের দিকে মুখ করে প্রচণ্ড গর্জনে এক ডাক দিল । আমনি বনের চারদিক থেকে সুরসুর করে একশো বাঘ এসে হাজির । তখন ওর বাঘভাইয়া বলল, ‘একটার পিঠে চড়ে বস। অন্য সবাই তোর পিছে পিছে যাবে।' সে তখনই একটার পিঠে চেপে বসল। চলল রাজবাড়ির দিকে । 

রাজবাড়ির সামনে পৌছতেই চারদিকে মহা হইচই পড়ে গেল, ছড়িয়ে পড়ল আতঙ্ক । যে যে-দিকে পারে পড়ি-মরি ছুটতে লাগল। রাজার প্রহরীরা ছুটে গিয়ে রাজাকে খবর দিল। শুনে রাজাও ভীষণ ভয় পেল। কিন্তু সিংহাসনে বসে থেকে সে বলল, ‘ওকে বাঘসহ আসতে দাও।” 

বাঘের পিঠে বসে সে চলল রাজ দরবারের দিকে, পিছে পিছে চলল নিরানব্বইটি জোয়ান বাঘ। সিংহাসনের সামনে গিয়ে সে থামল । নিরানব্বইটি বাঘও অমনি থেমে গেল। বাঘের পিঠ থেকে নেমে সে বলল, মহারাজ, বন থেকে আমি বাছাই করা একশোটি বাঘ নিয়ে এসেছি। এর থেকে যে-কোনো চারটি আপনি বেছে নিন।’ রাজা তো ভীষণ অবাক! 

তারপর ধাতস্থ হয়ে চারটি তাগড়া জোয়ান বাঘ বেছে নিয়ে বাকিগুলোকে চলে যেতে আদেশ দিল। কিন্তু ছেলেটির মণিরত্নের প্রতি লোভ তার গেল না। রাজকন্যার সঙ্গে বিয়ে বা অর্ধেক রাজত্ব কিছুই দিল না ।

কিছুদিন পরে রাজা আবার তরুণ বালকটিকে ধরে আনতে পাইক পাঠাল । তাকে নিয়ে এলে রাজা বলল, আমার প্রাসাদের চারটি সোনার চূড়ায় চারটি ময়ূর এখনই চাই। এনে দিতে না পারলে তোর মায়ের শাস্তি হল মৃত্যুদণ্ড। আর তুই হবি আমার চাকর। তরুণ বালক রাজার আদেশ শুনে হতাশ হয়ে গেল। মনের দুঃখে সে ঘরে ফিরল। 

মাকে সব কথা খুলে বলল । মা তখন বলল, ‘দুঃখু করিস না বাবা, এই নিয়ে যা তোর মেজ ভাইয়ের দেওয়া পালক। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে পালকগুলো হাওয়ায় ছেড়ে দিয়ে ডাক দিতেই অসাধারণ সুন্দর এক ময়ূর গাছের উচু ডাল থেকে উড়ে সামনে এসে বসল। ময়ূর বলল, “এই তো আমি ভাইটি। কী হয়েছে তোর বল। কোনো বিপদ-আপদ নয় তো?” 

বিপদ বলতে বিপদ। রাজার আদেশ, এখুনি যদি রাজপ্রাসাদের চারটি গলা, আর আমাকে করে নেবে ক্রীতদাস । শুনেই ময়ূর পেখম খুলে বলল, ‘এই শুধু? এতো কোনো সমস্যাই নয়। আমি তোর সঙ্গে অনেকগুলো ময়ূর দিচ্ছি। এই বলে ময়ুর গাছের উচু ডালে উঠে তীক্ষ সুরে কয়েকটি ডাক দিল । অমনি কোথা থেকে আকাশ উজ্জ্বল করে চলে এল এক ঝাক অপূর্ব ময়ূর। দলের সেরা ময়ূরটি বলল, চলো এবার, আমাদের সঙ্গে রাজপ্রাসাদে চলো | রাজপ্রাসাদে । সেখানে গিয়ে তারা একটি উঁচু গাছে বসল।

মন্ত্রী রাজাকে খবর দিল। রাজা সিংহাসনে বসে তাদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল । ময়ূরেরা তরুণ বালককে নিয়ে রাজার সিংহাসনের সামনে নামল। তারপর সবাই একে একে তরুণ বালকের পেছনে সারি বেঁধে দাড়িয়ে পেখম খুলে দিল । 

তরুণ বালক বলল, মহারাজ, বন থেকে আমি বাছাই করা সেরা ময়ূরদের নিয়ে এসেছি। আপনি এর থেকে যে-কোনো চারটি বেছে নিন।’ রাজা আরেক দফা বিস্ময়ে হতবাক! তারপর সম্বিত ফিরে পেয়ে চারটি সুন্দর ময়ূর বেছে নিয়ে বাকিগুলোকে চলে যেতে আদেশ দিল। 

কিন্তু ছেলেটির মণিরত্বের প্রতি লোভ তার গেল না। আর আগের ওয়াদা অনুযায়ী রাজকন্যার সঙ্গে বিয়ে বা অর্ধেক রাজত্ব সম্পর্কেও কিছু বলল না। কিছুদিন পর রাজা তাকে আবার তলব করল । রাজা এবার বলল, “তোর মা ইঁদুরীকে খালি হাতে আমার হাতির সঙ্গে লড়াই করে মেরে ফেলতে হবে, নয়তো হাতি তাকে শেষ করবে। আর তুই হবি আমার নফর। 

শুনে তরুণ বালক ভীষণ ব্যথিত হল । কারণ তার মায়ের পক্ষে খালি হাতে প্রকাণ্ড রাজহস্তীকে মারা অসম্ভব। তবুও কী আর করা, দুঃখ ও হতাশা নিয়ে মায়ের কাছে এসে সে সব কথা খুলে বলল। কিন্তু মা তাকে বলল, “এই কথা? এ জন্য তোর কোনো চিন্তা করতে হবে না বাবা । শোন তবে । তুই আমার সারা গায়ে ভালো করে বিষ মেখে দে বাছা । আর একখানা সরু শক্ত সুতো আমার লেজের সঙ্গে বেঁধে দে।" 

মায়ের কথা মতো সব কাজ সে ঠিক ঠিক করল । তারপর সে মাকে তার জামার হাতার মধ্যে পুরে নিয়ে রাজবাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হল। রাজপ্রাসাদের আঙিনায় মল্লভূমিতে সব রকম প্রস্তুতি নেওয়া হল। মল্লভূমির শক্ত ঘেরার বাইরে রাজা ও সভাসদদের আসন বসানো হল। প্রাসাদের ছাদ ও বারান্দায় শত শত দর্শনার্থী ভিড় করে দাড়াল। রাজ্যের যত লোকজন এল । সবাই উৎসুক হয়ে অপেক্ষা করে রইল এই অসম যুদ্ধ দেখার জন্য। মল্লভূমির একদিকে রাজহস্তী প্রস্তুত। তার পায়ে শেকল বাঁধা । তরুণ বালক তার জামার হাতার নিচে মাকে নিয়ে মল্লভূমিতে প্রবেশ করল। হাতির উল্টো প্রান্তে গিয়ে তারা দাঁড়াল। ওদিকে হাতি ছটফট করছে আক্রমণ করার জন্য, এদিকে তরুণ বালক শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চারদিক নিস্তব্ধ। যুদ্ধ শুরুর শিঙা বেজে উঠতেই হাতির পায়ের শেকল খুলে দিল । আমনি সে ছুটল তরুণ বালকের দিকে। 

হাতি তার সামনে এসেই শুড় তুলে প্রচণ্ড এক ডাক দিল । সঙ্গে সঙ্গে ছোট্ট মা ইঁদুর ছেলের জামার হাতা থেকে লাফিয়ে মাটিতে নেমে হাতির দিকে ছুটল। হাতিও দেখতে পেল ছোট্ট একটা কী যেন, অমনি সে দাঁড়িয়ে পড়ল ব্যাপারটি ভালো করে বুঝে নেওয়ার জন্য। ঠিক সেই মুহুর্তে মা ইদুর একটুও সময় নষ্ট না করে চোখের পলকে এক লাফে হাতির পায়ের কাছে চলে গেল। হাতিও সঙ্গে সঙ্গে শুড় নামিয়ে পায়ের কাছে শুকে দেখতে চেষ্টা করল জিনিসটা কী! অমনি চোখের পলকে ছোট্ট মা ইঁদুরী এক লাফে শুড়ের ছিদ্রে ঢুকে পড়ল। আর সেই ছিদ্র দিয়ে তরতর করে বেয়ে মাথায় ঢুকে পড়ল। 

সেখানে গিয়ে মা ইঁদুরী হাতির মস্তিষ্কে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে তার মগজ ফালা ফালা করে দিতে লাগল। সেই সঙ্গে তার গায়ে লেপে দেওয়া আঠালো বিষ সারা মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ল ।

হাতি তখন কিছুই বুঝতে না পেরে মল্লভূমির চারদিকে দাপাদাপি শুরু করল। বিষের ক্রিয়া তখন শুরু হয়ে গেছে। তার চিৎকারে চারদিক কেঁপে উঠল। যন্ত্রণায় ছুটতে ছুটতে মল্লভূমির বেড়া থেকে শুরু করে সবকিছু তছনছ করে দিল । 

কিন্তু বিষের ক্রিয়ায় আস্তে আস্তে তার সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে গেল। সে প্রচণ্ড এক শব্দ করে আছড়ে পড়ল মাটিতে এবং সঙ্গে সঙ্গে মারা গেল ।

ছোট্ট ইঁদুরীর ছেলে তরুণ বালক তখন সুতো ধরে আস্তে আস্তে টেনে মাকে বের করে আনল। মুক্ত বাতাসে বেরিয়ে এসে মা ইঁদুর তখন একটু হাসল। সেই হাসির রেশ ছেলের মুখেও ছড়িয়ে পড়ল।

রাজার তখন তরুণ বালককে দেওয়া প্রতিজ্ঞা রাখা ছাড়া আর উপায় রইল না। রাজকন্যার সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল ধুমধাম উৎসব করে। সেই উৎসব ও বিয়ের ভোজ চলল রাজবাড়ির জৌলুস মাফিক। তারপর রাজার মৃত্যু হলে সেই তরুণ বালক হল রাজা। মা ও রানীকে নিয়ে সুখে রাজত্ব করে তার জীবন কাটতে লাগল ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য