জোলার বুদ্ধি - বাংলাদেশের লোককাহিনী

জোলার এক গাই! জোলা তো সারাদিন তাত-খুঁটি লইয়া কাপড় বুনায়। গাইটিকে মাঠে চরাইতে যাইবে কখন? জোলা এক বুদ্ধি বাহির করিল। খুব লম্বা একটি দড়িতে বাঁধিয়া জোলা গাইটিকে রোজ সকালে ছাড়িয়া দেয়। গাই মাঠে যাইয়া সারাদিন ঘাস খায়। সন্ধ্যা হইলে জোলা দড়ি ধরিয়া টানিয়া গাইটিকে ঘরে আনে। এইভাবে বহুদিন কাটিয়া গেল। মাঠের নানা শস্যক্ষেতে খাইয়া গাইটি বেশ নাদুসনুদুস হইয়া উঠিল।
জোলার বাড়ির পাশে সাত ভাই চাষীর বাড়ি। জোলার গাইটিকে একদিন তাহারা জবাই করিয়া খাইয়া ফেলিল। তারপর গাইটির নাড়ী-ভুঁড়ি হাড়-গোড় আর চামড়া সেই দড়ির সঙ্গে বাঁধিয়া রাখিল । 
রোজ বিকাল বেলা জোলা রশি ধরিয়া টানিলে গাই আপনা হইতে চলিয়া আসে। আজ জোলা এত টানাটানি করে কিন্তু গাই আসে না। তখন জোলা আর জুলনী হেইও হেইও করিয়া কোনো রকমে সেই নাড়ী-ভুঁড়ি আর হাড়-চামড়ার পুঁটলিটি টানিয়া আনিল। জোলা আর জুলনী বুঝিল তাহাদের গাইটিকে সাত ভাই চাষীরা কাটিয়া খাইয়া ফেলিয়াছে। গাইটির জন্য তাহারা সারারাত বসিয়া কাঁদিল । পরদিন সকালে জোলা সেই হাড়-গোড় আর চামড়া একটা ছালায় পুরিয়া হাটে লইয়া গেল বিক্রি করিতে। মরা গরুর হাড়-গোড় আর কে কিনিবে? তাছাড়া নাড়ী-ভুড়ি পচিয়া দুৰ্গন্ধ হইয়া উঠিয়াছে। যে দেখে সেই জোলাকে মারিতে আসে। জোলা হাটের এ কোণা হইতে ও কোণায় যায়-ও কোণা হইতে সে কোণায় যায়। সকলেই দূর দূর করিয়া তাহাকে তাড়াইয়া দেয়। কোথাও সেই হাড়-গোড় সে বেঁচিতে পারিল না। তখন সেই ছালা মাথায় করিয়া জোলা বাড়ি রওয়ানা হইল। 

পথের মধ্যে রাত্র হইল। বাড়ি যাইতে আরও বহু পথ বাকী। কিন্তু রাত্রিকালে পথ চলিতে ডর করে। সেই ছালাসমেত জোলা একটি বটগাছের ডালে যাইয়া বসিয়া রাত কাটাইবে ঠিক করিল। অনেক রাতে সাত ভাই চোর এক বস্তা টাকা চুরি করিয়া আনিয়া সেই গাছতলায় আসিয়া বসিয়াছে টাকা ভাগ করিবার জন্য। তাহাদের দেখিয়া জোলা ভয়ে ঠির ঠির করিয়া কাঁপিতে লাগিল। এমন সময় তার হাত হইতে সেই হাড়-গোড়ের বস্তা পড়িয়া গেল। তখন ভয়ে চোরেরা টাকার বস্তা ফেলিয়া দে চম্পট।
ভোর হইলে সেই টাকার বস্তা মাথায় করিয়া জোলা বাড়ি ফিরিয়া আসিল। জোলার বউ তো সেই টাকার বস্তা দেখিয়া আহলাদে আটখানা। মনের খুশীতে জোলা আর জুলনী হাত ধরাধরি করিয়া সেই টাকার বস্তার চারিদিকে ঘুরিয়া ঘুরিয়া নাচিতে লাগিল! নাচিয়া নাচিয়া হয়রান হইয়া জোলা ভাবিতে লাগিল, এক ছালা টাকা সে গণিবে কেমন করিয়া? সে বউকে বলিল, “সামনের সাত ভাই ভাষীর বাড়ি হইতে চাউল মাপিবার একটি সের লইয়া আইস ।" 

হেলিতে দুলিতে জোলার বউ সাত ভাই চাষীর বউয়ের কাছে যাইয়া বলিল, “তোমাদের চাউল সেরটি দিবে?" 
জোলার হাঁড়িতে এক সেরের বেশি দুই সের চাউল কোনদিন তাহারা দেখিল না। তার বউ আসিয়াছে আজ সের লইতে! সাত ভাই চাষীর সাত বউ জুলনীকে ঘিরিয়া ধরিল, “কি মাপিবি লো সের দিয়া?"
গুমরে গড়াইয়া খুশীতে ছড়াইয়া জুলনী বলিল, “তোমরা তো আমাদের গাইটিকে মারিয়া ভঅইয়াছ। তারই হাড়গোড় লইয়া জোলা হাটে গিয়াছিল। তাহাই বেচিয়া জোলা এক ছালা টাকা লইয়া আসিয়াছে। তা এত টাকা আমরা গণিব কি দিয়া? তাই তোমাদের সেরটি লইতে আসিয়াছি।"

কথাটা বিশ্বাসও করা যায় না আবার অবিশ্বাসও করা যায় না। বাড়ির বড় বউ সেরের মধ্যে একটু আঠা লাগাইয়া দিল। যদি সত্য সত্যই জোলা টাকা পাইয়া থাকে তবে দু-একটি টাকা সেই আঠার সঙ্গে লাগিয়া থাকিবে। বিকাল বেলা যখন জুলনী সেরটি ফিরাইয়া দিয়া গেল, সাত ভাই চাষীর বউরা দেখিয়া অবাক হইল। সত্য সত্যই সেরের তলায় একটি টাকা আটকাইয়া আছে। শোনা শোন এই কথা সাত ভাই চাষীরাও শুনিল। তাহারা ভাবিল, একটা গরুর হাড়-গোড় বিক্রি করিয়া জোলােএকছালা টাকা পাইয়াছে। আমাদের সাতটা বলদ আছে। ঐগুলির হাড়-গোড় বেচিয়া আমরা সাত ছালা টাকা পাইব । সামনের হাটে সাত ভাই চাষী তাহাদের সাতটি হালের বলদ মারিয়া ঐগুলির হাড়-গোড় সাতটি ছালায় ভরিয়া হাটে লইয়া গেল বেঁচিতে । 

মরা গরুর হাড়-গোড় কে কিনিবে? হাটের লোকেরা তাহাদের মারিয়া তাড়াইয়া দিল । বাড়িতে আসিয়া সাত ভাই চাষীর বড়ই রাগ হইল। জোলা ফাকি দিয়া তাহাদের সাতটি বলদ মারাইল । তাহারা আসিয়া জোলার কুঁড়েঘরখানি আগুন দিয়া পোড়াইয়া দিয়া গেল ।

পরদিন জোলা সেই পোড়া ঘরেই ছাই একটি ছালায় ভরিয়া হাটে চলিল । পথের মধ্যে রাজার পাইকেরা গরুর গাড়িতে করিয়া টাকার বস্তা লইয়া যাইতেছিল। জোলা তাহাদের কাছে যাইয়া বলিল, “ভাইরা! আমার বস্তাটি বড়ই ভারী লাগিতেছে। তোমাদের গাড়ির উপর একটু রাখিতে দিবে?" 
জোলার কাকুতি-মিনতি দেখিয়া পাইকদের দয়া হইল-“আচ্ছা রাখ ভাই।"

জোলা ছাই-এর বস্তা টাকার গাড়িতে রাখিয়া সঙ্গে সঙ্গে চলিল । কতক দূর যাইতে গাড়ি যখন অন্য পথ ধরিবে জোলা তখন ছাই-এর বস্তা রাখিয়া একটা টাকার বস্তা মাথায় লইয়া পথ চলিতে লাগিল । এত বস্তার মধ্যে রাজার পাইকেরা টেরও পাইল না যে, জোলা টাকার বস্তা লইয়া গিয়াছে। জোলা বাড়ি ফিরিয়া আসিল। আগের মতো জুলনী টাকা মাপিবার জন্য সাত ভাই চাষীর বাড়ি হইতে সের চাহিয়া আনিল । এবারও সের ফেরত দেওয়ার সময় সত্য সত্যই একটি টাকা সেরের তলায় আঠার সঙ্গে আটকাইয়া আসিল । 

সাত ভাই চাষী জোলার নিকট যাইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কিরে জোলা, এবার টাকার ছালা পাইলি কোথায়?” 

ঘরখানা পোড়াইয়া বড়ই উপকার করিয়াছ। সেই পোড়া ঘরের ছাই হাটে লইয়া গিয়াছিলাম। বিক্রি করিয়া এক ছালা টাকা পাইয়াছি।” সাত ভাই চাষী তখন বাড়ি আসিয়া ভাবিতে বসিল, “দেখরে, জোলার একখানা ঘর পোড়াইয়া যে ছাই পাওয়া গেল তাহা বিক্রি করিয়া জোলা একছালা টাকা পাইয়াছে। আমাদের সাতখানা বড় বড় ঘর আছে। এগুলি পোড়াইলে সাত ছালারও বেশি ছাই হইবে। হাটে বিক্রি করিয়া আমরা সাত ছালা টাকা পাইব ।" 
যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। দাউ দাউ করিয়া সাত ভাই চাষীর সাতখানা ঘর আগুনে পুড়িয়া গেল। তখন সাত ভাই চাষী সাত ছালা ছাই লইয়া হাটে গেল। “মিঞা সাহেবরা! আপনারা কেহ ছাই কিনিবেন?" ছাই আবার কে কেনে? সকলেই দূর দূর করিয়া তাহাদের তাড়ায়। সেদিন বাতাস ছিল জোরে। সাত ভাই চাষীর ছালা হইতে একটি ছালার মুখ গেল খুলিয়া। অমনি বাতাসে ছাই উড়াইয়া এর চোখে তার চোখে যাইয়া ছড়াইয়া পড়িল । সমস্ত হাটুরে লোকেরা

তখন সাত ভাই চাষীকে এ দিল কিল-ও দিল থাপ্পড়— সে দিল ঘুষি । কথায় বলে, হাটুরে লোকের মার। নুলোও আসিয়া নুলো হাতের একটা থাপ্পর দিয়া যায়। কোনোরকমে হাট হইতে পালাইয়া সাত ভাই চাষী বাড়ী ফিরিল। মারের চোটে রাত্রে তাহদের জ্বর হইল।
সাতখানা ঘর পোড়াইয়াছে। সাত ভাই চাষী খুব রাগিয়া, জোলাকে একটি ছালার মধ্যে ভরিল। তারপর সেই ছালা মাথায় করিয়া তাহাকে নদীতে ফেলিয়া দিতে লইয়া চলিল ।
জোলা বড়ই ভারী। যে জোলাকে ছালা সমেত মাথায় করিয়া লইয়া চলিয়াছিল সে আর পারে না। নদীর নিকটে আসিয়া ঢিপ্পিস করিয়া ছালাসমতে জোলাকে মাটিতে ফেলিয়া দিল। তারপর সামনের বাড়িতে সাত ভাই চাষী তামাক খাইতে গেল।
সেখানে এক রাখাল গরু চরাইতেছিল। জোলা ছালার ভিতর হইতে সেই রাখালকে ডাকিতে লাগিল। রাখাল ছালার মধ্যে মানুষ দেখিয়া অবাক হইয়া গেল। সে জিজ্ঞাসা করিল, “ভাই! তোমার এইরূপ অবস্থা কে করিল?"
ছালার ভিতর হইতে জোলা বলিল, “আরে ভাই! আমার দুঃখের কথা আর বলিবার নয়! আমি তো বিবাহ করিতে চাহি না, কিন্তু সাত ভাই চাষী আমাকে জোর করিয়া ছালায় ভরিয়া লইয়া যাইতেছে বিবাহ করাইবার জন্য।" 

রাখাল বহুদিন হইতে বিবাহ করিতে চেষ্টা করিতেছে ; কিন্তু বিবাহ করিতে তো অনেক টাকা লাগে । টাকা জোগাড় করিতে পারে নাই বলিয়া বিবাহ করিতে পারিতেছে না। সে বলিল, “আচ্ছা ভাই! এক কাজ করিলে হয় না ? তুমি ছালার ভিতর হইতে বাহির হইয়া আস। আমি ছালার ভিতরে যাই । তোমার বদলে আমি বিবাহ করিয়া আসি। আমি ভাই বহুদিন হইতে বিবাহ করিতে চাহিতেছি, কিন্তু টাকা-পয়সার অভাবে বিবাহ করিতে পারি নাই।" 

ছালার ভিতর হইতে জোলা বলিল, “তুমি ভাই আমাকে বাঁচাইলে । আমার বদলে তুমি যাইয়া বিবাহ করিয়া আইস। আচ্ছা, এক কাজ কর। তোমার হাতের কাস্তেখানা দিয়া ছালার মুখ কাটিয়া দাও।” বোকা রাখাল তাহাই করিল। জোলা ছালার ভিতর হইতে বাহির হইয়া রাখালকে ছালার মধ্যে ভরিয়া বেশ করিয়া ছালার মুখ বাঁধিয়া দিল । তারপর পাশের একটি ঝোপের মধ্যে পালাইয়া রহিল। 

এদিকে সাতভাই চাষী পাশের বাড়ি হইতে তামাক খাইয়া আসিয়া সেই ছালাসমেত রাখালকে নদীতে ফেলিয়া দিয়া বাড়ি চলিয়া গেল। তাহারা ভাবিল, জোলা এবার সত্য সত্যই নদীতে ডুবিয়া মরিবে । জোলা পাশের ঝোপ হইতে বাহির হইয়া আসিয়া রাখালের গরুগুলি লইয়া বাড়ি ফিরিল। 

সাত ভাই চাষী ভাবে, জোলাকে নদীতে ফেলিয়া দিয়া আসিলাম । বেটা আবার একপাল গরু লইয়া ফিরিয়া আসিল । ব্যাপার কি ? জোলার কাছেই সমস্ত খবর শুনিতে হইবে।

সাত ভাই চাষী জিজ্ঞাসা করিতেই জোলা বলিল, “ভাই ছালায় ভরিয়া নদীতে ফেলিয়া দিয়া তোমরা আমার বড়ই উপকার করিয়াছ। আমি তো ছালাসমেত নদীর তলায় ডুবিয়া গেলাম। সেখানে দেখি কি, কত শত শত গরু চরিয়া বেড়াইতেছে। আমি আর কয়টা আনিতে পারি। এই গোটা পনেরো গরু তাড়াইয়া লইয়া বাড়ি আসিলাম। তোমরা সাত ভাই চাষী যদি থাকিতে তবে প্রায় সকল গরুই লইয়া আসিতে পারিতে।"
সাত ভাই চাষী তখন জোলাকে অনুরোধ করিল, “তুমি আমাদিগকে একে একে ছালায় পুরিয়া নদীতে ফেলিয়া দিয়া আস। দেখ ভাই! তোমার কথা মতো গরু মারিলাম- ঘর পোড়াইলাম। এখন আমাদের কিছুই নাই। এবার যদি তোমার মতো কিছু গরু লইয়া আসিতে পারি তবেই হালচাষ করিতে পারিব।"
জোলা তখন একে একে সাত ভাই চাষীকে ছালায় পুরিয়া নদীতে ফেলিয়া দিয়া আসিল । তারপর দুই ছালা টাকা দিয়া আর গরু বাছুর লইয়া সুখে দিন কাটাইতে লাগিল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য