টিপ্‌টিপানী - বাংলাদেশের লোককাহিনী

     এক তাঁতী। তাঁত চালাইয়া পেটের ভাত জোটে না। কাপড় বুনাইয়া যা লাভ হয়, সূতার দাম দিতে দিতেই তার প্রায় সবটা খরচ হইয়া যায়। তাঁতী ভাবিল, তাত-খুঁটি বেচিয়া যদি একটি ঘোড়া কিনিতে পারি তবে ঘোড়ায় করিয়া বেপারীদের মাল এ-বাজারে ও-বাজারে লইয়া গিয়া বেশ কিছু উপার্জন করিতে পারিব।
     তাই সে তিন টাকায় তাঁত-খুঁটি বেচিয়া হাটে আসিল ঘোড়া কিনিতে। কিন্তু একটা ঘোড়ার দাম দুইশ’ তিনশ' টাকা। তিন টাকায় কে তাহার কাছে ঘোড়া বিক্রি করিবে ?
     তখন সে ভাবিল, তিন টাকা দিয়া সে একটি ঘোড়ার বাচ্চা কিনিবে ; কিন্তু একটা ঘোড়ার বাচ্চার দামও তিরিশ চল্লিশ টাকার কম না। তার টেকে আছে মাত্র তিনটি টাকা। ভাবিল যদি সে একটি ঘোড়ার ডিম কিনিতে পারে, সেই ডিম হইতে ঘোড়ার বাচ্চা হইবে। একটা ঘোড়ার ডিমের দাম আর কত হইবে? নিশ্চয় তিন টাকার বেশি নয়।
     কিন্তু ঘোড়ার কি কখনো ডিম হয় ? সে ঘোড়া-ওয়ালাদের কাছে জিজ্ঞাসা করে, “তোমাদের কাছে ঘোড়ার ডিম আছে?" তাহারা হাসিয়া কেহ তাহার গায়ে কুটা ছড়াইয়া দেয়- কেহ বালু ছড়াইয়া দেয়। কিন্তু তাতী ঘোড়ার ডিম না কিনিয়া কিছুতেই বাড়ি ফিরিবে না। সে যাহাকে দেখে তাহাকেই ঘোড়ার ডিমের কথা জিজ্ঞাসা করে।
     আগেকার দিনে হাটে বাজারে কতকগুলি ট্যাটন থাকিত। তাহারা লোক ঠকাইয়া বেড়াইত।
     ঘুরিতে ঘুরিতে তাঁতী এক ট্যাটনের কাছে জিজ্ঞাসা করিল, "তোমার কাছে ঘোড়ার ডিম আছে।" ট্যাটন বলিল, “আছে। দাম পাঁচ টাকা ।" 
     তাঁতী তাহার হাতখানা ধরিয়া অনেক কাকুতি-মিনতি করিয়া বলিল, “ভাই! আমার কাছে মাত্র তিনটি টাকা আছে। ইহা লইয়াই তোমার ঘোড়ার ডিমটি আমাকে দাও।” 
     ট্যাটন একটি পাকা বাঙ্গী আনিয়া তাঁতীকে দিয়া বলিল, “এটিকে তাড়াতাড়ি বাড়ি লইয়া যাও। ফাটিলেই ইহার ভিতর হইতে ঘোড়ার বাচ্চা বাহির হইবে।" 
     তিনটাকা দিয়া বাঙ্গীটি কিনিয়া তাঁতী হনহন করিয়া বাড়ির দিকে চলিল। 
    খানিকদূরে আসিয়া তাঁতী সামনে দেখিল একটি পুকুর। সে বাঙ্গীটি এক জায়গায় রাখিয়া মুখহাত ধুইতে সেই পুকুরের পানিতে নামিল । এর মধ্যে বাঙ্গীটি ফাটিয়া গিয়াছে। ফাটা বাঙ্গীর গন্ধ পাইয়া এক শেয়াল আসিয়া সেই বাঙ্গী খাইতে লাগিল। মুখহাত ধুইয়া আসিয়া তাঁতী অবাক হইয়া দেখিল, তাহার ঘোড়ার ডিম ফাটিয়া বেশ বড়সড় একটা বাচ্চা বাহির হইয়াছে। সে তাড়াতাড়ি দড়ি লইয়া শেয়ালের পিছে পিছে দৌড়। কিন্তু মানুষ শেয়ালের সঙ্গে দৌড়াইয়া পরিবে কেন? শেয়াল দৌড়াইয়া এক জঙ্গলের ভিতর ঢুকিল । 
     তখন রাত্র হইয়াছে। চারিদিকে অন্ধকার। এখন বাড়ি ফিরিয়া যাওয়াও মুস্কিল। সেই জঙ্গলের ধারে ছিল এক বুড়ীর বাড়ি। তাঁতী বুড়ীকে যাইয়া বলিল, “বুড়ীমা। আজকার রাতের মতো আমাকে তোমার বাড়িতে থাকিতে দিবে?" 
     বুড়ী ভালো লোক। তাঁতীকে থাকিবার জন্য কাছারী ঘরে কাঁথা-বালিশ আনিয়া দিল ।
     কিন্তু তাঁতীর আর ঘুম আসে না। সে দড়িগাছি হাতে লইয়া জাগিয়া বসিয়া রহিল। যদি তার ঘোড়ার বাচ্চা এই পথ দিয়া যায়, শেষরাত্রে টিপ টপ করিয়া বৃষ্টি হইতেছিল। এমন সময় বাঘ আসিয়া ঘরের পিছনে ওঁৎ পাতিয়া বসিল। বাঘ সুযোগ খুঁজিতেছিল কি করিয়া একলাফে যাইয়া তাঁতীকে খাইয়া ফেলিবে। 
     অন্ধকারে সব তো ভালোমতো চেনা যায় না! তাঁতী ভাবিতেছিল, ওই বাঘটিই তাহার ঘোড়ার বাচ্চা। সে দড়ি হাতে লইয়া বসিয়া বসিয়া ফন্দী আটিতেছিল কি করিয়া তার ঘোড়ার বাচ্চাটিকে বাঁধিয়া ফেলিবে । 
     বুড়ীর এক নাতনী বুড়ীর সঙ্গে ঘুমাইত। সে জাগিয়া উঠিয়া বলিল, "দাদী, ওই ঘরে আমার পুতুল আছে শিগগীর আনিয়া দাও।” দাদী বলিল, “একে তো বাঘের ভয় । তার উপরে টিপটিপানী! এখন ঘুমাইয়া থাক। সকাল হইলেই তোর পুতুল আনিয়া দিব।" 
     বুড়ীর কথা শুনিয়া বাঘের তো আক্কেল গুডুম। টিপটিপানী অর্থে বুড়ী বলিয়াছিল টিপ টপ করিয়া বৃষ্টি পড়ার কথা। বাঘ ভাবিল টিপটিপানি যেন কি এক জন্তু! বাঘের চাইতেও জোরওয়ার বাঘ! তখন লেজ উঁচাইয়া দে দৌড়। তাঁতী মনে করিল ঘোড়ার বাচ্চা পালাইয়া যায়। সে পিছে পিছে দৌড়াইয়া একেবারে বাঘের পিঠে উঠিয়া সওয়ার হইয়া বসিল। 
     বাঘ মনে করিল, সেই টিপটিপানী বুঝি তাহার পিঠে আসিয়া বসিয়াছে। তখন সে প্রাণের ভয়ে দৌড়াইয়া এদিকে যায়ওদিকে যায়। তাঁতী আরও শক্ত করিয়া দুই হাতে বাঘের ঝুটি ধরিয়া রাখে। কিছুতেই বাঘ তাহাকে পিঠ হইতে নামাইতে পারে না। এমনি করিয়া ভোর হইল। চারিদিক আলো হইল। তাঁতী দেখিল, সর্বনাশ! এ তো তাহার ঘোড়ার বাচ্চা নয়, বাঘ! তখন ভয়ে তাতী কাঁপিতে লাগিল। বাঘ কিন্তু আগের মতোই এদিকে দৌড়াইতেছে, ওদিকে দৌড়াইতেছে। এইভাবে বাঘ যখন একটি বড় গাছের তলায় আসিয়াছে, তাঁতী তখন লাফ দিয়া গাছের ডালে গিয়া উঠিল। বাঘ ঋঠি তো পড়ি, পড়ি তো উঠি করিয়া দৌড়াইয়া পালাইল।
     এদিকে হইয়াছে কি, বাঘ যাইয়া তার দলের আর সব বাঘকে বলিল, “এই বনে টিপটিপানী আসিয়াছে। আজ সারারাত আমার পিঠে চড়িয়া আমাকে হয়রান করিয়াছে। তোমরা সকলে সাবধানে চলাফেরা করিবে, টিপটিপানী যেন ধরে না। সে এখন গাছের উপর বসিয়া আছে ।"
     শুনিয়া দলের যে বুড়ো বাঘ সে বলিল, “আমরা বাঘ, বনের সব চাইতে জোরওয়ার। আমাদের চাইতে জোরওয়ালা আবার কে আসিল? চল তো দেখিয়া আসি, কেমন সেই টিপটিপানী!"

     এঁড়ে বাঘ, হেড়ে বাঘ, ধেড়ো বাঘ, কুতকুতানি বাঘ, মিন মিনানি বাঘ, জুরো বাঘ, কেশোবাঘ, সব বাঘ একত্র হইয়া কেউ কাঁথামুড়ি দিয়া, কেউ মাথায় ভাঙ্গা হাড়ির টোপর পরিয়া সেই গাছের তলায় আসিয়া উপস্থিত হইল।
     বুড়ো বাঘ নজর কিরয়া দেখিল সেই গাছের উপরের ডালে জোলা দড়ি হাতে লইয়া বসিয়া আছে।
    কিন্তু অত উপরের ডাল তো বাঘের নাগালের বাইরে। তখন সেই বুড়োবাঘ, তার কাঁধে একটা বাঘ, সেই বাঘের কাঁধে আর একটা বাঘ, তার কাঁধে আর একটা বাঘ উঠিয়া, শেষ বাঘটা যখন জোলাকে ছুঁইছুঁই তখন ভয়ে জোলা দড়িসমেত গাছ হইতে গিয়াছে পড়িয়া। নিচের বুড়োবাঘ ভাবিল, টিপটিপানী বুঝি আমাকে দড়ি দিয়া বাঁধিতে আসিয়াছে। সে তখন উঠিয়া পড়িয়া দৌড়। সঙ্গে সঙ্গে তার কাঁধের উপর হইতে আর আর বাঘগুলি দুডুম, দাড়ুম করিয়া পড়িয়া গেল। তাহারাও বুড়োবাঘের সঙ্গে দৌড়াইয়া পালাইল। তাঁতী কাঁপিতে কাঁপিতে বাড়ির পথে পা বাড়াইল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য