ছোটো জলকন্যার কথা-- ২য় অংশ

মাঝে মাঝে একটা রঙ-চঙে নেীকো করে রাজপুত্র বেড়াত, মাথার উপর নানা রঙের নিশান উড়ত। জলকন্যা জলের ধারে সবুজ নল-বনে লুকিয়ে লুকিয়ে রাজপুত্রের গলার স্বর শুনত ।
রাতে অনেক সময় বাতি-ঘরের আলোয় জেলেরা জাল ফেলে মাছ ধরত। জলকন্যা শুনতে পেত ওরা রাজপুত্রের কথা, তার নানান বীরত্বের কথা বলাবলি করছে। এই ভেবে তার ভারি আনন্দ হত যে, রাজপুত্রের প্রাণ তারই জন্যে বেঁচেছিল। মনে পড়ত, রাজপুত্রের মাথাটি কেমন তার বুকের উপর লুটিয়ে পড়েছিল, সে কেমন আস্তে একটা চুমো খেয়েছিল, কিন্তু রাজপুত্র সে কথা টেরও পায় নি, স্বপ্নেও ভাবতে পারে নি।
যতই দিন যায়, মানুষদের তার ততই ভালো লাগে, বড়ো ইচ্ছা করে, আহা, সে-ও যদি মানুষ হত ! জলের মানুষদের জগতের চাইতে এদের জগৎটাকে অনেক বেশি বড়ো মনে হত। জাহাজে চড়ে মানুষরা যেমন সমুদ্রের উপরে ভেসে বেড়াতে পারে, আবার আকাশ-ছোয়া পাহাড়ের শিখর অবধি চড়তে পারে। জলকন্যাদের চোখ যতদূর যায়, তার চাইতেও অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে ওদের বনে ঢাকা রাজ্য।

অনেক জিনিস ছোটো রাজকুমারী বুঝতে পারত না, মনে হত কেউ বুঝিয়ে দিলে ভালো হয়, কিন্তু দিদিরাও ঠিক উত্তরটি বলতে পারত না। শেষপর্যন্ত বুড়ি রাজ-মাতাকেই জিজ্ঞাসা করতে হত, তিনি তো উপরের জগতের বিষয়ে অনেক কিছু জানতেন। সে জগৎকে তিনি বলতেন, ‘সাগরের উপরের রাজ্য ।” একদিন ছোটো জলকন্যা জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা, ঠাকুমা, মানুষরা যদি ডুবে না যায়, তা হলে কি তার চিরকাল বেঁচে থাকে ? আমরা যারা সাগরের তলায় বাস করি, আমাদের মতো ওরা মরে যায় না ?”

ঠাকুমা উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, আমাদের মতাঁ ওরাও মরে যায়, এমন-কি, ওরা আমাদের চাইতে কম দিন বাঁচে। আমরা তো তিনশো বছর বাঁচি, কিন্তু মরে গেলে আমরা সমুদ্রের ফেনা হয়ে যাই, প্রিয়জনের কাছাকাছি একটা কবরের একটু ভাগও পাই না। আমাদের অমর আত্মা নেই, আমরা আবার জন্মাই না ; ঘাস কেটে ফেললে যেমন চিরদিনের মতো শুকিয়ে যায়, আমরাও তেমনি মরে গেলে নিঃশেষ হয়ে যাই! মানুষদের কিন্তু আত্মা আছে ; দেহ ধুলোর সঙ্গে মিশে গেলেও ওদের আত্মা বেঁচে থাকে। আমরা যেমন জল থেকে উঠে মুগ্ধ হয়ে মানুষদের বাড়িঘর দেখি, ওরাও তেমনি মরে গেলে আকাশ পারের অপূর্ব অজানা আবাসে উঠে যায়। সে জায়গা চোখে দেখবার আমাদের অধিকার নেই।”

ছোটো জলকন্যা বলল, “তা কেন ? আমাদের কেন অমর আত্মা নেই ? মরে যদি আকাশ পারের সেই স্বৰ্গে ঢুকবার অধিকার পাই, তা হলে আমি খুশি হয়ে এই তিনশো বছরের জীবনের বদলে একটিমাত্র দিন মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই ।”

ঠাকুমা বললেন, “ও কথা ভাবতে হয় না। এই যেমন আছি, এই ভালো। মানুষদের চেয়ে আমরা অনেক বেশি দিন বাঁচি আর অনেক বেশি সুখে থাকি।” ছোটো জলকন্যা কেঁদে বলল, “তবে কি আমাকে মরে গিয়ে ফেনার মতো সমুদ্রের উপরে আছড়ে পড়তে হবে, আর কোনোদিনও সুন্দর ফুল, আলোয় আলো সূর্য দেখতে পাব না! বল, ঠাকুমা, এমন কোনো উপায় নেই কি যাতে আমিও অমর আত্মা পাই ?”. বুড়ি ঠাকুমা বললেন “না, বাছা, তবে এ কথাও সত্যি

যে, যদি কোনো মানুষ তোকে মা-বাপের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, সমস্ত প্রাণমন দিয়ে যদি সে তোকে ভালোবাসে, যদি পুরুতঠাকুর যখন তোদের দুজনার হাত এক সঙ্গে বেঁধে দেবেন, তখন সে প্রতিজ্ঞা করে যে, চিরদিন তোকে ছাড়া আর কাকেও মনে স্থান দেবে না, তা হলেই তার আত্মা তোর মধ্যেও প্রবাহিত হবে, আর তাই যদি হয়, তবেই তুই মানবজন্মের সুখের ভাগ পাবি। কিন্তু সে তো হবার জো নেই ; তার কারণ আমাদের দেহের যেটুকু আমাদের চোখে সবচাইতে সুন্দর, অর্থাৎ কিনা আমাদের ল্যাজটি, ওদের চোখে সেটিই হল সবচাইতে কুৎসিত, ওটিকে ওরা সইতে পারে না। ওদের চোখে সুন্দর দেখাতে হলে, দুটি আনাড়িপানা ঠেকো দরকার, তাকে ওরা বলে পা ।”

ছোটো জলকন্যা একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে, মুখ ভার করে নিজের শরীরের আশে ঢাকা জায়গাটুকুর দিকে তাকিয়ে রইল ; শরীরের বাদবাকিটুকু কি ফরস, কি সুন্দর।

বুড়ি ঠাকুমা বললেন, “আমরা কত সুখী রে, তিনশো বছর ধরে কেমন লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে সাঁতরে কাটাতে পারি। সে তো অনেকদিন রে মানিক, তার পর মরে গিয়ে কেমন শান্তিতে ঘুমুব ! জানিস্, আজ সন্ধ্যায় রাজসভায় নাচ-গান হবে!” রানীমা যে নাচের আসরের কথা বলছিলেন তেমন জমকাল ব্যাপার পৃথিবীতে কখনো দেখা যায় না। সভাঘরের দেয়ালগুলি স্ফটিক দিয়ে তৈরি, খুব পুরু, তবু কি স্বচ্ছ। দেয়ালে শতশত বড়ো-বড়ো ঝিনুক বসান, কোনোটার রঙ গোলাপের মতো, কোনোটা ঘাসের মতো সবুজ। সবগুলি থেকে উজ্জ্বল আলো বেরুচ্ছে ; সেই আলোতে সভাঘর আলোয় আলোময়। কাচের মতো দেয়াল ভেদ করে সেই আলো জলের মধ্যে কত দূরে ছড়িয়ে পড়েছে। অগুন্তি মাছ ভেসে বেড়াচ্ছে, ছোটো বড়ো লাল বেগুনি সোনালি রুপোলি ; ভালো লেগে তাদের গায়ের আঁশ বলমল করছে। সভাঘরের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে ঝিকমিকে নির্মল একটি জলের ধারা। সেই জলের ধারায় জল-মানবরা জলকন্যারা নাচছে আর মিষ্টি গলায় নাচের তালে তালে গান গাইছে ।

ছোটো রাজকুমারী সবার চাইতে সুরেলা গলায় গান গাইল, সবাই হাত-তালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানাল। তাতে তার বড়োই আনন্দ হল। সে জানত সমুদ্রের নীচেই হোক, বা উপরের জগতেই হোক অমন মধুর কণ্ঠ কারও নেই। তবু খানিক বাদেই তার সমস্ত মন ভরে উঠল উপরের জগতের চিন্তায়। রাজপুত্রের কথা সে কিছুতেই ভুলে থাকতে পারত না ; একটা অমর আত্মা না থাকার দুঃখ রাখার জায়গা সে খুঁজে পেত না। রাজবাড়িতে সকলে আনন্দে মত্ত, শুধু ছোটো রাজকুমারী কাউকে না জানিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে এসে, নিজের বাগানটিতে বসে চিন্তায় ডুবে রইল। সে বাগানের আজকাল কেউ যত্ন নেয় না।

হঠাৎ তার কানে এল জলের উপরে দূরে কোথায় শিঙা বাজছে। মনে মনে জলকন্যা বলল, “যাকে আমি আমার মা-বাবার চেয়েও বেশি ভালোবাসি, সে এখন শিকারে বেরুল । ওকে এবং একটি অমর আত্মা পাবার জন্য আমি সব খোয়াতে রাজি। রাজবাড়িতে দিদিরা এখনো নাচ-গানে ব্যস্ত, এই বেলা যাই জাদুকরীর কাছে। এত-কাল তাকে কি ভয়ই-না করেছি, কিন্তু এখন সে ছাড়া কেউ আমাকে বুদ্ধিও দিতে পারবে না, সাহায্যও করতে পারবে না।’ ছোটো জলকন্যা বাগান ছেড়ে ফেনাভৱা ঘূর্ণিজলের দিকে


চলল ; ঘূর্ণির ওপারে জাদুকরীর বাড়ি। এদিকে এর আগে সে কখনো আসে নি। এ পথে ফুল ফোটে না, সাগর তলার ঘাস গজায় না। অনেকখানি ন্যাড়া ধূসর বালি পার হয়ে সে ঘূর্ণিজলের কাছে পৌছল। ময়দা-পেষা কলের মতো সেখানকার জলগুলো কেবলই ঘুরছে, পাক খাচ্ছে, নাগালে যা কিছু পাচ্ছে তাকেই ধরে পাক খাইয়ে অতল গভীরে ফেলে দিচ্ছে । জাদুকরীর এলাকায় পৌছতে হলে এই ভয়াবহ জায়গাটা পার হতে হয়। সেটি পেরিয়ে সামনে দেখে শ্যাওলাভরা একটা জলাভূমি টগবগ করে ফুটছে। জাদুকরী এ জায়গাকে বলত তার ঘাস-বিল ।

তারও পরে বন, সেই বনে জাদুকরীর বাড়ি। বড়ো অদ্ভুত সে বাড়ি। তার চারধারের গাছপালা ঝোপঝাড় সব জ্যান্ত প্রাণী, দেখে মনে হয় যেন শত শত মাথাওয়ালা সাপ না কেঁচো, মাটি থেকে গাছের মতো গজিয়েছে। তাদের ডালপালাগুলো পিছলা লম্বা হাতের মতে, আঙুলগুলোও যেন জোঁক। শিকড় থেকে মগ-ডাল অবধি সে গাছগুলো কেবলই নড়ছে চড়ছে, হাত বাড়াচ্ছে! যদি কিছু ঐ হাতে পড়ে, তার আর ছাড়া পাবার উপায় নেই।

সেই বিকট বনের দিকে চেয়ে এক মুহূর্ত দাঁড়াল জলকন্যা ; ভয়ে বুক চিপ-চিপ করতে লাগল ; কাজ শেষ না করেই হয়তো সে ফিরে আসত, কিন্তু ঠিক সেই সময় রাজপুত্রের কথা, অমর আত্মার কথা মনে পড়ে গেল, আর ফিরে আসা হল না। অমনি মনে নতুন করে সাহস পেল। তখন জলকন্যা করল কি, লম্বা কোঁকড়া চুলগুলোকে এঁটে খোঁপা বেঁধে নিল, যাতে জন্তুগুলো না ধরতে পারে। তার পর বুকের উপরে হাত দুটিকে জড়ো করে নিয়ে জলের মধ্যে মাছ যেমন তীর বেগে ছুটে


বেড়ায়, তার চেয়েও বেগে ছুটে বীভৎস গাছগুলো পার হয়ে গেল। তাকে ধরবার জন্য তারা বৃথাই আঁকুপাকু করে হাত বাড়াল। পার হয়ে যাবার সময় রাজকুমারী দেখতে পেল প্রত্যেকটি বিকট হাতের মুঠির মধ্যে একটা কিছু ধরা রয়েছে, ছোটাে-ছোটাে আঙুলগুলো লোহার বাঁধনের মতো সেগুলোকে ধরে রেখেছে ! কত জুবে যাওয়া মানুষের সাদা কঙ্কাল, কত জাহাজের হাল, কত সিন্দুক, কত ডাঙার জানোয়ারের হাড়গোড়, এমন-কি, ছোটো একটি মরা জলকন্যা, তাকে ডাল পালাগুলো ধরে, দম বন্ধ করে মেরেছে ! কি ভয়ংকর দৃশ্যইনা দেখল হতভাগিনী রাজকুমারী ! 

সেই ভয়াবহ বন পার হয়ে জলকন্যা একটা শ্যাওলা-ঢাকা পিছল জায়গায় এল, সেখানে প্রকাণ্ড মোটা-মোটা সব গুগলি হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে। আর তারই মধ্যিখানে জাহাজডুবি

হয়ে প্রাণ হারান হতভাগ্য লোকদের হাড়-গোড় দিয়ে তৈরি একটা বাড়ি । বাড়ির সামনে জাদুকরী বসে একটা কোলাব্যাঙকে আদর করছিল, যেমন করে অনেকে পোষা পাখিকে আদর করে। কদাকার ভোঁদা গুগলিগুলোকে জাদুকরী বলত তার মুরগি-ছানা, ওর গায়ের চারদিকে তারা ঘুরে বেড়াত, বুড়ি কিছু বলত না । 

ছোটো রাজকুমারীকে দেখেই জাদুকরী বলল, “তুমি কি চাও সে আমি ভালো করেই জানি । ঘোর বোকামি হলেও, সে ইচ্ছা তোমার পূর্ণ হবে, ওগো রূপসী রাজকন্যে ! অবিশ্যি তাতে তুমি দুঃখ ছাড়া আর কিছু পাবে না ! ঠিক সময় বেছেই এসেছ যা হোক ; সূর্য-ডোবার পরে এলে, এক বছরের মধ্যে

তোমার জন্যে কিছু করতে পারতাম না। সাঁতরে যেও ডাঙার কাছে, তার পর সাগর-তীরে বসে, একটা ওষুধ দিচ্ছি, সেটি খেও । অমনি তোমার ল্যাজটি খসে শুকিয়ে মানুষরা যাকে পা বলে, তাই হয়ে যাবে। সে সময় কিন্তু বড়ো যন্ত্রণা পাবে, মনে হবে তোমার শরীরের মধ্যে ধারাল ছোরা চালান হচ্ছে। কিন্তু তার পরে যারাই তোমাকে দেখবে তারাই বলবে এমন সুন্দর মেয়ে কখনো দেখে নি। অপূর্ব লাবণ্যে ভরা থাকবে তোমার চলা-ফেরা, তোমার মতো হাল্কা পায়ে কেউ নাচতে পারবে না, কিন্তু পা ফেললেই মনে হবে বুঝি শান দেওয়া তলোয়ারের উপরে হাঁটছ, রক্ত ঝরছে। পারবে এত কষ্ট সইতে ? পার তো তোমার ইচ্ছা পূরণ করি।” 

কাপা কাপা গলায় রাজকুমারী বলল, “পারব।” মনে পড়ল রাজপুত্রের কথা, হয়তো অমর আত্মা পাবে সেই কথা। জাদুকরী বলল, “কিন্তু মনে রেখো, একবার মানুষের রূপ ধরলে আর কখনো জলকন্যা হতে পারবে না। আর কখনো বোনদের কাছে তোমার বাবার রাজপ্রাসাদে ফিরে যেতে পাবে না। তা ছাড়া রাজপুত্র যদি তোমাকে এতখানি ভালো না বাসে যে তোমার জন্য মা বাবাকে ছাড়তে পারে তার সব চিন্তাকে সব ইচ্ছাকে এক তুমি জুড়ে থাক আর যদি পুরুত এসে তোমাদের হাতে হাত মিলিয়ে বিয়ে না দেয়, তা হলে কিন্তু ঐ যে অমর আত্মাটি চাইছ, ওটি তোমার পাওয়া হবে না। যেদিন রাজপুত্র অন্য কোনো মেয়েকে বিয়ে করবে, তার পর দিনই তোমার মৃত্যু হবে। দুঃখে তোমার বুক ফেটে যাবে, তুমি একটুখানি সমুদ্রের ফেনা হয়ে যাবে।” 

যে মরতে বসেছে তারই মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেল জল কন্যার মুখ, সারা গা কাপতে লাগল। তবু সে বলল, “সে সাহস আমার আছে।” 

বুড়ি বলল, “তার উপরে আমি আছি, আমাকে দাম দিতে হবে। এত কষ্ট করব তোমার জন্যে, কাজেই যেমন তেমন দাম দিলেও চলবে না। সব সাগরবাসীদের মধ্যে তোমার গলার স্বরটি সবচাইতে মিষ্টি, হয়তো মনে ভেবেছ ঐ গলা দিয়েই রাজপুত্রের মন ভোলাবে, কিন্তু ঐটি আমার চাই। আমার এই জাদুর ওষুধের বদলে তোমার সেরা জিনিসটি আমাকে দিতে হবে, কারণ আমার নিজের গায়ের রক্ত না দিলে ওষুধে দো-ফলা তলোয়ারের ধারটি আসবে কেন ?” 

ছোটো রাজকুমারী বলল, “কিন্তু তুমি আমার গলার স্বরটি নিয়ে নিলে, রাজপুত্রকে মুগ্ধ করব কি দিয়ে ?” 

জাদুকরী বলল, “কেন, তোমার রূপ দিয়ে, তোমার কোমল লাবণ্যে ভরা চলা-ফেরা দিয়ে, তোমার ভাষাময় চোখ দুটি দিয়ে। এ-সব জিনিস দিয়ে মানুষদের দেমাকে ভরা মন ভোলান খুবই সহজ। কি হল ? সব সাহস উবে গেল নাকি ? ছোটো জিবটি এবার বের কর দিকিনি, কুছ করে কেটে আমার ওষুধের দাম উসুল করি।” 

রাজকুমারী বলল, “বেশ, তাই হোক।” বুড়ি তখন কড়াই নিয়ে ওষুধ পাকাতে বসল। এক মুঠো ব্যাঙ আর গুগলী দিয়ে কড়াই মাজতে মাজতে জাদুকরী বলল, “পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মতো কিছু নেই বুঝলে ?” তার পর নিজের বুক আঁচড়িয়ে কয়েক ফোঁটা কুচকুচে কালো রক্ত কড়াইতে ধরল, তার সঙ্গে কতরকম নতুন উপকরণ ঢালল। ওষুধের ধোয়া নানারকম বিকট আকার নিতে লাগল, গো-গো শব্দ বেরুতে লাগল, তার পর
জাদুর ওষুধ বিশুদ্ধ জলের মতো টলটলে পরিষ্কার হয়ে গেল। ওষুধ তৈরি।


জাদুকরী বলল, “এই নাও ওষুধ ” এই বলেই রাজকুমারীর জিবটি কেটে নিল। বেচারি জলকন্যা অমনি বোবা হয়ে গেল, আর কথাও বলতে পারত না, গানও গাইতে পারত না।
জাদুকরী বলল, “আমার কুঞ্জবনের ভিতর দিয়ে যাবার সময় জ্যান্ত গাছগুলো যদি তোমাকে ধরবার চেষ্টা করে তবে ওদের গায়ে কয়েক ফোটা ওষুধ ছিটিয়ে দিও, অমনি ওদের হাতগুলো হাজার টুকরো হয়ে ভেঙে পড়বে।” অবিশ্যি তার দরকার হল না, জ্যান্ত গাছগুলো যেই দেখল জলকন্যার হাতে ওষুধের শিশিটি তারার মতো জ্বলজ্বল করছে, অমনি তারা সরে গেল। সেই ভয়ংকর বনের মধ্যে দিয়ে, জলাভূমি পার হয়ে, ফেনায় ভরা ঘূর্ণিজলের উপর দিয়ে, রাজকুমারী নিরাপদে চলে এল। যখন জলকন্যা রাজপুত্রের প্রাসাদের কাছে এসে, বড়ো চেনা ঘাটের শ্বেত পাথরের সিঁড়ি দিয়ে উঠে এল, তখনো সূর্য ওঠে নি। শিশির আশ্চর্য ওষুধ খাবার সময় সে দেখল আকাশে তখনো চাঁদ রয়েছে। সমস্ত শরীরের মধ্যে দিয়ে যেন একটা ধারাল ছোরা চলে গেল, রাজকুমারী অচেতন হয়ে পড়ে গেল। সূর্য ওঠার সময় তার চেতনা ফিরে এল, সমস্ত অঙ্গে সে কি নিদারুণ ব্যথা। কিন্তু তাকিয়ে দেখল পাশে দাঁড়িয়ে তার এত ভালোবাসার পাত্র সেই তরুণ রাজকুমার, তার ঘন কালো চোখ দিয়ে কি যেন জানতে চাইছে।


গভীর লজ্জায় চোখ নামাতেই জলকন্যা দেখল কোথায় তার সেই লম্বা মাছের ল্যাজটি, তার জায়গায় দুখানি কী সুন্দর পা। পরনে কিছু নেই, লম্বা ঘন চুলের গোছা দিয়ে রাজকুমারী গা ঢাকতে চেষ্টা করল। রাজপুত্র শুধোল, “কে তুমি ? কি করে এখানে এলে ?” উত্তরে রাজকুমারী মৃদু হেসে, দুটি উদ্ভাসিত নীল চোখে তার দিকে চেয়ে রইল। 


[-- হ্যান্স অ্যান্ডারসন]

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য