তরুণ দৈত্য --জার্মানির রূপকথা

এক চাষীর একটি ছেলে ছিল । ছেলেটি তার বুড়ো আঙুলের মতো । কয়েক বছর কেটে গেল। কিন্তু মাথায় সে একচুলও বাড়ল না । 
একদিন সেই চাষী ক্ষেতে কাজে বেরুবে এমন সময় তার ক্ষুদে ছেলে বলল, “বাবা, আমিও তোমার সঙ্গে যাব ।”
 তার বাবা বলল, “আমার সঙ্গে যাবি কি রে ? তোকে নিয়ে তো ঝামেলার শেষ থাকবে না ? তা ছাড়া তুই সেখানে হারিয়ে যেতে পারিস।” 
কিন্তু ক্ষুদে ছেলে বায়না ধরে কাঁদতে শুরু করে দিল। তাই চাষী তাকে পকেটে ভরে নিয়ে চলল । ক্ষেতে কাজের জায়গায় পৌছে চাষী তাকে নামিয়ে দিল সবে যেখানে হাল চালিয়ে খাত কাটা হয়েছিল ।
সেখানে তারা যখন রয়েছে এমন সময় পাহাড় থেকে লম্বা-লম্বা পা ফেলে বিরাট এক দৈত্য নেমে এল । চাষী চেঁচিয়ে উঠল, “ঐ জুজুটাকে দেখেছিস ? ও তোকে ধরে নিয়ে যেতে আসছে।” ক্ষুদে ছেলেকে ভয় দেখিয়ে কথার বাধ্য করার জন্যই কথাটা চাষী বলেছিল । দৈত্য কিন্তু কথাগুলো শুনতে পেয়ে দু’পা ফেলে সেই খাতের কাছে এসে কোনো কথা না বলে ক্ষুদে ছেলেটাকে নিয়ে চলে গেল। ভয়ে চাষী হয়ে গেল একেবারে বোবা, তার মুখ দিয়ে রা সরল না। সে ভাবল চিরকালের মতো ছেলেকে সে হারাল, কখনো আর তার দেখা পাবে না । 

দৈত্য তাকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে খাওয়াতে লাগল দৈত্যদের খাবার ।

তাই দেখতে-দেখতে সে হয়ে উঠতে লাগল দৈত্যদের মতো বড়ো । দু’বছর কাটার পর তার শক্তি পরীক্ষা করার জন্য দৈত্য তাকে বনে নিয়ে গিয়ে বলল, “গাছের একটা ডাল ভাঙো দেখি ।” চাষীর ছেলের গায়ে তখন খুব জোর । চক্ষের নিমেষে শেকড়সুদ্ধ ছোটো একটা গাছ সে ফেলল উপড়ে । দৈত্য কিন্তু মনে-মনে বলল, ছেলেটার এখনো শিখতে অনেক বাকি। তাই তাকে আবার বাড়ি নিয়ে গিয়ে আরো দু বছর ধরে খাওয়াল-দাওয়াল । ততদিনে চাষীর ছেলের শক্তি এমন বেড়ে গিয়েছিল যে, অনায়াসে সে উপড়ে ফেলতে পারত বড়ো-বড়ো গাছ । তাতেও কিন্তু দৈত্য সন্তুষ্ট হল না। আরো দু বছর ধরে তাকে সে খাওয়াল-দাওয়াল । তার পর তাকে বনে নিয়ে গিয়ে বলল, “নিজের জন্যে একটা বড়োসড় ছড়ি জোগাড় করো দিকিনি।” তাই শুনে চাষীর ছেলে অনায়াসে বনের সব চেয়ে বড়ো ওকগাছটা উপড়ে নিল । তাই দেখে দৈত্য বলল, “এতেই হবে । তোমার শিক্ষা এবার সম্পূর্ণ হয়েছে ।” এই-না বলে দৈত্য যেখান থেকে তাকে নিয়ে গিয়েছিল সেইখানে পৌছে দিল । 

তার বাবা তখন, জমি চাষতে ব্যস্ত ছিল । ছেলে তার কাছে গিয়ে বলল, “বাবা, এই দেখো—তোমার ছেলে এখন প্রমাণ মানুষের মতো বড়ো হয়ে উঠেছে ।” 

তাকে দেখে আঁতকে উঠে চাষী বলল, “তুমি আমার ছেলে নও । তোমাকে আমার বলার কিছু নেই। সরে পড়ো ।” 

সে বলল, “আমিই তোমার ছেলে । তোমার বদলে আমায় কাজ করতে দাও । তোমার চেয়ে ভালো করে জমিতে আমি হাল দেব ।” 

চাষী বলল, “না, না । তুমি আমার ছেলে নও । লাঙল চষতে তুমি জান না। সরে পড়ো।” 

কিন্তু প্রকাণ্ড চেহারার মানুষটাকে দেখে ভয় পেয়ে লাঙল ফেলে থানিক দুরে সরে গেল চাষী । তরুণ দৈত্য তখন এক হাতে লাঙল ধরে এমন জোরে জমিতে সেটা টিপল যে, লাঙলের ফলাটা খুব গভীরভাবে গেথে গেল মাটির মধ্যে । চাষী চেঁচিয়ে উঠল, অত জোরে: লাঙলের ফলা গেথো না । এতে কাজ ভালো হয় না ।”

চাষীর ছেলে তখন লাঙল থেকে ঘোড়াগুলোকে খুলে দিয়ে নিজের কাধে জোয়াল নিয়ে বাবাকে বলল, “বাড়ি গিয়ে মাকে বোলো আমার জন্যে খুব বেশি করে রাতের খাবার রাধতে । ইতিমধ্যে জমিটা আমি - চষে ফেলছি ।”

 চাষী বাড়ি ফিরে বউকে খবরটা দিল । আর চাষীর ছেলে একলাই জমি চষে তার পর দুটো মই টানল জমিতে। জমিতে মই দেওয়া শেষ হলে বনে গিয়ে দুটো ওকগাছ সে ওপড়াল । তার পর একটা গাছে দুটো মই আর অন্যটায় ঘোড়া দুটোকে ঝুলিয়ে গাছ দুটো কাধে ফেলে এমনভাবে সে বাড়ি ফিরল, যেন ঘাসের আঁটি বয়ে এনেছে । 

উঠোনে সে পৌছতে তার মা তাকে চিনতে পারল না । আঁতকে : সে চেচিয়ে উঠল, “এই ভয়ংকর দৈত্যটা কে ?” 
চাষী বলল, “তোমার ছেলে ।” 
তার বউ বলল, “হতেই পারে না । আমাদের ছেলে বেঁচে নেই । এত বড়ো ছেলে কখনো আমাদের ছিল না । আমাদের ছেলে ছিল ছোট্রোটি ।” তার পর আবার তাকে সে বলল, “এখান থেকে সরে পড়ো । তোমাকে আমাদের দরকার নেই।"

তরুণ দৈত্য সে কথার কোনো জবাব দিল না । ঘোড়া দুটোকে আস্তাবলে রেখে খাবার-দাবার দিয়ে আবার ঘরে এসে একটা বেঞ্চিতে বসে বলল, “মা, আমার খুব ক্ষিদে পেয়েছে । রাতের খাবার তৈরি ?” 
তার মা বলল, “হ্যা ।” 
তার পর মাংস-ভরা প্রকাণ্ড দুটো ডিশ তার সামনে রাখলে । সেটা তার আর তার স্বামীর এক সপ্তাহের খাবার । 

তাদের ছেলে ডিশ দুটো শেষ করে প্রশ্ন করল, "আর নেই ?” 
তার মা বলল, “না ।” 
“এটা খেয়ে তো সবে আমার ক্ষিদে চাগিয়ে উঠেছে । আমার আরো - খাবার দরকার ।” 

তাকে না বলতে চাষীর বউ-এর সাহস হল না । তাই বিরাট একটা কড়াইতে শুয়োরের মাংস বোঝাই করে সে উনুনে চাপাল । রান্না শেষ হলে ছেলেকে সে আবার দিল খেতে ৷ তাদের ছেলে বলল, “এইবার ঠিক হয়েছে।” গবগব করে সবটা সে শেষ করল । তবু তার ক্ষিদে মিটলে না । 
খাওয়া শেষ করে বাবাকে সে বলল, “বুঝতে পারছি এখানে যথেস্ট পরিমাণে খাবার পাব না । আমাকে একটা লোহার শক্ত ডাণ্ডা দাও, যেটাকে হাটুতে রেখে ভাঙা না যায় । সেটা নিয়ে ভাগ্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ব ।”

তার কথা শুনে চাষী হাফ ছেড়ে বাঁচল । মালগাড়িতে ঘোড়া দুটো জুতে সে বেরিয়ে পড়ল। তার পর এমন মোটা আর ভারী একটা লোহার ডাণ্ডা নিয়ে বাড়ি ফিরল যেটা টেনে আনতে ঘোড়া দুটো রীতিমতো হিমসিম খেয়ে গিয়েছিল । তাদের ছেলে কিন্তু সেটা নিজের হাটুর উপর রেখে এমনভাবে মই করে ভেঙে ফেলল—যেন সেটা প্যাঁকাটি । চাষী তখন চারটে ঘোড়া জুতে এমন ভারী লোহার একটা ডাণ্ডা নিয়ে এল যে, ঘোড়াগুলো প্রায় হাঁটতেই পারছিল না । কিন্তু আগেরটার মতোই অনায়াসে সেটা ভেঙে তাদের ছেলে বলল, “এটাও বাজে । আরো শক্ত দেখে নিয়ে এসো।” শেষটায় চাষী আটটা ঘোড়া জুতে এমন ভারী একটা ডাণ্ডা নিয়ে এল, যেটা টানতে ঘোড়াগুলোর মুখে ফেনা বেরিয়ে গিয়েছিল । তাদের ছেলে সেটা তুলে নিয়ে এক পাশে মই করে ছোটো একটা টুকরো ভেঙে বলল, “বুঝলাম যেরকম চাই সেরকম ডান্ডা জোগাড় করতে পারবে না। এখান থেকে চললাম।” 

কামারশালায় কাজের খোঁজে সে বেরিয়ে পড়ল । যেতে-যেতে সে পৌছল এক গ্রামে । সেখানে থাকত ভারি কৃপণ এক কামার । কাউকে কখনো কিছু সে দিত না । সব কিছু নিজে আত্মসাৎ করতে চাইত । চাষীর ছেলে কামারশালায় তার কাছে গিয়ে চাকরি চাইল । তার বলিষ্ঠ চেহারা দেখে খুব খুশি হয়ে কামার ভাবল, একে দিয়ে হাতুড়ি পিটিয়ে অনেক টাকা কামানো যাবে। জিজ্ঞেস করল, “কত বেতন চাও ?” 

সে বলল, “কিছু না । শুধু পনেরো দিন অন্তর অন্যদের যখন বেতন দেবে, আমার দুটো ঘুষি তোমায় খেতে হবে ।” কৃপণ লোকটা খুশি হয়ে ভাবল, যাক, অনেক পয়সা বেঁচে গেল। পরদিন তার প্রথম হাতুড়ির ঘা দেবার কথা । গনগনে লাল লোহার ডান্ডা তার প্রভু নিয়ে এলে এমন জোরে সে হাতুড়ি চালাল যে, ডান্ডাটা গেল চুরমার হয়ে আর লোহার টুকরো পড়ল চার দিকে ছিট্‌কে । আর কামারের নেহাইটা এমনভাবে মাটিতে সেধিয়ে গেল যে, সেটাকে টেনেটুনে কিছুতেই বার করা গেল না ।

ভীষণ রেগে প্ৰভু তাকে বলল, “তোমাকে দিয়ে আমার কাজ চলবে না । ভারি জোরে তুমি হাতুড়ি চালাও ৷ হাতুড়ির এই একটা বাড়ির জন্যে কত তোমায় দিতে হবে ?” 
“তোমাকে সামান্য একটু ছুঁতে দাও । আর কিছু চাই না ।” এই-না বলে তাকে এমন একটা লাথি সে কষাল ষে, খড়-বোঝাই চারটে মালগাড়ির উপর দিয়ে ছিটকে পড়ল সেই কৃপণ কামার । তার পর কামারশালা থেকে লোহার সব চেয়ে মোটা ডান্ডাটা নিয়ে ছড়ির মতো ঘোরাতে-ঘোরাতে বেরিয়ে পড়ল চাষীর ছেলে । 

খানিক এগুতে একটা গোলাবাড়িতে সে পৌছল । জোতদারকে সে প্রশ্ন করল, “তোমার কোনো লোকের দরকার ?” জোতদার বলল, “হ্যাঁ, আমার একজন লোক দরকার । দেখে মনে হচ্ছে তুমি বেশ তাগড়া লোক, আর কাজকর্মও জান । কত বেতন চাও ?" 

চাষীর ছেলে বলল, “বেতন চাই না । শুধু চাই তোমাকে তিনটে করে ঘুষি মারার অনুমতি ।” 

তার কথায় জোতদার খুব খুশি হয়েই রাজি হল । কারণ এ লোকটাও ছিল কৃপণ । পরদিন ভোরে বন থেকে কাঠ আনার কথা ছিল । গোলাবাড়ির অন্য চাকররা ঘুম থেকে উঠে করছিল যাবার তোড়জোড় । চাষীর ছেলে কিন্তু তখনো ছিল বিছানায় শুয়ে । 

চাকরদের একজন তাকে বলল, “উঠে পড়ো, যাবার সময় হয়ে গেছে । আমরা বনে যাচ্ছি। আমাদের সঙ্গে তোমায় যেতে হবে ।” সে খেকিয়ে বলল, “তোমরা আগে যাও । তোমাদের আগেই দেখো, বন থেকে কাঠ নিয়ে আমি ফিরব ।” জোতদারের কাছে গিয়ে তারা বলল, “নতুন লোকটা এখনো শুয়ে রয়েছে । বলছে—আমাদের সঙ্গে যাবে না ।" জোতদার বলল, “আবার তাকে ডেকে বল ঘোড়াগুলো জুততে ।” চাষীর ছেলে আবার বলল, “তোমরা আগে যাও । তোমাদের আগেই দেখো বন থেকে কাঠ নিয়ে আমি ফিরব ।” আরো দু ঘন্টা সে বিছানায় শুয়ে রইল । তার পর উঠে দু বস্তী মটর সেদ্ধ করে ধীরে-সুস্থে খেয়ে বনে যাবার জন্য জুতলো ঘোড়াগুলো ।

বনে যাবার পথে একটা সুড়ঙ্গ ছিল । সেই সুড়ঙ্গর ভিতর দিয়ে গাড়ি নিয়ে গিয়ে অন্যদিকে সে থামল । তার পর গাছ-গাছড়া দিয়ে সুড়ঙ্গর মুখ এমনভাবে সে বন্ধ করে দিল যাতে তার ভিতর দিয়ে কেউ যেতে না পারে । সে যখন বনে ঢুকছে অন্যরা তখন তাদের গাড়িতে কাঠ বোঝাই করে ফিরছিল। সে বলল, “যাও, যাও । কিন্তু দেখো, তোমাদের আগেই ফিরব ।” 
তার পর আর না এগিয়ে প্রকাণ্ড দুটো গাছ উপড়ে তার মালগাড়িতে রেখে সে ধরল গোলাবাড়ির পথ । সেই সুড়ঙ্গের কাছে পৌছে সে দেখে—সব মালগাড়িগুলোই সেখানে থেমে রয়েছে । তাই দেখে সে বলে উঠল, “আজ সকালে আমার মতো বাড়িতে থাকলে আরো খানিক ঘুমুতে পারতে । আর সন্ধেয় বাড়ি ফিরতে আমারই সঙ্গে ।” এই-না বলে সুড়ঙ্গর মুখের গাছ-গাছড়া সরিয়ে আগে সে পৌছল গোলাবাড়িতে । তার পর জোতদারকে গাছ দুটো দেখিয়ে বলল, “খুব ভালো কাঠ আনি নি ?” 

জোতদার বউকে গিয়ে বলল, “চকেরটা খুব কাজের । সবাইকার শেষে গেলেও—ফিরেছে সবাইকরা আগে,” গোলাবাড়িতে এক বছর কাজ করার পর সব চাকররা বেতন পেল । জোতদারকে তখন চাষীর ছেলে জানাল-এইবার তাকে কড়ার মতো সেই তিনটে ঘুষি মারার সময় এসেছে। তাই-না শুনে দারুণ ঘাবড়ে গিয়ে কাকুতি-মিনতি করে সে বলল, “আমাকে রেহাই দাও । আমিই বরং তোমার চাকর হয়ে থাকব । তুমি হও এখানকার জোতদার ।” 

চাষীর ছেলে বলল, “না। আমি চাকর-চাকর হয়েই থাকব । কিন্তু যে শর্ত হয়েছে সেটা পালন করতেই হবে ।” জোতদার বলল, “যা চাইবে তাই দেব । আমাকে রেহাই দাও।” চাষীর ছেলে বলল, “না ।” কী করবে ভেবে না পেয়ে জোতদার পনেরো দিন সময় চাইল । চাষীর ছেলে তাতে আপত্তি করল না । জোতদার তখন তার অন্য চাকরদের ডেকে পরামর্শ চাইল । তারা দেখল এরকম একটা লোক সেখানে থাকলে সবাইকারই জীবন বিপন্ন । কারণ মাছির মতো যে-কোনো মানুষকে সে টিপে মারতে পারে । তাই সবাই একমত হয়ে স্থির করল কুয়ো পরিষ্কার করার ছুতোয় তাকে কুয়োয় নামাতে। আর সে নামলে পর উপর থেকে বড়ো-বড়ো পাথর তার মাথায় ফেলে তাকে মেরে ফেলতে ।

তাদের পরামর্শ শুনে জোতদার খুশি হল । আর চাষীর ছেলে কুয়োয় নামার পর সবাই মিলে তার মাথায় ফেলতে লাগল বড়ো-বড়ো পাথর । কুয়োর নীচ থেকে চাষীর ছেলে তখন হেঁকে বলল, “কুয়োর মুখ থেকে মুরগিগুলোকে তাড়াও—বড্ড বালি ফেলছে।” 
কাজ শেষ করে চাষীর ছেলে সেই শর্তমতো জোতদারকে আবার মারতে চাইল তিনটে ঘুষি । জোতদার আবার চাইল পনেরো দিন সময় । লোকে তাকে বলল চাষীর ছেলেকে গম ভাঙাবার জন্য রাতে জাদুময় জাতাকলে পাঠাতে । জোতদার সঙ্গে-সঙ্গে চাষীর ছেলেকে বলল আট বস্তা গম রাতের মধ্যে জাতাকল থেকে ভাঙিয়ে আনতে।

চাষীর ছেলে দু বস্তা গম ভরল তার ডান দিকের পকেটে, দু বস্তা বা দিকের পকেটে আর বাকি চার বস্তা গম মস্ত একটা ঝোলায় ভরে সেটা পিঠে ফেলে পড়ল বেরিয়ে । জাতাকলে পৌছলে পর জাতাওয়ালা তাকে জানাল, গম ভাঙাবার সময় রাতে নয়—দিনে । আরো বলল, রাতে যারা গম ভাঙতে গেছে পরদিন সকালে তাদের দেখা গেছে মরে পড়ে থাকতে । 

চাষীর ছেলে বলল, “আমি মরব না । তুমি নাক ডাকিয়ে ঘুমোও গে।” এই-না বলে জাঁতাকলে গিয়ে পরম নিশ্চিন্ত মনে সে শুরু করল গম ভাঙতে । রাত এগারোটা নাগাদ জাতাওয়ালার আপিসঘরে গিয়ে একটা বেঞ্চিতে সে বসল। সঙ্গে সঙ্গে আপনা থেকে দরজাটা খুলে গেল আর আপনা থেকে সড় সড়িয়ে চলে এল একটা টেবিল । তার পর আপনা থেকেই সেটা ভরে উঠল নানারকম সুখাদ্যে । টেবিলের চার দিকে নানা টুলও চলে এল । কিন্তু কাউকেই দেখা গেল না । 


খানিক পরে চাষীর ছেলে দেখে কতকগুলো আঙুল ছুরি-কাটা দিয়ে প্লেটগুলোয় খাবার ভরছে । তার খুব ক্ষিদে পেয়েছিল। তাই টেবিলের সামনে একটা টুলে বসে পেট ভরে সে খেল । নিজের খাওয়া শেষ হলে অন্য খালি প্লেটগুলোর দিকে তাকিয়ে সে বুঝল, অদৃশ্য অতিথিদেরও খাওয়া শেষ হয়েছে । তার পর কারা যেন ফু দিয়ে মোমবাতিগুলো নিভিয়ে দিল। আর তার পর অন্ধকারে সে টের পেল কে যেন আচ্ছা করে তার কান মলে দিচ্ছে । 

চেঁচিয়ে সে বলে উঠল, “এরকমটা আর করলে আমিও উচিত জবাব দেব।” কিন্তু আবার কে যেন তার কান মলে দিল আর সে-ও দিল তার কান মলে । সারারাত ধরে এইরকম কান মলামলি চলল । থামল সেটা ভোরবেলায় । জাঁতাকলওয়ালা এসে তাকে তখনো বেঁচে থাকতে দেখে হল দারুণ অবাক । চাষীর ছেলে বলল, “সারা রাত ভারি মজায় কেটেছে । কারা আমার কান মলছিল । আমিও কষে তাদের কান মলে দিয়েছি।” জাতাওয়ালা খুব খুশি হল । কারণ সে দেথল তার জাঁতাকল জাদুমুক্ত হয়ে গেছে। কৃতজ্ঞতা দেখাবার জন্য চাষীর ছেলেকে সে
দিতে চাইল অনেক টাকাকড়ি । 

চাষীর ছেলে বলল, “টাকাকড়ির দরকার নেই—আমার যথেস্ট আছে।” এই-না বলে থলিগুলো পিঠে নিয়ে গোলাবাড়িতে ফিরে জোতদারকে সে বলল—কাজ হাসিল করেছে, এইবার শর্তমতো তিনটে ঘুষি তাকে সে মারতে চায়। তার কথা শুনে দারুণ ঘাবড়ে গেল জোতদার । সে স্থির থাকতে পারল না, ঘরময় পায়চারি করে চলল। বিন্‌বিন করে ঘেমে উঠল তার কপাল। বাতাসের জন্য সে খুলল একটা জানলা আর কিছু সন্দেহ করার আগেই চাষীর ছেলের এক ঘুষিতে জানলা গলে বেরিয়ে আকাশের উপর উড়তে উড়তে অদৃশ্য হয়ে গেল । 

চাষীর ছেলে তখন জোতদারের বউকে বলল, “এবার তোমার পালা । দ্বিতীয় ঘুষিটা তোমার প্রাপ্য ।” 

জোতদারের বউ কেঁদে বলল, “না, না । মেয়েদের গায়ে হাত তুলতে নেই ।” ভয়ে ঘেমে সে নেয়ে উঠল । তাই সে-ও খুলল আর-একটা জানলা । আর সঙ্গে সঙ্গে চাষীর ছেলের দ্বিতীয় ঘুষিতে জানলা গলে বেরিয়ে শূন্যে তার স্বামীর চেয়ে অনেক উপরে উঠে গেল—কারণ জোতদারের চেয়ে সে ছিল অনেক হালকা । জোতদার তাকে ডেকে বলল, “আমার কাছে এসো ।” তার বউ বলল, “তুমি এসো আমার কাছে । তোমার কাছে আমি যেতে পারছি না।” ক্রমশ আরো উচুতে তারা উড়ে চলল, কিন্তু কাছাকাছি আসতে পরিল না । হয়তো এখনো তারা আরো উপরে উড়ে চলেছে । চাষীর ছেলে তার লোহার ভান্ডটা নিয়ে আবার যাত্রা করল ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য