একগুঁয়ে শিশু

একদিন রাজসভায় বীরবল ঠিক সময়ে এসে পৌছতে পারেননি। সেদিনের রাজসভায় জরুরি পরামর্শ ছিল। বীরবল ছাড়া সেই পরামর্শ আর কারও পক্ষে সমাধান করার সাধ্য ছিল না। সেজন্য এখনই বীরবলকে দরকার ছিল বাদশার। তিনি দূত পাঠালেন। দূত এসে দাঁড়াল বীরবলের দরজায়। বীরবল বললেন, ‘বলো গে যাচ্ছি।’
এদিকে ৩০ মিনিট অপেক্ষার পর বাদশা আবার দূত পাঠালেন। পুনরায় সেই দূত ফিরে এল বীরবলের কাছ থেকে একই উত্তর নিয়ে। আবার ৩০ মিনিট অপেক্ষা। তৃতীয়বার তার লোক গেল, এবং ফিরে এল ওই একই উত্তর নিয়ে। আবার লোক গেল, সেই একই উত্তর। এবার বাদশা ক্রুদ্ধ হলেন। আধঘণ্টা পরে এবারও
যখন বীরবল এসে পৌছলেন না, তিনি হুকুম করলেন,“ফৌজ গিয়ে বীরবলকে ধরে আনুক, দরকার হলে বেঁধে আনুক, ওর কোনও ওজর আপত্তি না শুনে।’ 

ফৌজ গিয়ে দাঁড়াল বীরবলের দরজায়। এবার না গেলে সর্বনাশ! বীরবল তাড়াতাড়ি পোশাক-পরিচ্ছদ চড়িয়ে সোজা বাদশার কাছে এসে হাজির। লম্বা সেলাম ঠুকে দাঁড়ালেন, কিন্তু তিনি আজ আর তার সেলাম গ্রহণ করলেন না। ধমক দিলেন,‘বারবার আমার লোককে ফিরিয়ে দিলে কেন? তোমার এই ধরনের দেরি করা বা আমাকে অপমান করার সাহস কেমন করে হল? 
‘হুজুর, বাড়িতে ছেলেটা বায়না ধরে কাঁদছিল তাই তাকে ভোলাচ্ছিলাম। ছেলেটা বড্ড জেদি। যা বলবে তাই করবে।’

‘কী বাজে কথা বকছ ? আমাকে বোকা বানাচ্ছ? ছেলে শাস্ত করতে কতক্ষণ লাগে? হাতের কাছে একটা খেলনা ছিল না? তোমার বুদ্ধিসুদ্ধি দিনদিন লোপ পেয়ে যাচ্ছে। আজকাল মিথ্যে ছাড়া তুমি সত্যি কথা বলতে ভুলে গেছ।
অনেক তিরস্কার শুনলেন। এবার বীরবল বললেন,‘হুজুর ছেলে ভোলানোর অভিজ্ঞতা আপনার বোধহয় একেবারে নেই। ঘ্যানঘেনে ছেলে কেমন হয় বোধহয় আপনি জানেন না। আমার ঔদ্ধত্য ক্ষমা করবেন সম্রাট! আমি সত্যি কথাই বলছি হুজুর।’
বাদশা তার দিকে তাকালেন। সহসা বীরবল হাউহাউ করে কেঁদে উঠে বললেন, জাঁহাপনা, আপনি প্ৰজাগণের পিতা, আপনি আমারও পিতা।’

বলতে বলতে বীরবল শিশুর মতো কঁদিতে লাগলেন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে। কাঁদতে কাঁদতে মেঝের ওপর পড়ে শিশুর মতো গড়াগড়ি দিতে লাগলেন। সম্রাট একেবারে হতবুদ্ধি। বীরবল এমন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কাঁদছেন যে সম্রাট কেন, কোনও সভাসদরাও সাত্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। সম্রাট অস্থির পদচারণা করতে লাগলেন। বীরবল তার প্রধান মন্ত্রণাদাতা।
নিশ্চয়ই তাঁর পারিবারিক জীবনে কোনও ঘোরতর অশাস্তি দেখা দিয়েছে। না হলে তিনি এমন করে কান্নাকাটি করবেন কেন। 
তিনি বীরবলের গায়ে মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে বললেন, শান্ত হও, শান্ত হও বীরবল, কী হয়েছে তোমার বলো? নিশ্চয় তোমার কোনও বিপদ-আপদ হয়েছে, তুমি সব খুলে আমাকে বলো।’ 
মিথ্যা সাত্ত্বনা, বীরবল গড়াগড়ি দিয়ে ব্যাকুল ভাবে কাঁদতে লাগলেন। সে কান্না এমন বেয়াড়া যে, বাদশা কী করবেন কিছু বুঝতে পারলেন না। সমগ্র রাজসভা একেবারে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে চেয়ে দেখছে। কেউই বীরবলের কান্নার কারণ কী বুঝতে পারছে না। বা কী করে কান্না থামাবে ভাবতে পারছে না। 
কাঁদতে কাঁদতে বীরবল বললেন,‘আমি পেয়ারা খাব।” 
তৎক্ষণাৎ এক ঝুড়ি পেয়ারা এল। সবচেয়ে ভালটি বেছে সম্রাট বীরবলকে দিলেন। চেঁচিয়ে কেঁদে বীরবল বললেন, ‘কেটে ফালি করে দিন।' টুকরো টুকরো করে তখনই পেয়ারা কেটে আট ফালি করে দেওয়া হল। তখন বীরবল  কেঁদে বললেন, ‘থলির মধ্যে পেয়ারা রাখুন। যেন নোংরা না হয় এমনভাবে রাখুন। 
তাই করলেন সম্রাট। ভাল করে মুছে থলির মধ্যে রাখলেন। 
বীরবল বললেন, এবার থলির মুখ বন্ধ করুন।" তাই হল। বীরবল থলি নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বললেন, না, এ থলি আমি নেব না— আমি ভাল থলি চাই। বাদশা নিজে পেয়ারাগুলো কুড়িয়ে একত্র করে আরেকটি ভাল থলিতে সেগুলি গুছিয়ে বীরবলের কাছে ধরলেন। বীরবল তখনও চিৎকার করে হাত পা ছুড়ে কাঁদছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে এবার বললেন, অমন করে পেয়ারা কাটা হয়েছে কেন? আবার ওই টুকরোগুলো জোড়া দিয়ে দিন। না জোড়া দিলে চলবে না।’ এইভাবে নানান বায়না ধরতে লাগলেন।
সম্রাট বললেন, তা কেমন করে সস্তুৰ বীরবল ?’ বীরবল এবার চেঁচিয়ে কেঁদে বললেন, "তা যদি সম্ভব না হয় তাহলে আমার কান্না থামবে কেন? কোনওমতেই আমার কান্না থামবে না। বাদশা এবার পরাজিত। একগুঁয়ে শিশু যদি বায়না ধরে তবে সম্রাট কেন, স্বয়ং খোদারও অসাধ্য কাজ। 
বীরবল এবার উঠে চোখের জল মুছে হাসি -খুশি হয়ে গিয়ে বসলেন নিজের আসনে। তখন বীরবল বললেন, "সম্রাট এইজন্য, আমার একগুঁয়ে শিশুর বায়নার জন্য, আসতে দেরি হয়েছে বলে ক্ষমা করে দিন। একগুঁয়ে শিশু বায়না ধরলে কিছু করার উপায় থাকে না। সম্রাট খুব জব্দ হয়েছিলো এবার। বীরবলও মনে মনে বেশ হাসতে লাগলেন।

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য