সাদাসিধে বালকের মাকড়শা তাড়ানো -- তিব্বতের লোককাহিনী

নীলকান্ত মণি খুজে দিতে সফল হয়েছিল এক সাধাসিধে বালক। বাড়ি ফেরার পথে ছেলেটি সারাদিন হেঁটে চলল। রাতে সে সেই পপলার গাছটির নিচে আশ্রয় নিল যেখানে আগে এসেছিল ভাগ্যহারা হয়ে । পরদিন ভোর না-হওয়া পর্যন্ত তার ঘুম ভাঙলই না। ভোরের আলো ফুটতেই সেই আগের মতো দাড়কাক-দুটি কথা শুরু করল । ছেলেটিও তাদের কথা শুনতে লাগল।
মা দাঁড়কাকি শুরু করল, সুপ্রভাত আমার ছানাপোনাদের বাবা দাঁড়কাক । কাল রাতে ফিরতে তোমার এত দেরি হয়েছিল কেন বলো তো?
বাবা দাঁড়কাক বলল, তাহলে শোনো। কারণটা হল গতকাল আমি অদূরে একটা খামারবাড়িতে খাবার খুঁজতে গিয়েছিলাম। খাবারও জুটেছিল ভালো। ওই বাড়ির কত্রী তার বা কানের ব্যথায় খুব কষ্ট পাচ্ছিল। এতে তার প্রায় পাগল হয়ে যাওয়ার দশা । আশেপাশের কেউ কী করলে তার ভালো হবে বলতে পারছিল না। বললেও তাতে কোনো কাজ হচ্ছিল না। বিখ্যাত যত ডাক্তার ও লামাদের ডাকা হল । কিন্তু কোনো কিছুতেই কিছু হল না। ওরা কেউই রোগের আসল কারণ ধরতে পারছিল না। একমাত্র আমিই জানি তার ওষুধ । 
আমি আবিষ্কার করেছি যে একটা বড় মাকড়শা ওই মহিলার কানে কিছু দিন আগে ঢুকে পড়েছিল। তখন মহিলা ঘুমুচ্ছিল বলে টের পায় নি। এখন সেই মাকড়শা ও তার বাচ্চারা ওই মহিলার মাথার মধ্যে বেঁধেছে বাসা । ডাক্তারদের পক্ষে অসম্ভব মাকড়শাদের সেখান থেকে তাড়ায় । একমাত্র কৌশল করেই তাকে বের করে আনতে হবে। তুমি তো জানো, মাকড়শারা শীতকালে শীতঘুম দেয়। বসন্তকালে তারা ঘুম থেকে জেগে বাসা থেকে বেরিয়ে আসে। এখন শীতকাল চলছে। তবে যদি মাকড়শাদের কোনো মতে বিশ্বাস করানো যায় যে বসন্তকাল এসেছে, অমনি তারা সুর সুর করে বেরিয়ে আসবে। নয়তো সারা শীতকাল ওরা সেখান থেকে নড়ছে না।

’ সত্যিই?’ মা দাঁড়কাকি বলল, ভারি আশ্চর্য তো! কিন্তু ওই মাকড়শাদের কী করে বিশ্বাস করানো যাবে যে এই অসময়ে বসন্ত এসে গেছে?" 

‘এই ব্যাপারে খুব সহজ একটি উপায় আছে। বাবা দাড়কাক বলল, “এক টুকরো সবুজ কাপড় প্রথমে একটা টেবিলে পেতে দিতে হবে। তার উপর ছোট ছোট জলবিন্দু ছিটিয়ে দিতে হবে যেন বৃষ্টির ফোটা জমে আছে। ওই মহিলাকে তখন সবুজ চাদরের উপর কান পেতে শুয়ে পড়তে হবে যাতে কানের ভেতর থেকে মাকড়শাগুলো সবুজ কাপড় ও জলকণা দেখতে পায়। ওদের কাছে তখন চাদরটা মনে হবে সবুজ মাঠ, জলকণাগুলোকে মনে করবে বসন্তের বৃষ্টির ফোটা, অর্থাৎ বৃষ্টিতে সবুজ ঘাস ভিজে আছে। তার অর্থ শীতের শেষ, তাদের বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে। যদি তাতেও তারা বেরিয়ে না আসে তাহলে ঢাক বাজাতে হবে যাতে তারা মনে করে যে আকাশে মেঘ ডাকছে, বাজ পড়ছে। তুমি তো জানো আমাদের তিব্বতে একমাত্র বসন্তেই বজ্রপাত হয়। এই প্রচণ্ড শব্দ শুনতে পেয়ে মাকড়শারা মনে করবে যে বসন্ত নিশ্চয়ই এসে গেছে। তখন তারা আর একটু দ্বিধা না করে মহিলার কানের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে। আর যে মুহুর্তে তারা টেবিলের উপর নেমে আসবে অমনি তাদের কাপড় দিয়ে মুড়ে নিতে হবে। খুব দ্রুত কাজটি করে তাদের দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং তারপর তাদের মেরে ফেলতে হবে । 

ওরা যদি একটুও টের পায় বা একটু দেরি হলেই ওরা বুঝে ফেলবে যে আসলে বসন্ত আসে নি। আর অমনি সুতো বেয়ে ওরা আবার কানে ঢুকে পড়বে সেই আগের জায়গায়, যেখান থেকে তারা একটু আগে বেরিয়ে এসেছিল ভুল করে।’ 

এই তথ্য জানানোর জন্য মা দাড়কাকি বাবা দাড়কাককে ধন্যবাদ দিয়ে বলল, কিন্তু আজ সকালে তোমাকে একটুও ভালো মনে হচ্ছে না। কী হয়েছে তোমার বলো তো?" 

"ও, এ-কথা? সে বলল, আমি দুঃখিত, গতকাল খাওয়াটা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল। সেই বাড়ির লোকেরা মহিলার আরোগ্য কামনা করে প্রার্থনা করছিল। এজন্য সারাদিন লোকজনকে খাইয়েছে দাইয়েছে। যেমন অঢেল ভাত, তেমনি ময়দার তৈরি খাবার। তার মধ্যে অনেক খাবার পশুপাখিদের জন্য বাগানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিয়েছিল। তাই যত খুশি খেয়ে নিয়েছি। সত্যি বলতে কি, না বুঝে খুব বেশি হয়ে গেছে খাওয়াটা। এই বয়সে এত খাওয়া কি সহ্য হয়? আমার ভয় হচ্ছে এই যাত্রায় আমি আর বাঁচব না। সত্যিই যদি তাই হয় তাহলে আমাদের তিব্বতি রীতি অনুযায়ী তুমি আমার জন্য তিন বছর, তিন মাস এবং তিন দিন শোক পালন করো। 

শুনে মা দাড়কাকি খুব কাঁদল এবং আন্তরিকভাবে ধর্মসাক্ষী করে প্রতিজ্ঞা করল যে, সে তার স্বামীর জন্য তাই করবে। এই কথা বলে বাবা দাঁড়কাক পাশের ডাল থেকে বাসায় এসে বসল এবং একটু পরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল । বাবা দাঁড়কাকের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে মা দাঁড়কাকির উপর সংসারের সব দায়দায়িত্ব এসে পড়ল। এখন তাকে একাই সংসার দেখতে হবে, বাড়ির সব কাজ একা করতে হবে। এত সব কাজের মধ্যে বাবা দাঁড়কাকের জন্য শোক প্রকাশ করার সময় কোথায়? 

রীতি অনুযায়ী শোক প্রকাশের সব কাজ করা তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তখন সে তার ঠোঁট দিয়ে মরা দাঁড়কাককে বাসা থেকে ঠেলে নিচে ফেলে দিল । তারপর সে তার সদ্য ফোটা বাচ্চাগুলোর জন্য খাবার আনতে উড়ে চলে গেল বাইরে । এরি মধ্যে ছেলেটি দাঁড়কাকদের সব কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনে শেষ করল। 

তারপর সোজা বেরিয়ে সেই মহিলার ঘরটি যখন খুঁজে বের করল সে শুনতে ও দেখতে পেল বাড়িতে কী গভীর দুঃখের ছায়া নেমে এসেছে। মহিলা কানের ব্যথায় তখন চিৎকার করছে। সে গিয়ে জানতে চাইল ব্যাপার কি, বাড়িতে কী হয়েছে। সবকথা শুনে সে সঙ্গে সঙ্গে বলল, তার এমন অলৌকিক ক্ষমতা আছে যে সে অল্পক্ষণের মধ্যে মহিলার রোগ সারিয়ে দিতে করতে নিজের চোখে দেখেছিল। কাজেই তারা সঙ্গে সঙ্গে তার কথা বিশ্বাস করল। তারা তখন জানতে চাইল এর জন্য তাদের কী কী করতে হবে। 'এর জন্য দরকার একটি চৌকো বড় সবুজ কাপড়, এক জগ পরিষ্কার পানি এবং এক জোড়া ঢাক।” 

এসব জিনিস জোগাড় করা হলে ছেলেটি বড় একটি টেবিলের উপর সবুজ কাপড়টি বিছিয়ে দিল। তার উপর পানি ছিটিয়ে দিল বৃষ্টির ফোটার মতো করল। মহিলা যন্ত্রণায় কাঁদতে কাঁদতে সেখানে এলে তার ব্যথাভরা কানটি সবুজ কাপড়ের উপর একটু ফাক রেখে শুয়ে পড়তে আদেশ করল । সে তার কান সবুজ কাপড়ের উপরে রাখার সঙ্গে সঙ্গে কানের ভেতরের মাকড়শাগুলো সবুজ কাপড় ও পানির ফোটা দেখতে পেল এবং তারা ভেতর থেকে   ডাকাডাকি শুরু করে দিল। আর মা মাকড়শাটি সঙ্গে সঙ্গে সুতো বেয়ে বেরিয়ে এসে দেখতে লাগল সত্যি সত্যি বসন্ত এসেছে কিনা। 

বাড়ির লোকজন তা দেখে অবাক হয়ে গেল। ছেলেটি তখন তাদের বলল যেন কেউ মাকড়শাটিকে না ছোয়। মা মাকড়শা যখন সত্যিই দেখতে পেল যে কাপড়ের উপর পানির বিন্দু জমে আছে তখন সে তার সুতো বেয়ে মহিলার কানের ভিতরে ঢুকে তার বাচ্চাদের সুখবরটি দিতে গেল। ছেলেটি তখন ঢাক বাজানোর জন্য আদেশ দিল । সেই শব্দ শুনতে পেয়ে মাকড়শা পরিবারের সবাই ভাবল যে, আকাশে বজ্রপাত হচ্ছে, অর্থাৎ বসন্ত নিৰ্ঘাত এসে গেছে। কাজেই তারা সবাই একে একে মহিলার কানের ভিতর থেকে সুর-সুর করে বেরিয়ে আসতে লাগল। একের পর এক সবুজ কাপড়ে এসে সবাই জড়ো হয়ে গেল। ওরা সবাই টেবিলে পাতা কাপড়ে নেমে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটি এক টানে কাপড়টি সরিয়ে নিল, মুহুর্তের মধ্যে কাপড় ভাজ করে মাকড়শাগুলোকে বন্দি করে ফেলল এবং কাপড়টা বাইরে নিয়ে গিয়ে সবগুলোকে সাবাড় করে দিল । 

সঙ্গে সঙ্গে মহিলার মাথা ও কানের যন্ত্রণা উধাও। তার মুখে হাসি ফুটে উঠল । ছেলেটিকে উপহার ও ধন্যবাদ দিয়ে ভরিয়ে দিল । সে অনেক সোনা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল, আর আগের দিন যে-সব উপহার নীলকান্তমণি খুঁজে দেওয়ার জন্য পেয়েছিল সেগুলো তো সঙ্গে আছেই। সে তখন তার মায়ের কাছে ফিরে চলল। কিন্তু রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় সেই ভিখিরির দেখা পেল যে তাকে একদিন অবিশ্বাস ও অপমান করেছিল, আর যাকে ছেলেটি শাস্তি দিয়েছিল। সেই ভিখিরি তার সামনে এসে পড়ল । 

বুড়ো ভিখিরিটি ছিল ভীষণ প্রতিহিংসাপরায়ণ ও ঈর্ষাতুর । সে ছেলেটির উপর ভয়ানক চটে আছে এবং ঠিক করে রেখেছে যে ছেলেটির উপর প্রতিশোধ নেবে। ছেলেটি রাস্তা দিয়ে নেমে আসতেই ভিখিরি পাশের ঝোপ থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এল। তার ডান হাতে ছিল একখান তলোয়ার এবং বা হাতের মুঠোয় ছিল একটি মাছি। ‘এখন বাছাধন’, 

ভিখিরি বলল, আমার বিশ্বাস তুমি একজন প্রতারক। তুমি দু’বার তোমার জাদুর শক্তি আছে বলে জাহির করেছ। আসলে বাস্তবে তোমার তেমন কোনো ক্ষমতা নেই। এখন আমি তোমাকে শেষ পরীক্ষা করে দেখব । তুমি যদি বলতে পার আমার বা হাতের মুঠোয় কী আছে তাহলে আমি তোমাকে যেখানে খুশি চলে যেতে দেব। কিন্তু যদি বলতে না পার, এই তলোয়ারের এক কোপে হাপিস হয়ে যাবে।’

বেচারী ছেলেটি এই শুনে একটু ভড়কে গেল। কারণ তার হাতে কোনো অস্ত্র নেই, এখন সম্পূর্ণভাবে ভিখিরির দয়ার উপর তার বাচা-মরা নির্ভর করছে। সে কী বলবে ভেবে না পেয়ে যা মুখে আসে বলে দিল । 

বলল, ঠিক আছে, তোমার ইচ্ছে হলে তুমি আমাকে মারতে পার। কারণ আমি এখন তোমার হাতের মুঠোয় পড়া মাছির মতো, তোমার ইচ্ছে হলে তাকে তুমি পিষে মেরে ফেলতে পার। ইচ্ছে না হলে ছেড়ে দিতে পার।’

বুড়ো ভিখিরি ছেলেটির উত্তর শুনে একেবারে থ। তার সব চালাকি ভেস্তে গেল। আর ছেলেটির মধ্যে তাহলে তো অলৌকিক ক্ষমতা আছে বলে প্রমাণিত হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ভিখিরি ছেলেটির অতি উৎসাহী ভক্ত হয়ে গেল। আর সে জানত ছেলেটির ঘোড়া, কুকুর এবং অন্যান্য জিনিস হারিয়ে গেছে সেই শেয়ালটিকে তাড়া করতে গিয়ে। 

এখন ভিখিরি তাকে নিয়ে চলল সেই দূরের উপত্যকায়, সেখানে গিয়ে ছেলেটির ঘোড়া, কুকুর ও অন্য সব জিনিস খুঁজে বের করল। বন্দুক ও তলোয়ারও পেল। সেই কোটটি এবং সব জিনিস পেয়ে খুশি মনে ছেলেটি ঘোড়ায় চড়ে বসল।
বাড়িতে পৌছলে মা ছেলেকে দু হাতে বুকে জড়িয়ে ধরে সুখে কেঁদে ফেলল। আর সত্যিই সে সুখী হয়েছিল মায়ের কাছে ফিরে গিয়ে ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য