টিনের সেপাইয়ের কথা -- হ্যান্স অ্যান্ডারসন

এক সময়, পাঁচশটা টিনের সেপাই ছিল ; তারা সবাই ভাইভাই, কারণ সবাই একটা পুরনো টিনের হাত গলিয়ে তৈরি। সবার হাতে বন্দুক, সবাই তক্তার মতো খাঁড়া দাড়িয়ে, সকলের লাল আর নীল সৈনিকের পোশাক, সবাই দেখতে ভারি মজাদার। পৃথিবীতে জন্ম নেবার পর, যেই ওদের বাক্সের ঢাকনি খোলা হল, অমনি প্রথম যে কথা ওদের কানে গেল, তা হল, 'টিনের সেপাই ! একটি ছোটো ছেলে আনন্দে হাততালি দিয়ে ঐ কথা বলল। সেপাইগুলোকে সে জন্মদিনে উপহার পেয়েছিল। তার পর সে টেবিলের উপরে তাদের সাজিয়ে রাখল।
সেপাইদের মধ্যে একচুল তফাত নেই। শুধু একটা অন্যদের চাইতে একটু অন্যরকম, কারণ তার মোটে একটা ঠ্যাং। ওকেই কিনা সবার শেষে তৈরি করা হয়েছিল, টিনে কুলোয় নি বলে। সে যাই হোক, অন্যরা দুঠ্যাঙে যেমন মজবুত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত ওর এক ঠ্যাঙেও ও তেমনি মজবুত হয়ে দাঁড়াত। আমার মনে হয় ওরই জীবনের নানান ঘটনা তোমাদের শোনাবার যোগ্য ।
যে টেবিলে টিনের সেপাইরা সাজানো ছিল, তাতে আরো কয়েকটা খেলনাও ছিল। তার মধ্যে সবচাইতে সুন্দর হল পীচ- বোর্ডের তৈরি চমৎকার একটা দুর্গ। দুর্গের ক্ষুদে-ক্ষুদে জানলা দিয়ে ঘরের ভিতরে দেখা যেত। দুর্গের সামনে, একটা ছোটো আয়নার চারদিকে ভিড় করে ছিল কয়েকটা ক্ষুদে গাছ। আয়নাটাকে একটা দীঘি মনে করতে হবে। কয়েকটা মোমের রাজহাঁস ঐ দীঘির জলে সাঁতার কাটত, জলে তাদের ছায়া দেখা যেত । 

এ-সবই খুব চমৎকার সন্দেহ নেই, কিন্তু তার মধ্যে সবচাইতে সুন্দর জিনিস হল ছোটো একটি মেয়ে। সে দুর্গের খোলা দরজার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকত। সেও পাঁচবোর্ড কেটে তৈরি, কিন্তু তার পরনে ছিল খাটি মসলিনের জামা, তার কাঁধের উপর চাদরের মতো করে ফেলা ছিল একটুখানি ফিকে নীল রেশমী ফিতে, আর সেই ফিতের ঠিক মধ্যিখানে ছিল একটা ঝকঝকে সোনার ডানা। এই ক্ষুদে মহিলাটি হল একজন নর্তকী, তাই সে হাত দুটিকে বাড়িয়ে ধরেছিল, আর একটা পা এত উঁচুতে তুলে রেখেছিল যে টিনের সেপাই সেটিকে দেখতে না পেয়ে ভাবত ঐ মেয়েটিরও বুঝি তারই মতো মোটে একটি পা । 

সে মনে মনে বলত, “ঐ তো ঠিক আমার বউ যেমন হওয়া উচিত। মুস্কিল হল, ওর বংশ বড়ো উঁচু। ও থাকে দুর্গে আর আমি থাকি শুধু একটা বাক্সে। তার উপর বাক্সাঁ এাঁ আমারও নয়, ওর মধ্যে আমরা পঁচিশজন থাকি ; ওখানে তো আর বউ আনা যায় না। সে যাই হোক গে, ওর সঙ্গে আলাপ করতে দোষ কি ? এই-সব ভেবে টেবিলের উপরে রাখা একটা নস্তির কোঁটোর পিছনে গিয়ে টিনের সেপাই দাঁড়াল। এই জায়গাটা থেকে পাতলা ছোটো মহিলাটিকে একেবারে সামনাসামনি দেখা যেত। সে তখনো এক পায়েই দাঁড়িয়ে ছিল, অথচ টাল হারিয়ে পড়ে যাচ্ছিল না।

সন্ধেবেলা সব টিনের সেপাইদের বাক্সে ভরে, বাড়ির লোকেরা শুতে গেল। তখন খেলনাগুলোর পালা, তারা এবার খেলা শুরু করল। তারা খেলা করতে লাগল যেন এ-ওর বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছে, যেন যুদ্ধ হচ্ছে, নাচের আসর বসেছে। টিনের সেপাইরা বাক্সের ভিতর থেকে ঝনঝন শব্দ করতে লাগল, তাদেরও বেরিয়ে এসে খেলা করার ইচ্ছা, কিন্তু বাক্সের ঢাকনিটাকে কিছুতেই খুলতে পারছিল না। বাদাম ভাঙার জাতিটা ডিগবাজি খাচ্ছিল, শ্লেট-পেনসিলটা শ্লেটের উপর বেচাকেনা খেলছিল। সব মিলিয়ে এমনি হটগোল শুরু হয়ে গেল যে ক্যানারি পাখিটার ঘুম ভেঙে গেল, অমনি সেও কথা বলতে আরম্ভ করল, অবিশ্যি সে সর্বদা ছড়া কেটে কথা বলত। মাত্র দুজন নিজেদের জায়গা থেকে এতটুকু নড়ল না ; তারা হল সেই ছোটো টিনের সেপাই আর সেই সুন্দরী নর্তকী। সে সব সময় ঐ এক সুন্দর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকত, এক পায়ের আঙলে ভর করে, হাত বাড়িয়ে। এদিকে সেপাইয়ের কথা আর কি বলব, সে সারাক্ষণ তার এক পায়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত আর সুন্দরী মেয়েটির উপর থেকে কখনো চোখ ফেরাত না।

রাত বারোটা বাজল। অমনি খট করে নস্তির কৌঁটোর ঢাকনি খুলে গেল। কৌটোর ভিতরে নস্তি ছিল না ; তার বদলে ছোটো একটা কালো রঙের জাদুকর লাফিয়ে উঠল ; ওটা আসলে একটা খেলনা, ওকে ‘জ্যাক্‌-ইন-দি-বক্স’ বলে। জাদুকর বলল, “ও হে টিনের সেপাই, চোখদুটো সামলাও !”

কিন্তু টিনের সেপাই ভাব দেখাতে লাগল যেন কিছু শুনতেই পায় নি ।
জাদুকর বলল, “আচ্ছা ! কাল অবধি অপেক্ষা করেই দেখনা কি হয় ।”

সকাল হলে ছেলেমেয়েরা বিছানা থেকে উঠে পড়ল । টিনের সেপাইকে তুলে নিয়ে তারা জানলার চৌকাঠের উপর রেখে দিল, আর তখুনি, সে জাদুকরের জন্যেই হোক, কিংবা বাতাসের জন্যেই হোক, জানলাটা দুড়ুম করে খুলে গেল আর পা উঁচুতে মাথা নিচুতে করে সেই তিনতলার উপর থেকে, টিনের সেপাই মাটিতে পড়ল । সে কি ভয়ংকর পড়া! ৰেচারার একমাত্র ঠ্যাংটা শূন্যে ঘুরপাক খেতে লাগল, তার পর যখন মাটিতে পৌঁছল তখন সেপাই টুপিতে ভর করে পা ওপরে করে পড়ল, আর বন্দুকের সঙ্গিনটা রাস্তার শানের মধ্যে ঢুকে রইল ।

তখুনি ঝির সঙ্গে ছোটো ছেলেটা ওকে খুজতে নীচে নেমে এল, কিন্তু তাকে দেখতেই পেল না যদিও আরেকটু হলেই ওরা তাকে মাড়িয়ে দিত। সেই সময় টিনের সেপাই যদি চেঁচিয়ে বলত, “এই যে, আমি এখানে!” তা হলেই ওরা ওকে খুঁজে পেত, কিন্তু সে ভাবল সৈনিকের পোশাক পরে ওভাবে চ্যাঁচানটা ঠিক হবে না। 

তার পর বৃষ্টি পড়তে আরম্ভ করল ; একেকটা ফোটা পড়ে যেন তার আগের ফোটার চাইতে ওজনে বেশি ! ঝম্‌ঝম করে বৃষ্টি পড়ে সব ভিজিয়ে সপসপে করে দিল । বৃষ্টি থামলে, দুটো ছেলে এদিকে এল। একজন বলল, “দেখেছ, একটা টিনের সেপাই ! জীবনে এই একবারের মতো বেচারা নৌকো চেপে বেড়াতে যাক ৷” 
এই বলে তারা পুরনো খবরের কাগজ দিয়ে একটা নৌকো বানিয়ে, তার মধ্যে টিনের সেপাইকে চাপিয়ে দিল। অমনি নর্দমার জলের সঙ্গে নৌকো ভেসে চলল ; ছেলেদুটো হাততালি দিতে দিতে, পাশে পাশে দৌড়তে লাগল। কাগজের নৌকো জলে দোল খেতে লাগল আর মাঝে মাঝে হঠাৎ এমনি পাক খেল যে টিনের সেপাইয়ের মাথা ঘুরতে লাগল। তবু সে এতটুকু নড়ল-চড়ল না ; বন্দুকের সঙ্গিন শক্ত করে ধরে, সটান সামনের দিকে তাকিয়ে রইল । 

এক জায়গায় নালার উপর তক্তা পাতা ছিল, তার তলা দিয়ে নৌকো ভেসে চলল। টিনের সেপাই দেখল এ জায়গাটা বাড়িতে তার বাক্সের ভিতরটার মতোই অন্ধকার । 

সে মনে মনে বলল, ‘এবার কোথায় যাচ্ছি কে জানে! এ-সবই নিশ্চয় ঐ জাদুকরের কাজ ! আহা, ঐ মেয়েটি যদি আমার সঙ্গে এই নৌকোয় থাকত, তা হলে এর দুগুণ অন্ধকারেও আমার এসে যেত না ? একটা জলের ইঁদুর ঐ তক্তার নীচে থাকত ; সে তার বাসা থেকে ছুটে এসে বলল, “পাসপোর্ট আছে ? কই, দেখি তোমার পাসপোর্ট ?” 

টিনের সেপাই কোনো কথা বলল না, খালি হাতের অস্ত্রটাকে আরো শক্ত করে ধরল। নৌকো ভেসে চলল, ইঁদুরও পিছন পিছন চলল। উঃ! সেকি বিকটভাবে সে দাঁত খিঁচিয়ে, জলে ভেসে যাওয়া খড়-কুটোকে বলতে লাগল, “ওকে থামাও ওকে থামাও ! ও পারের কড়ি দেয় নি, পাসপোর্ট দেখায় নি!” এদিকে স্রোতের বেগ বাড়তে লাগল। টিনের সেপাই দূরে ঝকঝকে রোদ দেখতে পেল ; ঐখানেই নৌকোটা সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল। সঙ্গে সঙ্গে সে কি ভয়ংকর গর্জন ! অমন আওয়াজ শুনলে অতি বড়ো বীরও ভড়কে যেত! সুড়ঙ্গ যেখানে শেষ হয়েছে, ঠিক সেইখানেই নালার জলও হুড়হুড় করে মস্ত একটা খালের মধ্যে গিয়ে পড়েছে। একটা মস্ত জলপ্রপাত বেয়ে নৌকোয় নামা আমাদের পক্ষে যতটা বিপদের কথা, টিনের সেপাইয়ের পক্ষে নালা থেকে খালে পড়াও তাই। 

ততক্ষণে কাগজের নৌকোটা জলপ্রপাতের এত কাছাকাছি এসে পড়েছিল যে টিনের সেপাই আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। নৌকোটা ছিটকে এগিয়ে চলল, টিনের সেপাই বেচার যতটা পারে আড়ষ্ট অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ; কেউ বলতে পারবে না যে একটি বারের জন্যেও তার চোখের পলক পড়েছিল। নৌকোটা তিনবার—না তিনবার নয়, চারবার— ঘুরপাক খেল, কানায় কানায় জলে ভরে গেল ; এবার নৌকো ডুববে ! 

টিনের সেপাই গলাজলে দাঁড়িয়ে ছিল ; ক্রমে নৌকো আরো তলিয়ে যেতে লাগল, কাগজ আরো নরম হয়ে এল, সেপাইয়ের মাথার উপর দিয়ে জল বয়ে গেল। তখন তার সেই সুন্দরী নর্তকীর কথা মনে হল, তার সঙ্গে আর দেখা হবে না । টিনের সেপাইয়ের কানে এই কথাগুলো বাজতে লাগল,
দুরন্ত অভিযান, সঙ্কট মহান, 
কপালেতে লেখা, অচিন মহাপ্রাণ !

তার পর কাগজটা ছু-টুকরো হয়ে গেল, ফাঁক দিয়ে গলে টিনের সেপাই পড়ে গেল। অমনি একটা মস্ত মাছ তাকে গিলে ফেলল। সে কি অন্ধকার! নালায় পাতা তক্তার তলাতেও এত অন্ধকার ছিল না, আর কি বেজায় সরু জায়গা ! কিন্তু টিনের সেপাইয়ের কোনো আলি-বালি নেই, বন্দুক কাঁধে নিয়েই সে লম্বা হয়ে শুয়ে রইল ।
মাছটা এদিকে ফেরে, ওদিকে ফেরে, কিলবিল করে অদ্ভুত সব অঙ্গভঙ্গি করে। তার পর হঠাৎ যেন একেবারে থেমে গেল,

তার শরীরের মধ্যে দিয়ে এক ঝলক বিদ্যুৎ খেলে গেল। তার পরেই ঝকঝকে দিনের আলো ! কে যেন বলে উঠল, “আরে, টিনের সেপাই যে ” ইতিমধ্যে মাছটা ধরা পড়েছিল ; তাকে বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করা হয়েছিল ; তার পর রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে, মস্ত একটা ছুরি দিয়ে দাসী তাকে কুটতে বসেছিল। এবার সে দুই আঙুলে করে তার কোমর ধরে, তাকে একেবারে বসবার ঘরে নিয়ে গেল। মাছের পেটে ভ্রমণ করে এসেছে এমন আশ্চর্য মানুষ দেখতে সবার কি আগ্রহ ! কিন্তু আমাদের সেই ক্ষুদে যোদ্ধার মনে এতটুকু অহংকার হল না।

ওরা ওকে একটা টেবিলের উপর রাখল আর সেখানে—না, এমন আশ্চর্য ব্যাপার কি পৃথিবীতে কখনো ঘটে? টিনের সেপাই দেখল সে আবার তার সেই পুরনো ঘরেই ফিরে এসেছে, যেখানে সে আগেও ছিল। দেখল সেই একই ছেলেমেয়ে, টেবিলের ওপর সেই একই খেলনা, তার মধ্যে সেই চমৎকার দুর্গে সেই সুন্দরী ছোটো নর্তকী, এখনো সে একপায়ে দাঁড়িয়ে, আরেক পা শূন্যে উঁচু করে রেখেছে; তারও কোনো অদলবদল নেই। তাই দেখে টিনের সেপাই বড়োই অভিভূত হয়ে পড়ল ; ইচ্ছা করলেই সে টিনের চোখের জলও ফেলতে পারত, কিন্তু সেরকম ব্যবহার তো আর টিনের সেপাইকে শোভা পায় না ! সেপাই মেয়েটির দিকে তাকাল, মেয়েটি সেপাইয়ের দিকে তাকাল, কিন্তু কেউ কোনো কথা বলল না।

হঠাৎ ছোটো ছেলেগুলোর মধ্যে একজন টিনের সেপাইকে তুলে নিয়ে, কথা নেই বার্তা নেই, একেবারে উনুনের মধ্যে ফেলে দিল। কেন এমন করল, তার কোনো কারণ দেখাল না সে, কিন্তু নিঃসন্দেহে এর মধ্যে নস্তির কোঁটোর জাদুকরের হাত ছিল ।


এক ঝলক লাল আলোর মাঝখানে টিনের সেপাই দাঁড়িয়ে রইল। তার বেজায় গরম লাগছিল, তবে সেটা সত্যিকার আগুনের জন্য, নাকি তার মনের ভিতরকার ভালোবাসার আগুনের জন্য, সে নিজেও জানত না। তার গায়ের সব রঙ জ্বলে গিয়েছিল। সেটা নানান জায়গায় ভ্রমণ করার সময়ই হয়েছিল, নাকি আবেগের আতিশয্যে হয়েছিল, তা জানি না। সে ছোটো নর্তকীর দিকে চাইল, ছোটো নর্তকী তার দিকে চাইল ; সেপাই টের পেল সে গলে যাচ্ছে, তবু তার অদলবদল নেই, বন্দুক কাঁধে করে খাঁড়া দাঁড়িয়ে রইল। তার পর কে যেন দরজা খুলতেই, মেয়েটি বাতাসে উড়ে, আকাশের পরীর মতো সোজা উনুনের মধ্যে টিনের সেপাইয়ের কাছে চলে এল। সঙ্গে সঙ্গে দুজনে জ্বলে উঠে, একেবারে মিলিয়ে গেল। টিনের সেপাই গলে গিয়ে ছাইয়ের উপর ফোট-ফোটা হয়ে পড়তে লাগল। পরদিন সকালে দাসী যখন উনুনের ছাই বের করে নিয়ে গেল, দেখল সেপাইয়ের টিনের শরীর গলে গিয়ে ছোটো একটি হরতনের মতো হয়ে আছে। সুন্দরী নর্তকীর শুধু সোনালি ডানাটি বাকি ছিল, তাও জ্বলেপুড়ে কালো কয়লার মতো হয়ে গিয়েছিল ।

[--হ্যান্স অ্যান্ডারসন]

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য