বাদশার সিলমোহর

প্রজারা তার সম্বন্ধে কী ধারণা পোষণ করে, বাদশা আকবর ছদ্মবেশে মাঝে মাঝে রাজ্য ঘুরে তা দেখতেন স্বচক্ষে। কখনও তিনি মন্ত্রিদেরও এই উদ্দেশ্যে পাঠাতেন ঘুরে ঘুরে দেখার জন্য।
একদিন বাদশা খবর পেলেন যে, কিছু গুপ্তচর অন্য দেশ থেকে আগ্রায় এসেছে। বাদশা ঠিক করলেন তিনি ব্যাপারটি নিজেই দেখবেন এবং তাদের সম্পর্কে খবরাখবর নেবেন। গুপ্তচরকে ধরার জন্য তিনি উঠেপড়ে লেগে গেলেন।

ছদ্মবেশে যাওয়ার পথে আকবর হঠাৎ লক্ষ করলেন, কেউ যেন তার পিছু পিছু আসছে। তিনি হঠাৎ এক জায়গায় থেমেই আচমকা পিছু ফিরে দেখলেন তার পেছনে একটি লোক হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল এবং অন্যদিকে চেয়ে থাকার ভান করল। কিছুদুর যাওয়ার পর পেছন ফিরতে যখন একই ঘটনা ঘটল, আকবর তখন লোকটিকে প্রশ্ন করলেন, কী নাম তোমার? কোথায় যাচ্ছ তুমি? 
‘আমাকে আপনি কুঁড়ে বলে ডাকতে পারেন! এই নামে সকলে ডাকে।’ 
তুমি কোথায় থাকো, কী কাজ করো ?

কিছুই না, আমি ভবঘুরের মতো শহরে ঘুরে বেড়াই। রাস্তাই আমার স্থান।'

‘তোমার বাড়ি কোথায়, কতদূরে? 
“যেখানেই যাই সেখানেই বাড়ি। লোকটির কাছ থেকে উদ্ভট সব উত্তর পেয়ে ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে আকবর বললেন, “আমি কে, তুমি জানো? আকবর ভুলেই গেলেন যে তিনি ছদ্মবেশে রাস্তায় বের হয়েছেন। 

আপনি আমারই মতো দুই হাত দুই পা-ওয়ালা মানুষ। কোনওরকম ভয়ডর না করেই লোকটি উত্তর দিল সঙ্গে সঙ্গে।


এবার মেজাজ একেবারে সংবরণ করতে পারলেন না আকবর, তিনি তার সিলমোহর জেব থেকে বের করে লোকটিকে দেখিয়ে বললেন, "কী বুঝলে, আমি মোগল বাদশা আকবর। এখন তোমাকে শুলেও দিতে পারি, বুঝলে ?’ 

লোকটিও মুখে বিশেষ কোনও ভাবান্তর দেখা গেল না। সে বাদশার সিলমোহরটি ভাল করে দেখতে লাগল। হঠাৎ অতর্কিতে সে তার হাত থেকে সিলমোহরটি ছিনিয়ে নিয়ে দিল লম্বা ছুট। 

‘চোর চোর’ বলে তারস্বরে চিৎকার করতে লাগলেন আকবর। আশেপাশের লোকেরা সঙ্গে সঙ্গে চোরকে ধরে নিয়ে এসে তার সামনে হাজির করল তৎক্ষণাৎ। 

লোকটি বিচলিত হল না মোটেই। বলল, ‘মূর্খ, তোমরা জানো না, আমি বাদশা আকবর, বলেই সিলমোহরটি তাদের দেখাল। যারা তাকে ধরে এনেছিল তারা খুবই অনুতপ্ত হল এবং লোকটিকে বাদশা মেনে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিল। এমন কাজ কোনওদিন করবে না বলে প্রতিশ্রুতিও দিল। নকল বাদশা আরও বলল, "তোমরা যে এমন কাজ করেছ, এর জন্য তোমাদের এখনই শুলে চড়াতে পারি কিন্তু আজ দেব না। সময় বুঝে তোমাদেরকে শূলে দেব। 

এ দৃশ্য দেখে আকবর একেবারে বিমূঢ় হয়ে গেলেন, তিনি লোকগুলোকে বললেন, মূর্খ, তোমরা জানো না, আমিই তোমাদের বাদশা। একটা পথের লোককে তোমরা বাদশা বলে মেনে নিলে! তাজ্জব ব্যাপার। তোমাদের
জ্ঞানগম্যির বহর দেখে আমার এত রাগ হচ্ছে যে, তোমাদের এখনই শূলে দেওয়া উচিত। 

লোকগুলো প্রকৃত বাদশাকে সাধারণ মানুষ হিসেবে মনে করে বলল, “তুমি একটা পাগল ছাড়া কিছু নও। আর বেশি বাড়াবাড়ি কোরো না। বাদশা আমাদের সামনে উপস্থিত আছেন। তার আদেশে তোমার শাস্তি হতে পারে। এমন শাস্তি হতে পারে যে, জীবনেও ভুলতে পারবে না।’ এই বলে হো হো করে হাসতে লাগল। 

যাই হোক, আকবর বুঝলেন তাঁর কিছু করার নেই। তিনি সিলমোহরটি খুইয়ে মনের দুঃখে রাজপ্রাসাদে ফিরে এলেন সেদিন। নিজ ঘরে ঢুকেই তিনি একটি মোড়ক দেখতে পেলেন ; মোড়কের গায়ে লেখা আছে, “একাকী শহরে কখনও যাবেন না। এখন রাজ্যের অবস্থা খুব খারাপ।” লেখাটির নীচে স্বাক্ষর ছিল বীরবলের। মোড়কটি খুলে বিস্মিত হয়ে আকবর দেখলেন তার ছিনতাই হওয়া সিলমোহরটি রয়েছে। তিনি সবই বুঝলেন যে, এ কাজ বীরবলেরই। নিশ্চয় কোনও গুঢ় রহস্য আছে, সেজন্য সম্রাটকে বীরবল ছদ্মবেশে যেতে বারণ করেছে।

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য