পটলার বন ভ্রমন -- ২য় অংশ

এসব ছাড়াও এবার ভূধর অজয়বাবুর সম্পদ দখল করার জন্যই তাকে সস্ত্রীক টানা গাড়িতে করে এই গভীর বনের মধ্যে বাংলোয় এনেছে। অজয়বাবু, মানসীদেবী শহরের ভিড় থেকে দূর নির্জনে এই বনবাংলোয় এসে খুশিই হন। তবে সবকিছু তো একসঙ্গে মেলে না। বাংলোয় ওঁরা বাইরে থেকে চাল, ডাল, তেল, ঘি, মালপত্র মাছ, সবই এনেছেন। এখানের বাংলায় কাজের লোকের বড় অভাব। হতদরিদ্র এই আদিবাসীরা ভাত খেতে পায় পাঁচ-সাতদিন অন্তর। এদের খাদ্য বলতে কন্দমূল সিদ্ধ, মকাই সিদ্ধ, বন্য লতাপাতা নুন দিয়ে ঘাটা। আনাজপত্র ভালো রাঁধতেও জানে না। বেগুন পোড়া, শাকসিদ্ধ ইত্যাদিই খায়। টাই রান্না করার লোক এখানে তেমন মেলে না। অজয়বাবু দেখেন ওদের খাবার দিয়ে গেল কোনোরকমে-গলা ভাত, আলুপোড়া, বেগুন পোড়া। ডাল যা করেছে তা ভাতের মতো জমাট। তাতে নুনও নেই। সেইসঙ্গে খানিকটা ধানিলঙ্কা পুড়িয়ে দিয়েছে। মেনু দেখে মানসী চমকে ওঠেন।
একি এই আধপোড়া পিণ্ডি খেতে হবে? ও ভূধর।
ভূধর এখানে এসে তার নিজের একনম্বরী আর দু'নম্বরী ব্যবসার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেছে। কোনো দু’নম্বরী একট্রাক মাল গেছে স্টেশন বাজারে মহাজনের কাছে। অনেক টাকার মাল। এখনও ওর ফেরেনি। ট্রাকওয়ালার কাছে যেতে হবে টাকা আনতে। ভূধর বলে। তাই তো দেখছি বাংলোয় কাজ করার, রান্না করার লোকও পাচ্ছি না।
অজয়বাবু বলেন-অনেক তো খুঁজলে? এবার আমি নিজে খুঁজে দেখি যদি বাংলোয় কাজের জনা কোনো লোক পাই কিনা। বাংলোয় একজন কাজ জানা বেয়ারা চাই।
মানসী বলেন-এই বনমানুষদের মধ্যে এমন লোক পাবে না। নিজেদেরই এখানে দেখছি হাত পুরিয়ে রাঁধতে হবে। কাজকর্মও করতে হবে।
ভূধর দায়িত্ব এড়াতে চায়। সে বলে-তাই দেখুন? যদি কোনো কাজের লোক পান রান্না-বান্না তো করতে হবে নাহলে যে উপোস দিতে হবে।
ওদিকে ট্রাক ফেরার সময় হচ্ছে। ভূধর বলে, আমার কাজ আছে। আমি চলি, কাকাবাবু। ভূধর জিপ নিয়ে চলে যায়।
বনের মাঝখানে চেক পোস্ট। একটা খুঁটি পোতা। তাতে একটা খুঁটি আড়াআড়িভাবে লাগানো। কোনো গাড়ি এলে বনবিভাগের লোকরা তা চেক করে দড়ি খুলে দেয়। বাঁশট উঠে যায়। পথও পরিস্কার হয়ে যায়। গাড়ি চলে যেতে বাঁশ আবার নেমে যায়। এত পাহারা দেবার কারণ বনবিভাগের অগোচরে যাতে কোনো বে-আইনি কাজ না হয়!

ভূধর না খেয়েই বের হয়ে যায়। মানসী অজয়বাবুকে বলেন, তুমি খাবে না?

অজয়বাবু বলেন-দেখি, কাজের লোক যদি পাই তখন খাব। ওই চাল সিদ্ধ আর বেগুন পোড়া আদিবাসীদেরই দিয়ে দাও। আমি বরং চিড়ে-মুড়ি খেয়েই থাকব। লোক আমি জোগাড় করবই। 
বের হয়ে যান অজয়বাবু ফরেস্ট কলোনির দিকে কাজের লোকের সন্ধানে।

ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত পটলা-হোঁৎকা ট্রাকে বসে আছে। পথের জমা জল-কাদা সারা শরীরে ভর্তি হয়ে আছে। মুখে-চোখে ক্লান্তির ছাপ। আর জনহীন বনে হাতির পাল দেখেই ওরা খানিকটা ঘাবড়ে গেছে। ফরেস্টে যে কখন কী ঘটে তা ওরা বুঝেছে।
হঠাৎ বনের মধ্যে একটা জিপ আসতে দেখে ট্রাকটা থামে। জিপটাও এসে থামে ট্রাকের কাছে। ট্রাক থেকে দেখে পটলা-হোঁৎকা, ড্রাইভার তার সিটের নীচ থেকে একটা টাকার থলে নিয়ে এগিয়ে গেল জিপের আরোহীর দিকে। টাকার থলেটা সেই তরুণের হাতে দিয়ে বলে, মহাজন দিয়া। অউর বোলা, উড অউর দো ট্রাক চাহিয়ে, অউর দো শের কা চামড়া, হাতি কা দাঁত ভি।
পটলা-হোঁৎকা ট্রাকে বসে শুনছে ওদের কথা। জিপের সেই তরুণ বলে, কাঠ কাল দো ট্রাকই যায়েগা। তুম রাত কো জঙ্গলমে অাও সর্দারজি!
এই বলে তার হাতের থলে থেকে একমুঠো টাকা ড্রাইভারের হাতে দিয়ে জিপে উঠে বলে, চলি, রাতে ভেট হোগা। হুশিয়ার।
জিপটা চলে যায়! ট্রাকটিও এবার বনের রাস্তা দিয়ে চলে গেল। একটা জায়গায় এসে থামে। খালাসি বলে, যাও, থলকোবাদ আ গিয়া ফরেস্ট বাংলো উ ধারা উ টিলাকা উপর।
জায়গাটা এক নজর দেখে ভালোই লাগে। চারদিকে গভীর বনে ঢাকা আদিম রহস্যময় পাহাড়। এই উপত্যকাতে কিছু ঘর-বাড়ি-জমিজিরাতও আছে। সামান্য চাষবাসও হয়। পাহাড়ের গায়ে একটা সুন্দর ছোট্ট বাংলো। কে বলে-ওটা নিখিল সাহেবের বাংলো। আজীব সে আদমি। এই বনের তিনি ছিলেন বড়কর্তা। রিটায়ার করার পর একাই এই বনে থেকে গেছিলেন। আদিবাসীদের মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন, আর ভালোবাসেন এই অরণ্যকে।
হোঁৎকা বলে-নিখিল সাহেব নয়, ওঁর নাম হওয়া উচিত বুনো সাহেব, নাহলে এই গভীর বনে কেউ পড়ে থাকে? চল গিয়া
দূর থেকে দেখা যায় সেই টিলার উপর গাছ-গাছালি ঘেরা ছবির মতো বাংলোটাকে। পটলা বলে-দারুণ সিনসিনারি।
হোঁৎকা বলে-প্যাট ভরবো সিনসিনারি দেইখা? ইখানে দোকান বলতে তো ওই মুদির দোকান একটা। খাওনের কী হইব?
পটলা বলে-চল দেখি, বাংলোর চৌকিদার কিছু দিতে পারে।
ওরা আসছে দুজনে জামা-প্যান্টে কাদা-জলের শুকনো ছাপ। আর একদিনের জল-কাদাতেই কলকাতার ভদ্র ছাপটা মুছে
গেছে।
আই শোনো, শুনছো? এই ছোকরারা?
এই পরিবেশে হঠাৎ ওই ডাক শুনে পটলা-হোঁৎকা দুজনেই চাইল। দেখে ওদিক থেকে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক ওদের দিকে এগিয়ে আসছেন।
পটলা বলে-আমাদের বলছেন?
ভদ্রলোক কাছে এসে দুজনকে আপাদমস্তক যেন জরিপ করে দেখছেন। পটলা-হোঁৎকা দুজনের অবস্থাই শোচনীয়। বেশ বুঝেছে তারা হুট করে খাবার না নিয়ে এখানে এসে ঠিক করেনি। পকেটটার অবস্তাও বিশেষ ভাল না। এখানে থাকার খরটা দিয়ে খাবার পয়সাও দুদিনের জন্যও থাকবে না। আর ফিরবে কী করে সেটাও ভাবেনি তারা।
ভদ্রলোক শুধোন-কী করা হয় কাজকর্ম?
পটলার মুখে যেন কথাটা এসে যায়-জামশেদপুরে একটা হোটেলে কাজ করি দুজনে। এদিকে এসেছি।
ভদ্রলোক যেন হাতে চাঁদ পান। বলেন-অ্যাঁ, হোটেলে কাজ করো দুজনেই।
হোঁৎকা বলে-হঃ বয়-বেয়ারার কাজ! ওখানে ভালো লাগত্যাছে না। তাই চইল্যা আইলাম।
অজয়বাবুও বলেন-গুড় ভেরি গুড় তা এখানে কয়েকদিন আমরা ওই বনবাংলোয় আছি। চলো না ওখানে। মাত্র তিনজন আমরা। এখানে ওই আদিবাসীদের রান্না ঠিকমতো পছন্দ হচ্ছে না। একটু কুকিং-এর কাজ আর তুমি বেয়ারার কাজই করে দেবে। ওখানেই থাকবে। খাবে-দাবেও আমাদের সঙ্গে। আর ডেলি দুজনে একশো টাকা করেও পাবে। কাজ খুব সামান্যই। ডেলি দুজনে দুশো টাকা। এছাড়া থাকা-খাওয়া!

পটলা কোনোদিন এসব কাজ করেনি। তাদের বাড়িতে, তাদের কারখানায় এমন কত লোকই কাজ করে। এই বনে এসেছে বেড়াতে। তাকে যে এরকম বেয়ারার কাজ করতে হবে তা ভাবেনি। হোঁৎকা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। সে টুকটাক বাড়ির কাজও করে। এখানে এসে বিপদেই পড়েছে। তবু ক'দিন আহার-আশ্রয় পাবে। আর দিনে দুশো টাকা করে পাবে। ওদের খরচা করতেও হবে না। পটলা কিছু বলার আগেই হোঁৎকা বলে, আপনি বুড়া মানুষ, বনবাংলোয় এসে বিপদে পড়েছেন দেহি।
অজয়বাবু বলেন-সত্যি বিপদে পড়েছি হে দিন পাঁচ-সাত থাকব।
হোৎকা বলে-ঠিক আছে, আপনি যহন কইছেন-কইরা দিমু। বয়-বেয়ারার কাজ সব জানি আমরা।
গুড, তাহলে চলো বাংলোয়। অজয়বাবু তাদের নিয়ে এবার পথের ধারে কাঠের ব্রিজ পার হয়ে টিলার উপর উঠতে থাকেন।
হোঁৎকা পটলাকে বলে-চল, সব ঠিকঠাকই হইব।
বাংলোতে মানসী একা। তিনিও ভাবনাতে পড়েছেন কাজের লোকের জন্য। এই বনবাংলোতে এসে হাঁপিয়েও উঠেছেন। কোথাও যাবার উপায় নেই। টিভি-রেডিও-সিনেমা নেই। সন্ধা থেকে নামে আদিম অন্ধকার। তখন বাংলোর বাইরে থাকাও নিরাপদ নয়। গত রাত্রেই তো হাতির পাল এসে বাগানের সাজানো বাহারি ফুলের টবগুলোকে নিয়ে ফুটবল খেলে গেছে। সেদিন রাতে একটা সাবধানী চিতাকে আসতে দেখেছিলেন। মাঝে মাঝে হায়নার দলও আসে। দাঁতাল শুয়োরও ঘোরাফেরা করে।
এই তো অবস্থা তার উপর যদি রান্নার লোক, কাজের লোক না পান চলবে কী করে। ভূধর তো এখানে এসে বনে বনে ঘোরে। তার কাঠের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। মাঝে মাঝে রাতেও জিপ নিয়ে বের হয়।

একাই রয়েছেন মানসী বাংলোতে। আশপাশে লোকজন আর কেউ নেই। পিছনেই গভীর জঙ্গল। যে কোনো মুহুর্তে ভালুক, হাতি চলে আসতে পারে। তাই দিন দুপুরেও তিনি দরজা বন্ধ করে আছেন। বিশ্রী লাগছে এখানে। হঠাৎ কাদের কথা শুনে সাহসে ভোর করে দরজা খুলে বের হয়ে দেখেন বিজয়ীর মতো ফিরছেন অজয়বাবু। সঙ্গে দুটি ছেলে। অজয়বাবু বলেন, গিন্নি নাও, তোমার জন্য এই যে হোটেলের ট্রেনেড বেয়ারা এনেছি। এরমধ্যে অজয়বাবু এদের নামও জিজ্ঞাসা করেছেন।

হোঁৎকাই বলে, এর নাম চঞ্চল গাঙ্গুলি, ব্রাহ্মণ। আমার নাম মঙ্গল দাস। আমরা হোটেল নন্দনে কাজ করতাম। ওখানে আমাদের চঙ্গু আর মঙ্গু বলেই ডাকতেন সবাই।
অজয়বাবু বলেন-গিন্নি, এ চঙ্গু আর এ মঙ্গু। জামশেদপুরের নামী হোটেলের স্টাফ। ক'দিনের জন্য বনে বেড়াতে এসেছে। আমি ধরে আনলাম। সব দেখিয়ে দাও এদের। চঙ্গু আগে চা হোক। দেখি, চা কেমন করো।

মানসী দেখছেন ওদের। ওরা যে ক্লান্ত বিধ্বস্তু তা বুঝেছেন। মানসীর নিজের সস্তান নেই। ছেলে দুটোকে তাঁর ভালো লেগেছে। দুঃখও হয়, কাজের জন্য অসহায় দুটো ছেলে এই বনেও এসেছে। মানসী বলেন-ওরা সবে এসেছে এতটা পথ, ওদের হাতমুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম নিতে দাও। আউট হাউসে গিয়ে জামা-প্যান্ট বদলাক, তারপর ওসব হবে। তারপর ওদের বলেন-ওদিকে তোমাদের থাকার ঘর। ওখানে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নাও। জল-টল খেয়ে কাজ করবে।
পটলা-হোঁৎকারা এইসব প্যাচ -এর ব্যাপার দেখে বেশ চমকে উঠেছে। এবার আউট হাউসে এসে পটলা বলে,-এটা কী করলি? বেড়াতে এসে চাকরগিরি করতে হবে?
হোৎকা বলে-নিজেদের পকেট তো গড়ের মাঠ থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা না করলে এখানে থাকা যাবে না। বাঘ-হাতিতেই শেষ কইর‌্যা দিবে। তাই কইত্যাসি, তুই ভাবিস না। আমিই ম্যানেজ কইর‌্যা দিমু। তোরে কিছু করতে হইব না।

পটলা গজগজ করে-চঙ্গু-মঙ্গু হয়ে থাকতে হবে!
হোৎকা বলে-পুরুষের দশ দশা। কখনও হাতি, কখনও মশা। এহন না হয় মশা হইয়াই থাকি। ফিরা গিয়া আবার হাতি হইব। চল, চা করছি। তুই কাপ-প্লেট গুলান ট্রেতে সাজাই ল। তার আগে পাউরুটি, মাখন, চিনি কলা, সন্দেশও আছে দেখি অনেক। খাইয়া ল-ক্ষুধা শাস্ত হইলে মন-মেজাজও ঠাণ্ডা হইব।

পটলা-হোঁৎকা এবার বেশ সাজিয়ে-গুছিয়ে উদর সেবা করে। বেশ বুঝেছে এখানে খাওয়া-দাওয়া ভালোই হবে। হোঁৎকা চায়ের আয়োজন করতে থাকে।
বিকালের দিকে ফিরেছে ভূধর। তবে তার দলবলকে খবর দিতে হবে। আজ রাতেই চোরা কাটাই হবে দক্ষিণের বনে। বিশাল একটা সেগুন গাছকে রাতারাতি কেটে টুকরো টুকরো করে চালান করে দিতে হবে। আর ডমরুকে বলতে হবে হাতির দাঁতের জন্য বাঘের চামড়ার জন্য। এগুলো বেশ ভালো দামেই চালান হয়। লাখ লাখ টাকার ব্যাপার। ডমরু এই অঞ্চলের নামী চোরাশিকারি। তার দলে বাছা বাছা শিকারি আছে। ওরা বনের নানা প্রান্তে ঘোরে। সঙ্গে থাকে ছোরা, রাইফেল। তার গুলিতে হাতি-বাঘও লুটিয়ে পড়ে। ওরা কাজ শেষ করে হাতির দাঁত বাঘের চামড়া, হরিণের শিং নিয়েই সরে পড়ে। বনবিভাগের কর্তারা পরে মৃত জন্তুর দেহটা পায় আর ব্যাপারটা বুঝতে পারে।

এইভাবে একটা চক্র টাকার লোভে বনভূমির সবুজ বনসম্পদকে-বনের প্রাণীদের শেষ করে অরণ্যকেই নিঃশেষ করতে চায়। ভূধর তাদেরই একজন। তাদের অত্যাচারের কথা এখন কর্তারাও জেনেছেন। অপরাধীদের ধরার চেষ্টাও চলছে। তবে নানা কারণে তা আর হয়ে উঠছে না।

মিঃ নিখিল রায় ছিলেন ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার। বনবিভাগের পদস্থ কর্তা। তিনি অরণ্যজগতেরই লোক হয়ে গেছেন। বন্যপ্রাণীদের ভালোবাসেন। বনে বনে ঘুরে ঘুরে দেখেছেন আরণ্যক প্রাণীদের চরিত্রকে। বাঘ মাংসাশী প্রাণী। শিকার করে অন্য প্রাণীকে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় বেশি প্রাণীকে সে মারে না। আর মানুষের লোভ অত্যন্ত বেশি। সে নিজের জন্য নয়, তার পরিবারের জন্য, তার পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও সঞ্চয় করে রাখে। তাই সবকিছু সে লুট করে নিতে চায়। পশুরা তা করে না। আর তাকে বিরক্ত না করলে সে অন্য প্রাণীকে আক্রমণও করে না। মানুষের এই সহাবস্থান নীতি নেই যা পশুর জগতে আছে।

নিখিলবাবু রিটায়ার করার পরও এই বনভূমিতে রয়ে গেছেন। স্ত্রী গত হয়েছেন। ছেলেরাও পড়াশুনা শেষ করে ভালো চাকরি করছে। তারা শহরে থাকে। নিখিলবাবু আর ফিরে যাননি। তিনি যখন যুবক ছিলেন তখন বন্যপ্রাণী শিকার বে-আইনি ছিল না। তখন তিনিও বাঘ, হরিণ, হাতি শিকার করেছেন। এখন তিনিই তাদের রক্ষার কাজ করেন সাধ্যমতো।
বর্তমান রেঞ্জার মি. মিত্রও নিখিলবাবুর অধীনে কাজ করেছে। সেও ভদ্রলোককে তাই খুবই শ্রদ্ধা করে। কোনও পরামর্শের প্রয়োজন হলে ছুটে আসে নিখিলবাবুর কাছে। নিখিলবাবুর ঘরে দুতিনটে বাঘের চামড়া ট্যান করে তার ভিতর খড়-তুলো ইত্যাদি পুরে পূর্ণসাইজের বাঘই বানিয়ে রাখা আছে। হঠাৎ কেউ ঘরে ঢুকলে তার মনে হবে আলোছায়ায় যেন জ্যান্ত বাঘই বসে আছে। দরজার উপর হরিণের মাথা। বাইসনের মাথাও আছে। নিখিলবাবু বলেন-অতীতের ভুলের চিহ্ন ওগুলো। আর রাইফেল চালানোও অনেকদিন আগে ছেড়ে দিয়েছি। তবে মনে হচ্ছে, ওগুলো আবার বের করতে হবে।

ইদানীং এই রেঞ্জে বেশ কিছু অন্ধকারের লোক গোপনে দামি গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে! আবার বাঘ, হাতি, হরিণও শিকার করছে চামড়া, দাঁত পাবার আশায়। নিখিলবাবু বলেন, বনকে বাঁচাও, মিত্র। দ্যাখো, হয়তো সরষের মধ্যেই ভূত আছে। তাদের ধরার চেষ্টা করো।

বাংলোর বাগানে বিকালের পড়ন্ত রোদ হলুদ আভা এনেছে। ওদিকে দূরে পাহাড়ের কোলে সূর্য অস্ত গেছে। পটলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছে এই দৃশ্য। পরনে ওর হাফ প্যান্ট আর সাদা শার্ট। এখানে এসে ওদের নাম-পোশাক সবই বদলে গেছে। হোঁৎকার পরনেও একই রকম পোশাক। সে ট্রেতে টি-পট, কাপ সাজিয়ে নিয়ে গিয়ে নামায়। অজয়বাবু বলেন ভূধরকে, এই হল মঙ্গু, আর ওই যে চঙ্গু। জামশেদপুরের একটা হোটেলের বেয়ারা।
মানসী বলেন-বেশ ভালো ছেলে দুজন। কাজের খোজে এই বনে এসেছে।
পটলা-হোঁৎকা এখানে ভূধরকে দেখবে তা ভাবেনি। ওকে দেখেই চিনতে পারে ওরা দুজনে। এই লোকটাই যে ওই ট্রাক ড্রাইভার সর্দারজির সঙ্গে দুনম্বর ব্যবসা চালায় তা বুঝেছে। আর তাকে এই বাংলোতেই থাকতে দেখে একটু অবাকই হয়। অবশ্য ভূধর ওদের ট্রাকে দেখতে পায়নি। সে বাস্ত ছিল চোরাচালানের কথা বলতে। তাই সে বাংলোতে পটলা-হোঁৎকাকে দেখে বলে, সত্যি, কাকাবাবুর এলেম আছে। এই বনে এসেও ঠিক কাজের লোক বের করেছেন।

অজয়বাবু চায়ের কাপ তুলে নিয়ে তাতে চুমুক দিয়ে বলেন, নাহে, মঙ্গু চাও বেশ ভালো তৈরি করেছে।
এ যাত্রাটা পার হয়েছে ওরা। রাতে এবার রান্না করতে হবে রুটি আর কষা মুরগি। পটলা বলে, এবার কী করবি হোঁৎকা? 
রুটি করতে গেলে তো গোল হবে না, ইন্ডিয়ার ম্যাপই হবে। আর কষা মুরগি, ও তো খেয়েইছি এতদিন। এবারে বাঁচবি কী করে।
হোঁৎকা বলে-গোবিন্দর দোকানে মুরগি-রুটি বানাতে দেখেছি। ঠিক বানাই দিমু। তুই আটায় জল দে-আটা মাখতে হইব।
একটা গামলায় আটা নিয়ে পটলা তাতে বেশ খানিকটা জল ঢেলে দেয়।
হোৎকা চিৎকার করে-আই থাম-থাম
আর থাম ততক্ষণে গামলার আটা সিন্নিতে পরিণত হয়েছে। জল আর আটা মিশে তরল একটা কিছু হয়ে গেছে। আর সেই হাত মুখে ঠেকিয়েছে। ফলে তার মুখ-মাথা আটায় ভর্তি হয়ে গেছে।

একি করেছ অ্যাঁ--
মানসী ঘরে ঢুকে দুই আটারঞ্জিত মূর্তিকে দেখে হেসে ফেলেন।
হোঁৎকা বলে-রুটি কইরত্যাছি মাসিমা!
মানসী হাসছেন-এ যে আটার লেই হয়েছে খানিকটা ফেলে দিয়ে আরও আটা দাও ওতে। রুটি করতেও জানো না! আর মাংসা?
মাংস তখন ওদিকে তেমনই রয়েছে। আলু কাটতে গিয়ে হোৎকা এর মধ্যে তার আঙুলও কেটেছে। মানসী দেখছেন ওদের।
বলেন-এসব কাজ কখনও করেছ বলে তো মনে হয় না করেছ?
পটলা বলে-না মাসিমা, সাহেব কিছু বলার আগেই আমাদের ধরে আনলেন।
হোঁৎকা বলে-আমাগোর থাকার জায়গাও নাই, খাবার টাকাও নাই। এহানে থাকতে-খেতে পামু, তাই চইলা আইছি।
মানসী দেখছেন দুই বিচিত্র মূর্তিকে শুনছেন ওদের কথা। কী ভেবে বলেন মানসী-ঠিক আছে। কাউকে বলবে না এসব কথা। আমি দেখিয়ে দিচ্ছি। চঙ্গু, এই আটার লেই খানিকটা ফেলে এতে আরও আটা দিয়ে শক্ত করে মাখো। আর মঙ্গু, মাংস রান্নাটা আমি যেভাবে বলছি সেইমতো করো। সিদ্ধ হলে ডাকবে। কতটা কী দিতে হবে দেখিয়ে দেব।
পটলা-হোঁৎকা হাতে-নাতে ধরা পড়তে পড়তে মাসিমার জন্যই কোনোমতে বেঁচে গেছে। মাসিমাকে তাদের আসল পরিচয়ও দিয়েছে। মানসী সব শুনে বলেন, খুব সাহস তো তোমাদের

আর পটলারাও জানতে পারে এই ভূধরবাবু, অজয়বাবু বা মানসীদেবীর রক্তের সম্পর্কের কেউ না। অজয়বাবুর বন্ধুর ছেলে। তাঁদের দয়াতেই মানুষ হয়েছে ভূধর। তাদের টাকাতেই এই বনে কাঠের ব্যবসা করে।
পটলা-হোঁৎকা এখন এখানে চঙ্গু-মঙ্গু নামেই পরিচিত। রাতের খাবার আজ ভালোই হয়েছে। ভূধর খাবার টেবিলে বসে অজয়বাবুকে বাঘের গল্পও বলেছে। অজয়বাবুর কন্ঠে ভয়ের সুর,-বাঘ আছে জেনেও বনে এইভাবে কেন ঘোরো?
ভূধর বলে-বাঘের ভয় আমার নেই কত বাঘ দেখেছি বনে। বাঘ, হাতি, বাইসন-এসবকে ভয় পাই না। প্রায়ই তো বাঘ-হাতির সামনে পড়ি। নো ফিয়ার।
পটলা-হোঁৎকা শুনছে। ভূধরবাবুর উপর তাদেরও সন্দেহ কেমন বাড়ে। লোকটা সাহসী বটে।
রাতের খাওয়া শেষ হবার পর ভূধর বের হয়ে যায়। তার নাকি কী জরুরি কাজ আছে। অজয়বাবু ও মানসীদেবীও শুয়ে পড়েন। নিশুতি বাংলো। ওদিকের ঘরে পটলা-হোঁৎকা রয়েছে। ওরা দেখে বনের দিক থেকে মাঝে টর্চের আলোর ঝলক ওঠে। আবার নিভেও যায়। হোৎকা বলে। ওই ভূধরবাবু রাতে বনে বের হইল, কী করে ওরা? চল দেইখা আসি
পটলা বলে-এত রাতে বনে যাবি?
হোৎকা বলে-ভূধরবাবু যদি যাইতে পারে, আমরাও যামু-চল হুঁশিয়ার।
এর মধ্যে ওরা দুজনে দিনের আলোয় বনকলোনি আর আদিবাসী বস্তির খানিকটা দেখেছে। ওদিকেই বন। দুজনে চলেছে রাতে। ভূধর এর মধ্যে তার লোকদের গাছ কাটাই করে পাচার করার ব্যবস্থা করে খুশি মনে ফিরছে। বনের ভিতরে একটা ছোট ঝরনার জল পড়ার শব্দ কানে আসে। দুদিকে ঘন বন। একটা ছোট মন্দিরও রয়েছে। আর সেটাকে কেন্দ্র করে দুএকটা ঘরও তৈরি হয়েছে। ভূধর সেইমন্দিরে আসে। সেখানে কালীমূতি রয়েছে। রয়েছে একটা শিবলিঙ্গ। পূজারী ভজনলালও ভূধরকে চেনে। ভূধরকে দেখে ভজনলাল বলে-ক্যা, ভূধরবাবু-ব্যবসা তো ভালোই চলছে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য