আমের স্বাদ - বাংলাদেশের লোককাহিনী

     ইরান-তুরান দেশের বাদশা দিল্লি জয় করিয়া বঙ্গ ভারতের বাদশা হইয়া বসিলেন। একদিন দরবারে বসিয়া আছেন, হঠাৎ তার উজিরকে ডাকিয়া বলিতে লাগিলেন, “দেখরে উজির! আমি লোকের মুখে শুনিয়াছি, এই ভারত মুলুকে এক প্রকারের ফল আছে । তাহার নাম আম । যেমন তাহার খোশবু, খাইতেও তেমনি মধুর। তুমি জলদি করিয়া আমার জন্য কয়েকটি আম লইয়া আস ।” 
     তখন শীতকাল । কোথাও আম পাওয়া যায় না | উজির জোড়হাতে কুর্নিশ করিতে করিতে বলিল, “বাদশা নামদার! আলম্পনা! জাঁহাপনা ! বান্দার গোস্তাকি মাফ করুন, এটা শীতকাল। এখন আম পাকে না। সুতরাং আম খাইতে হইলে
জাঁহাপনাকে জৈষ্ঠ্যমাস পর্যন্ত অপেক্ষা করিতে হইবে।” 
উজিরের কথা শুনিয়া বাদশা গোস্বায় জুলিয়া উঠিলেন। কি, এতবড় দেশের বাদশা তিনি! যাহার হুকুমে বাঘে-গরুতে একঘাটে পানি খায় ; তাঁহাকে কিনা একটি সামান্য আম খাইতে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করিতে হইবে! বাদশা আদেশ 
করিলেন,

“দেখরে উজির! তুমি জানিয়া জান না, 
সাত দিবসের মধ্যে যদি তুমি আম না 
খাওয়াইতে পার 
তবে তোমার কাটিবে গর্দান ।”

     শুনিয়া উজির ভয়ে কাঁপিতে লাগিল। কিন্তু হাকিম নড়ে ত হুকুম নড়ে না। বাদশার আদেশ নাকচ হইবার নয়। 
     উজির ঘুমায় না— খায় না, নায় না, দিন ভরিয়া চিন্তা করে,– রাত ভরিয়া চিন্তা করে, কি করিয়া বাদশাকে আম খাওয়ানো যায়। উজির এ বনে যায়,– ও বনে যায়,– সারি সারি আম গাছ । তার পাতার আড়ালে কোথাও একটি আম দেখিতে পায় না। আর পাইবে কি! অসময়ে কি আমগাছে আম ধরে ? মাঝে মাঝে আমগাছ হইতে এক একটি শুকনা পাতা ঝরিয়া পড়িয়া উজিরকে উপহাস করিতে থাকে। 
     ভাবিতে ভাবিতে একদিন উজিরের মনে একটি বুদ্ধি আসিল । সাতদিন গত হইলে সকালে উজির কিছু তেঁতুলের রস আর চিটাগুড় একত্র করিয়া তার সমস্ত দাঁড়িতে মাখাইল । তারপর যথাসময়ে বাদশার দরবারে যাইয়া উপস্থিত হইল ।
     দরবারের সমস্ত কাজ রাখিয়া বাদশা জিজ্ঞাসা করিলেন, “দেখরে উজির! তুমি সেই আম্রফলের খোজ পাইয়াছ ?”
    উজির হাতজোড় করিয়া বলিল, “খোদাবন্দ আলম্পনা! জাঁহাপনা! বান্দার গোস্তাকি মাফ করিবেন! এই অসময়ে আমি জাঁহাপনাকে সত্যকার আম খাওয়াইতে পারিব না। কিন্তু আমের যে কিরূপ স্বাদ, আপনাকে তাহা অনুভব করাইতে পারিব । আপনি আমার এই দাড়িতে জিহবা লাগাইয়া দেখুন, আপনি আমের স্বাদ পাইবেন ।” 
     এই বলিয়া উজির বাদশার সামনে যাইয়া, তাহার দাড়ি আগাইয়া ধরিল । বাদশা উজিরের দাঁড়িতে জিহবা লাগাইয়া বলিলেন, "চমৎকার ! —তোফা—তোফা!” 
     তখন সভাসদেরা জিজ্ঞাসা করিল, “বাদশা নামদার ! উজিরসাহেবের দাঁড়িতে জিহবা লাগাইয়া আপনি কি বুঝিলেন?” বাদশা সহাস্যে বলিলেন, “আমি বুঝিলাম, আম খাইতে সামান্য টক=মিশানো মিষ্টি, আর কিঞ্চিৎ আঁশযুক্ত।”
     উজির হাতজোড় করিয়া বলিলেন, “জাঁহাপনা সত্যই অনুভব করিয়াছেন।”

     সে যাত্রা উজিরের গর্দান রক্ষা পাইল । উজিরের এই উপস্থিত বুদ্ধি দেখিয়া বাদশা তাহাকে একজাহার টাকা ইনাম দিলেন ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য