অারুণীর ব্রহ্মবিদ্যা লাভ

সেকালে গৌতমবংশীয় আরুণি নামে এক ঋষি ছিলেন–তাঁর পুত্রের নাম শ্বেতকেতু। পিতা যেমন বেদবিদ ছিলেন, পিতার নিকট শিক্ষা লাভ করে পুত্র শ্বেতকেতুও সেইরূপ বেদবিদ হয়ে উঠেছেন। অল্পবয়সে এভাবে বেদশাস্ত্রে দক্ষতা লাভ করে শ্বেতকেতুর মনে বেশ অহঙ্কার হল। তিনি ভাবলেন, দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করে বড় বড় জ্ঞানীদের তর্ক করে, বিচার করে জয়ী হয়ে যশের মাল্য নিয়ে ফিরবেন ঘরে। এই ভেবে শ্বেতকেতু প্রথমেই যাত্রা করলেন পাঞ্চাল দেশের দিকে। সেকালে নানাবিধ বিদ্যাচর্চার জন্য পাঞ্চল দেশের যথেষ্ট খ্যাতি ছিল, এই কারণেই শ্বেতকেতু সর্বপ্রথম পাঞ্চালে গিয়েই উপনীত হলেন।
জীবল রাজার পুত্র রাজা প্রবাহণ ছিলেন তখন পাঞ্চাল দেশের রাজা। তার রাজসভায় আশ্রয় পেতেন বহু জ্ঞানী-গুণী। শ্বেতকেতু ভেবেছিলেন, রাজা এবং রাজসভাস্থিত পণ্ডিতদের সহজেই বিচারে পরাজিত করে তারপর অন্য দেশে যাবেন। এই ভেবে তিনি সরাসরি একেবারে রাজসভায় এসে উপস্থিত হলেন।
আরুণি ঋষির পুত্র শ্বেতকেতু বেদবিদ্যা শিখে খুবই আত্মাভিমানী হয়ে উঠেছেন—এ সংবাদ রাজা প্রবাহণ আগেই শুনেছিলেন। এক্ষণে তাকে নিজের রাজসভায় উপস্থিত হতে দেখে রাজার ইচ্ছা হল—শ্বেতকেতুর বিদ্যার বহর কত, একটু যাচাই করে দেখবেন।
তাই শ্বেতকেতু রাজার সম্মুখে পৌছানো মাত্রই রাজা তাকে যথোচিত সংবর্ধনা করে জিজ্ঞেস করলেনঃ ঋষিকুমার! আপনি কি আপনার পিতার নিকট থেকে সমস্ত বিদ্যা শিখে নিয়েছেন?’

রাজার সরাসরি প্রশ্নে ঋষিকুমার একটু বিব্রত হলেন, বিরক্তও হলেন। তবু মনের ভাব গোপন রেখে বাইরে যথাসম্ভব বিনয়ী হয়ে বল্লেনঃ
হা মহারাজ! পিতা সকল বিষয়েই আমায় যথাযোগ্য উপদেশ দিয়েছেন।” 
ঋষিকুমারের উত্তর শুনে রাজা মনে মনে হাসলেন। তারপর রাজা প্রবাহণ জন্মমৃত্যু ইত্যাদি বিষয়ে শ্বেতকেতুকে পর পর পাঁচটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। এখন এই প্রশ্নগুলি হল ব্রহ্মবিদ্যা সম্পর্কিত। শ্বেতকেতু পিতার নিকট থেকে বেদবিদ্যাই শিখেছিলেন—ব্রহ্মবিদ্যা কিছুই জানতেন না। কিন্তু তথাপি তার মনে অহমিকা ছিল যে তিনি সর্ববিদ্যাবিশারদ হয়ে উঠেছেন।
রাজার প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তরেই মাথা নুইয়ে রাজসভার সামনে দাঁড়িয়ে শ্বেতকেতুকে বলতে হলঃ
‘আমি এর উত্তর জানিনে মহারাজ।’
লজ্জায় শ্বেতকেতুর মাথা হেট হয়ে গেল। এত জাঁক করে এসেছিলেন, কিন্তু রাজার কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারলেন না। শ্বেতকেতু যে কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারবেন না—এতটা হয়তো রাজা প্রবাহণও বুঝে উঠতে পারেননি। তাই বিস্মিত হয়ে বল্লেনঃ
এই বিদ্যা নিয়ে আপনি দিগ্বিজয়ে বেরিয়েছেন ঋষিকুমার! আমার একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারলেন না, অথচ আপনার বিদ্যার বড়াই তো শুনে আসছি বহুকাল। যে সর্ববিষয়ে বিশারদ নয়, সে কি করে আপনাকে সর্ববিদ্যাবিদ বলে পরিচয় দেয় ?”
রাজার টিটকারিতে শ্বেতকেতুর ইচ্ছা হল তিনি যেন মাটির সঙ্গে মিশে যান। সভাসুদ্ধ লোকের সামনে এমনি ভাবে অপমানিত হয়ে লজ্জায়, দুঃখে, ক্ষোভে শ্বেতকেতু রাজসভা ত্যাগ করলেন।
ধীরে ধীরে শ্বেতকেতু ফিরে এলেন পিতার আশ্রমে—অভিমানে তাঁর কণ্ঠ বাপরুদ্ধ। পিতার সঙ্গে দেখা হতেই শ্বেতকেতু বললেন সমস্ত কাহিনি। কী ভাবে ক্ষত্রিয় রাজা প্রবাহণ তাঁকে পাঁচ পাঁচটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলেন–কিন্তু শ্বেতকেতু কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারেননি। সভাশুদ্ধ লোকের সামনে তাকে রাজার ধিক্কার সইতে হল—অপমানিত হয়ে ফিরে আসতে হল রাজসভা ছেড়ে। সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করে শ্বেতকেতু বললেনঃ
পিতা, আপনি তো আমাকে সর্ববিদ্যা শিখিয়ে দিয়েছিলেন, তবে আমি রাজার কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারলাম না কেন ??
আরুণি একে একে প্রশ্নগুলি শুনলেন পুত্র শ্বেতকেতুর মুখে। 
তারপর বললেনঃ বৎস তোমার কোনো দোষ নেই। রাজা তোমাকে যে সমস্ত প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছেন, আমি নিজে তার একটিরও উত্তর জানিনে। আর আমি জানতাম না বলেই তোমাকেও শেখাতে পারিনি।’
পিতার কথা শুনে শ্বেতকেতু বুঝলেন, পিতা তাকে ঠকাননি। এতে শ্বেতকেতু কিছুটা শান্ত হলেন, কিন্তু আরুণি মনের শান্তি হারালেন। তিনি বুঝলেন—তাঁকেও ব্রহ্মবিদ্যা শিখতে হবে, আর শিখতে হবে, রাজা প্রবাহণের কাছেই। ব্রাহ্মণ হয়ে ক্ষত্রিয়ের নিকটই তাকে শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে হবে—এ বিষয়ে মনের মধ্যে কোনো অহংকার পুষে রাখলে ব্রহ্মবিদ্যা শেখা হবে না।
এই ভেবে অন্তরে শ্রদ্ধা নিয়ে আরুণি ঋষি রাজা প্রবাহণের রাজসভায় গিয়ে উপনীত হলেন। রাজা ঋষিকে রাজসভায় উপস্থিত দেখে যথাযোগ্য সংবর্ধনা জানালেন।

পরদিন প্রভাতে রাজা ঋষিকে বললেনঃ
ভগবান, মানুষের প্রিয় যে কোনো বস্তুর জন্য আপনি আমার নিকট বর গ্রহণ করুন।
প্রিয় বস্তু আর বিত্ত দিয়ে কি হবে! ঋষির মন ব্রহ্মবিদ্যা শিক্ষার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে—বিত্তের প্রতি তার কোনো লালসাই নেই। 
তাই তিনি বললেনঃ মানুষের প্রিয় বিত্ত আপনারই থাক মহারাজ। আমার অন্য প্রার্থনা আছে।
আশ্চর্য হয়ে রাজা বললেনঃ“কি সে প্রার্থনা ভগবান ?’
তখন আরুণি বললেনঃ ‘মহারাজ, আপনি আমার পুত্র শ্বেতকেতুকে যে বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, সেই ব্রহ্মবিদ্যা আমায় দান করুন।’
ঋষির কথায় রাজা প্রবাহণ একটু চিন্তিত হলেন—কারণ এতকাল পর্যন্ত এই পবিত্র বিদ্যা শুধু রাজারাই জানতেন; ব্রাহ্মণ বেদবিদ্যা পর্যন্ত জানতেন, কিন্তু জানতেন না শুধু ব্রহ্মবিদ্যা। এক্ষণে মহর্ষি প্রার্থনা করছেন, তাকে ফিরিয়ে দেবার জো নেই। এতকাল পর্যন্ত যা শুধু ক্ষত্রিয়ের জ্ঞাত ছিল, এখন তা ব্রাহ্মণেরও আয়ত্ত হবে—এই ভেবে রাজা চিন্তিত হয়েছিলেন। কিন্তু আরুণিকে ফিরিয়ে দিতে পারেন না। 
তাই বললেনঃ আপনাকে আমার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে দীর্ঘকাল এখানে বাস করতে হবে—তবেই অপর ব্রাহ্মণের অজ্ঞাত এই ব্রহ্মবিদ্যার অধিকারী হতে পারবেন।”
ঋষি এই বিষয়ে তৈরি হয়েই এসেছেন। তিনি সর্ব অহংকার বিসর্জন দিয়ে, শ্রদ্ধাযুক্ত মন নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে ব্রহ্মবিদ্যা শিক্ষা করলেন। ক্ষত্রিয়ের গুপ্তবিদ্যা এই ভাবে প্রথম ব্রাহ্মণও শিখে নিলেন।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য