জনক রাজার সভায় যাজ্ঞবল্ক

বিদেহ রাজ্যের রাজা জনক। জনক শুধু রাজা হিসাবে সে যুগে শ্রেষ্ঠ ছিলেন না, তিনি ছিলেন সেকালের একজন শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মবিদ। সেই জন্যই লোকে তাকে বলতো রাজর্ষি। সেকালের বড় বড় পণ্ডিত, মুনি এবং ঋষিরাও ভাবতেন যে জনক রাজার সঙ্গে কিছু শাস্ত্রচর্চা না করলে তাদের বিদ্যা-বুদ্ধি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তাই প্রত্যহই কয়েকজন শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী জনকের রাজসভায় উপস্থিত থাকতেন।
একবার জনক রাজা এক বিরাট যজ্ঞ করলেন; যজ্ঞ যেমন বিরাট, তার দক্ষিণাও ছিল তেমনি প্রচুর— তাই যজ্ঞের নামই ছিল বহু-দক্ষিণ যজ্ঞ। সেই যজ্ঞে নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন কুরু, পাঞ্চাল এবং বিদেহ দেশের বড় বড় পণ্ডিত এবং মুনি-ঋষিগণ।

যজ্ঞ তখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, এমন সময় জনক রাজার এক অদ্ভুত খেয়াল হল। তিনি ভাবলেনঃ
‘আমার যজ্ঞসভায় এত এত ব্রহ্মবিদ এসেছেন—তাদের মধ্যে কে সর্ববিষয়ে শ্রেষ্ঠ, তা তো বুঝা হল না!”
অথচ সোজাসুজি এমন প্রশ্ন জিজ্ঞেসও করা যায় না। তাই জনক রাজা এক অদ্ভুত ব্যবস্থা করলেন। তিনি এক হাজার উৎকৃষ্ট গাভি বাছাই করলেন, তারপর তাদের শিং সোনায় মুড়িয়ে দিয়ে তাদের যজ্ঞশালার কাছাকাছি এক জায়গায় বেঁধে রাখলেন। তারপর সমবেত মুনি-ঋষিদের লক্ষ করে জোড়হস্তে বললেনঃ
আপনারা সবাই বেদবিদ ও ব্রহ্মবিদ। আপনাদের মধ্যে কে বড় কে ছোট—আমি জানিনে, বিচার করবার দুঃসাহসও আমার নেই। যিনি আপনাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মবিদ, ব্রহ্মিষ্ঠ, তিনি ঐ সহস্র স্বর্ণশৃঙ্গ গাভিদের গ্রহণ করে আমায় কৃতাৰ্থ করুন।

জনকের কথা শুনে সমবেত মুনি-ঋষিরা স্তদ্ধ হয়ে গেলেন। কার এত বড় বুকের পাটা যে নিজেকে ব্রহ্মিষ্ঠ বলে পরিচয় দেবে! আর জনকেরই বা কী সাহস যে এরূপ প্রস্তাব করেন!
সবাই নীরব—সভায় টু শব্দটিও নেই। সবাই মাথা নুইয়ে বসে আছেন, আর ভাবছেন—কে উঠে দাঁড়াবেন।
যজ্ঞ-সভার এক প্রান্তে বসেছিলেন ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য। ধীরে ধীরে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। সমবেত সবাই তাকিয়ে দেখলেন—দীর্ঘদেহ সৌম্য শাস্ত জটামণ্ডিত-শির এক জ্যোতির্ময় ব্রাহ্মণ তাঁর শিষ্য সামশ্রবকে আদেশ
করছেনঃ
সামশ্রব, ঐ ধেনু সহস্ৰকে আমার আশ্রমে নিয়ে যাও।
সভাশুদ্ধ লোক চমকে উঠল । কী দুঃসাহস—এতগুলি বেদবিদ ব্রহ্মবিদ ব্রাহ্মণের মধ্যে নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে পরিচয় দেয় যাজ্ঞবল্ক্য!
সমস্বরে চিৎকার উঠলঃ
'যাজ্ঞবল্ক্য! তুমি কি ব্রাহ্মিষ্ঠ বলে নিজের পরিচয় দিচ্ছ?
যাজ্ঞবল্ক্য জোড়হাতে সবাইকে প্রণাম জানিয়ে বললেনঃ
ব্রাহ্মিষ্ঠের চরণে শতকোটি প্রণাম।
জনকের পুরোহিত ছিলেন অশ্বল। রাজার পুরোহিত বলে অহঙ্কারও ছিল তার যথেষ্ট। তিনি ভেবেছিলেন, শেষ পর্যন্ত ঐ সমস্ত গাভি নিশ্চয় তারই গোশালায় ঠাঁই পাবে। কিন্তু যখন দেখলেন যে যাজ্ঞবল্ক্যের শিষ্য সামশ্রব গাভিগুলির বাঁধন খুলছেন, তখন আর তার সহ্য হল না। তিনি সবার আগে উঠে দাঁড়িয়ে যাজ্ঞবল্ক্যকে লক্ষ করে বললেনঃ
কি হে যাজ্ঞবল্ক্য, তুমিই কি আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মবিদ।
ব্রহ্মিষ্ঠের চরণে আমার শতকোটি প্রণাম। আমার ধেনুর প্রয়োজন ছিল মাত্র।
এই উত্তেজিত ব্রাহ্মণমন্ডলীর মধ্যে একমাত্র যাজ্ঞবল্কাই ধীর, শান্ত। জনকের মনে হল—গাভিগুলি হয়তো যোগ্য পাত্রেই পড়েছে।
অশ্বল কিন্তু যাজ্ঞবল্ক্যের উত্তরে খুশি হলেন না। তিনি সভার মধ্যে যাজ্ঞবল্ক্যকে অপদস্থ করবার ইচ্ছায় তাকে এমন কতগুলি প্রশ্ন করলেন, যা যাজ্ঞবল্ক্যের জানবার কথা নয়। অথচ কি আশ্চর্য, যাজ্ঞবল্ক্য অবলীলাক্রমে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিলেন।  নিজে অপদস্থ হয়ে অশ্বল বসে পড়লেন।
অশ্বলকে পরাজিত হতে দেখে ব্রাহ্মণরা যাজ্ঞবল্ক্যের উপর আরো চটে গেলেন। এবার উঠে দাঁড়ালেন ঋষি আর্তভাগ। আর্তভাগের প্রশ্ন শুনে যাজ্ঞবল্ক্য খুশি হয়ে বললেনঃ
‘এই সভার মধ্যে এই প্রশ্নের উত্তর তো তুমি বুঝতে পারবে না। এসো আমার সঙ্গে।’
এই বলে আর্তভাগকে নিরালায় নিয়ে ধীরে সুস্থে তার প্রশ্নের উত্তর বুঝিয়ে দিলেন। আর্তভাগ শান্ত হলেন—এবার উঠে দাঁড়ালেন ভুজু ঋষি। ভুজু ঋষি গন্ধৰ্বলোক থেকে এমন জ্ঞান আহরণ করেছিলেন, যা অন্য কারো জানবার কথা নয়। অনেক ভূমিকা ফেঁদে তারপর ভুজু ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যকে সেই অজ্ঞাত বিষয়ে প্রশ্ন করলেন। যাজ্ঞবল্ক্য কিন্তু স্পষ্টভাষায় তার যথাযথ উত্তর দিলেন।

তারপর পর পর উষস্ত ঋষি এবং কহোল ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যকে প্রশ্ন করলেও যাজ্ঞবল্ক্য ধীর শান্তভাবে উত্তর দিলেন।
এইবার ব্রাহ্মণ সভা থেকে উঠে দাঁড়ালেন এক নারী—গার্গী তার নাম। সেকালে পুরুষদের মতো নারীরা সমস্ত জ্ঞান এবং বিদ্যার অধিকারী ছিলেন। তাদের অনেকেই বেদের মন্ত্র পর্যন্ত রচনা করেছিলেন।


সভাস্থ সবাই আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে দেখলেন গার্গী প্রশ্ন করছেন যাজ্ঞবল্ক্যকে। গার্গী প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যাচ্ছেন, শান্তভাবে তার উত্তর দিয়ে যাচ্ছেন যাজ্ঞবল্ক্য। শেষ পর্যন্ত গার্গী এমন এক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে বসলেন, যা বেদের বিধান পার হয়ে যায়। যাজ্ঞবল্ক্য তখন তাকে সাবধান করে দিয়ে বললেনঃ
সাবধান গার্গী। আর প্রশ্ন করো না—তুমি বেদবিধি লঙ্ঘন করে যাচ্ছ, তোমার মুণ্ড খসে পড়বে।’ ভয়ে পেয়ে গার্গী আর প্রশ্ন না করে চুপ করে গেলেন।
এবার উঠে দাঁড়ালেন অরুণ ঋষির পুত্র উদ্দালক। তিনি অত্যন্ত কঠিন এক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে বললেনঃ
'যাজ্ঞবল্ক্য, যদি তুমি এ প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারো, তাহলে ব্রাহ্মিষ্ঠের গোধন অপহরণের অপরাধে তোমারই মুণ্ড খসে পড়বে।’
কিন্তু যাজ্ঞবল্ক্যের মুণ্ডপাত হল না। উদালক যে বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, সে বিষয়ও যাজ্ঞবল্ক্যের অজ্ঞাত ছিল না। সভাসথ সবাই সবিস্ময়ে শুনলেন, যাজ্ঞবল্ক্য ধীর স্থির এবং বিস্তারিতভাবে উদ্দালককে তাঁর প্রশ্নের বিষয় সুন্দর করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন।
উদালক চুপ করে গেলেন । অন্য কেউ উঠেও আর প্রশ্ন করতে সাহস পেলেন না। কিন্তু গার্গী উস্‌খুস্‌ করছেন। যাজ্ঞবল্ক্যের ভয়ে তখন তিনি চুপ করে গেলেও একেবারে দমে যাননি। তিনি মনে মনে অন্য প্রশ্ন চিন্তা করছিলেন। উদ্দালককে পরাজিত হতে দেখে তিনি আবার উঠে দাঁড়িয়ে বললেনঃ
‘আমি যাজ্ঞবল্ক্যকে আর দুটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করব। যদি যাজ্ঞবল্ক্য দুটি প্রশ্নেরই সদুত্তর দিতে পারেন, তবে বুঝতে হবে, এ সভায় এমন কেহ নেই, যিনি যাজ্ঞবল্ক্যকে পরাজিত করতে পারেন।”
সমবেত ব্রাহ্মণগণ কেহ মাথা তুলতে পারছিলেন না—তাদের প্রশ্নের ভাণ্ডারও বুঝি ফুরিয়ে আসছিল। এ অবসথায় গার্গীকে আবার উঠতে দেখে তারা উৎসাহিত হয়ে বললেনঃ
বেশ গার্গী, তুমিই প্রশ্ন জিজ্ঞেস কর।’ গার্গী প্রথম প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন। বেশ সহজেই যাজ্ঞবল্ক্য তার প্রশ্নের উত্তর দিলেন। এবার গার্গী কিছুটা নম্র হয়ে যাজ্ঞবল্ক্যকে তার নমস্কার জানালেন–কিন্তু তবু দ্বিতীয় প্রশ্ন জিজ্ঞেস না করে ছাড়লেন না। যাজ্ঞবল্ক্য গার্গীর দ্বিতীয় প্রশ্নেরও উত্তর দিলেন, অধিকন্তু তাকে অতিরিক্ত কতকগুলি উপদেশও দান করলেন। যাজ্ঞবল্ক্য থামলেন, গার্গীও শান্ত হলেন। তারপর যাজ্ঞবল্ক্যের চরণে শতকোটি প্রণাম নিবেদন করে সভাসথ সমস্ত ব্রাহ্মণদের লক্ষ করে বললেনঃ
পূজনীয় ব্রাহ্মণগণ! এই সভায় যাজ্ঞবল্ক্যই ব্রহ্মিষ্ঠ। আপনারা আর কেহই তাকে পরাজিত করতে পারবেন না। এখন একে নমস্কার করেই আপনারা মুক্তিলাভ করুন।’
প্রমাণিত হল এই সভায় যাজ্ঞবল্ক্যই ব্রাহ্মিষ্ঠ এবং তার পরবর্তী স্থানই গার্গীর প্রাপ্য। কিন্তু এই সহজ প্রমাণকে মেনে নিতে ব্রাহ্মণরা বুঝি রাজি হলেন না। তাই আবার উঠে দাঁড়ালেন আর এক ব্রায়ণ–শকল ঋষির পুত্র বিদগ্ধ।
বিদগ্ধ সমানে যাজ্ঞবল্ক্যকে প্রশ্ন করে যেতে লাগলেন, যাজ্ঞবল্ক্য সবগুলিরই উত্তর দিলেন। কিন্তু বিদগ্ধের বাচালতা দেখে মুনি যাজ্ঞবল্ক্য কিছুটা রুষ্ট হয়েছিলেন। যখন বিদগ্ধের প্রশ্ন শেষ হল, তিনি চুপ করে গেলেন, তখন যাজ্ঞবল্ক্য এক প্রশ্ন করে বসলেন তাকে এবং সঙ্গে সঙ্গে বলে বসলেনঃ
যদি তুমি এ প্রশ্নের উত্তর দিতে না পার, তবে এখনি তোমার মুণ্ড খসে পড়বে।’ বিগন্ধ যাজ্ঞবল্ক্যের প্রশ্নের উত্তর জানতেন না—তিনি চুপ করে রইলেন, যাজ্ঞবল্ক্যের শাপে তার মুণ্ড খসে পড়ল।
এবার যাজ্ঞবল্ক্য সভাসথ ব্রাহ্মণদের লক্ষ করে বললেনঃ আপনারা যে কেউ অথবা সবাই আমাকে প্রশ্ন করুন। অথবা আমিই আপনাদের সবাইকে প্রশ্ন করব।’ বিদগ্ধের অবস্থা দেখে আর কেউ যাজ্ঞবল্ক্যকে প্রশ্ন করতে সাহস পেলেন না। তারা নীরবেই যাজ্ঞবল্ক্যের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিয়েছিলেন। সবাইকে চুপ করে থাকতে দেখে যাজ্ঞবল্ক্য সবাইকে লক্ষ করে এক প্রশ্ন করলেন।
ব্রাহ্মণ-সভা নীরব—কেউ যাজ্ঞবল্ক্যের প্রশ্নের উত্তর দিতে দাঁড়ালেন না। কাজেই নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হল যে যাজ্ঞবল্ক্যই সমবেত বেদবিদ আর ব্রহ্মবিদদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। জনক রাজাও প্রকৃত ব্রাহ্মিষ্ঠের সন্ধান পেয়ে আনন্দিত হলেন।
যাজ্ঞবল্ক্যের শিষ্য সামশ্রব আনন্দধ্বনি করতে করতে স্বর্ণশগমণ্ডিত সহস্র গাভিকে তাড়িয়ে নিয়ে চললেন গুরু আশ্রমে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য