বুদ্ধির জয়-- শ্রী ক্ষিতীশচন্দ্র কুশারী

এক চাষীর এক কুকুর ছিল। কুকুরটা বুড়ো হয়ে পড়েছে। তাই চাষী তাকে খেতে দেয় না। আবার, বাড়ী থেকে দূরদূর করে তাড়িয়ে দেয়। মনে দুঃখে কুকুর এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। খেতে পায় না। ক্রমে সে শুকিয়ে একবারে কাঠ হয়ে গেল।
একদিন রাত্রিবেলা কুকুরটা চাষীর বাড়ীর ভিতর ঢুকে একেবারে রান্নাঘরের কাছে দাঁড়াল। চাষী তখন খেতে বসেছে। চাষী-গিন্নী তাকে ভাত বেড়ে দিচ্ছে।
কুকুর শুনতে পেল, চাষী তার গিন্নীকে বলছে, এ কুকুরটা বুড়ো হয়ে গিয়েছে। একে এবার একেবারে তাড়িয়েই দেব। আর একটা কুকুর পুষব।

চাষী-গিন্নী জবাব দিল, কুকুরটা বুড়ো হয়েছে। তাই তেমন আর পাহারা দিতে পারে না। তাই বলে তাড়িয়ে দেবে? একদিন ত এ পাহারা দিয়েছে, ছোট ছোট ছেলেকে আগলে রেখেছে। তুমি কুকুরটাকে ডেকে খেতে দাও।

চাষী রেগে বলল, না। আর একটা নতুন কুকুর পুষবই। দু’একদিনের মধ্যেই নিয়ে আসব।

চাষী-গিন্নী আর কিছু বলল না। চুপ করে গেল। কুকুরটা ধীরে ধীরে পাশের বনের ভিতর ঢুকে গেল।

এখন, সেই বনে ছিল একটা শেয়াল। কুকুর জানে, শেয়ালের খুব বুদ্ধি। সে শেয়ালকে সব কথা খুলে বলল।

কুকুরের কথা শুনে শেয়াল অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, তুমি কিছু ভেবো না, একটা উপায় বার করবই। চল এখন ত কিছু খেয়ে আসি।

কুকুরের তাতে আপত্তি নেই। শেয়ালের সঙ্গে সঙ্গে সে বনের ভিতর এগোতে লাগল, শেষ পর্যন্ত দাঁড়াল চাষীর বাড়ীর কাছে। 
কুকুরকে ডেকে শেয়াল বলল, আজ তোমারও কিছু খাওয়া হয়নি, আমারও না। চল আজ চাষীর রান্নাঘরে ঢুকে খেয়ে নিই। তুমি ত বাড়ীর সব জান। পথ দেখিয়ে এগিয়ে চল।

শেয়ালের কথায় কিন্তু কুকুর রাজী হল না। চাষী হয়ত তাকে আজ তাড়িয়ে দিয়েছে। তাই বলে এতদিনের মনিবের সে অপকার করবে? কুকুর বলল, আমি ভাই, তা পারব না। বরং অন্য বাড়ী চল, আমি সব বাড়ীরই পথঘাট চিনি।

শেয়ালের এখন খাবার পেলেই হল। এবাড়ী ওবাড়ী বলে কোন কথা নেই। চুরি করেই যখন খেতে হবে, তখন যেখানে সুযোগ সুবিধা আছে, সেখানে যাওয়াই ভাল। আবার দু’জনে পথে বের হল।

সামনেই একটা বাড়ী। কুকুর ও শেয়াল সে বাড়ীর ভিতর ঢুকে গেল। চুপে চুপে তারা এসে দাঁড়াল রান্নাঘরের কাছে। কুকুর দেখল রান্নাঘরের দোরে শিকল দেওয়া। কুকুর হতাশ হয়ে শেয়ালের মুখের দিকে চাইল, রান্নাঘর শিকল দেওয়া। তারা ঢুকবে কেমন করে?

শেয়াল বুঝল কুকুরের মনের কথা। সে ভাবল, তুমি ভেবো না ভাই। সব ঠিক হবে। আমি যা বলি, শোন।

শেয়ালের কথামত কুকুর এসে দাঁড়াল রান্নাঘরের দেওয়ার উপর। শেয়াল চড়ে বসল কুকুরের পিঠে। কুকুরের পিঠে দু’পায়ে ভর দিয়ে শেয়াল সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর আর দু’পায়ের এক পা রাখল দোরের ওপর আর এক পা নিয়ে গেল শিকলটার কাছাকাছি। তারপরই খুট করে আওয়াজ। শিকল খুলে গিয়েছে।

তারপর আর কি। দোর খুরে মহানন্দে তারা ভোজে লেগে গেল। পেট ভরে খেয়ে দু’জনেই বেরিয়ে এল।

শেয়ালের বুদ্ধি দেখে কুকুর ত অবাক!
এ ঘটনার দু’দিন পরের কথা।
কুকুর এসে শেয়ালকে ধরে বসল, যা হয় কর, ভাই। আমার মনিব কাল আমাকে একেবারে তাড়িয়ে দেবে। নতুন কুকুর আসছে।

শেয়াল বলল, আমি ত দেখি, প্রত্যেক দিন চাষী আর চাষী-গিন্নী ছোট ছেলেটিকে নিয়ে মাঠে যায়। মাঠের কাছে তাকে শুইয়ে রেখে তারা মাঠে কাজ করে। কাল আমরা দু’জনেই এক সঙ্গে মাঠের কাছাকাছি একটা ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকব। ছেলেটিকে শুইয়ে রেখে যেই চাষী ও চাষী-গিন্নী মাঠের কাজ শুরু করবে,আমি অমনি ছেলেটিকে ধরতে যাব। আর তুমি বেড়িয়ে এসে আমাকে তাড়া করবে। আমি পালিয়ে যাব।

বোকা কুকুর জিজ্ঞেস করল, তাতে কি হবে।
শেয়াল বলল, দেখই না কি হয়।
সেদিন চাষী ও চাষী-গিন্নী মাঠে গিয়েছে। সঙ্গে তাদের কোলের ছেলেটি। ছেলেটিকে গাছের নিচে শুইয়ে রেখে তারা মাঠে কাজ করতে নেমেছে। ছেলেটি ঘুমিয়ে আছে। তারা সবেমাত্র কাজ শুরু করেছে, এমন সময় শেযালটি এসে ঘুমন্ত ছেলেটির কাছে দাঁড়াল। মা মাঠে কাজ করছে কিন্তু মায়ের মন ছেলের কাছে পড়ে আছে। ছেলের কাছে শেয়াল দেখতে পেয়েই সে চীৎকার করে উঠল।

সঙ্গে সঙ্গে কুকুর ছুটে গেল। কুকুরকে দেখে শেয়াল যেন কতই ভয় পেয়েছে, এমন ভাব দেখিয়ে সে বনের মধ্যে পালিয়ে গেল।

চাষী-গিন্নী তাড়াতাড়ি এসে ছেলেকে কোলে তুলে নিল। চাষীও সঙ্গে সঙ্গে এসে গেল।

কুকুর তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। চাষী-গিন্নী এবার চাষীকে বলল, তুমি ত কুকুরটা তাড়িয়ে দিচ্ছিলে। আর সেই ত আজ আমাদের ছেলেকে বাঁচাল। আমি কখনও কুকুরটাকে ছাড়ব না।

নিজের ব্যবহারে চাষীর মনে বড় দুঃখ হল। এই কুকুর এককালে তার কত উপকার করেছে। আজও শেয়ালের মুখ থেকে ছেলেকে বাঁচিয়েছে, একে কিনা সে তাড়িয়ে দিচ্ছিল!

চাষী কুকুরের কাছে এসে পিঠ চাপড়ে দিল।
কুকুরটাও আনন্দে চাষরি পায়ের নিচে গড়িয়ে পড়ল।
সেদিন থেকে কুকুরের আদর বেড়ে গেল। চাষী-গিন্নী তার খুব যত্ন করে, খুব খেতে দেয়। চাষীও কুকুরকে আর ছাড়ে না। সব সময় সঙ্গে নিয়ে যায়। যথন সে খেতে বসে তখন কুকুরও একটু দূরে বসে যায়। চাষরি পাতের ভাল ভাল খাবার, মাংস, ভাত দই এর ভাগ কুকুরও পায়।

দিনে দিনে কুকুরের চেহারা ফিরে গেল। বেশ মোটাসোটা হয়ে উঠল। গায়ে শক্তি হল। আবার আগের মত বাড়ী পাহারা দিতে লাগল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য