আবু কাশেমের চটি-- শ্রী ক্ষিতীশচন্দ্র কুশারী

বাগদাদ শহরে আবু কাশেম একজন বড় দোকানদার। তার অনেক টাকা। কিন্তু টাকা থাকলে কি হবে?  সে এক পয়সাও কাউকে দেয় না। দারে ভিখিরী এল, দোরগোড়া থেকেই কাশেম তাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। বিপদে পড়ে হয়ত কেউ কিছু চাইল। কোন কথা না বলে এক মস্ত বড় লাঠি নিয়ে তেড়ে আসে। লাঠির ভয়েই সে পালিয়ে যায়।

তারপর, কাশেম আবার কৃপণের কৃপণ। নিজের জন্য সহজে কিছু ব্যয় করে না। এক বেলার খাবার দুবেলা খায়। বছরে একবার মাত্র স্নান করে। কারণ, বাগদাদ শহরে বাড়ীতে স্নানের কোন ব্যবস্থা নেই। বাইরে হামামে অর্থাৎ সরকারী পুকুরে স্নান করতে হয়। সরকারী পুকুরে স্নান করতে গেলে পয়সা লাগে। স্নানের জন্য পয়সা ব্যায়! সর্বনাশ! তা হলে ত তার জমানো টাকাকড়ি দু’দিনেই উড়ে যাবে।
পোশাকের বেলায়ও তাই। একটা আলখেল্লা আর পাজামা যে ক’বছর সে পরে আছে, তার ঠিক নেই। আল-খাল্লাটার রং একেবারে জ্বলে গিয়েছে। স্থানে স্থানে নানা রং এর তালি-- লাল নীল, হলদে, সবুজ, সাদা। আর পাজামাটা একদম ময়লা আর ছেঁড়ে। তাতেও তালির অন্ত নেই। নানা রঙের তালি।

সব চাইতে চমৎকার তার একজোড়া চটিজুতো। চটি জোড়া কবে যে কেনা হয়েছিল, তার কোন হিসেব নেই। তবে এতদিনের চটি শুধু নামেই আছে। চটি-জোড়া তালির মধ্যে একেবারে হারিয়ে গেছে। উপরে তালি, নীচে তালি, চটির তলায় চামড়ার ওপর চামড়া লাগানো হয়েছে, গোড়ালিতেও তাই। ফলে চটি জোড়ার ওজন হয়েছে পাঁচ সের। শহরের সব লোক এই চটি চেনে। বিশ্রী বেঢপ কোন পুরনো জিনিসের কথা কারো মনে এলেই সবারই চোখে প্রথমেই ভেসে ওঠে এই চটিজোড়া। আবু কাশেমের চটি তাই শহরে সর্বত্র বিখ্যাত।

কিন্তু আবুর তাতে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। কারো কোন কথায সে কান দেয় না। কারো ঠাট্টাবিদ্রুপ সে গায়ে মাখে না। তাই তার পোশাক-আশাকের কোন পরিবর্তন নেই। আবার পয়সা্ খরচ করে নতুন জুতো কেনবার কথা তার মনেও হয় না। তার একমাত্র চিন্তা, কি করে টাকা রোজগার করা যায়। আর সে টাকা ব্যয় না করে কেবলই জমানো যায়।

একদিন আবুর কাছে এল এক আতরওয়ালা সঙ্গে তার আতরভরা অনেকগুলি বোতল। কয়েকদিন শহরে ঘুরে ঘুরে সে মোটেই আতর বিক্রি করতে পারেনি। তার যা টাকা ছিল, সব ফুরিয়ে এসেছে। আর শহরে থাকা চলে না। এদিকে আবু খুব চতুর। ব্যবসা-বাণিজ্যে তার প্রখর বুদ্ধি। আতরওয়ালার অবস্থা বুঝে সে সব আতর খুব সস্তায় কিনে নিল। সে বুঝল, এতে তার মোটা টাকা লাভ হবে। আতরওয়ালা চলে যেতেই আবু একেবারে আনন্দে লাফিয়ে উঠল। এতবড় লাভের ব্যবসা অনেকদিন করেনি। মনটা খুশিতে ভরে গেল। বহুদিন সে ভাল কোন খাবার খায় নি। আজ আবার মনে হল, বেশ করে পেট ভরে খেতে হবে। কিন্তু তার আগে স্নান করাও হয় নি। না হয় কিচু খরচই হবে। আতর বেচে যা লাভ করা যাবে, তার কাছে এ খরচটা কিছুই না।

আবু চলল হামামের দিকে। গায়ে সেই পোশাক আর পায়ে সেই বিখ্যাত চটি। পথে এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা। বন্ধুটি আবুর দিকে চেয়ে বলল, কোথায যাচ্ছ, আবু?

বন্ধু আবুকে ভাল করেই চেনে। সে বলল, বেশ ত, স্নান করবার আগে আর একটা কাজ কর। নতুন জামাজুতো কিনে নাও। তোমার পোশাক দেখে যে শহরের লোক হাসে।
আবু গম্ভীর স্বরে বলল, সে দেখা যাবে। এই বলে সে হন হন করে চলে গেল।

সামনেই হামাম। জুতোজোড়া খুলে সে তাড়াতাড়ি স্নানের ঘরে ঢুকে গেল। স্নান শেষে বেরিয়ে এসেই সে অবাক হয়ে গেল। কোথায় তার জুতা? তার সেই বিখ্যাত জুতোর জায়গায় পড়ে আছে এক জোড়া মখমলের নতুন চকচকে চটি জুতো। জুতো জোড়া দেখে আবু মনে মনে হাসে। এটা নিশ্চয়ই সেই বন্ধুর কীর্তি। এখন ত পায়ে দি। তারপর দাম দেবার সময় দেখা যাবে। নতুন চটি জোড়া পায়ে দিয়ে আবু বাড়ী চলে গেল।

এদিকে ত মহাকান্ড! সেই নতুন চটিজোড়া ছিল শহরের কাজী সাহেবের। বাইরে জুতো রেখে ঢুকেছিলেন হামামে। স্নান সেরে বার হয়ে দেখেন জুতো নেই। জুতো গেল কোথায়? খোঁজ,খোঁজ ,খোঁজ। খুঁজতে খুঁজতে পাওয়া গেল ঘরেরকোণে আবুর জুতো জোড়া। সবাই একেবারে হচকচিয়ে গেল। আবুর এত সাহস! নিজের জুতো ছেড়ে রেখে কাজী সাহেবের জুতো চুরি করেছে? কাজী সাহেব রেগে বললেন, কৃপণ চোরটাকে এখুনি ধরে নিয়ে এস।

চারদিকে লোক ছুটল। একটা হৈ চৈ পড়ে গেল। আবু সবেমাত্র বাড়ী এসে তালা খুলেছে। তালা আর খুলতে হল না। কাজী সাহেবের লোকজন তাকে বেঁধে হাজতে নিযে গিয়ে আটকে রাখল। তার পরদিন বিচার। কাজী সাহেব বিচার করছেন। তিনি আবুর কোন কথা শুনলেন না। যে সে জুতা চুরি করেনি, একথা কাজী সাহেবের বিশ্বাস হল না। একটা মোটা টাকা জরিমানা দিয়ে আবু সেবারের মত রেহাই পেল।

আবু বাড়ী ফিরে এল। সে জুতো জোড়ার উপর ভয়ানক চটে গেল। এই জুতোর জন্যই তার এত দুর্দশা, এই আপমান, এই জরিমানা! এই চটির জন্য আর কি বিপদ হবে কে জানে?

এ পাপ বিদেয় করাই ভাল। এই ভেবে সে জানালা গলিয়ে জুতোজোড়া ছুঁড়ে ফেলে দিল তাইগ্রিস নদীর জলে। তার বাড়ীর নীচেই এই নদী।

কিন্তু ছুঁড়ে ফেলে দিলে কি হবে? জুতো আবুকে ছাড়ে না। দিন-তিনেকের মধ্যে আরও এক কান্ড ঘটে গেল। একদল জেলে গেছে নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরতে। জাল ফেলে খানিকক্ষণ পরে তাতে টান দিতেই মনে হল অনেক মাছ পড়েছে, জাল বেশ ভারী ভারী ঠেকছে। তাড়াতাড়ি টানতে গিয়ে জালের খানিকটা ছিঁড়েও গেল। তবুও মনের আনন্দে তারা জাল টানছে, জাল ডাঙায় তুলে তাদের চক্ষু স্থির! মাছ কই? এ ত সেই আবুর চটি। তারা রেগে গিয়ে সেই চটি জোড়া আবুর জানালার দিকে ছুঁড়ে মারল। জানালার ভিতর দিযে এসে সে জুতো পড়বি ত পড় একেবারে আতরের শিশিগুলির উপর। ফলে বোতলগুলি ভেঙ্গে গেল, আর সব আতর মেঝেয় গড়িয়ে বন্যার মত বয়ে গেল। আবু মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।

এই জুতো নিয়ে এখন সে কি করে। কি করে এই জুতো বিদেয় করে। অনেক ভেবে সে ঠিক করল, জুতো জোড়া এবার একেবারে বাগানের ভিতর মাটিতে পুঁতে রাখবে, আর দেরি করা নয়। কখন কি বিপদ ঘটবে, বলা যায় না। আবু তাড়াতাড়ি একটা বড় গর্ত করে, তার মধ্যে চটি জোড়া পুঁতে রাখল।

কৃপণ আবুকে প্রতিবেশীরা কেউ দেখতে পারত না। সন্ধ্যে বেলা অন্ধকারে বাগানের ভেতরে গর্ত খুঁড়ছে এই না দেখে প্রতিবেশীদের মধ্যে একজন ফৌজদারকে খবর দিল। খবর পেয়ে ফৌজদার বুঝল, নিশ্চয়ই আবু বাগানে অনেক ধনরত্ন লুকিয়ে রেখেছে। ফৌজদার তাকে তখুনি ধরে নিয়ে এসে লুকানো ধনত্নের বখরা চেয়ে বসল। আবু পড়ল মহা বিপদে। ফৌজদারকে সে খুব চেনে। সে তাকে সহজে ছাড়বে না। পাকা না পায় ত বেত দিয়ে মারবে। বেতের কথা মনে পড়তেই আবু একেবারে শিউরে উঠল। সে তাকে অনেক টাকা ঘুষ দিয়ে ঘরে ফিরে এল।

কিন্তু চটি জোড়া আর কিছুতেই বাড়ি তো রাখা যায় না। আজ রাতেই এ্র শেষে করতে হবে। এখন একমাত্র উপায় একে পুড়িয়ে ফেলা। যেই কথা সেই কাজ। অনেক কাঠ জড়ো করে সে আগুন  জ্বালাল। কিন্তু ভিজে চামড়া আগুলে পুড়বে কেন? এখন উপায় একে এখন তাড়াতাড়ি কেমন করে শুকানো যায়? আজ রাতে ত শুকাবে না। কাল দিনের বেলা রোদ্দুরে শুকিয়ে নিতে হবে। এই মনে করে সে চটি জোড়া ছাদের কোর্ণিশের ওপর রেখে এল।

দু’মিনিটও হয় নি। এরই মধ্যে রাস্তায় হৈ চৈ, চেঁচামেচি শুরু হয়ে গিয়েছে। আবু  চটি জোড়া রেখে আসবার পরই পাশের বাড়ীর দুটো বেড়াল খেলতে খেলতে জুতোর কাছে এসে পড়েছে। ভিজে চামড়ার গন্ধ পেয়ে বেড়াল দুটো মনে করেছে হয়ত খাওয়ার জিনিস। এই ভেবে যেমনি সেই চটি জোড়ায় মুখ দিয়েছে অমনি সেটা জুতো জোড়া কার্ণিশ থেকে একেবারে নীচে পড়ে গেল। তখন সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল এক বুড়ি। চটিজোড়া পড়ল তারই মাথায়। বুড়ি তো চিৎকার করে একেবারে অজ্ঞান। চিৎকার শুনে পাশের বাড়ীর লোকজন সব ছুটে এল; ছুটে এল সব রাস্তার লোক। সবার মুখেই এক কথা-- বুড়অকে খুন করল কে? কোথায় সে খুনে?

কে খুনী, তা বার করতে অবশ্য বেশি দেরি হল না, বুড়ির মাথার কাছেই পড়ে আছে আবুর বিখ্যাত চটি। আর এটা ত আবুরই বাড়ী। সুতরাং আবুই সযে বুড়ীকে খুন করেছে, এতে কারো কোন সন্দেহ রইল না। এবার সবাই মিলে এল আবুর বাড়ীর দুয়ারে। দুয়ার খুলে দেবার জন্য চলল ধাক্কার পর ধাক্কা। এই খুনের জন্য তারা নিজেরাই আবুকে শাস্তি দেবে। সবাই একেবারে ক্ষেপে গিয়েছে।

আবু ত ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে। এবার বুঝি জীবনটাই যায়। আবু তাড়াতাড়ি খিড়কির দোর খুলে একেবারে কাজী সাহেবের পায়ের উপর কেঁদে পড়ে বলল, হুজুর , আমাকে বাঁচান। এই সর্বনেশে চটিজোড়া থেকে আমায় রক্ষা করুন। বিপদের পর বিপদ  ঘটছে এই চটি জোড়ার জন্য। আবার আপনি শহরময় ঘোষণা করে দিন যে , এই চটি জোড়া যে অপরাধ করবে, তার জন্য আমি দায়ী থাকব না। আপনি যদি এ অনুগ্রহ না করেন, হুজুর, তা হলে আমার আর বাঁচার উপায় নেই। আমার জীবণমরণ এখন আপনার হাতে।

আবুর করুণ আবেদন শুনে কাজী সাহেব হাসলেন। কৃপণ আবুর জন্য তাঁর একটু দুঃখও যে হল না, তা নয়। তাই আবুর কথা তিনি শহরময় ঘোষণা করে দিলেন।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য