মহাবিপদে ভুতুই

(১)

এমন বিপদে কোনোদিনও পড়েনি বাবুই পাখি। শুধু বাবুই না, সব পশুপাখির ভেতরেই একধরনের চাপা আতঙ্ক। বেশ ক’দিন ধরে সূর্যিমামা থেকে যেন গনগনে আগুন ঝরাচ্ছে! সারা চরাচর কেমন তেতে উঠছে। প্রতিদিন সেটা একটু একটু করে বেড়েই চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে সব শুকিয়ে শ্মশানের মতো পোড়াভূমি হয়ে যাবে। কেউ বাঁচবে না। তা হলে কী উপায়? উপায় অবশ্য একটা খুঁজে পেয়েছে বাবুই পাখি। উপায়ের নাম—ভুতুই। তাদের প্রেত মহারাজ।

ক’দিন ধরে তাই বাবুই একমনে ভুতুইকে ডেকে যাচ্ছে। বাপ-দাদাদের কাছে শুনেছে একমাত্র ভুতুই-ই পারে এমন বিপদ থেকে উদ্ধার করতে। ভুতুই নাকি সবই পারে। তাই, সব কিছু ভুলে দু’দিন ধরে সে এক নাগাড়ে ডেকেই যাচ্ছে ভুতুইকে। কিন্তু এত ডেকেও ভুতুইয়ের আর দেখা মেলে না। একসময় বাবুই বিরক্ত হয়ে ভাবে, ভুতুই বলে বোধ হয় নেই কিছু। থাকলে এতদিনে ঠিকই দেখা দিত।

কুমার নদের পাড়ে একটি গভীর বনের ভেতরে বুড়ো মতো তালগাছের মাথায় বাস করে বাবুই। সেখানে এখন কলসীর মতো উল্টো করা বাসার ভেতর বসে-বসে ঝিমোচ্ছে বাবুইয়ের অসুস্থ বৌ আর তিনটে ছানাপোনা। বৈশাখ পার হয়ে জ্যৈষ্ঠ এলো, দেখতে দেখতে আষাঢ় আসার সময় হয়ে গেল, অথচ কাঠফাটা রোদ আর কাঁঠাল-পাকা গরম যেন পাল্লা দিয়ে বাড়তেই থাকলো। বাইরে বের হলেই শরীরের পালকে যেন আগুনের ছ্যাকা লাগে। আকাশে এক ফোঁটা মেঘ নেই, বৃষ্টির কথা তো ভাবাই যায় না।

দুপুর বেলা এই যখন অবস্থা, তখন বাবুই এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পায়। বনের পুব-পশ্চিমে একটি লম্বা রাস্তা দিগন্তে মিলে গেছে। যতদূর দৃষ্টি যায় রাস্তার দুপাশে ডোবার মতো গর্ত। তার তলায় কোথাও একটুখানি ঘোলাজল, কোথাও শুকনো খটখটে। সেসব ডোবার ভেতর থেকে সারি সারি ব্যাঙ হঠাৎ রাস্তায় উঠছে পড়িমড়ি করে। অথচ সেই মহাসড়ক দাপিয়ে হুশ-হাশ করে ছুটে চলছে বড় বড় বাস-ট্রাক। আর সেসব চলন্ত যানবাহনের দুপাশে হুটোপুটি করছে হাজার হাজার ব্যাঙ।

রহস্যটা বুঝতে বাইরের প্রচণ্ড রোদ্দুরকে উপেক্ষা করে বাবুই ঘর ছাড়ে। উড়ে এসে কাছাকাছি একটি গাছের ডালে বসে। ঠুস-ঠাস শব্দে তার কানে তালে লেগে যায়। দেখে, ব্যাঙগুলো আত্মহত্যার মতোই যেন চাপা পড়ছে দুরন্ত বাসের তলে, ট্রাকের তলে। তাদের দেহ ফেটে যাচ্ছে দুড়দাড়। একি কাণ্ড! বাবুই ভয় পেয়ে যায়।

পাশের ডোবার দিকে বাবুই তাকিয়ে দেখে, ছোট্ট একটি ব্যাঙ একা-একা একটি গর্ত থেকে কিছুতেই লাফ দিয়ে ওপরে উঠতে পারছে না। আহা বেচারা। ওরও মরার শখ? উড়ে গিয়ে তার পাশে বসে বলে, ‘কী হয়েছে ব্যাঙ ভায়া? এমন পড়িমড়ি করে লাফ দিচ্ছ? গর্তে কি সাপ ঢুকেছে?’

ছোট্ট ব্যাঙ কটমট করে তাকিয়ে বলল, ‘ব্যাঙাই দাদা বলেছে তাড়াতাড়ি পালাও। ডাঙায় যাও।’
‘ব্যাঙাই দাদা?’
‘হ্যাঁ। ব্যাঙাই দাদা। চেনো না?’
‘নাহ্!’
ছোট্ট ব্যাঙ অতি বিস্ময়ে বলে, ‘তুমি ব্যাঙাই দাদাকে চেনো না?’
‘না চিনি না। কি হয়েছে তাতে? তুমি ভুতুই দাদুকে চেনো?’
ছোট্ট ব্যাঙ বলে, ‘নাহ্!’
‘তবে? তুমি ভুতুই দাদুকে চোনো না, আমিও বাঙাইকে চিনি না।’ 
ব্যাঙ বলল, ‘ব্যাঙাই দাদাকে সবাই চেনে।’

বাবুই বুঝলো, এ বড্ড বেয়াড়া ব্যাঙ। গোঁয়ারের একশেষ। তাই এ নিয়ে আর কথা না বাড়িয়ে বলল, ‘তোমাদের ব্যাঙাই এমন কথা কেন বলেছে?’
ছোট্ট ব্যাঙ লাফাতে লাফাতে হাঁপিয়ে গেছে। একটু বিশ্রাম নিয়ে বলল, ‘তুমি এমন ভেঙিয়ে কথা বললে আমি কোনো জবাব দেব না।’
‘কেন, আমি ভেঙালাম কী করে?’
‘ব্যাঙাই দাদাকে শুধু ব্যাঙাই বলছো কেন?’
‘সে তোমাদের ‘দাদা’ হতে পারে, কিন্তু আমার তো কেউ হয় না। ‘দাদা’ বলতে আমার বয়েই গেছে।’
ছোট্ট ব্যাঙ খুব রেগে গেল। বলল, ‘তোমার এত বড় সাহস! যাও তোমার সঙ্গে কথা নেই।’ 
‘ও। আমি ভাবলাম তোমাকে গর্ত থেকে একটু ওপরে উঠতে সাহায্য করবো। ঠিক আছে, যাই।’ 
‘যাও যাও। আর ত্রিশ চল্লিশবার চেষ্টা করলেই ওপরে উঠে যাবো। না হয় একশ বারই লাগবে। কিন্তু কারো সাহায্য আমার চাই না। আমাদের ব্যাঙাই দাদা আছে।’
‘বাব্বা। তোমার বড্ড অহংকার। তোমার ব্যাঙাই এতকিছু পারে, অথচ তোমাকে একটুখানি ওপরে তুলে দিতে পারে না?’
‘খবরদার ব্যাঙাই দাদাকে নিয়ে আর একটাও বাজে কথা বলবে না। ব্যাঙাই দাদা আমাদের দেবতা। তোমার ভুতুই-কে নিয়ে তো আমি খারাপ কিছু বলিনি।’
‘ভুতুই দাদু-কে তো তুমি চেনোই না।’ এ কথা বলে বাবুই নিজের মনে ভাবলো, আমিও তো ভুতুই দাদু-কে চিনি না, শুধু মুখেই শুনেছি যে হ্যান করতে পারে ত্যান করতে পারে।
‘বলো শুনি তোমার ভুতুই কি মুতুই করে?’
বাবুই চোখ লাল করে বলল, ‘সাবধান করে দিচ্ছি। ভুতুই দাদু হলো আমাদের মৃত-মহারাজ। পঞ্চাশ পুরুষ আগে তিনি আফ্রিকায় থাকতেন। মারা যাওয়ার পর তিনি ভুতুই হন। তার অসীম ক্ষমতা, বিপদে তাঁকে ডাকলেই তিনি এসে আমাদের উদ্ধার করেন। ভুতুই দাদুকে নিয়ে ইয়ার্কি করলে তোমার থুতুই... থুক্কু... থুতনা ভেঙে দেব বলে দিলাম। ’
‘এহ্। থুতনা ভেঙে দেবে। আমি এমন থুতু ছেটাবো যে চোখে ঘা হয়ে যাবে।’

বাবুই দেখলো, বেশি ঝামেলা হয়ে যাচ্ছে। বলল, ‘ঠিক আছে ভাই, সামনে সবার বিপদ, এসো মিলমিশ করে চলি।’ তারপরই ভাবলো, এদের বিপদটা আসলে কী?
বাবুই বেশ চিন্তিত মুখ করে বলল, ‘আচ্ছা, বিপদটা কীসের?’
ব্যাঙ আবার লাফাতে শুরু করেছে। লাফানোর ফাঁকে বলল, ‘ব্যাঙাই দাদা বলেছে, মাটির তলে দুই রাজ্যের ভেতরে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। সেই যুদ্ধ শুরু হলে পৃথিবীর খুব জ্বর হয়। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। আজ বিকেলে সূর্য ডোবার কিছুক্ষণ পর সেই কাঁপুনি শুরু হবে। তখন সবাইকে ডোবা থেকে পালাতে হবে, নইলে মাটিচাপা পড়ে মরতে হবে।’
‘তার মানে ভূমিকম্প হবে?’
ব্যাঙ একমনে লাফাতে লাফাতে ছোট্ট করে ‘হু’ বলল।

বাবুই খুব দুশ্চিন্তায় পড়ল। সে অবশ্য কোনোদিন ভূমিকম্পের মুখে পড়েনি। কিন্তু অন্যসব দূরদেশের বন্ধু বাবুইদের কাছে শুনেছে, ব্যাপারটা অনেক সময় নাকি খুবই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। মুশকিলের কথা হলো, তাদের তালগাছটা বেশ বুড়ো হয়ে গেছে। ভেতরটা ফাঁপা। অনেকদিনই ভেবেছে নতুন এটা বাসা বানাবে। ক’দিন সে আশেপাশে ভালো কিছু তাল, নারকেল আর খেজুর গাছ খুঁজেছে। পেয়েছেও বেশ ভালো কয়েকটি, কিন্তু এতদিনের তালগাছটির প্রতি তার ভারি ভালোবাসা জন্মে গেছে। এই বনের ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট্ট কুমার নদ। পদ্মা নদীর একটি শাখা এটি। বিকেল বেলা রোদ্দুর থিতিয়ে এলে সে তালগাছটার মগডালে আরাম করে বসে। ভরাবর্ষায় এই কুমার নদের দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে ফুরফুরে বাতাস বয়। সেই বাতাসে তার শরীরের পালকগুলো ফুলে ফেঁপে ওঠে। দূরে সেসময় ছবির মতো ফুটে ওঠে পালতোলা নৌকা কিংবা দিগন্তে মেঘের নানা রঙের নিসর্গ। এমন নিসর্গসুধায় ভাগ বসাতে তার পাশে বৌ এসে বসে। হরেক খুঁনসুটিতে দু’জনের কত বিকেল পার করেছে ভারি আনন্দে! সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে এলে তারা তাদের খড়বিচুলির শান্তির নীড়ে ঢুকে পড়ে।

কিন্তু ভূমিকম্প আসছে যে! ফাঁপা তালগাছটা ভেঙে পড়বে না তো? তার এক চড়ুই বন্ধু পাশের গ্রামের এক বড়লোকের দোতলা বাড়িতে থাকে। পুরনো বাড়ি। চড়ুইকেও একটু সাবধান করে আসতে হয়।

এখান থেকে বাবুই উড়ে যাওয়ার একটু আগে দেখতে পেলো, ছোট্ট ব্যাঙটি অবশেষে ওপরে উঠতে পেরেছে। তবে এ জন্য তাকে কমপক্ষে শ’ খানেক বার লাফ দিতে হয়েছে।

এদিকে ভুতুই হন্যে হয়ে খুঁজছে বাবুই পাখিকে। সুন্দরবন ছাড়িয়ে আরো উত্তর দিকে উড়তে উড়তে সে পদ্মার পাড়ে একটি তালগাছের মাথায় বসে একটুখানি বিশ্রাম নেয়। মাঝ দুপুরে পদ্মাপাড়ে এমন অগ্নিগোলকের মতো রোদ ঝরছে যে মনে হচ্ছে সূর্যিমামা দিনদিন কেমন বেলুনের মতো ফুলে ফেঁপে বড় হয়ে উঠছে! চারদিকে বেশিক্ষণ তাকানোর পর ভুতুইয়ের মাথা কেমন ঝিম-ঝিম করতে থাকে। মনে মনে ভাবে, এত সুন্দর দেশ কত তাড়াতাড়ি নরক হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির এমন বিদঘুটে লক্ষ্মণ তার একটুও ভালো ঠেকলো না।


(২)

ঘরে আর মাত্র তিন-চার দিনের খাবার আছে। শস্যদানা, ছোটো পোকা, ঘাস আর ছোটো উদ্ভিদের পাতা। কিন্তু বাবুইয়ের ছানার চাই ফুলের মধু আর রেণু। কবে একদিন তারা খেয়েছিল একটুখানি, তারপর থেকে ওগুলোই মুখে লেগে আছে। সুযোগ পেলে বায়না ধরে, আর না পেলে গো ধরে বসে থাকে।

কিন্তু এখন মধু আর রেণু আনা কি চাট্টিখানি কথা? বাইরে পোড়া রোদ্দুরের সঙ্গে বিশ্রী গরম। একটুখানি বাতাসও নেই। তালগাছটার পাখাগুলো একটুখানি মৃদু দোল খেলেও বেশ আরাম লাগে বাবুইদের। আজ সবকিছু কাটা গাছের মতো স্থির। প্রকৃতির রস শুকিয়ে গিয়ে কেমন যেন গোরস্থান হয়ে গেছে। যেন কী এক বিশাল শোকের ঘটনা ঘটেছে, সবাই নিশ্চলভাবে নড়াচড়া বন্ধ করে শোকপালন করছে।

বাবুইয়ের বাসাখানি শীতে গরম, গরমে শীত। তারপরও বাতাসের দোলা না পেয়ে কেমন হাফ ধরে যায়। এ দিকে ছানাপোনাগুলো গতকাল থেকে ‘ফুলের রেণু খাবো’ বলে বলে বাবুইয়ের কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে। এই গরমে সে কোথায় পাবে ফুলের রেণু? আজ দুপুরে বাচ্চাগুলো এমন কান্না জুড়ে দিলো যে, একটু রোদ নরম হতেই বাধ্য হয়ে বাবুই বের হয় ঘর থেকে। বাইরে একটু বাতাসও পায়। কিন্তু তা এমন লু হাওয়ার মতো যে বাবুইয়ের শরীরে যেন ফোস্কা পড়ে যেতে চায়। ভয় পেয়ে সে একটি গাছের ছায়ার নীচে একটুখানি জিরিয়ে নেয়। চারদিকে প্রাণশূন্য। শুধু দূরের মহাসড়কে পঙ্গপালের মতো ব্যাঙের ঝাঁক আশ্রয় নিয়েছে। হঠাৎ বাবুই নিজের অজান্তে হেসে উঠলো। মাটিচাপার ভয়ে ব্যাঙগুলো রাস্তায় উঠেছে, অথচ একটু বেসামাল হয়ে বাস-ট্রাকের তলে চাপা পড়ে পটাপট ফেটে যাচ্ছে। ওদের ব্যাঙাই দাদা কি একটু সতর্ক করে দিতে পারতো না?

বিশ্রাম শেষে ফুলের রেণু খুঁজতে আবার উড়াল দেয়। কিন্তু কোথাও কোনো গাছে ফুল দেখতে পায় না সে। ফুলগাছ কি সব হারিয়ে গেছে, কিংবা গাছ থেকে সব ফুল ঝরে পড়ে গেছে? হঠাৎ দূরে কিছু শুকনো ফুলগাছ দেখে দ্রুত সেদিকে এগিয়ে যায় বাবুই। ফুলগাছটির পাশে একটি বাড়ন্ত তালগাছ। বাবুই দেখে সেই ছোটখাট তালগাছে তরুণ বয়সী অচেনা এক বাবুই খুব সুন্দর নলখাগড়া আর হোগলার ডাল দিয়ে বাসা বাঁধছে। এমন গরমে বেশিক্ষণ কাজ করা যায় না। কিন্তু তরুণ বাবুইয়ের হাতে সময় বেশি নেই। কাছে গিয়ে তালের একটি লম্বা পাতার ওপর আরাম করে বসে বাবুই। তারপর গোপন কথা বলার মতো ফিসফিস করে বলে, ‘ভূমিকম্প হবে, জানিস?’

সামনের সপ্তাহে তরুণ বাবুইয়ের বিয়ে। এরইমধ্যে সে নতুন বাসাটির দুটি নিম্নমুখী গর্ত বানিয়েছে। সেই গর্তের একপাশে তার নতুন বৌ ডিম পাড়বে, অন্যপাশে লম্বা করে যাতায়াতের পথ থাকবে। তরুণ বাবুই ঠোঁট দিয়ে ঘাসের আস্তরণ সরাতে সরাতে হেলাফেলা করে বলে, ‘জানি।’

বাবুই ভেবেছিল ভূমিকম্পের আগাম খবর দিয়ে খুব করে চমকে দেবে তরুণ বাবুইটিকে। উল্টো সে নিজেই অবাক হয়ে গেল। বলল, ‘কী করে জানলি?’
তরুণ বাবুই নতুন বানানো বাসাখানি যত্ন করে পেট দিয়ে ঘঁষে গোলাকার ও মসৃণ করতে থাকে। কাজের ফাঁকে লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে সে আগন্তুক বাবুইকে বলে, ‘ভুতুই দাদু বলেছে।’ 
বাবুই চমকে যায়, ‘ভুতুই দাদু? তাঁকে তুই কোথায় পেলি?’
বাবুইকে তরুণ বাবুই আবার চমকে দিয়ে বলে, ‘তোমার পেছনে তাকিয়ে দেখো।’
বাবুই পেছনে তাকিয়ে ‘হা’ হয়ে যায়। ভুতুই এসেছে! সত্যিকারের ভুতুই! সেই সুদূর আফ্রিকা থেকে এসেছে! 
তরুণ বাবুই বলে, ‘ভুতুই দাদু তোমার কথাই জিজ্ঞেস করছিল। এই দেখো ভুতুই দাদু আমাকে কত সুন্দর নলখাগড়া আর হোগলার ডাল দিয়েছে।’

ভুতুই দাদু দেখতে কেমন তা বাবুইয়ের কোনো ধারণাই ছিল না। তাঁর পেটের তলে হলুদ ছোপ আর কেমন চোখ ধাঁধানো স্বচ্ছ ডানা। এমন রূপ দেখে কেমন সম্মোহিত হয়ে যায় বাবুই।


(৩)

বাবুইয়ের মুখ থেকে নতুন করে কিছু শোনার দরকার হয়নি ভুতুইয়ের। তাকে খুব চিন্তিত দেখায়।

সুদূর আফ্রিকা থেকে উপহার হিসেবে সে অনেক কিছু নিয়ে এসেছে। তার ভেতরে মাদাগাস্কার দ্বীপের সবচেয়ে সুস্বাদু মধু ও ফুলের রেণুও আছে। বাবুইয়ের ছানাগুলো সেগুলি ঠোঁট-ডানায় মাখিয়ে মহাআনন্দে ছড়িয়ে ছিটিয়ে খাচ্ছে।

অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর ভুতুই বিষাদ গলায় বলে, ‘সামনে ভয়াবহ দিন আসছে। মাটি ফেটে চৌচির হবে। কুমার নদের সব জল শুকিয়ে যাবে। আকাশে মেঘ থাকবে না। বৃষ্টি হবে না। চারদিকে আরো আরো গরম হাওয়ার হল্কা বইবে। গাছের পাতা ঝরে যাবে। রস শুকিয়ে যাবে। শস্যদানা মিলবে না। আর সব খাবারও ফুরিয়ে যাবে। তারপর...’

বাবুই ভয় পেয়ে বলে, ‘তার পরেরটার আর শুনতে চাই না ভুতুই দাদু। উপায় কী তাই বলে দাও।’
‘উপায় একটাই।’ ভুতুই বলে, ‘বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণে একটা বড়সড় মেঘ জমেছে। ওখান থেকে এক টুকরো মেঘ ধার করে আনতে হবে। নইলে...’
‘এ তো অনেক সহজ কাজ।’ বাবুই বলে, ‘ওই মেঘ তো এমনি এমনি আমাদের এখানে চলে আসে।’
ভুতুই বলে, ‘না। এবার তা হবে না। সব জায়গায় মাটি ফেটে চৌচির। খরা। এক ফোঁটা বৃষ্টি নেই। আমি এখানে আসার পথে দেখেছি, সবাই ওই মেঘেদের কাছে গিয়ে ধর্না দিয়েছে।’
বাবুই বলে, ‘আমাদেরও কি ধর্না দিতে হবে?’
‘আমি সে কথাই বলছি। দেরি করে পৌঁছুলে আমাদের ভাগে একটুও মেঘ থাকবে না। আজ রাতেই রওয়ানা দিতে হবে। আমি যাব, কিন্তু সঙ্গে একজনকে চাই।’ 
বাবুই বলে, ‘আমি যেতে পারি, কিন্তু বৌ আর ছানা না খেয়ে থাকবে। ওরা অসুস্থ, দেখার কেউ নেই। তুমি ওই তরুণ বাবুইটাকে নিয়ে যাও।’

তরুণ বাবুইকে ডেকে এ কথা বলতেই সে আমতা আমতা করে। 
ভুতুই বলে, ‘যেতে ভয় পাচ্ছ?’
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। বাবুই কোত্থেকে একটি জোনাকী পোকা ধরে নিয়ে এসেছে তার ঘর আলো করতে। সেই মিটমিটে আলোয় তরুণ বাবুই বলে, ‘তুমি আমাদের দেবতা, তোমাকে বলতে দ্বিধা নেই। আমি খুব সুন্দরী এক বাবুইয়াকে ভালোবাসি। ও-ও আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু আমি যে নতুন বাসা বানাচ্ছি সেটি ওর পছন্দ না হলে আমাকে বিয়ে করবে না। তাই...’
ভুতুই তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘শুধু বাসা তৈরি করলেই হবে? তোমাকে সুন্দর স্বচ্ছজলে স্নান করে ভেজা গায়ে নাচতে হবে। নইলে ওই সুন্দরী বাবুইয়া তোমাকে বিয়ে করবে না। যদি মেঘ না আসে, বৃষ্টি হবে না, বৃষ্টি না হলে নদী-সরোবরে জল জমবে না, তখন তোমার সুন্দরী কনে এমনিতেই তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে।’ 
তরুণ বাবুই তাও তেতোমুখে বলল, ‘কিন্তু...’
ভুতুই আবার তাকে থামিয়ে দিল। বলল, ‘ঠিক আছে, কাউকে দরকার নেই। আমি একাই যাব।’

এমন সময় হঠাৎ প্রবল ভূমিকম্প শুরু হলো। ক্ষণে ক্ষণে কাঁপতে থাকলো তাদের ফাঁপা তালগাছটি।

সন্ধ্যার সেই ধোঁয়াটে আঁধারে সব পাখি তখন ডানা মেলেছে আকাশে। তাদের চিৎকার চেঁচামেচিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে সন্ধ্যার স্তব্ধ চরাচর।

চড়ুই পাখির কথা মনে পড়ায় বাবুইয়ের হঠাৎ মন খারাপ হয়ে গেল। তাই দেখে ভুতুই বলল, ‘তোমার চড়ুই বন্ধুকে আমি আগেই জানিয়ে দিয়েছে ভূমিকম্পের কথা।’

তরুণ বাবুই বিষাদ মনে একা একা কী যেন ভাবছিল, হঠাৎ বলল, ‘ভুতুই দাদা, আমি যাব তোমার সাথে।’


(৪)

ভুতুই আর তরুণ বাবুই মেঘ আনতে যাচ্ছে শুনে আর সব পশু-পাখিদের ভেতরেও গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়।

চাতক বলল, ‘শূন্য আকাশে চেয়ে থাকতে থাকতে চোখে নীল জমেছে, শরীরে আর একটুও শক্তি নেই। এমনটি কোনো বার হয় না। তোমরা তাড়াতাড়ি যাও ভাই।’

লম্বা গলা আর লালচে-হলুদ ঠোঁটের বক ধ্যানীর মতো দাঁড়িয়ে ছিল। বলল, ‘খাল-বিল সব শুকনো, মাছ নেই। যাও ভাই মেঘ নিয়ে এসো, আমি অনেক মাছ উপহার দেব।’

ডোবার ঘোলা তপ্ত জলে ঘুরঘুর করছিল পানকৌড়ি-কাদাখোঁচা আর হট্টিটিও। ওরা বলল, ‘আমাদের বাঁচাও ভুতুই।’

শিমুল-পলাশগাছে দোয়েল আর কোয়েলের দল চুপচাপ সব শুনছিল। বলল, ‘জলচেষ্টায় আমাদের গলার সব সুর শুকিয়ে গেছে। গান গাইতে পারি না। মেঘ আনো ভাই। তোমাদের খুব সুন্দর গান শোনাবো।’

চড়ুই এসে বলল, ‘মেঘ না আনতে পারলে খেতে শস্য হবে না, সব মানুষ না-খেয়ে মরে যাবে। আমরাও শস্যদানা পাবো না।’

এ সময় হঠাৎ তরুণ বাবুইয়ের হবু বউ কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, ‘তোমার কোনো ভয় নেই। যাও, মেঘ নিয়ে এসো, আমি তোমারই থাকব।’

এভাবে সবার ভালোবাসা নিয়ে যখন ভুতুই আর তরুণ বাবুই বঙ্গোপসাগরের অনেক গভীরে মেঘেদের কাছে পৌঁছলো তখন সেখানে মেঘ নিয়ে রীতিমতো কাড়াকাড়ি পড়ে গেছে। বাবুইরা আকারে অনেক ছোট, তাই বড় বড় পাখিদের সঙ্গে কিছুতেই পেরে উঠলো না। তরুণ বাবুই ভেবে পেল না, কী করে এত বড়বড় পাখির ভীড় ঠেলে মেঘ পাওয়া যাবে। তরুণ বাবুইয়ের মনে হলো, যতটুকু মেঘ রয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি রয়েছে পাখিদের বিশাল বিশাল ঝাঁক।

তারপরও ভুতুই যতভাবে সম্ভব চেষ্টা করল এক টুকরো মেঘ জোগাড় করতে। কিছুই পেল না। হতাশ আর ক্লান্ত হয়ে ওরা একটুখানি জিরিয়ে নিলো। ভুতুই তখন অনেক ভেবেচিন্তে একটা উপায় বের করল। বলল, ‘একটা বুদ্ধি পেয়েছি। যার কাছে দুটো মেঘ আছে তার কাছ থেকে কাকুতি মিনতি করে একটা চেয়ে নিতে হবে।’

তরুণ বাবুইয়ের খুউব মন খারাপ হয়ে গেল। সে ভেবেছিল, এমন কোনো কাজ নেই যা ভুতুই পারে না। এখন দেখা যাচ্ছে, ভুতুই অনেক কিছুই পারে না। ভুতুইও অনেক ক্ষেত্রে তাদের মতোই খুব সাধারণ আর অসহায়। নিজেরা অসহায় হলে ভয় লাগে না, কিন্তু গুরুজনেরা অসহায় হলে দুঃখ-কষ্টের শেষ থাকে না।

কিন্তু বিপদ আরো বাড়লো। ভুতুইয়ের বুদ্ধিটা একটুও কাজে লাগলো না। কাকুতি মিনতি দূরের কথা, ভুতুই আর বাবুইকে কেউ পাত্তাই দিলো না। শত চেষ্টা করেও তারা মেঘেদের কাছে ঘেঁষতে পারলো না। এটা আরো কষ্টের। ভুতুই বাবুইদের দেবতা হলে কি হবে, অন্যদের কাছে তো কেউ না। ফলে তারা কেউ গুরুত্বই দিলো না।

সব আশা ফুরিয়ে গেলে একে-একে। ক্লান্ত বিধ্বস্ত তরুণ বাবুই দুর্বল শরীরে ঝুপ করে সাগরের জলে পড়ে গেল। অতি বেদনায় চোখ ভিজে গেল ভুতুইয়ের। আহা, বেচারা! তাঁর সঙ্গে এসে আজ মরতে বসেছে। ভুতুই বুঝতে পারছে, তাঁর ক্ষমতা সামান্যই। বাবুইরা তাঁকে খুব ভালোবাসে বলে মনে করে তাঁর অসাধ্যি কিছু নেই। সে এবার বাবুই সমাজে মুখ দেখাবে কী করে? নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগলো তাঁর।

সমুদ্রের জলে দোল খাচ্ছে তরুণ বাবুইয়ের দেহ। মরেই গেল কী? মুখের কাছে গিয়ে ভুতুই ভালো করে নিঃশ্বাস করে পরীক্ষা করে দেখে এখনো অল্প-অল্প শ্বাস পড়ছে। 
হঠাৎ একটি নবীন মেঘ এগিয়ে আসে ভুতুইয়ের কাছে। বলে, ‘ও কি মরে গেছে?’
মেঘের চোখেও জল। ভুতুই বলল, ‘এখনই হয়তো মরে যাবে।’
মেঘ বলল, ‘আমার পিঠে ওকে চড়িয়ে দাও। কোথায় যেতে হবে বলো?’
ভুতুইয়ের চোখ এবার আনন্দে ভিজে গেল। বলল, ‘আমি পথ দেখাচ্ছি, আমার পিছে পিছে এসো।’

সারা পথে তার বুক ধুকধুক করতে লাগলো, তরুণ বাবুই বাঁচবে তো!


লেখক: অদ্বয় দত্ত
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য