নীলুর বড়াই -- শ্রী ক্ষিতীশচন্দ্র কুশারী

চৌদ্দ বছরের ছেলে নীলু। কিন্তু কথা বলে যেন চব্বিশ বছরের জোয়ান ছেলে। গল্প, গল্প, গল্প। এ গল্পের আর শেষ নেই।

কযেকজন ছেলে এক সঙ্গে হযেছে কি, নীলু বলতে শুরু করেছে--সেবার কি হ’ল জানিস। শীতকাল বেড়াতে গিয়েছি মামার বাড়ী। চারিদিকে শুধু কড়াইশুঁটি আর কড়াইশুঁটি। সব মাঠেই কড়াইশুঁটি। কেবল কড়াই শুঁটির চাষ।

নন্তুর বয়স বয়স । সেও শুনছিল নীলুর গল্প। সে হঠাৎ বলে বসল, আচ্ছা নীলুদা, তোমার মামারা বুঝি শুধু কড়াইশুঁটি খেয়েই বেঁচে থাকেন।

নীলু তখুনি জবাব দিল, কেবল কড়ায়শুঁটি খেয়ে কেউ থাকতে পারে নাকি! আরে মামার বাড়ীর দেশে আছে একটা মস্ত নদী। সেই নদীতে হাজার হাজার নৌকা। সেই সব নৌকা করে ধান-চাল তরিতরকারী আসে বিদেশ থেকে। তারপর শোন। কি বলছিলুম, হ্যাঁ, আর কেবল আখের চাষ। রসগোল্লার রস ফেলে আখের রস আমরা খেতুম। তবে তোদের চুপি চুপি বলে রাখি, এত রস খেতে আমাদের বাবা-মা দেবেন কেন। আমরা খেতুম চুরি করে। এখন, সে চুরির গল্পই বলছি।
আমি আর আমার এক মামাতো ভাই একদিন বেরিয়েছি ভোর রাতে আখ ক্ষেতের দিকে।

আমরা এক ঘরেই শুতুম। রাত ঠিক করতে পারিনি। মনে হল, ভোর হয়েছে। আস্তে আস্তে সদর দরজা ভেজিয়ে দিয়ে ত বার হলুম। কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হল, ভোর হয়নি। ভোর হতে তখনো অনেক দেরী। বার হয়ে পড়েছি। এখন আর কি করা যাবে। দু’জনে এগিয়ে চললুম সোজা পথে নয়, একটু ঘুর পথে। সোজা পথে যে ধরা পড়বার ভয়। কেউ যদি বাড়ি থেকে আমাদের দেখে ফেলে, তবে আর রক্ষা নেই। বেত ভাঙবে আমাদের পিঠে। তাই একটু সাবধানে যাচ্ছি।

জানোই তো আমার ভয়ডর কিছু সেই। মামাতো ভাইটা আবার একটু ভীতু। খানিকটা হাঁটে আকার খানিকটা দাঁড়ায়। ভূতের ভয় ত তার আছেই। তারপরে দেশটা আবার জঙ্গলা। বাঘটাঘ বেরোয়। গরুবাছুর, ছাগল-ভেড়া যা পায়, তাই নিয়ে যায়। তাই রাতে ত কথাই নেই, সন্ধার পর আর কেউ সহজ বাড়ি থেকে বার হয় না। আমি দেখলুম, ওকে সঙ্গে নিযে পথ চলা বড় বিপদ, কখন কি করে বসে তার ঠিক নেই। হয়ত ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠবে। তাই মামাতো ভাইকে আর আমি সঙ্গে নিলুম না। বাড়িতে রেখে এলুম। সে ত বেঁচে গেল। সদর দরজা বন্ধ করে সে একেবারে দেছুট।

আমি আবার পথ ধরলুম। সেই জঙ্গলা পথ। সে পথ ধরে খানিক দূর গেলেই বাঁশবন। বেশ বড় বড় সরু বাঁশ।

কিন্তু কেউ মাথা খাড়া করে দাঁড়িযে নেই। সবার আগা নুইয়ে পড়েছ্ শেষ রাতের আবছা অন্ধকার। এই আবছা অন্ধকারে বাঁশগুলিকে ভুতের মতো দেখায়। অন্য কেউ হলে হয়তো বেঁচিয়েই উঠত। কিন্তু আমি ত জানি ও গুলো কি। তাই এগোচ্ছি ধীরে ধীরে। অন্ধকারে ভালো করে দেখা যায় না।

তবে আর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হলো না। সামনে যা দেখলুম... নীলু চুপ করে গেল।

সবাই চুপ করে শুনছিল। কারো মুখে কোন কথা নেই। কিন্তু কতক্ষণ আর চুপ করে থাকা যায়। উত্তেজনায় সবাই কাঁপছে। প্রথমে মান্ত চোখ গোল করে বলল, কি দেখলে, নীলুদা...ভূত? সত্য প্রশ্ন করল, পেত্নী? ভুলু জিজ্ঞেস করল, রাক্ষস?

নীলুর মুখে কোন কথা নেই। একেবারে বোবা। এবার সবাই নীলুকে ঠেলাঠেলি শুরু করল। কি দেখেছিস বলবার জন্য বিরক্ত করতে লাগল। খানিকক্ষণ পরে নীলু বলল, --ভূত নয়, পেত্নী নয়, রাক্ষসও নয়...। সবাই এবার একসঙ্গে প্রশ্ন করল, তবে?

নীলু আবার বলতে আরম্ভ করল, সেটা যে কি তা ভাই আমিও আজও জানতে পারিনি। এখনো মনে হলে শরীর শিউরে ওঠে। দেখলুম একটা অদ্ভুত জন্তু। মস্ত বড় মাথা। মাথায় দুটো শিং। নাকটা থ্যাবরা। চোখ দুটো গোল গোল। মস্ত বড় গোঁফ। বড় বড় দাঁত। হাত দুটো বাঁদরের মতো আর পা দুটো গাধার। এই মূর্তি দেখে আমিতো আর নেই। কি করি?

চেঁচালে হয়ত বিপদ হবে। দৌড় দিয়েও রক্ষা নেই। অমনি একলাফে ধরে ফেলবে।

যারা শুনছিল, তারা এক সঙ্গে প্রশ্ন করল, তারপর?

তারপর--আবার শুরু করল নীলু, কোন উপায় দেখছিনে বাঁচবার। এমন সময় কয়েকবার খুব জোর বাতাস বইল। তোমরা জানো জোরে বাতাস বইলে বাঁশ গাছের পলকা ডগা মুলি নুয়ে পড়ে আবার উঠে যায়। আমার কাছাকাছি সেই একটা বাঁশের ডগা এসে পড়েছে। আমি সেটাকে ধরে ফেললুম আর সড়াৎ করে একেবারে আকাশে। কিন্তু মানুষের ভার একটা পলকা ডগা সইতে পারবে কেন। ভেঙ্গে গেল একেবারে মচাৎ করে, আর গিয়ে পড়লুম সেই ভীষন জীবটার কাঁধের ওপর। সে চমকে উঠে একেবারে দৌড়। আমি ভয়ে ভয়ে তার শিং দুটো প্রাণপণে আঁকড়ে ধরলুম। সে ছুটছে বনজঙ্গল পেরিয়ে। আমি তার কাঁধে। গা ছড়ে গেল। পা ছড়ে গেল। একেবারে রক্তারক্তিকান্ড। খানিক দূর এগিয়েই একটা বড় বটগাছ। বট গাছটার কাছাকাছি আসতেই আমি শিং ছেড়ে দু’হাতে ডাল আঁকড়ে ধরলুম। ছাড়া পেয়ে সে বনের মধ্যে মিলিয়ে গেল। আমি বাদুড়ের মতো ঝুলতে লাগলুম। অনেক কষ্টে কোনমতে ডালটার ওপর উঠে বসে হাঁফ ছাড়লুম। তারপর আমি আস্তে আস্তে গাছ থেকে নেমে এলুম। তখন ভোর হয়েছে। পাখিরা ডাকতে শুরু করেছে।

মামার বাড়ী এসে একেবারে শুয়ে পড়লুম।

গল্প শেষ হল। যারা শুনছিল তারা খুব খুশী হল না। নীলুর সব কথা সত্যি কি না কে জানে। অতটুকু ছেলের এতো সাহস! তা আবার শেষ রাতে।!

নন্তু, মান্ত, ভুলু, টুলু সবাই চলে গেল, কিন্তু বাড়ি গেল না। তারা নীদর ধারে বটগাছটার কাছে এসে বসে পড়ল।

আজ একটা নতুন গল্প তারা শুনেছে। এর আগে নীলুর কতো রোমাঞ্চকর কাহিনী তারা শুনেছে তার শেষ নেই। নীলু তরাই অঞ্চলে সাপের মুখে পড়েছে, সুন্দরবনে দাদার সঙ্গে শিকার করতে গিয়ে বাঘের মুখে পড়েছে, কুমীরের মুখ থেকে বের হয়ে এসেছে, এমন কত কি। গাঁয়ের সব ছেলে নীলুর কথা বিশ্বাস করে না। কিন্তু একটা দল আছে যারা নীলুকে দেবতার মত মানে। সে দলটা বড় কম নয়।

নন্তু বলল নীলুর কথা সত্যি কি না পরীক্ষা করে দেখতে হবে। তা নইলে ত গাঁয়ে টেকা দায়। ওর কোন কথা বিশ্বাস আমি করি নে। কেবল মুখেই বড়াই।
সবাই মিলে একটা মতলব ঠিক করে ফেলল।
কয়েকদিন পরের কথা।

এগাঁয়ের হরিদার বিয়ে। পাশের গাঁয়ে কনের বাড়ি। বিয়েতে সবাই যাবে। ছেলের দলের ত মহাফূর্তি। বিয়ে বাড়ীর নেমতন্ন খাবে, আর খাবে পোলাও, লুচি, মাছ, মাংস, দই, মিষ্টি। সন্ধ্যের সময় বিয়ের লগ্ন। নেমতন্নের পর তাড়াতাড়ি সবাই বাড়ি ফিরতে পারবে।

নীলু ত দলবল নিয়ে যাচ্ছে। বিয়ে বাড়ী।

নেমতন্ন খাবার পর মান্ত, নন্তু, ভুলু, টুলুরা আগেই বেরিয়ে গেল। খানিক পরেই নীলু বার হল তার দলবল নিয়ে। রাত হয়েছে। দু’গাঁয়ের মধ্যে একটা মাঠ। মাছের মাঝখানে একটা বড় বটগাছ। গাছটার ডালপালা অনেক। তাই গাছটার নিচে অন্ধকার।

নীলু এগিয়ে যাচ্ছে। তার পিছনে খানিক দূরে তার সঙ্গীরা। নীলুর ত কোন ভয়ডর নেই। সবাই সে কথা জানে। আর নীলুকেও তার সাহস দেখাতে হবে বন্ধুদের কাছে।

কিন্তু বটগাছটার কাছাকাছি আসতেই এক কান্ড ঘটে গেল। নীলু দেখল একটা জন্তু। বড় দুটো শিং; লম্বা কান, বড় বড় চোখ, গায়ে ডোরাকাটা হলদে রং। নীলু কাছে আসতেই জন্তুটা হুঙ্কার দিয়ে লাফিয়ে উঠল।

নীলু ত এক বিরাট চিৎকার দিয়ে একেবারে অজ্ঞান! একেবারে মাটিতে পড়ে গেল। আর মুখ দিয়ে বার হতে লাগল একটা গোঁ গোঁ গোঁ শব্দ। নীলুর বন্ধুরা ভয়ে আবার বিয়ে বাড়ির দিকে একেবারে ছুটল। ছুটে গিয়ে তারা হাঁপাতে হাঁপাতে যা বলল, তাতে বিয়ে বাড়ীতে একটা হুলস্থুল কান্ড পড়ে গেল। লোকজন দৌড়ে এল। কারুর হাতে লাঠি, কারু হাতে সড়কি। অনেকের হাতে আবার দা, কুড়ুল। সবাই এসে দেখে নীলু মাটিতে পড়ে আছে। তখনো জ্ঞান হয়নি। একদল তার চোখে মুখে জল দিতে শুরু করল। আর একদল জন্তুটার খোঁজ করতে লাগল। কিন্তু কোথায় জন্তু? খুজে পাওয়া গেল না। তবু সবাই তন্ন তন্ন করে দেখতে লাগল। খানিক দূর গিয়েই দেখা গেল একটা মুখোস আর একটা ডোরাকাটা লম্বা জামা পড়ে আছে।

আরে এ যে যাত্রার দলের পোশাক। এটা এল কোত্থেকে। তবে জন্তুটন্তু কিছু নয়। নীলুর মত বীরপুরুষ মুখোস দেখতেই অজ্ঞান! ইতিমধ্যে মান্ত-নন্তুরাও এসে গিয়েছে। তাদের মুখে হাসি। যারা বয়সে বড়, একদল ছেলের সুখে হাসি দেখে, তাদের কেমন সন্দেহ হল। মান্তু-নন্তুকে তারা ডাকল। ওরা এগিয়ে এল। কিন্তু হাসি আর থামে না।
একজন জিজ্ঞাসা করল, আরে তোরা হাসছিস কেন?
মান্ত জবাব দেয়, নন্তু জানে।
নন্তু জানে? তবে তো এরা সবই জানে। একটু চাপ দিতেই সব কথা বার হল। মান্তুরা নীলুর সাহস পরীক্ষা করাবার জন্য আগেই এখানে এসে দাঁড়িয়েছিল। নন্তু পড়েছিল একটা মুখোস আর এই পোষাকটা। এই মুখোস আর পোশাক পড়ে একটা হুঙ্কার দিতেই বীরপুরুষ নীলু একেবারে অজ্ঞান।

এবার সবাই হেনে উঠল। নীলুর জ্ঞান ফিরে এসেছে, শুনতে পেয়েছে মান্তুদের কান্ড।
এর পরে বহুদিন আর নীলুকে গাঁয়ে দেখা যায়নি।
শোনা গেল,সে মামার বাড়ির স্কুলে ভর্তি হয়েছে। দেশে আর শীগগির আসছে না।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য