কবচ--শর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

--আরে হরিপদবাবু যে! প্রাতঃপ্রণাম,প্রাতঃপ্রণাম!
-- প্রাতঃপ্রণাম। কিন্তু আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলুম না মশাই?
-- তার তাড়াহুড়ো নেই, ক্রমে ক্রমে চিনবেন। আগে কুশলপ্রশ্নাদি সেরে নিই, তারপর না হয় অন্য কথা। তা বলি আপনার খিদে-টিদে ঠিকমতো হচ্ছে তো? রাতে বেশ সুনিদ্রা হয় তো? কোষ্ঠ নিয়মিত পরিষ্কার হচ্ছে তো?
-- দেখছেন মশাই, বাজারে যাচ্ছি। এখন কি আর এত খাতেনের জবাব দেওয়া সময় আছে?
-- কিন্তু হরিপদ বাবু, প্রশ্নগুলোকে তুচ্ছ ভাববেন না। এসব প্রশ্নের পিছনে গূঢ় উদ্দেশ্যও থাকতে পারে তো। এই যে ধরুন, আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে রাতে ভাল ঘুমোননি, নানারকম দুশ্চিন্তা করেছেন। আপনার তেমন খিদেও হচ্ছেনা না বলে মুখখানা আঁশটে করে রেখেছেন। কোষ্ঠ পরিস্কার হচ্ছে না বলে আপনার মেজাজটাও বেশ তিরিক্ষি। ঠিক কি না!
-- তা খুব একটা ভুলও বলেলনি বটে। আপনার মতলবখানা কী বলুন তো?
-- চলুন, বাজারের দিকে হাঁটতে-হাঁটতে দুটো কথা  কয়ে নিই।
-- কথা কওয়ার উদ্দেশ্যটা কী একটু বলবেন? খামোখা একজন উটকো লোকের সঙ্গে হাপরহাটি বকে মরার সময় আমার নেই।
-- আহা, চটে যাচ্ছেন কেন? ষষ্ঠীচরণ যে আপনার কাছে পাঁচ হাজার টাকা পায় আর সুদসমেত সেই পাঁচহাজার যে পঞ্চাশ হাজার দাঁড়িয়ে যেতে বসেছে, আর পচা গুন্ডা যে ষষ্ঠীচরণের হয়ে আপনার গলায় গামছা দিযে প্রতিমাসে অন্যায্য টাকা আদায় করছে, সে তো আর আমার অজানা নয়।
-- দাঁড়ান মশাই, দাঁড়ান। এসব গুহ্য কথা আপনি জানলেন কী করে? মেয়ের বিয়ের সময় মোটে পাঁচটি হাজার টাকা ষষ্ঠীচরণের কাছে ধার নিয়েছিলুম। তখন কি আর জানতুম যে ওই পাঁচ হাজারের ফেরে আমার ঘটিবাটি চাঁটি হওয়ার জোগাড় হবে! ঠিকই বলেছেন মশাই, আমার খিদে হচ্ছে না, ঘুম উধাও, কোষ্ঠ পরিষ্কার নওয়ার লক্ষণই নেই।
-- শুধু কি তাই হরিপদবাবু? গণকঠাকুর সদানন্দ সরখেল যে শনির দৃষ্টি কাটানোর জন্য প্রায় জবরদস্তি একখানা নীলা ধারণ করিয়েছিলেন তারও কিস্তি টানতে গিযে আপনি কি কম নাকাল হচ্ছেন। সদানন্দ আবার ভয় দেখিয়ে রেখেছে যে, কিস্তি ঠিকঠাক না দিলে মহাক্ষতির অভিশাপ লাগবে। তার ওপর ধরুন আপনার বাড়ির পাশেই মহাকালী ব্যায়ামাগারের আখড়া। তারা জোড় করে আপনার জমির আড়াই ফুট বাই ষাঠ ফুট দখল করে বসে আছে, আর আপনি প্রতিবাদ করলেই তেড়ে আসছে, এও তো সবাই জানে কিনা।
-- আশ্চর্য মশাই, আমি আপনাকে না চিনলেও আপনি তো দেখছি আমার সব খবরই রাখেন! তা মশাই, এত সব জানলের কী করে? আপনি কি শত্রুপক্ষের লোক?
-- ছিঃ ছিঃ, হরিপদবাবু এরিকম অন্যায় সন্দে আপনার হল কী করে? আপনার ভালো চাই বলেই না আর পাঁচটা গুরুতর কাজ ফেলে আপনার সাহায্যের জন্য ছুটে এসেছি! আপনার গিন্নির বাঁ-হাঁটুর বাত আর অম্বলের অসুখের জন্য ডাক্তার বদ্যি আর ওষুধের পিছনে যে হাজার-হাজার টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে সে খবর জানি বলেই না আপনার দুঃখে ধুঃখিত হয়ে না এসে থাকতে পারলাম না।
-- কিছু মনে করবেন না মশাই, আজকাল লোক চেনা খুব শক্ত বলে একটু ধন্দ ছিল। এখন বুঝতে পারছি, আপনি তেমন খারাপ লোক নন।
-- নই-ই তো! এই যে গেল হপ্তায় আপনি অফিসের লেজারে একটা চল্লিশ হাজার টাকার ক্রেডিট এন্ট্রি ভুল করে ডেবিটের ঘরে বসিযে দিয়েছিলেন, তার জন্য গণেশবাবু কী অপমানটাই না আপনাকে করলেন। ইডিয়ট, গুড ফর নাথিং, অপদার্থ, মিসফিট, নন-কমিটেড ইত্যাদি কি বলতে বাকি রাখলেন বলুন! তার ওপর হেড অফিসে জানিয়ে আপনাকে পায়রাডাঙায় বদলি করার হুমকিও দিয়ে রেখেছেন। আর আপনি ভালোই জানেন, পায়রাডাঙায় বদলি হওয়া মানে আপনার ভবিষ্যত অন্ধকার।
-- ওঃ মশাই, আপনি নির্ঘাত অন্তর্যামী। এত খবর রাখেন দেখে আমি কেবল অবাকের পর অবাক হচ্ছি। সত্যিই মশাই, গণেশবাবুর মতো এমন অকৃতজ্ঞ লোক হয় না। এই তো গত ইয়ার এন্ডিং-এ গণেশবাবুর মান বাঁচাতে পরপর চারদিন অফিসের সময় পার করেও দু-তিন ঘন্টা করে বেশি খেটে তাঁর কাজ তুলে দিয়েছি। এই কি তার প্রতিদান? আর ভুলটাও এমন কিছু মারাত্মক নয়। সেদিন জামাইষষ্ঠীর নেমতন্নে যাব বলে একটু তাড়াহুড়ো ছিল। বিকেল ছ’টা ছাব্বিশের ট্রেন ধরব বলে তাড়াতাড়ি কাজ সারতে গিয়ে সামান্য একটা ভুল হয়ে গিয়েছিল।
--সেই কথাই তো বলছি। তারপর ধরুন, এপ্রিলের তেইশ তারিখে সন্ধে সাতটা দশ মিনিটে রথতলার মোড়ে কী কান্ডটা হল?
-- কিছু হয়েছিল নাকি? কী হয়েছিল বলুন তো?
-- সে কী মশাই, এত বড় ঘটনাটা ভুলে মেরে দিলেন! আপনার তো এখনও ভীমরতি ধরার বয়স হয়নি। মাত্র বিয়াল্লিশ বছর তিনমাস, এর মধ্যেই স্মৃতিবিভৃম তো ভাল কথা নয়। অবশ্য জলাতঙ্কের ইনজেকশান নিলে অনেক সময়ে শরীরে নানারকম কেমিক্যাল চেঞ্জ হয়, তাতে স্মৃতিবিভ্রম হওয়াটাও বিচিত্র নয়।
-- আমি যে জলাতঙ্কের ইনজেকশান নিয়েছিলাম এ খবরও আপনি জানেন দেখছি। নাঃ আমার আরও অবাক হওয়ার উপায় নেই মশাই। ইতিমধ্যে অবাক হওয়ার আপটিমামে পৌছে গেছি।
-- আহা, অবাক হওয়ার দরকারটাই বা কী আপনার! এপ্রিলের তেইশ তারিখে সন্ধে সাতটা দশ মিনিটে রথতলার মোড় দিযে আসার সময় আপনি যে দূরে শ্যামাদাস মিত্তিরকে দেখে অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে, “শ্যামাদাস, ওহে শ্যামাদাস” বলে চিৎকার করে ছুটে গিয়েছিলেন, তা কি আপনার মনে নেই?
-- দোষটা কিন্তু শ্যামাদাসরই, বুঝলেন মশাই, গত অক্টোবরে পাহাড়ে বেড়াতে যাবে বলে আমার কাছে দূরবিনটা ধার চেয়েছিল। দূরবিনটা আমার ঠাকুরদার। সাবেক জিনিস, একটা স্মৃতিচিহ্নও বটে। কিন্তু শ্যামাদাস এমন বেআক্কেলে যে, দূরবিনটা ছ’মাসের মধ্যে ফেরত দিল না। চাইলেই বলে, দেব দিচ্ছি। তারপর ‍শুনলুম তার বড় শালা নাকি দূরবিনটা তার কাছে চেয়ে নিয়ে গেছে দক্ষিণ ভারতে বেড়াতে যাবে বলে। বলুন তো, টেনশন হওয়ার কথা নয়! তাই সেদিন তাকে দেখে ওরকম ব্যস্ত হয়ে ছুটে গিয়েছিলুম।
-- আর তার ফলেই না আপনি রাস্তার একটা নেড়ি কুকুরের লেজ মাড়িযে ফেললেন। আর কুকুরটাও ঘ্যাক করে আপনার ডান পায়ে কামড় বসিয়ে দিল।
-- ওঃ সে একটা দুঃস্বপ্নের মতো ঘটনাই বটে। তবে আপনি যে অন্তর্যামী যে বিষয়ে আমার আর কোন সন্দেহই নেই। এসব ঘটনা আমার বাড়ির লোক আর অফিসের কলিগ ছাড়া কেউ জানে না। কুকুড়ের কামড়ের চেয়েও অনেক বেশি যন্ত্রনা পেটে অতগুলো ইনজেকশন নেওয়া। সে কী অসহ্য অবস্থা তা কহতব্য নয়।
-- না হরিপদবাবু, আপনি নবুবাবুর কথা ভুলে যাচ্ছেন। আপনার দুর্ভোগের জন্য নবুবাবুর অবদানের কথাটাও একটু ভাবুন। সেবার অ্যানুয়াল পরীক্ষায় নবুবাবুর ছেলে গজা  অঙ্কে বাইশ পেয়েছিল। নবুবাবু তখন আপনাকে গজার প্রাইভেট টিউটর রাখেন। অঙ্কের মাস্টার হিসেবে আপনার খুবই সুনাম। গজাকে অঙ্ক শেখানোর জন্য আনাকে নবুবাবু মাসে সাতশো টাকা দিতেন। তা দেবেন নাই বা কেন। নবুবাবুর টাকার লেখাজোখা নেই, আর গজাও তার একমাত্র ছেলে। কিন্তু হাফ ইয়ারলি পরীক্ষায় অঙ্কে এগারো পেল এবং অ্যানুয়ালে পেয়েছিল মাত্র তিন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে নবুবাবু আপনাকে ছাড়িয়ে তো দিলেনই, তার উপর প্রতিহিংসায় উন্মত্ত হয়ে আপনার বিরুদ্ধে মামলা করলেন। অভিযোগ ছিল, আপনি ইচ্ছা করেই গজাকে ভুলভাল শিখিয়েছেন। তা ছাড়া তাঁর গোয়ালে আগুন লাগানোর অভিযোগে এক দফা, তাঁর বুড়ি পিসির মৃত্যু হওয়ায় সেটাকে খুনের মামলা সাজিয়ে আর এক দফা, তাঁর বাড়িতে যে ডাকাতির চেষ্টা হয়েছিল সেই বাবদে তিনি আর এক দফা আপনাকে অভিযুক্ত করে এফআইআর করেন। পুলিশ একবার আপনাকে নিয়ে গিয়ে থানায় লক আপে এক রাত্রি আটকেও রাখে। ঠিক কিনা?
-- আর বলবেন না মশাই, আমার কী দোষ বলুন! গজা বেশিরভাগ দিনই অঙ্ক কষতে বসে ঘুমিয়ে পড়ত বা পেট ব্যাথা বলে আমাকে বিদায় করে দিত। নবুবাবুকে বলেও লাভ হত না। বলতেন, ছেলেমানুষ, ওরকম তো একটু করবেই। ওই ফাঁকে ফাঁকে শিখিয়ে নেবেন। কী কুক্ষণে যে গজাকে পড়াতে রাজি হয়েছিলুম কে জানে। নবুবাবু আমার জীবনটাই অসহ্য করে তুলেছেন।
-- সম্প্রতি তিনি আপনার বিরুদ্ধে একটা জালিয়াতির মামলা করার জন্যও তৈরী হচ্ছেন বলে শুনেছি।
-- ওরে বাবা!
-- তা তো বলছি, আপনি কেমন আছেন সেটা জানা বড় দরকার।
-- যে আজ্ঞে। ভেবেচিন্তে মনে হচ্ছে আমি বিশেষ ভাল নেই। আমার ঘুম হচ্ছে না, খিদে হচ্ছে না, কোষ্ঠ পরিষ্কার হচ্ছে না। বুক দুরদুর করে, শরীর দুর্বল লাগে,মাথা ঘোরে।
-- আহা, তার জন্য চিন্তা কী হরিপদবাবু। আমি তো আছি।
-- আপনি আছেন, কিন্তু কীভাবে আছেন?
-- আপনার দুঃখ দুর্দশা দেখে আমার প্রাণ কেঁদে উঠেছিল বলেই তো হিমালয়ে পাহাড়িবাবার কাছে ছুটে গিয়েছিলাম।
-- বলেন কী? আমার জন্যে আপনি হিমালয় ধাওয়া করেছিলেন? আপনি তো অতি মহৎ মানুষ মশাই। কিন্তু আমি তো আপনাকে চিনিও না!
-- তাতে কি? আমার চেনা-অচেনা ভেদ নেই। আপনার দুঃখের কথা পাহাড়িবাবার শ্রীচরণে নিবেদন করতেই উনি টানা পাঁচ বছরের ধ্যানসমাধি থেকে জেগে উঠে চিন্তিত মুখে বললেন, তাই তো? হরিপদর সময়টা তো বিশেষ ভাল যাচ্ছে না! এর একটা বিহিত করতেই হবে।
-- বলেন কি মশাই?
-- তবে আর বলছি কী! পাহাড়িবাবার মহিমা তো জানেন না। সাক্ষাৎ শিবস্বয়ম্ভো! তিনি প্রসন্ন হলে আর চিন্তা কীসের? তা তিনি সব টেনেটুনে আপনার ওপর প্রসন্ন হয়েই এই একস্ট্রা স্পেশাল বগলমুখী কবচখানা পাঠিয়ে দিয়েছেন। মঙ্গলবার সকালে কাঁচা দুধ, দই আর গঙ্গাজলে শোধন করে ধারণ করবেন। দেখবেন সব গ্রহ-বৈকল্য কেটে গিয়ে আপনি একেবারে অন্য মানুষ।
-- আপনি তো বড় পরোপকারী মানুষ মশাই।
-- আর লজ্জা দেবেন না। মানুষের জন্য আর কতটুকুই বা করতে পারি। যাই হোক, প্রণামী বাবদ সামান্য পাঁচ হাজার টাকা ফেলে দিলেই হবে।
-- অ্যাঁ!
-- আজ্ঞে হ্যাঁ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য