পরের ধনে পোদ্দারী

আগে মৌলবি সাহেবের ঘন ঘন দাওয়াত আসিত। তালেব এলেমের ( ছাত্রদের) কাঁধে কেতাব কোরান দিয়া বড়ই জাঁকজমকের সঙ্গে মৌলবি সাহেব দাওয়াত খাইতে যাইতেন। কিন্তু এখন খারাপ দিন পড়িয়াছে। লোকে বড় মৌলবি সাহেবের খোঁজ করে না।

অনেক দিন পরে দূরের একটা গ্রাম হইতে মৌলবি সাহেব দাওয়াত পাইলেন। বর্ষার দিন। পানির ভিতর হইতে নৌকাকানা মৌলবি সাহেব নিজেই সেচিলেন।

তাহার উপর তক্তার পাটাতন লাগাইয়া ছই বসাইলেন। কিন্তু সঙ্গে তালেব-এলেম না থাকিলে ত মান থাকে না।

আগে বহু তালেব-এলেম থাকিত। এখন গরিব অবস্থায় তাহারা চলিয়া গিয়াছে। অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া একজন তালেব-এলেমের কথা মৌলবি সাহেবের মনে হইল।

গ্রামে একজন বিধবা স্ত্রীলোক ছিল। তাহার একটিমাত্র ছেলে। পাড়া ভরিয়া ডান্ডা-গুলি খেলিয়া বেড়ায়। মৌলবি সাহেব সেই বিধবার বাড়িতে যাইয়া উপস্থিত হইলেন। বিধবা বড়ই গরিব। মৌলবি সাহেবকে কোথায় বসিতে দেয় সেজন্য খুবই ব্যস্ত হইয়া পড়িল।

মৌলবি সাহেব বলিলেন, ‘আমার জন্য ব্যস্ত হইবেন না। আমি সামান্য দরকারে আসিয়াছি।’

মাথার ঘোমটাটি আর একটু টানিয়া বিধবা বলিল, ‘আমার মতো গরিব বিধবা আপনার কি কাজে লাগিতে পারে?’

মৌলবি সাহেব একটু কাশিয়া বলিলেন,‘আমি দূরের গ্রাম হইতে একটি দাওয়াত পাইয়াছি। আপনার ছেলেকে যদি আমার সঙ্গে দেন সে আমার তালেব-এলেম হইয়া কেতাবগুলি বহিয়া লইয়া যাইবে।’

বিধবা একগাল হাসিয়া বলিল, ‘তাহাতে আর কি হইয়াছে, আমার ছেলেটি ত পাড়ায় পাড়ায় খেলিয়া বেড়ায়। আপনার সঙ্গে থাকিয়া যদি একটু এলেম-কালাম পড়ে সে  ত ভালই হইবে। আপনি এখনই তাহাকে লইয়া যান। ওরে ওসমান! তুই মৌলবি সাহেবে সঙ্গে যা।’

মৌলবি সাহেব ছেলেটির হাত ধরিয়া একটু ইতস্তত করিয়া কহিলেন, ‘আরও একটি কথা। দাওয়াতে যে যাইব, আমার পরিবার কাপড়খানাও ছিঁড়িয়া গিয়াছে। আপনার ডুমাখানা যদি দেন তবে লুঙ্গির মতো করিয়া পরিয়া দাওয়াতে যাইতে পারি। সেখান হইতে আসিয়াই আপনার ডমুখানা ফেরত দিয়া দিব।’

[পূর্বে গ্রামের মেয়েরা লুঙ্গির মতো একখন্ড কাপড় পরিত, অন্য একখন্ড বুকে জড়াইত। তাহাকে ডুমা বলিত।]

বিধবা একটু চিন্তা করিয়া বলিল, ‘তা নিবেন নিন। আমারও বেশি কাপড় নাই। তা না হয় একদিন কষ্ট করিয়াই কাটাইব।’ মৌলবি সাহেব বিধবার ডুমাখানা গলায় জড়াইযা ছেলেটিকে সঙ্গে করিয়া বাড়ি আসিলেন।

আগের দিনে মৌলবি সাহেব দাওয়াতে যাইতেন, তাকিয়া-বালিশ সঙ্গে লইতেন। তাহা দেখিয়া লোকে মৌলবি সাহেবকে কত সমীহ করিয়া চলিত। আজও কি তাকিয়া-বালিশ সঙ্গে লওয়া যায় না? তুলার বালিশটি তেলে ময়লায় বড়ই নোংরা হইয়া আছে। তা হোক, সেটাতেই চলিবে, কিন্তু তাকিয়া কোথায় পাওয়া যাইবে? ঘরের মধ্যে কিছু খড় ছিল, তাহা দিয়া মৌলবি সাহেব একটি তাকিয়া তৈরী করিলেন। তাহা অতি পরিপাটি করিয়া ন্যাকড়া দিয়া জড়াইয়া লইলেন। লোকে যেন বুঝিতে না পারে ইহা খড় দিয়া তৈরী। ছোকরা তালেব-এলেম সবই দেখিল। বালিশ ও তাকিয়া নৌকার ছইয়ের মধ্যে রাখিয়া মৌলবি সাহেব দাওয়াতে চলিলেন।

সারাটি পথ মৌলবি সাহেব নিজেই নৌকা বাহিয়া চলিলেন। যে বাড়িতে যাইবেন, সে-বাড়ির ঘাটের কাছে আসিয়া বৈঠাখানা ছোকরা তালেব-এলেমের হাতে দিয়া মৌলবি সাহেব ছই-এর মধ্যে ভালভাবে আমিরি চালে যাইয়া বসিলেন।

নৌকা ঘাটে আসিয়া ভিড়িল। নিমন্ত্রন বাড়ির লোকেরা ব্যস্ত-সমস্ত হইয়া মৌলবি সাহেবকে অতি সমাদরে নৌকা হইতে হাত ধরিয়া নামাইল। তারপর বৈঠকখানায় লইয়া গিয়া বসাইল। সকলে মিলিয়া, ‘হুঁকো আনরে,’--‘ওজুর পানি আনরে’বলিয়া সমস্ত বাড়ি সরগরম করিয়া তুলিল।

মৌলবি সাহেব সেখানে বসিয়া আমিরি-চালে ছোকরা তালেব-এলেমকে হুকুম করিলেন, ‘ওরে! আমার তাকিয়া-বালিশ লইয়া আয়।” তালেম-এলেম গরিব বিধবার পুত্র। তাকিয়া কোনটা আর বালিশ কোনটা জানে না। সে ইতস্তত করিতেছিল।

মৌলবি সাহেব ধমকের সুরে বলিলেন, ‘ওরে কথা শুনিতেছিস না কেন? আমার তাকিয়া বালিশ লইয়া আয়।’

বালক দূর হইতে চেঁচাইয়া উত্তর করিল, ‘মৌলবি সাহেব! কোনটা আনিব? খড়ের টা না তুলারটা?’
জবাব শুনিয়া সভার লোক একটু মুচকি হাসিল।
মৌলবি সাহেব রাগিয়া বলিলেন, ‘ওরে বেয়াল্লিক উল্লুক, তাকিয়া আবার খড়ের কিরে?’

ছেলেটি উত্তর করিল, ‘আপনি যেটা খড় দিয়া তৈরী করিয়া ন্যাকড়া দিয়া জাড়াইয়া আনিয়াছেন সেইটা আনিব?’

সভার লোক এ ওর মুখের দিকে চাহিয়া আবার হাসিল। মৌলবি সাহেব এবার আরও রাগের সঙ্গে বুলিলেন,‘চুপ থাক্‌ বেয়াদব। আমার তাকিয়া লইয়া আয়।’

ছেলেটি তখন কাঁদ কাঁদ হইয়া বলিল, ‘মৌলবি সাহেব! আপনার রাগের কি ধার ধারি? আপনি আমার মার ডুমাখানা লুঙ্গির মতন করিয়া পরিয়া আসিয়াছেন, সেটা আমাকে দিন। আমি বাড়ি যাই।’

--সভার লোক আবার হাসিয়া উঠিল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য