অনুসরণকারী--শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

-- এই যে অবণীবাবু?
-- অ্যাঁ! কিছু বলছেন?
-- আজ্ঞে হ্যাঁ। বলতেই হচ্ছে মশাই, আপনাকে যত দেখছি ততই হতাশ হচ্ছি।
-- তাই নাকি? তা আপনি কে বলুন তো! আপনাকে তো চেনা-চেনা মনে হচ্ছে না!
-- চেনা-চেনা মনে হওয়ার কারণও নেই কিনা। আপনি আমাকে কস্মিনকালেও দেখেননি। এই যে গত দু-ঘন্টা ধরে আমি আপনার পিছু নিয়েছি সেটা কি আপনি টের পেয়েছেন?
-- পিছু নিয়েছেন? কী সর্বনাশ? পিছু নিয়েছেন কেন?
-- সেটা তো ভেঙে বলা যাবে না। বলায় বারণ আছে। শুধু বলছি, আমাকে আপনার পিছু নিতে বলা হয়েছে।
-- ওরে বাবা! কে বা কারা আপনাকে আমার পিছু নিতে বলল?
-- সেটাও বলা যাবে না। অনেক প্যাঁচালো ব্যাপার আছে। তবে ব্যাপারটা যে কী তা আমিও ভালো জানি না। পিছু নিতে বলা হয়েছে, আমি হুকুম তামিল করছি। সঠিক সব খবর জায়গামতো পৌছে দিতে পারলে কিছু টাকা পাবো।

-- এ তো খুব দুশ্চিন্তার কথা হল মশাই। কেউ টাকা খরচ করে পেছনে স্পাই লাগিয়েছে, এটা তো বেশ উদ্বেগেরই ব্যাপার। 
-- তা হতে পারে। আপনি একজন বিপজ্জনক লোক। হয়তো বিদেশি রাষ্ট্রের চর বা উগ্রপন্থী বা চোরাই চালানদার বা খুনি বা জোচ্চর কিংবা...
-- মুখ সামলে! মুখ সামলে! এসব কী বলছেন বলুন তো? আপনার নামে তো মানহানির মামলা করা যায়।
-- আহা, প্রথমেই মামলা-মোকদ্দমা এনে ফেললেন কেন? আপনার সম্পর্কে এখনও তো কিছুই প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
-- তাহলে এসব বলছেন যে!
-- বলিনি। সম্ভাবনার কথা বলছিলাম। কিন্তু মশাই, দু-ঘন্টা ধরে আপনি আমাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছেন, একবারটিও একটু বেচাল চললেন না! তাহলে ‍পিছু নিয়ে কী লাভ হল বলুন তো?
--আচ্ছা মুশকিল! পিছু নিযে আপনি কী আশা করেছিলেন বলুন তো?
--আশা ভরসা যাই হোক, সে কথা আর বলে লাভ কি? কিন্তু আপনার ভাবগতিক আমার মোটেই ভালো লাগেনি অবনীবাবু।
--কেন, কী এমন খারাপ ভাবগতিক দেখলেন?
--ধরুন, অফিস থেকে আপনি পাঁচটা নাগাদ বরোলেন, আর তক্ষুনি আমি আপনার পিছু নিলাম। ঠিক তো?
-- তা তো ঠিকই। আমার অফিস পাঁচটাতে ছুটি হয়।
--তারপর আপনি অত্যন্ত গদাই লস্করী চালে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে হেমন্ত কেবিনে ঢুকলেন।
-- তাও ঠিক।
-- হেমন্ত কেবিনে ঢুকে আপনি বাঁ দিকে একেবারে কোণের চেয়ারে দিয়ে বসলেন।
--বহুৎ আচ্ছা। তারপর?
-- তারপর আপনি দুটো টোস্ট আর এককাপ কফির অর্ডার দিলেন। ঠিক কিনা!
-- হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব ঠিক।
-- দেখলাম, আপনি মরিচ টোস্ট খান, চিনি টোস্ট খান না।
-- ঠিকই ধরেছেন।
-- এবং টোস্ট আর কফি খেতে-খেতে আপনি টেবিলে পড়ে থাকা সকালের খবরের কাগজখানা বেশ অনেকক্ষণ ধরে পড়লেন।
--বটেই তো। আপনি বেশ ভালো গোয়েন্দা দেখছি!
--তবু তো মশাই, ওপরওয়ালার গাল ওঠে না। সর্বদাই কাজের ভুল ধরে।
-- খুব অন্যায়, খুব অন্যায়। হ্যাঁ, তারপর বলুন।
-- প্রায় আধঘন্টা পর টোস্ট আর কফি খেয়ে খবরের কাগজ পড়ে আপনি উঠলেন। তারপর হাঁটতে হাঁটতে হেঁদো। আচ্ছা মশাই, হেঁদোর জলে ছেলে-ছোকরাদের দাপাদাপি অত মন দিযে দেখার কী আছে বলুন তো! দেখলাম, আপনি খামোখা দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করছেন। বলছি হেঁদোতে কি কারও সঙ্গে আপনার গোপন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল?
--তা ছিল বই কি! বিকেলেন দিকে আমার বেয়াইমশাইও ওখানে রোজ আসেন কিনা।
-- বেয়াইমশাই! হাসালেন মশাই। বেয়াইয়ের সঙ্গে কারও অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকে বলে শুনিনি। তবে যাই হোক, সে লোকটা শেষ পর্যন্ত আসেনি। হয়তো টের পেয়ে সাবধান হয়েছে।
--বাঃ, আপনার অনুমান দিব্যি ভালো।
--আপনি বললে তো হবে না। ওপরওয়ালা যে খুশি হয় না। যাকগে, তারপর মিনিট কুড়ি বাদে আপনি হেঁদো থেকে বেরিয়ে ফের হাঁটা ধরলেন। বিডন স্ট্রিটের একটা মনোহারি দোকানে ঢুকে নানারকম জিনিসপত্র দেখতে লাগলেন। স্যান্ডউইচ ব্লেড, টমোটো সস, ধূপকাঠি, কাসুন্দির শিশি, ফিনাইল, যত সব আলতু ফালতু জিনিস।
-- ওরে বাবা! আপনার চোখ তো সাংঘাতিক!
-- তবে? ফলো করা কি চাট্টিখানি কথা! চারদিকে চোখ রাখতে হয়। কিন্তু সেই দোকান থেকে আপনি পাঁউরুটি ছাড়া আর কিছুই কিনলেন না। বিবেকানন্দ বেকারির এক পাউন্ডের একটা রুটি, তাই না?
-- খুব ঠিক।
-- বিবেকানন্দ বেকারির মিল্ক ব্রেড আমারও বেশ প্রিয়।
-- তাই নাকি? তাহলে তো আপনার সঙ্গে আমার বেশ মিল!
-- না মশাই, না। আপনি টার্গেট, আমি আপনার শ্যাডো। সম্পর্কটা বন্ধুত্বের নয়। যাক, রুটি কিনে আপনি আরও খানিকটা হাঁটলেন। হেঁটে একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কড়া নাড়ালেন। একজন বউমতো মহিলা দরজা খুলতেই তাকে জিগ্যেস করলেন, অভয় বাড়ি আছে? বউটা বলল, না, বার্নপুর গেছে।
-- তাও শুনেছেন?
-- হ্যাঁ। বুঝতে পারলাম না, অভয়ের সঙ্গে আপনার সম্পর্কটা কী? হতে পারে, এই অভয়ই আপনার সহ-ষড়যন্ত্রকারী।
-- মন্দ বলেননি। কথাটা ভেবে দেখতে হবে। তবে এমনিতে অভয় আমার পুরনো কলিগ।
-- তা তো বলবেনই। সত্যি কথা কি এত সহজে বের করা যায়?
-- সে তো বটেই। কিন্তু সত্যি কথাটা কী তা কি আন্দাজ করেছেন?
-- তা আর করিনি! গভীর ষড়যন্ত্র মশাই, গভীর ষড়যন্ত্র। অপরাধ বিজ্ঞানে বলা আছে, প্রকৃত ভয়ংকর অপরাধীদের বাইরের আচরণ দেখে তাদের মতলব বোঝা অসম্ভব। একজন খুনিকে হয়তো বাইরে থেকে খুবই নিরীহ বলে মনে হয়। আপনাকে দেখেও আমার অনুমান, আপনি অপরাধ জগতের খুব উঁচুদরের খেলোয়াড়। টোস্ট, কফি খাওয়া, সাঁতার দেখা, পাঁউরুটি কেনা বা অভয়ের খোঁজ করা এসবের মধ্যেও একটা গভীর অপরাধপ্রবণ মন নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না, ধরা যাচ্ছে না।
-- চমৎকার! তারপর কী হল?
-- হ্যাঁ, অভয়কে না পেয়ে আপনি ডানদিকের একটা গলিতে ঢুকে গেলেন। সেই দুলকি চালে হাঁটা, কোনও উদ্বেগ বা তাড়াহুড়ো নেই। হাঁটতে-হাঁটতে- বড় রাস্তায় এসে আপনি একটা বুক স্টলের সামনে দাঁড়ালেন। ঠিক কিনা?
-- হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক।
-- বুক স্টলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাঁউরুটিটা বগলে চেপে ধরে পত্র-পত্রিকা দেখতে লাগলেন। এইখানে আমার একটু আপত্তি জানিয়ে রাখি। পাঁউরুটি একটা খাবার জিনিস। সেটাকে বগলে চেপে রাখাটা মোটেই উচিত কাজ নয়। মানুষের বগলের ঘাম এবং দুর্গন্ধ থাকেই। পাঁউরুটিটা বগলে চেপে রাখাটা কি আপনার উচিত হয়েছে?
-- আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। কাজটা ঠিক হয়নি। এবার থেকে ব্যাপারটা সম্পর্কে আমি সজাগ ও সতর্ক থাকব।
-- হ্যাঁ, আপনি স্টলে দাঁড়িয়ে মোট তিনটে পত্রিকা দেখেছেন। একটা লাইট অব এশিয়া, একটা ইনলুকার এবং একটা বাংলা পত্রিকা স্বপ্নানন্দা। ঠিক বলেছি?
-- এ পর্যন্ত আপনার সব অবজার্ভেশনই নিখুঁত। বলে যান।
-- ওই বুকস্টলে আপনার সময় লাগল আধঘন্টা। আপনি বাংলা মাসিকপত্রটা কিনেও ফেললেন। সেটা এখন আপনার হাতেই রয়েছে। অবশ্য জানি না ওই পত্রিকা কোনটাও কোনও সংকেত কিনা। ওর মধ্যেই হয়তো আপনার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার হাল হদিশ রয়েছে।
-- থাকতেই পারে, থাকতেই পারে। বিচিত্র কি? তারপর?
-- তারপর থেকে আপনি এসে এই পার্কে বসে আছেন। হয়তো এখানে আপনার সঙ্গে কারও একটা রাঁদেভু হবে। কিন্তু মশাই, সেটা আর কখন হবে? আমি তো ধৈর্য্ রাখতে পারছি না। সন্ধে সাতটা বেজে পাঁচ মিনিট হয়ে গেল যে!
-- ব্যস্ত হবেন না। কেল্লা তো প্রায় মেরেই দিয়েছেন। ওই যে দেখছেন, মোটাসোটা এক ভদ্রমহিলা এদিকে আসছেন ওঁর সঙ্গেই আমার রাঁদেভু। উনিই আর অপারেটর। যত খুন খারাপি, স্মাগলিং আর দুষ্কর্ম আছে সব কাজ উনিই পরিচালনা করেন।
-- বটে!
--হ্যাঁ। তবে বাইরে থেকে দেখে বুঝবেন না। হাতে শাঁখা-পলা, সিঁথিতে সিঁদুর। একেবারে গিন্নিবান্নির মতো চেহারা। কিন্তু ফুলন দেবীর চেয়েও ভয়ংকর।
-- সর্বনাশ! উনি কে বলুন তো?
--উনিই বিদিশা দেবী। আমার স্ত্রী।
ঝুরি কুড়ি গল্প
- শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য