জামায়ের শ্বশুর বাড়ি যাত্রা

বিবাহের পর ছেলেটি প্রথম শ্বশুরবাড়ি যাইবে। সে গোপনে কিছু টাকা-পয়সা সংগ্রহ করিয়া বউর জন্য একখানা শাড়ি, কয়েকগাছা চুড়ি আর একছড়া পুঁতির মালা কিনিয়া সঙ্গে লইল।

যাইবার সময় মা উপদেশ দিলেন, ‘বাবা! শ্বশুরবাড়ি যাইতে কাউকে সঙ্গে লইবে না। আর সেখানে গেলে তোমার শাশুড়ি তোমাকে নানারকম জিনিস খাইতে দিবে, কিন্তু তুমি যদি তার সব খাও, লোকে বলিবে, জামাই পেটুক। তাই শাশুড়ি কিছু পাতে দিতে গেলেই প্রথমে না না বলিবে।’

ছেলে মায়ের সকল কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করিবে, এই প্রতিজ্ঞা করিয়া শ্বশুরবাড়ির পথে রওয়ানা হইল।
তখন ছিল দুপুরবেলা। পথ চলিতে চলিতে দুপুরবেলা গড়াইয়া পড়িল। সে পিছনে ফিরিয়া দেখিল, তাহার সঙ্গে সঙ্গে ছায়া আসিতেছে। এতক্ষণ সূর্য মাথার উপর ছিল বলিয়া সে আগে তাহাকে দেখে নাই।
সে ছায়াকে বলিতে লাগিল, ‘ছায়া! তুই বাড়ি ফিরিয়া যা। জানিস ত মা আমাকে একলা শ্বশুরবাড়ি যাইতে বলিয়াছে। তুই  আমার সঙ্গে আসিস না।’

ছায়া তবু তার সঙ্গে আসে। ছেলেটি আরও অনুনয় বিনয় করিয়া বলে, ‘ছায়া তুই আমার ভাই হইবি? বন্ধু হইবি? আমার গাই বিয়াইলে তার দুধ দিয়া তোকে লাড়ু বানাইয়া দিব। উড়কি ধানের মুড়কি খাইতে দিব। আম কাঁঠাল ভাঙিয়া দিব। তুই ডালে বসিয়া খাইস। দেখ্‌ তুই আমার সঙ্গে আসিস না।’ ছায়া তবু তাহার পাছ ছাড়ে না।

ছেলেটি আবার বলে, ‘ছায়া! সোনামানিক! তুই যদি এমন করিয়া আমার পাছ লইবি, তবে আমার শ্বশুরবাড়ি যাওয়া হয় না।’

ছায়া তবু তাহার সঙ্গে সঙ্গে আসে। ছেলেটি তখন  বউ এর জন্যে যে একছড়া পুঁতির মালা লইয়া আসিয়াছিল, তাহাই পথের মধ্যে ফেলিয়া দিয়া বলিল, ‘ছায়া! তুই এই মালাটি লইয়া বাড়ি ফিরিয়া যা। আমার সঙ্গে আসিস না।’

তখন এক খন্ড মেঘে সূর্য ঢাকা পড়িয়াছিল। ছেলেটি পিছন ফিরিয়া চাহিয়া দেখিল, ছায়া তার সঙ্গে সঙ্গে আসিতেছে না। সে খুশি হইয়া জোরে জোরে পা ফেরিয়া শ্বশুরবাড়ির দিকে হাঁটিয়া চলিল।

কতক্ষণ পরে সূর্যের উপর হইতে মেঘ সরিয়া গেল। ছেলেটি পেছনে ফিরিয়া চাহিয়া দেখে, ছায়া আবার আসিয়া তাহার পাছ লইয়াছে। ছেলেটি বলিল, ‘ছায়া! তুই আবার আমার সঙ্গে সঙ্গে আসিতেছিস! আমার বউর জন্য দুই জোড়া কাচের চুড়ি লইয়া আসিয়াছি। তুই তাহাই লইয়া বাড়ি ফিরিয়া যা। আর আমার পিছ লইস না।”

এই বলিয়া সে দুই জোড়া চুড়ি পথের মধ্যে ফেলিয়া দিল। তখন সে একটি বনের মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছিল। সে পিছনে ফিরিয়া চাহিয়া দেখিল, ছাড়া তাহার সঙ্গে সঙ্গে আসিতেছে না। ছেলেটি আরও জোরে জোরে পথে চলিতে লাগিল।

খানিক বাদে বনের পথ শেষ হইল। এবার পথের উপর বিকালের রোদ পড়িয়াছে। ছেলেটি পিছন ফিরিয়া চাহিয়া দেখিল, ছায়া এবার আর বড় হইয়া তাহার পাছে পাছে আসিতেছে।

ছেলেটি তখন আরও অনুনয় বিনয় করিয়া বলিল, ‘ছায়া! তোকে পুঁতির মালা দিলাম, দুই জোড়া চুড়ি দিলাম, তবু তুই আমার পাছ ছাড়লি না? আর ত আমার কাছে শাড়িমাত্র আছে। তাও যদি তোকে দেই, তবে বউর কাছে কি লইয়া হাজির হইব? ছায়া! সোনা মানিক! তুই বাড়ি ফিরিয়া যা।’

ছায়া তবু যায় না। তখন শাড়িখানা পথে ফেলিয়া দিয়া সে বলিল, ‘ছায়া! শাড়িখানা লইয়া তুই বাড়ি ফিরিয়া যা।’ এবার বেলা ডুবুডুবু। সন্ধ্যা হয় হয়। ছেলেটি পিছন ফিরিয়া দেখিল, ছায়া চলিয়া গিয়াছে। সে জোরে পা ফেলিয়া নানা পথ ঘুরিয়া শ্বশুরবাড়ি আসিয়া উপস্থিত হইল।

জামাই শ্বশুরবাড়ি আসিয়াছে। শাশুড়ি কত রকমের খাবার তৈয়ার করিয়াছে। কিন্তু খাইতে বসিয়া জামাই মায়ের উপদেশ মনে মনে  আওড়াইতে লাগিল। মা বলিয়া দিয়াছিলেন, ‘শ্বশুরবাড়ি যাইয়া কম করিয়া খাইবি।’

শাশুড়ি জামাইকে খাওয়াইতে বসিয়া তার পাতে এটা দেয়--ওটা দেয়। জামাই কেবল বলে, ‘না! না! আর দিবেন না।’ শাশুড়ি ভাবিল, জামাইর বুঝি অসুখ করিয়াছে। তাই সে আর পীড়াপীড়ি করিল না। জামাই না খাইয়াই খাওয়া শেষ করিল।

রাত্রে শুইতে যাইয়া ক্ষুধায় জামাইর পাতে যেসব  বড় বড় গোস্তের টুকরা, সন্দেশ, রসগোল্লা, দই, মিষ্টি ইত্যাদি কত রকমের খাবার দিয়াছিল, জামাই না খাইয়া সেগুলি পাতে ফেলিয়া রাখিয়াছিল। তাহারই যেন রাতের অন্ধকারের উপর মিছিল করিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। জামাইর ক্ষধার্ত জিহ্বা হইতে টস টস করিয়া পানি পড়িতে লাগিল। রাত্রি অনেক হইল; কিন্তু দারুণ ক্ষুধার জ্বালায় কিছুতেই তাহার ঘুম আসে না! বাড়ির সবাই ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। কুকুর বিড়ালও জাগিয়া নাই।

জামাই ভাবে, নিশ্চয়ই রান্নাঘরে এখনও অনেক কিছু খাবার পড়িয়া আছে। সে পা টিপিয়া টিপিয়া অতি ধরে ধরে ঘর হইতে বাহির হইল। ভয়ে তাহার বুক ঢিবঢিব করিতেছে। মনে হইতেছে, তাহার নিশ্বাস-প্রশ্বাস শুনিয়াও লোকে জাগিয়া উঠিতে পারে। আস্তে আস্তে পা ফেলিয়া সে  রান্নাঘরের দরজায় আসিয়া দাঁড়াইল। হায় হায়, ঘরের দরজা যে বাহির হইতে শিকল আটকানো! দম বন্ধ করিয়া সে অতি সাবধানে সেই শিকল খুলিয়া রান্নাঘরের ভিতরে প্রবেশ করিল।

এ হাঁড়িতে পেয়াজ-রসুন,--ও পাতিলায় মুগের ডাল, ওখানে মাছকাটা বঁটি। অন্ধকারে হাতড়াইয়া কিছুই ভালমতো বুঝিবার যো নাই।

একটি হাঁড়ির ঢাকনি খুলিতে কতকগুলি মুরগির ডিম তাহার হাতে লাগিল। এতে ত দারুণ ক্ষুধা--তাহার উপর খাইবারও অন্য কিছু নাই; সে তাড়াতাড়ি দুই তিনটি ডিম উঠাইয়া মুখে পুরিল, এমন সময় অসাবধানে হাত নাড়িতে একটা হাঁড়ি আর একটা হাঁড়ির উপর পড়িয়া শব্দ করিয়া ভাঙিয়া গেল।

অমনি বিড়াল ম্যাও ম্যাও করিয়া ডাকিতে লাগিল। বিড়ালের ডাক শুনিয়া উঠান হইতে বাঘা কুকুরটি ঘেউ ঘেউ করিয়া তাড়িয়া আসিল। শ্বশুড় জাগিল, শাশুড়ি জাগিল, শাশা-শালী সবাই জাগিয়া কলরব করিয়া উঠল। এ বাড়ি হইতে--ও বাড়ি হইতে--সে বাড়ি হইতে, কেহ লাঠি লইয়া, কেহ সাড়কি লইয়া, কেহ রামদা লইয়া ছুটিয়া আসিল।--চোর -- চোর--- চোর--- বাড়িতে ঢুকিয়াছে!

সকালে আসিয়া দেখিল রান্নাঘরের দরজা খোলা। নিশ্চয় চোর রান্নাঘরেই লকাইয়া আছে। ধর--ধর--চোর ধর। সকলে রান্নাঘরে আসিয়া দেখিল, জামাই ডিমের হাঁড়ির সামনে বসিয়া কাঁপিতেছে। শ্বশুর ডাকে ‘ও জামাই কি হইয়াছে?’ জামাই কোন কথা বলে না।


শাশুড়ি কাঁদিয়া উঠিল, ‘হায় হায়! আমার জামাই বুঝি বাঁচিবে না!’

বাড়ি কাছে ছিল এক নাপিত ডাক্তার। তাহাকে ডাকিয়া আনা হইল। সে জামাইর হাতের নাড়ি পরীক্ষা করিল--বুকের ঢিবঢিবানি গনিয়া দেখিল, কিন্তু রোগের কোনই লক্ষণ খুঁজিয়া পাইল না। তারপর জামাইর মুখের দিকে চাহিয়া দেখিল, তাহার মুখ ফুলিয়া রহিয়াছে।

অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া নাপিত বলিল, ‘জামাইয়ের মুখে ফোঁড়া হইয়াছে। তাই জামাই কথা বলিতে পারিতেছে না। ফোঁড়া কাটিয়া দিলেই জামাই কথা বলিবে।’

এই বলিয়া সে ঘচঘচ করিয়া তাহার ক্ষুরে ধার দিতে লাগিল। ক্ষুর ধার দেওয়ার শব্দ যেন জামাইকে টুকরো টুকরো করিয়া কাটিতে লাগিল। অনেকক্ষণ ধার দিয়া নাপিত জামাইর মুখে যেই ক্ষুর ধরিতে যাইতেছে তখনি জামাই বলিয়া উঠিল, ‘আমি ডিম খাই নাই।’ অমনি জামাইর মুখ হইতে দুটি তিনটি ডিম বাহির হইয়া আসিল। লোকজন, পাড়া পড়শি সকলেই বুঝিতে পারিল।

শাশুড়ি তাড়াতাড়ি জামাইকে খাওয়াইতে অন্য ঘরে লইয়া গেল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য