স্বার্থপর দৈত্য ওস্কার ওয়াইল্ড

স্কুল  থেকে ফেরার পথে প্রতিদিন বিকেলে ছোট্ট ছেলেমেয়েরা দৈত্যের বাগানে খেলতে যেত। এটি একটি সুন্দর নরম গালিচার মতো সবুজ বাগান। বাগানের এখানে সেখানে ঘাসের ওপর তারার মতো অসংখ্য ফুল ফুটে আছে। সেখানে বারোটির মতো পীচ্ গাছ আছে। বসন্তে এই সব গাছে গোলাপি ও মুক্তোর মতো নরম ফুলে ভরে ওঠে। এবং শরতে এগুলো ফলভারে নুইয়ে পড়ে। পাখিরা গাছের ডালে বসে সুমধুর গান গায়। এই গান শোনার জন্য ছেলেমেয়েরা কখনো খেলা পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়। পাখিরা নিজেরাই বলাবলি করে, ‘আমরা এখানে কত সুখী’! একদিন দৈত্য ফিরে এলো। সে এতদিন তার বন্ধু কর্নিশ ওগারের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিল। এবং সেখানে দীর্ঘ সাত বছর ছিল। সাত বছর পর সে তার নিজের বাড়িতে ফিরে এসেই দেখতে পায় তার বাগানে ছোট্ট ছেলেমেয়েরা খেলা করছে। ‘তোমরা এখানে কী করছ?’ কর্কশ স্বরে চিৎকার করে উঠল দৈত্য। এতে ছেলেমেয়েরা ভয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল।
দৈত্য বলল : আমার নিজের বাগান মানে আমার নিজের বাগান। যে কেউ তা বুঝতে পারে। আমি নিজেকে ছাড়া আর কাউকে এখানে খেলতে অনুমতি দিতে পারি না।



এরপর দৈত্য বাগানের চারদিকে উঁচু দেয়াল তুলে দিল। এবং নোটিশ বোর্ডে একটি নোটিশও টাঙিয়ে দিল। তাতে লেখা ছিল : অনধিকার প্রবেশকারীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা রুজু করা হবে।

সে ছিল স্বার্থপর দৈত্য। ছোট ছেলেমেয়েদের আর কোথাও খেলার জায়গা রইল না। তারা রাস্তায় খেলতে চেষ্টা করছিল, কিন্তু রাস্তায় প্রচুর ধুলোবালি ও শক্ত পাথর থাকায় সেখানে খেলাও সম্ভব হলো না। ছেলেমেয়েরা ছুটি শেষে কেবল উঁচু দেয়ালের চারপাশে ঘোরাফেরা করত এবং ভেতরে একটি চমৎকার বাগান আছে এর কথা বলত। ওরা এখন নিজেরাই পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করে, আহা! আমরা ওখানে কত সুখী ছিলাম। এরপর সারাদেশে ফুলে ফলে ভরে বসন্ত এলো। শুধু দৈত্যের বাগানে তখনো শীতকাল বিরাজ করছিল। সেখানে কোনো পাখিও ডাকল না, কোনো ছেলেমেয়েও গেল না। বৃক্ষরা ফুল ফোটাতে ভুলে গেল। একবার একটি সুন্দর ফুল ফোটার জন্য যেই ঘাসের ওপরে মাথা তুলছে অমনি সে নোটিশ বোর্ড দেখে বাচ্চাদের জন্য এতই দুঃখিত হলো যে সে আবার ঘাসের মধ্যে ডুবে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। আর  ফোটার চেষ্টা করল না। এতে একমাত্র যারা খুশি হলো তারা তুষার আর বরফ। ওরা চিৎকার করে বলল, এই বাগানে বসন্ত আসতে ভুলে গেছে। আমরাই এখানে সারা বছর ধরে থাকব। তুষারে সমস্ত ঘাস ঢেকে গেল এবং বরফ সমস্ত বৃক্ষ রুপালি করে দিল। তখন তারা উত্তুরে হাওয়াকে বাগানে আসার আমন্ত্রণ জানাল। এবং সে তাদের আমন্ত্রণে সাড়া দিল। সে একটি লোমশ কোট পরে এলো এবং সারাদিন বাগানে গর্জন করল। আর চিমনির ঢাকনাগুলো সে উড়িয়ে দিল।

সে বলল : এটি একটি আনন্দময় জায়গা। আমরা এখানে অবশ্যই শিলাবৃষ্টিকে আসতে বলবো। বলামাত্রই শিলাবৃষ্টি এলো। প্রত্যেকদিন তিন ঘণ্টা বাড়ির ছাদে শিলা বর্ষণ করল যতক্ষণ না ছাদের অধিকাংশ টালিগুলি খসে পড়ল। এরপর সে বাগানে ঘূর্ণিপাক খেয়ে নাচতে লাগল। সে ধূসর রঙের পোশাক পরিধান করেছিল এবং তার নিঃশ্বাস ছিল বরফের মতো।

স্বার্থপর দৈত্য, আপন মনে বলল, ‘আমি বুঝতে পারি না বসন্ত কেন এতো দেরি করছে?’ সে জানালার ধারে বসে তার তুষারাচ্ছাদিত বাগানের দিকে তাকিয়ে আরো বলল, আমি আশা করি খুব শিগগিরই আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু বাগানে আর বসন্ত এলো না, গ্রীষ্মও না। শরতে প্রত্যেক বাগান সোনালি ফলে ভরে গেল। কিন্তু দৈত্যের বাগানে শূন্যতা খাঁ খাঁ করতে লাগল। শরৎ বলল, সে খুব স্বার্থপর দৈত্য। সে জন্য সেখানে সারা বছর শীত থাকে। এবং উত্তুরে হাওয়া শিলাবৃষ্টি, তুষার ও বরফ গাছে গাছে নেচে বেড়ায়।

একদিন সকালে দৈত্য ঘুম থেকে উঠেই সুমধুর সঙ্গীত শুনতে পেল। এই সঙ্গীত এতোই সুমিষ্ট ছিল যে দৈত্য ভাবল রাজার বাদক দল বুঝি পাশ দিয়ে যাচ্ছে। এটা আসলে ছিল বহুদিন ধরে সে তার বাগানে কোনো পাখির গান শোনেনি। তাই এটা তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুমধুর সঙ্গীত বলে মনে হলো। তখন শিলাবৃষ্টি ছাদের ওপর তার নাচ বন্ধ করল এবং উত্তুরে হাওয়া তার গর্জন থামাল। এরপর সারাদেশে ফুলে, ফলে ও পাখিতে ভরা বসন্ত এলো। এ দৃশ্য দেখে দৈত্য লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে বাইরে তাকাল। খোলা জানালা দিয়ে একরাশ সুগন্ধি ভেসে এল।
সে কী দেখতে পেল?

সে একটি চমকপ্রদ দৃশ্য দেখতে পেল দেয়ালের ছোট্ট ফাঁক দিয়ে। ছোট্ট শিশুরা বাগানে ঢুকে পড়েছে এবং ওরা গাছের ডালে ডালে গিয়ে বসে আছে। প্রত্যেকটি গাছেই ছোট্ট শিশুরা বসে। গাছগুলি আবার শিশুদের ফিরে পেয়ে মহাখুশি। গাছে আবার ফুল ফুটল। গাছের ডালগুলি শিশুদের মাথার ওপর আদর বুলিয়ে যেতে লাগল। পাখিগুলিও আনন্দে গাছের ডালে ডালে কিচিরমিচির করতে শুরু করল। ফুলগুলো সবুজ ঘাসের ওপর হেসে উঠল। এটি একটি মনোহর দৃশ্য। বাগানের এক কোনায় এখনো কিন্তু শীতকাল রয়ে গেছে। এটি ছিল বাগানের অনেক দূরের একটি অংশ। সেখানে একটি ছোট্ট বালক দাঁড়িয়েছিল। সে এতোই ছোট ছিল যে সে গাছের ডালে উঠতে পারছিল না। সে চারদিকে ঘোরাফেরা করছিল আর বিকট শব্দে চিৎকার করছিল। আহা, গাছগুলো এখনো তুষার ও বরফে ঢাকা। জোরে উত্তুরে হাওয়া বইছিল। তখন বৃক্ষ আদর করে বলল, ওহে বালক তুমি ওপরে উঠে এসো। এবং যতটা সম্ভব বৃক্ষ তার ডাল নোয়াল যাতে সে গাছে উঠতে পারে। কিন্তু বালকটি এতোই ছোট্ট ছিল যে তার পক্ষে গাছের ডালে ওঠা সম্ভব হলো না।

এ দৃশ্য দেখে দৈত্যের মন গলে গেল এবং সে ভাবল, আমি এতদিন কত স্বার্থপর ছিলাম। এতদিনে বুঝলাম আমার বাগানে কেন বসন্ত আসে না। আমি ওই ছোট্ট অসহায় বালকটিকে গাছের ডালে বসিয়ে দেবো। তাতে আমার বাগান আবার চিরকালের মতো ছোট্ট সোনামণিদের খেলার মাঠে পরিণত হবে। এতদিন সে যে কাজ করেছে এর জন্য দুঃখবোধ করল। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসল এবং সামনের দরজাটা আস্তে খুলে বাগানে প্রবেশ করল। যেইমাত্র ছোট্ট শিশুরা তাকে দেখতে পেল, অমনি ভয়ে তারা পালিয়ে গেল। বাগানে ফের শীত নেমে এল। কেবলই ছোট্ট বালকটি পালিয়ে গেল না। তার জলভরা চোখে আসলে সে দৈত্যকে দেখতে পায়নি। দৈত্য চুপি চুপি বালকটির পেছনে এসে দাঁড়াল। এবং আস্তে করে কোলে নিয়ে ওকে গাছের ডালে বসিয়ে দিল। অমনি সে গাছটি ফুলে ফলে ভরে উঠল। পাখিরা গান জুড়ে দিল। ছোট্ট বালকটি হাত বাড়িয়ে দৈত্যের গলা জড়িয়ে ধরে চুমু খেল। যখন অন্য শিশুরা দেখল যে দৈত্যটা আগের মতো আর দুষ্ট নয়, তখন তারা দৌড়ে বাগানে এলো। তাদের সাথে বসন্ত নিয়ে এলো।



দৈত্য শিশুদের ডেকে বলল, এটি এখন থেকে তোমাদের বাগান। এই বলেই সে একটি শাবল নিয়ে এলো এবং মুহূর্তেই বাগানের উঁচু দেয়াল ভেঙে ফেলল। এরপর লোকেরা যখনই বারটার দিকে বাজারে যেতো, তখনই দেখতে পেতো দৈত্য অনিন্দ্য সুন্দর একটি বাগানে ছোট্ট সোনামণিদের সঙ্গে খেলা করছে। সারাদিন তারা খেলল। সন্ধ্যার সময় তারা দৈত্যকে বিদায় জানাতে গেল। তখন দৈত্য জানতে চাইল, কিন্তু তোমাদের ছোট্ট সাথীটি কোথায়? ওই যাকে আমি গাছে বসিয়ে দিয়েছিলাম। দৈত্য ওই বালকটিকে খুব ভালোবাসত, কারণ সে তাকে আদর করে চুমু খেয়েছিল। ছোট্ট শিশুরা উত্তরে বলল, ‘আমরা জানি না, সম্ভবত সে চলে গেছে।’ দৈত্য বলল, তোমরা অবশ্যই কাল ওকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবে। তখন শিশুরা বলল যে সে কোথায় থাকে তা আমরা জানি না, এমনকি এর আগে কোনদিন ওকে দেখিওনি। তাতে দৈত্য খুবই মন খারাপ করল। প্রতিদিন বিকেলে স্কুল ছুটির পর বাচ্চারা দৈত্যের সঙ্গে খেলা করতে আসত। কিন্তু ওই ছোট্ট বালকটি যাকে দৈত্য খুব ভালোবাসত, তাকে আর দেখা গেল না।


দৈত্য এর পর থেকে সকল শিশুর প্রতি সদয় হলো। সে প্রায়ই তার প্রথম দেখা শিশু বন্ধুটি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করত, ‘ইশ, আবার যদি ওর দেখা পেতাম! কী মজাই না হতো!’

সময় দাঁড়িয়ে থাকে না। এদিকে দৈত্য ক্রমে বৃদ্ধ ও দুর্বল হয়ে পড়ে। সে আর খেলতে পারে না। একটা বিরাটকার আর্মচেয়ারে বসে থাকে। ছোট্ট সোনামণিদের খেলা দেখে আর তার বাগানের তারিফ করে। একদিন দৈত্য বলল, আমার অনেকগুলো সুন্দর ফুল আছে। আসলে শিশুরাই আমার সবচেয়ে সুন্দর ফুল।

একদিন শীতের সকাল। দৈত্য পোশাক পরতে পরতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। সে এখন আর শীতকালকে ঘৃণা করে না, কারণ সে জেনে গেছে শীতের ভেতরেই বসন্ত ঘুমিয়ে থাকে। ফুলগুলো বিশ্রাম নেয়। হঠাৎ সে অবাক হয়ে চোখ কচলালো এবং তাকিয়ে থেকে বলল, এটি সত্যি একটি আশ্চর্যজনক দৃশ্য। বাগানের দূরে এক কোণে একটি গাছে সাদা ফুলে ঢেকে আছে। এর সব শাখা সোনালি আকার ধারণ করেছে এবং রুপালি ফলগুলি ডালে ঝুলে আছে। আর ওই গাছের নিচেই দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট বালকটি যাকে দৈত্য খুব ভালোবাসত। দৈত্য আনন্দে সিঁড়ি বেয়ে নিচতলায় নেমে এলো এবং তাড়াতাড়ি ঘাস মাড়িয়ে শিশুদের কাছে যেতে লাগল। শিশুদের কাছে যেতেই তার মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল এবং জানতে চাইল, কার এত সাহস যে তোমাকে আঘাত করেছে? শিশু বালকটির দুই হাতের তালুতে এবং দুই পায়ের পাতায় পেরেকের ক্ষতচিহ্ন ছিল। দৈত্য রাগে চিৎকার করে উঠল, কে তোমাকে আঘাত করেছে? আমাকে জলদি বল, আমি তাকে আমার বড় তলোয়ার দিয়ে টুকরো করে ফেলবো।


তখন বালকটি জবাব দিল না। আসলে এগুলি ভালোবাসার আঘাত। দৈত্য জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কে?’ সে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল এবং বালকটির সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। বালকটি হেসে উঠল এবং দৈত্যকে বলল, তুমি একবার তোমার বাগানে আমাকে খেলতে দিয়েছিলে। আজকে তুমি আমার সাথে আবার বাগানে যাবে যাকে স্বর্গ বলা হয়।

এরপর ছোট্ট ছেলেমেয়েরা যখন ঐদিন বিকেলে খেলতে এলো তারা দৈত্যকে গাছের নিচে পড়ে থাকতে দেখল, আর দেখল সাদা ফুলে ঢেকে আছে তার শরীর।

গল্পের ছবিগুলো : barbbjornson. com/ থেকে নেওয়া
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য