অলস ভূত

এক দেশে ছিল একটা বিরাট বটগাছ। সেই বটগাছে বাস করতো একদল ভূতরা। ভূত রাজার আদেশ অমান্য করাই, এক ভূত পরিবারের সব ভূতকে মৃত্যুদণ্ড দেন ভূত রাজা। তবে সেই ভূত পরিবারের একটা শিশু ভূতকে ছাড়া। শিশু ভূতটি ছিল কলিমদ্দি।
ভূত রাজা তার রাজ্যের ভূত-পেতনি সবাইকে আহ্বান জানায়, ছেলেটিকে যেন সবাই বাবা-মার আদর স্নেহ দিয়ে বড় করে। কেউ রাজার আহ্বানে সাড়া না দেয়ায়, শিশু কলিমদ্দিকে মানুষ রূপে রাজা মানুষের মধ্যে পাঠিয়ে দেয়। তবে রাজা রেখে দেন, কলিমদ্দির সব ভূতো যন্ত্র-মন্ত্রর কৌশলগুলো।
রাজা তার মন্ত্র রাখার বাক্সে বন্দি করে রাখে আর সবাইকে বলে, কলিমদ্দি তার মন্ত্র শক্তি ফিরে পাবে যখন কলিমদ্দির বয়স হবে বিশ বছর।
সেদিন রাতে কলিমদ্দিকে রেখে যায় এক কাঠুরিয়ার দরজার সামনে। কাঠুরিয়ার কোনো সন্তান ছিল না। গভীর রাতে শিশুর কান্না কাঠুরিয়ার কানে যায়। সে দরজা খুলে দেখে কালো কুচকুচে একটা শিশু কাঁদছে।
কাঠুরিয়া প্রথমে চমকেই উঠে। কাঠুরিয়া তার স্ত্রীকে ডেকে বলে, দেখো, দেখো একটা সন্তান। তার স্ত্রীর মুখেও একটাই প্রশ্ন এ সন্তানটা কার? কেনই বা এখানে রেখে গেলো।

কাঠুরিয়া বললো, ভালোই হলো এ সন্তানটাকে লালন-পালন করে আমাদের সন্তানের অভাব মিটাবো। শিশুটিকে কোলে নিতেই কাঠুরিয়া দেখলো শিশুটির হাতে একটা চিঠি। তাতে লেখা আছে, ‘এই শিশুটির নাম কলিমদ্দি। এর বাবা-মা এ দুনিয়াতে নাই। আজ থেকে আপনারাই এর বাবা-মা। নিজের সন্তানের মতো একে বড় করবেন। তবে এর নামটা কলিমদ্দিই রাখবেন। আল্লাহ্ হাফেজ।’

কাঠুরিয়া চিঠিটা পড়ে বললো, ‘বউ আজ থেকে এই কলিমদ্দিই হবে আমাদের সন্তান, কী বলো?’ কাঠুরাণী বললো, ‘ঠিক আছে তাই হবে।’
আদর স্নেহ দিয়ে লালন পালন করতে লাগলো কলিমদ্দিকে। তবে কলিমদ্দি যতো বড় হয় ততো যেন কালো হতে লাগলো। তাই গ্রামের লোকজন কলিমদ্দির নাম রাখলো কালিমদ্দি। আবার অনেকে ডাকে কালিমদ্দি ভূত বলে। তারা মনে করে ভূতরা খুব কালো হয়। ছোট্ট বেলা থেকেই কলিমদ্দি গ্রামে বাহুল্য পরিচিত লাভ করে কালিমদ্দি ভূত নামে। তাকে সবাই কালিমদ্দি ভূত নামেই চেনে বা জানে।

দেখতে দেখতে কেটে গেলো আরো দশটি বছর। এর মধ্যে মারা যায় কাঠুরিয়া। এজন্য কালিমদ্দি আর কাঠুরাণী মা বড় সমস্যায় পরে যায়। সংসার চলে না তাদের এক বেলা খেতে পেলে দুই বেলা না খেয়ে থাকতে হয় কালিমদ্দিদের।

কালিমদ্দির বর্তমান বয়স ১৭ বছর হলে কী আর হবে। সে যে বড় অলস কোনো কাজ-র্কম করে না। বৃদ্ধ মাকেই কাঠ কাটতে হয়। কালিমদ্দি শুধু খায় আর ঘুমায়। একদিন তার মা কালিমদ্দিকে বকা দেয়। এই রাগে কালিমদ্দি রাতে বনের মধ্যে যায়। বনের মধ্যে হাঁটছে আর কালিমদ্দি বিভিন্ন কথা ভাবছে, এমন সময় তাকে একদল সত্যিকারের ভূত ডাক দেয়। কালিমমিদ্দি ভূত দেখে আগে থেকেই ভয় পায় না। তাই সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, ‘কী হয়েছে? কী বলতে চাস তোরা? আমাকে এখন বিরক্ত করিস না। আমি অনেক চিন্তায় আছি। আমি কোনো কাজ করতে পারি না এজন্য মা আমাকে বকা দিয়েছে। বৃদ্ধ মা কাঠ কাটলে পেটে যায় নইলে না খেয়ে থাকতে হয়।’

ভূতগুলো গাছ থেকে বলে, ‘বকা তো দিবেই, মায়ের সঙ্গে কাজ করতে পারিস না?’
কালিমদ্দি বললো, ‘আমি তো কাজ করতে চাই, কাজ করার শক্তি তো পাইনা।’

একটা বয়স্ক ভূত বললো, ‘শক্তি পাবি কী করে, তোর শক্তি যে ভূত রাজার কাছে বন্দি।  আসলে তুই সত্যি ভূত।’
কালিমদ্দি রেগে যায়, সে মনে করছে তারাও তাকে ভূত বলছে, তাই ভূত বলার অপরাধে একটা ইট ছুড়ে মারে বয়স্ক ভূতটির দিকে। কালিমদ্দি রেগেই বলে, ‘ভূতের বাচ্চা ভূত, আমি কালো দেখে তোরাও আমাকে ভূত বলে ডাকছিস?’
ইটটি বয়স্ক ভূতের নাকে গিয়ে লাগে এবং নাকটা ফেটে যায়। ভূতটি কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘বিশ বছর পূরণ হলেই বুঝবি, তুই ভূত না মানুষ।’

কালিমদ্দির মা কালিমদ্দিকে খুঁজছে। একটা মশাল জ্বালিয়ে। খুঁজতে খুঁজতে বনের মধ্যে আসে তার মা। কালিমদ্দির দেখা পায় এবং বলে, ‘তুই এখানে কী করিস? আমি তোকে অনেকক্ষণ ধরে খুঁজছি, চল্‌ ঘরে চল্।’ কালিমদ্দি বলে, ‘না আমি ঘরে যাবো না। তুমি আমাকে বকা দিয়েছো।’

মা বললো, ‘বাবারে আমি কী তোকে মন থেকে বকা দিতে পারি বল? এমনীতে রাগের মাথায় না হয় কিছু বলেছি। তাই বনে চলে আসবি? আয় বাবা ঘরে আয়, আমি ঘুমাতে পারছি না বাবা।’

কালিমদ্দির মায়ের কথা শুনে মনটা নরম হয়ে যায়। এবং মায়ের সঙ্গে ফিরে আসছে ঘরে। এমন সময় কালিমদ্দি মাকে বলে, ‘মা জানো আমি না একটা ভূতের নাক ফেটে দিয়েছি, ভয়ে ভূতগুলো পালিয়েছে।’

মা অবাক হয়ে বললো, ‘কেন?’

মাকে কালিমদ্দি সব বললো। মা সব শুনে বললো, ‘বাবা, ওরা ভালো না, তোর যদি ক্ষতি করে ফেলে?’ কালিমদ্দি বললো, ‘মাগো, আমি ওদের ভয় পাই না। কারণ, ওরা ভূত আমিও ভূত। মানুষজন আমাকে তো ভূত বলেই ডাকে।’
মা বললো, ‘তোকে মানুষ ভালোবেসে ভূত বলে ডাকে। আর তোর বুদ্ধি যে কবে হবে?’

ঘরে এসে মা ও ছেলে খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। পরেরদিন সকাল আটটার দিকে মা যাবে কাঠ কাটতে, ঘরে চাল নেই। তাই রাতে একটু বেশি হওয়া ভাতগুলো পান্তা করে রেখেছে। মা সকালে খেয়ে কাঠ কাটতে যাবেন। কালিমদ্দিকে মা খাওয়ার জন্য ডাকলে কালিমদ্দি ঘুম থেকে চোখ না খুলতেই বললো, ‘কী তরকারি দিয়ে রান্না করেছো?

মা বললো, ‘রান্না করিনি। কিছু পান্তা আছে তা দুজনে মিলে ভাগ করে খাবো। বাবা, এখন ঘুম থেকে উঠ্।’
কালিমদ্দি মনে মনে বললো, আগে খেয়ে নেই তারপর আবার ঘুমাবো। কালিমদ্দি এবার বিছানা থেকে উঠে ভালোভাবে মুখ হাত ধুয়ে খেতে বসেছে। পান্তা খাচ্ছে, মা তাকিয়ে দেখছে কালিমদ্দির দিকে।
মা বললো, ‘বাবা আজ একটু রাজার বাড়িতে যাস। কাজ পেতে পারিস। তাছাড়া আমার বয়স হয়েছে। আমি যদি এখনি মারা যাই তোকে কে খাওয়াবে বাবা?’

মার মুখে এমন কথা শুনে কালিমদ্দির চোখে পানি এস যায়। কালিমদ্দি বললো, ‘মাগো! এমন করে আর কোনদিন বলো না, কথা দাও? তুমি ছাড়া আমিও বাঁচবো না। মাগো, আমি আজই যাবো রাজার কাছে।’

মা বললো, ‘ঠিক আছে আমি আর কোনদিন এমন করে বলবো না।’

কালিমদ্দির আর ঘুম হলো না। মা গেলো বনে কাঠ কাটতে। কালিমদ্দি রাজার কাছে গিয়ে বললো, ‘হুজুর আমি খুব বিপদে পড়েছি। আমার বৃদ্ধ মা বনে কাঠ কাটে আর আমি বাড়িতে বসে খাই। হুজুর আমি কাজ করতে চাই আপনার দরবারে।’

রাজা বললো, ‘তুমি কী কাজ পারো?’
কালিমদ্দি বললো, ‘হুজুর আমি শুধু ঘুমাতে পারি। কোনো কাজ পারি না

রাজা তাকে বললো, ‘তুমি লাল পাহাড়ে যাও, সেখান থেকে ফিরে এলে তবেই পাবে আমার এখানে একটা কাজ। তবে মিথ্যার কোনো স্থান আমার এখানে নেই। তোমাকে লাল পাহাড় থেকে আনতে হবে এক মুঠো মাটি। মাটিটা লাল পাহাড়ের কী-না তা পরীক্ষা করার জন্য আছে আমাদের এখানে আধুনিক যন্ত্র। ভুলেও যদি মিথ্যা বলো মনে রেখো তোমার মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত।’

কালিমদ্দি তাতেই রাজি হয় এবং রাজাকে বলে, ‘হুজুর আমি আজই যেতে চাই লাল পাহাড়ে। তবে তার আগে আমি আমার মার সঙ্গে দেখা করতে চাই।’

রাজা বললো, ‘ঠিক আছে তুমি সন্ধ্যার সময় যাবে লাল পাহাড়ে।’
কালিমদ্দি বাড়িতে এসে মাকে সব বলে, ‘মা জানো, লাল পাহাড়ে অনেক কঠিন কাজের প্রশিক্ষণ হয়। সেখানে প্রশিক্ষণ দিতে গিয়ে একশ জনের মধ্যে বিশজনই ফিরে আসে না।’
মার মনটা বলে কালিমদ্দিকে যেতে দিবো না। কিন্তু রাজাকে কথা দিয়েছে কালিমদ্দি, যদি কথা না রাখে রাজা কালিমদ্দিকে কঠিন সাজা দিবে। তাই মা বললো, ‘বাবা তুই পারবি না বাবা ‘
কালিমদ্দি বললো, ‘মাগো, তোমার দোয়া থাকলে আমি সব পারবো।’

মা আর বাধা দেয় না। সন্ধ্যার সময় মায়ের পায়ে সালাম করে চলে যায় লাল পাহাড়ের দিকে। তবে কালিমদ্দি নিজেই জানেনা লাল পাহাড় কোথায়। মার মুখে শুনেছে আমাদের পাড়া গ্রামের কোনো পথ দিয়ে বহুদূরে লাল পাহাড়। অনেক পথিককে জিজ্ঞাসা করেছিল লাল পাহাড় কোথায়? পথিকরা কালিমদ্দিকে পাগল মনে করে  বলে সামনেই লাল পাহাড়। কালিমদ্দি সামনের দিকে এগোতেই থাকে। তিনদিন হয়ে গেলো লাল পাহাড়ের দেখা পেলো না। আজ কালিমদ্দি একটা বটগাছের নিচে ঘুমিয়ে পড়লো। সেই বটগাছে ছিল ভূত রাজা।

ভূত রাজা এক ভূত প্রজাকে বললো, ‘এই ছেলেটা কে? সে এখানে কী করে?

ভূত প্রজা রাজাকে সব খুলে বলে। রাজা ভূত প্রজাকে বলে, ‘এই ছেলেটিকে আর কষ্ট দিব না। ওকে আমাদের কারাগারে এনে বন্দি করো। ও ওর শক্তি ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত ওকে বন্দি করে রাখবো।’

প্রজা বললো, ‘ঠিক আছে হুজুর, তাই হবে।’ এই বলে কালিমদ্দিকে ঘুমন্ত অবস্থায় তুলে নিয়ে যায় ভূতপ্রজা।
ঘুমন্ত অবস্থায় কালিমদ্দির জীবন থেকে কেটে যায় তিনটি বছর। কালিমদ্দির তিন বছর পর  ঘুম ভেঙে যায়। এবং দেখতে পায় সে তার বিভিন্ন পরিবর্তন। সে চমকিয়ে উঠে বলে আমি কেন এখানে। কী ভাবে এলাম এখানে আমি তো যাচ্ছি লাল পাহাড়ের খোঁজে।

ভূত রাজা কালিমদ্দিকে সব খুলে বলে, তার অতিথির কথা, এবং রাজা কালিমদ্দির কাছে ক্ষমা চায়। কারণ ভূত রাজার কারণেই কালিমদ্দির এমন দশা। রাজা, কালিমদ্দিকে লাল পাহাড়ের মাটি দেয় আর বলে এইবার তোমার মানুষ রাজার কাছে যাও। তাকে বুঝিয়ে দাও তুমি অলস নও। তুমি বীর। কালিমদ্দি ভূত রাজাকে বললো, ‘হুজুর আমি কী আমার মন্ত্র শক্তি দিয়ে আমাদের অভাব মিটাতে পারবো?’

রাজা বললো, ‘শুধু তোমার অভাব না। তুমি ইচ্ছা করলে পুরো রাজ্যের অভাব মিটাতে পারো।’

কালিমদ্দি সত্যি খুশি হলো এবার। এবং বিদায় নিয়ে উড়ে চলছে তার নিজ বাড়িতে। আর মনে মনে বলছে, আমি বাড়ি গিয়ে মাকে আর কাঠ কাটতে দিবো না। আমি মাকে নতুন শাড়ি দিবো। মাকে নিয়ে মাঝে মাঝে পরীর দেশে যাবো ঘুরতে। মা আমাকে অনেক কষ্ট করে এতো বড় করেছে, মাকে আর কোনদিন কষ্ট দিবো না। মা আর আমি সুখে শান্তিতে বসবাস করবো।

কালিমদ্দি বাড়িতে এসেই মা মা বলে ডাকছে। মার কোনো সাড়া নেই। তাই পাশের বাড়ির এক চাচিকে বললো, ‘চাচি মাকে দেখেছেন?’ চাচি কালিমদ্দির মুখে এমন কথা শুনে ডুকরে কেঁদে উঠে আর বলে, ‘কালিমদ্দি তোর মা আর নেই, তোর মা আর নেই।’

কালিমদ্দি বুঝে গেছে তার মা জননী এই পৃথিবীতে আর নেই অচিন দেশে চলে গেছেন চিরদিনের জন্য। কালিমদ্দিও মায়ের জন্য অনেক কাঁদে। মায়ের কবরের পাশে গিয়ে বলে, ‘মাগো কত কষ্ট করে তুমি আমারে এতো বড় করলে মা। আজ আমি আমার শক্তি ফিরে পেলাম আর তুমিও চলে গেলে?’

মায়ের কবরের পাশে কালিমদ্দি অনেক কাঁদে। তারপর আসে রাজার কাছে। রাজা কালিমদ্দিকে দেখে চমকেই উঠে এবং বলে তুমি কী করে এখানে আসলে? এ পযন্ত কোনো মায়ের সন্তান লাল পাহাড়ে গিয়ে ফিরে আসিনি। তুমি কীভাবে এলে?’

কালিমদ্দি সব খুলে বলে রাজাকে এবং রাজাকে কালিমদ্দি অনেক সোনা রুপা দেয় আর বলে, ‘হুজুর আপনি আমাকে কথা দেন এই রাজ্যে আর কোনো বৃদ্ধ মা-বাবা ভাতের অভাবে থাকবে না এবং মরবে না।’ রাজা কালিমদ্দিকে কথা দিল। রাজ্যের প্রজারা ও জেনে গেল কালিমদ্দি সত্যি সত্যি ভূতই ছিল। কালিমদ্দি গ্রাম থেকে চলে যাওয়ার পর রাজা সব প্রজাকেই সোনা রুপা ভাগ করে দেয়। তারপর থেকে এই রাজ্যে আর অভাব থাকলো না।

লেখাটি পোষ্ট করেছেন: গোলাম মওলা আকাশ
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য