হোঁদল কুতকুতে -- মনোজ বসু

বাঘের নাম হুমদো, বাঁদরের নাম টেনি। থাকে সুন্দরবনে। দু’জনে ভারী ভাব। ডালের উপর টেনি বসেছে, তলায় হুমদো। সুখ-দুঃখের কথা হচ্ছে।
হুমদো বলে, “দু-দুটো দিন পেটে কিচ্ছু পড়েনি। জল খেয়ে আছি।
“কেন, কেন?”
হরিণগুলো ভয়-তরাসে হয়ে গেছে। একটা গাছের পাতা পড়লেও দৌড়ে পালায়।
টেনি বলে, “গাঙে-খালে মাছ তো আছে।”
হুমদো বলে, “নেই। জেলেরা জাল টেনে টেনে চিংড়ি-চুনো অবধি ছেঁকে নিয়ে যায়। বেলান্ত কাদা ঘেঁটে আমার কপালে শুধু শেওলা-শামুক।
টেনির দিকে তাকিয়ে বলে, “তুই খাসা আছিস ভাই। খাস ফলপাকুড় তুলে তারা পালাতে পারে না, ডালের বোঁটায় ঝুলে থাকে।”
টেনি বলে, “ঝুলত না, ফলটল সব খতম হয়ে যেত, শুধু বন নিয়ে যদি পড়ে থাকতাম। গাঁ গ্রামে গিয়ে চরে ফিরে খাই, সেই জন্য অভাব হয় না।”
হুমদো ধরে বসল, “আমিও গাঁ-গ্রামে যাব। যাইনি কখনো। তাই ভয়-ভয় করে। কিন্তু না গিয়ে আর চলছে না।” টেনি সাহস দিয়ে বলে, “কিসের ভয়? যে গাঁয়ে ইচ্ছে ঢুকে পড়বি, গরু-বাছুর ছাগল-কুকুর হাঁস-মুরগি দেদার ধরে ধরে খাবি। চাই-কি মানুষও—”
হুমদো শিউরে উঠে বলে, “ওরে বাবা, ঐ জন্তুর শুনেছি বুদ্ধি সাংঘাতিক।”“হলে হবে কী। হরিণের মতন দৌড়তে পারে না, জোড়া শিং নেই গরুর মতন। বাঁদর আমরা আঁচড়াই-কামড়াই, ওদের সে-ক্ষমতা নেই, এমন কী কষে দাঁত খিঁচিয়ে খানিকটা ভয় দেখাবে, সেটুকুও পারে না। চারখানার জায়গায় পা মোটে দুটো, নেংচে নেংচে বেড়ায়। ঘাড় মটকানো অতি সোজাহুমদোর ভয় তবু একেবারে যায় না। বলল, “অজানা গাঁয়ে যাব না ভাই। যে তল্লাটে তুই যাস, পথঘাট ভাল করে বাতলে দে, আজ আমি সেখানে চলাফেরা করব। গিয়ে গিয়ে পাকাপোক্ত হয়ে তখন আর বাছাবাছি লাগবে না।”
বড়োসড়ো এক গ্রাম, বাদাবন থেকে সামান্য দূর। দালান কোঠা, খোড়োঘর, আমকাঁঠালের বাগবাগিচা অগুন্তি। টেনি আজ-কাল সেখানে যাচ্ছে। জ্যৈষ্ঠ মাস—গাছে গাছে মহাস্ফূর্তিতে আম খায়, কাঁঠাল খায়, লিচু খায়। হাটের দোকানে মর্তমান কলার কাঁদি টাঙানো—টুক কর কাঁদিসুদ্ধ নিয়ে টেনি চালের উপর বসে, কলা খায় আর খোসা ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারে হাটুরে মানুষের গায়ে। হুমদো গিয়ে হাজির সেখানে—সেই গ্রামের রায়-বাড়ি।

রায়েরা বড়লোক—শৌখিনও। গ্রাম জায়গায় পাকারাস্তার অভাব বলে মোটরগাড়ি রাখা চলে না—ঘোড়ারগাড়ি রেখেছেন। এবং গাড়ির জন্য কোচোয়ান, ঘোড়ার জন্য সহিস। বাবুদের ঝকমকে অট্টালিকার কাছেই কোচোয়ান ও সহিসের খোড়োঘর। ঘর-কানাচে ঝোপ-জঙ্গল—অন্ধকার দস্তুরমতো। হুমদোকে টেনি পই-পই করে বলে দিয়েছে, পেটের ক্ষিধেয় আগে বেরিয়ে পড়িসনে, ঝোপেঝাপে গা ঢাকা দিয়ে থাকবি। চারিদিকে নিশুত হয়ে গেলে তারপর বেরুনো—খাওয়াদাওয়া তখন। তা খাসা জায়গা মিলেছে বটে। হুমদো ঘাপটি মেরে রইল।, ধরলেই কাত।” জানলা খোলা, ঘরের মধ্যে বাচ্চা ছেলে কাঁদছে। কান্না থামাতে মা হরেক চেষ্টা করছে। বলে, “চুপ চুপ! শিয়াল এসেছে খোকন, কান্না থামাও। নয়তো কঁ্যাক করে টুঁটি ধরে নিয়ে যাবে।”
হুমদোর চমক লাগে, দেখল নাকি তাকে? আঁধারে আবছা রকম দেখে জলজ্যান্ত বাঘকে শিয়াল বলে ঠাউরেছে। বাচ্চা থামবে কী কান্নার জোর আরও বাড়িয়ে দিল। হুমদো ভাবছে, একরত্তি মানুষের ছানা—কিন্তু সাহস কী বিষম! শিয়াল শুনে আমলই দিল না মোটে।
মা এবারে বলে, “খোকনমণি, কেঁদো এসেছে রে, কানাচে আছে। চুপ, চুপ!”
হুমদোকেই বুঝি কেঁদো বলছে। মন্দের ভাল। কেঁদোও বাঘ বটে, তবে জাত্যাংশে ছোট। কুলীন বাঘেরা নাক সিঁটকায়, কেঁদোর সঙ্গে ওঠা বসা করে না। তা হলেও তারাও খানিকটা-বাঘ, না মেনে উপায় নেই।
মা বলছে, “গোয়ালে ঢুকে বাছুর নিয়ে গিয়েছিল, কান্না শুনে এক্ষুনি ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়বে। শিগ্গির থামো, নয়তো দোর ভেঙে ঢুকল বলে।”
থামতে বয়ে গেছে! কান্নার আরও জোর। হুমদো তাজ্জব: মানুষ নামের জন্তু কী দুর্দান্ত রে? এক ফোঁটা ছেলে—তারও দাবরাব।
কিছুতেই না-পেরে মা এবারে বাঘই এনে ফেলল। “খোকন রে, বাঘ এসে গেছে। যেমন-তেমন নয়—বাঘের রাজা রয়াল-বেঙ্গল হালুম করে ঝাঁপিয়ে পড়বে—চুপ, চুপ।”
খোকনের দৃকপাত নেই। কান্নার সঙ্গে এবারে পা-দাপানি। মা রেগে যায়: “তবে রে ছেলে, বড্ড জেদ হয়েছে তোমার। হোঁদল কুতকুতেকে ডাকি, এসে চুলের ঝুঁটি ধরে নাচাক। হোঁদল, ও হোঁদল—”
আহ্বানমাত্রেই হোঁদল হাজির। হাজির হয়ে সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিল: অ-র্-র্-র-র— মা নিজেই গলার ভিতর থেকে আওয়াজ বের করে—খোকন জানে, হোঁদলের গর্জন। কান্না থামিয়ে সে একেবারে চুপ। ঘর-কানাচে হুমদো বাঘও হকচকিয়ে গেছে।
এর উপরে মা আবার শোলক পড়ে দিল:
হোঁদল বলে নাটাবনে কাঁটাগাছে আছি—
যে ছেলেটা কাঁদে তার ঝুঁটি ধরে নাচি।
হুমদো ভাবছে, এত বনে-বাদাড়ে ঘুরি, হোঁদল কুতকুতে জানিনে তো। দেখিনি কখনো, নামও শুনিনি। নিশ্চয় কোন ভয়ানক জন্তু। দামাল বাচ্চা বাঘের রাজা রয়াল-বেঙ্গলকেও তাচ্ছিল্য করে, হোঁদলের নামে ঠান্ডা। সেই হোঁদল ঘরের মধ্যে—বেজখানার ওপারে। এত কাছাকাছি থাকা ঠিক হচ্ছে না—

আস্তাবলের ওদিকটা গাছে-গাছে অন্ধকার। সরে গিয়ে হুমদো গাছের নীচে গা-ঢাকা দিয়ে দাঁড়াল।
কান্না থামিয়ে ফোঁপাচ্ছে খোকন। মা গায়ে হাত বুলোয়, আর হোঁদলকে নিরস্ত করে, “চলে যাও তুমি হোঁদল। খোকনবাবু ঘুমিয়ে গেছে—বেহুঁশ হয়ে ঘুমুচ্ছে। তাই না খোকন?”
“হুঁ।” বলল খোকন। ঘাড় নেড়ে সায় দিল।
হঠাৎ গণ্ডগোল—বিষম চেঁচামেচি। চোর এসে রায়েদের অট্টালিকায় সিঁধ খুঁড়ছে, রায়কর্তা দেখে ফেলেছেন। ‘ধর্ ধর্’ করে চেঁচাচ্ছেন তিনি। বাড়ির লোকেরাও ‘ধর্ ধর্’ করছে। পালাচ্ছে চোর। দরোয়ান চাকরবাকর সব পিছু ছুটেছে।

কাকে ধরতে আসেহোঁদলকে না হুমদো-বাঘকে? অন্ধকারে হুমদো আরও গুটিসুটি হল। চোর ছুটতে ছুটতে সেইখানটা এসে পড়েছে। হুমদোকে ভেবেছে ঘোড়াআস্তাবল থেকে একটা ঘোড়া কী গতিকে বেরিয়ে পড়েছে। পাকা সওয়ার সে এমন সুযোগ ছাড়বে কেন? এক লম্ফে হুমদোর পিঠের উপর। জিন-লাগাম নেই বলে চোর সর্বশক্তিতে গলা জড়িয়ে ধরেছেহুমদোর দম আটকানোর গতিক। তার উপর চোরের কোমরে গোঁজা সিঁধকাঠি, ধারালো-মুখ হাতখানেক লম্বা লোহার শাবল, যা দিয়ে সে সিঁধের গর্ত খুঁড়ছিল। সিঁধকাটি হাতে নিয়ে দিল তিন-চারটে মোক্ষম ঘা কষিয়ে, ঘোড়া যাতে জোর ছুটে বেরোয়। ঘা খেয়ে হুমদো পিঠ বাঁকায় আর দৌড়য়। ভাবছে, হোঁদল ঘাড়ে চেপেছে, আর রক্ষে নেই। উঠি-পড়ি সে দৌড়চ্ছে।

রাত্রির শেষ প্রহর। চাঁদ উঠল এতক্ষণে, চারিদিকে ক্ষীণ জ্যোৎস্না। চোর  তাকিয়ে দেখেকী সর্বনাশ! ঘোড়া নয়, বাঘ। বাঘে চড়ে ছুটেছে সে। এখন উপায়?

বড় এক বাগিচার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নিচু ডাল পেয়ে তাই ধরে চোর ঝুল খেয়ে পড়ল। ফনফন করে গাছের মাথায় উঠে গেল সে। বাঘে গাছে চড়তে পারে নাখাও কলা!
হুমদোর খালি পিঠ, তবু কিন্তু ভয় ঘোচে না তার। দুরন্ত বেগে ছুটছে, হোঁদলে না তেড়ে ধরতে পারে। বাদানের বাসায় গিয়ে উঠলে তবে সোয়াস্তি। পরম বন্ধু টেনিও ঐ বাগিচায় লিচু গাছে বসে মহানন্দে লিচু খাচ্ছে। সে দেখে, তীরের মতো কী যেন একটা আসছে। কাছে এলে চিনল।
“হুমদো, বাসায় ফিরছিস বুঝি? দৌড়স কেন রে?”
টেনিকে পেয়ে ভরসা হল। দাঁড়াল সে একটুখানি। হাঁপাচ্ছে।
টেনি শুধায়, “খাওয়া দাওয়া হল কেমন?”
“আর খাওয়া! খাওয়া মাথায় উঠে গেছে। হোঁদলে ধরেছিল।”
টেনি অবাক হয়ে বলে, “হোঁদল কী?”
হুমদো ব্যাখ্যা করে বলে, “হোঁদল কুতকুতে।”
জিনিসটা আরও গোলমেলে হয়ে পড়ল। টেনি বলে, “জন্মে তো নামই, শুনিনি। কোন বস্তু সেটা? গাছ-পালা না পশুপক্ষী? জলে না ডাঙায় বেড়ায়? না, আকাশে?”

হুমদো বলল, “বলিস কীরে? পয়লা দিনই আমি হোঁদলের খপ্পরে পড়ে গেলাম, পিঠে চড়ে তাবৎ অঞ্চল ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ালতুই এদ্দিনে নামটাও শুনিস নি?”
সড়াক করে টেনি তলায় নেমে এলো। হুমদোকে কীরকম নাজেহাল করেছে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনল সব। রেগেমেগে তার হাত ধরে টানে। “কোন গাছে উঠেছে, আমায় দেখিয়ে দে। কেমন জন্তু, কতখানি তাগত ধরে, দেখব।”
হাত ছাড়াতে পারে না হুমদো, ভয়ে ভয়ে এগুতে হয়। দূর থেকে গাছ দেখিয়ে দিয়ে সে সরে দাঁড়াল। মস্ত বড় কাঁঠাল গাছ। পা টিপে টিপে গিয়ে টেনি উঁকি ঝুকি দিল। ফিরে এসে হুমদোকে ছি-ছি করছে। “অ ঘেন্না, মানুষ একটা! বাঘ হয়ে তুই মানুষ বয়ে এলিবাঘ জাতের তুই মুখ হাসিয়েছিস। শুনলে তারা থুতু দেবে তোর মুখে।”

শোধ না তুলে ছাড়াছাড়ি নেই। দুই বন্ধু বীরদর্পে কাঁঠালতলায় গিয়ে হাজির। টেনি বলল, “তলায় থাক তুই হুমদো, আমি গাছে চড়ছি। আঁচড়ে কামড়ে ধাক্কা মেরে নীচে ফেলে দেবো, টুক করে তুই অমনি মুখে পুরবি।”
রাগে গরগর করতে করতে হুমদো বলে, “হাড় খাবো মাস খাবো, চামড়া নিয়ে আমার মেয়েটার জন্য ডুগডুগি বানাবো।”
ঘোর বিপদগাছের উপর থেকে চোর দেখতে পাচ্ছে। বাঘ নীচে ওঁত পেতেছে, বাঁদর উঠে আসছে মতলব করে। গাছের গুঁড়িতে গর্তদিব্যি বড়সড় গর্ত একটা। চোর তার ভিতরে ঢুকে গেল।
“কাপুরুষ!” বলে বাঁদর ঘৃণাভরে গুঁড়ির উপর দুমদুম করে লাথি মারে। বলে, “লুকিয়ে বাঁচতে পারবিনে, আমিও কায়দা জানি। হয় বেরোবি, নয়তো দম আটকে মরে থাকবি গর্তের ভিতরে।”

বাঁদুরে ভাষায় কথাচোর অবশ্য বুঝল না। মট-মট করে মেলা ডালপালা ভেঙে টেনি গর্তের মুখ আটকে দিল। নিজে তার উপর চেপে বসেপাতালতা সরে না যায়, বাইরের বাতাস সামান্য ছিদ্রপথেও না ঢুকতে পারে। গ্যাঁট হয়ে বসে মুখ খিঁচিয়ে চার হাত নেড়ে টেনি দেমাক করছে। “এইবারে কী করবি ওরে ব্যাটা মানুষ”
উম-হুম হুড়ুদ্দুম বাম্-মাম্বাঁদুরে আর্তনাদ করে টেনি গড়াতে গড়াতে গাছতলায় একেবারে হুমদোর পাশে। রক্তের ধারা বয়ে যাচ্ছে। দিশা না পেয়ে চোর সিঁধকাঠির ধারালো মুখ দিয়ে দারুণ খোঁচা মেরেছে টেনির উরুতে। বীরত্ব-টিরত্ব উপে গিয়ে এখন টেনি থরহরি কম্পমান। হুমদোকে বলে, “ঠিক বলেছিস ভাই। দেখতে মানুষের মতন, আসলে হোঁদল কুতকুতে। দাঁত বসিয়ে দিয়েছেওরে বাবা, ওরে মা, পুরো এক বিঘত মাপের দাঁত”
মুহূর্ত আর দেরি নয়, ল্যাজ তুলে হুমদো দৌড় দিল। টেনিকে বলে, “এক্ষুনি পালা, প্রাণে যদি বাঁচতে চাস।”
টেনি পারে না। জখম বড় সাংঘাতিক। ছুটতে গিয়ে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ল। ডুকরে কেঁদে ওঠে, “ফেলে যাসনে ভাই হুমদো। পিঠে তুলে নে। নয়তো হোঁদল নেমে এসে আমায় শেষ করবে।”
বাঘের পিঠে বাঁদর। হোঁদলের আতঙ্কে বাঘ পাঁই-পাঁই করে ছুটছে। চোর দেখে গাছের গর্ত থেকে মুখ বাড়িয়ে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য