বৃদ্ধ ষাঁড়

প্রাসাদের গম্বুজের মাথার ওপর বাদশা বিরাট একটি ঘন্টা ঝুলিযে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। দড়ি বাঁধা থাকত সেই ঘন্টার সাথে। মাটিতে পড়ে থাকত সেটি। কেউ যখন বাদশার সাক্ষাৎপ্রার্থী হত তখন দড়িটা ধরে সে টান দিত এবং দড়ির সেই টানে ঘন্টার আওয়াজ হলেই বাদশা দরবারে তাকে তলব করতেন কেন ঘন্টা টানছে।

একদিন দুপুরে ঘন্টা বেজে উঠল। অসময়ে ঘন্টার আওয়াজ শুনে প্রহরীরা ছুটে এসে দেখতে পেল একটা ষাঁড় ঘন্টার দড়িটা চিবোচ্ছে। তারা ষাঁড়টিকে তাড়িয়ে যে যার কাজে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পরে ষাঁড়টা আবার ফিরে এসে দড়িটা চিবোতে লাগল। আবার ঘন্টা বাজাতে লাগল। বাদশা এবার স্বচক্ষে ব্যাপারটি দেখলেন। তিনি তাঁর প্রহরীদের আদেশ দিলেন ষাঁড়টিকে দরবার কক্ষে নিয়ে আসতে।

ষাঁড়টিকে সভাকক্ষে আনা হলে বীরবলকে তার সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দিতে বললেন বাদশা। বীরবল দেখলেন, ষাঁড়টির বয়স হয়েছে অনেক। ষাঁড়টাকে দেখে তাঁর মনে করুণা হল। সে যতদিন কর্মক্ষম ছিল তার প্রভু তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে কসুর করেনি এবং বিনিময়ে তার খাওয়া দাওয়া ও থাকার ব্যবস্থা করত। আজ সে বৃদ্ধ হয়ে পড়ায় তাকে এখন সে ছেড়ে দিয়েছে--এই যুক্তি দেখিয়েই বীরবল বাদশাহকে বললেন, ‘ষাঁড়টি বাদশার কাছে ন্যায়বিচারের জন্য এসেছে। ওর ন্যায় বিচার আনাকে করতে হবে হুজুর। আপনি বিচার না করলে কোথায় যাবে সে? আকবর ষাঁড়টির মালিককে তলব করে দরবারে ডাকলেন। কেন দরবারে ডেকে এসেছেন সে কথা তাকে বলা হল।

তার কাছে কৈফিয়ত চাইতে সে বলল, জাহাপনা, সাঁড়টি বৃদ্ধ রুগ্ন হয়ে গিয়েছে, এখন ওর কাজ করার ক্ষমতা নেই, আর শুধু শুধু বসিয়ে খাওয়ানোর মতো অবস্থাও আমার নেই, সেজন্য আমি ছেড়ে দিয়েছি। ও যদি ওর নিজের খাবারটা জোগাড় করে নিতে পারে তাহলে আমাকে আর কষ্ট করতে হয় না।’

বীরবল লোকটির কাছে সপ্রশ্ন যুক্তি পাড়লেন যে, ‘যদি ঘরের মা-বাব  বৃদ্ধ ও অথর্ব হয়ে পড়ে, তাহলে সে কি তাদের খাওয়াবার ব্যবস্থা করবে না, না তাদের ঘর থেকে বের করে দেবে?’
লোকটি বলল, ‘আমার আপনজনের সঙ্গে এই ষাঁড়টির তুলনা চলে না। আমি কী করে বাবা-মা বুড়ো হলে তাড়িয়ে দেব? সে কখনই হতে পারে না।’
বীরবল তখন বললেন, ‘এই জন্তুটিও তো বরাবরাই তোমার কাছে ছিল। এতদিন তোমারই কাজে লেগেছে; এখন তোমার কর্তব্য এর বাকি জীবনের ভার অবশ্যই নেওয়া।’

বীরবলের এই ন্যায়বিচারের তারিফ করে বাদশা সেই লোকটিকে শাস্তির ভয় দেখিয়ে বাধ্য করলেন ষাঁড়টিকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে তার সবকিছু দায়িত্ব বহন করার। যদি না করে তবে শাস্তির জন্য সে যেন তৈরী হয়। তখন বাধ্য হয়ে লোকটি ষাঁড়টিকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য