Home Top Ad

Responsive Ads Here

Search This Blog

বোধিসত্ত্ব একবার পায়রা হয়ে জন্মান। বারাণসীর নাগরিকদের মধ্যে তখন পায়রা ও নানা রকম পাখির প্রতি প্রবল প্রীতি ছিল। তারা মনে করত পাখিদের যত্নআত্ত...

কপোত জাতক

বোধিসত্ত্ব একবার পায়রা হয়ে জন্মান। বারাণসীর নাগরিকদের মধ্যে তখন পায়রা ও নানা রকম পাখির প্রতি প্রবল প্রীতি ছিল। তারা মনে করত পাখিদের যত্নআত্তি করলে নিজেদেরই মঙ্গল হবে। পাখিদের থাকার সুবিধের জন্য তারা খড় দিয়ে ঝুড়ি বানিয়ে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখত। বারাণসীর প্রধান বণিকের রাঁধুনিও রান্নাঘরে এরকম একটি ঝুড়ি ঝুলিয়ে রেখেছিল। বোধিসত্ত্ব সেই ঝুড়িতেই থাকতেন। রোজ তকালে তিনি খাবারের খোঁজে বেরিয়ে যেতেন। ফিরতেন সন্ধায়।

একটি কাক একদিন সেই রান্নাঘরের চালের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল। উড়ে যাওয়ার সময় রান্নাঘরের মাংসের সুগন্ধ পেয়ে তার খুব লোভ হল। কি করে মাংস খাওয়া যায় ভাবতে লাগল। পাশের একটা গাছে বসে রইল। আর ভেবে চলল। সন্ধা হলে বোধিসত্ত্ব ফিরে এলেন। বোধিসত্ত্ব রান্নাঘরে ঢুকে গেলেন। তা দেখে কাক ভাবল এই পায়রাটাই আমার ভরসা। ওর ওপরে ভর করলেই আমার মনের আশ মিটবে।
পরের দিন ভোরে রান্নাঘরের কাছে কাকটা অপেক্ষা করছিল। বোধিসত্ত্ব খাবারের খোঁজে উড়তে শুরু  করলে সে-ও পিছু পিছু উড়ে চলল। বোধিসত্ত্ব তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি আমার সঙ্গে আসছ কে ভাই?’

কাকা বলল, ‘আপনাকে আমার খুব মনে ধরেছে, এখন থেকে আপনার চেলা হয়ে থাকতে চাই।’
বোধিসত্ত্ব বলল, ‘সে কি কথা। তুমি এক জিনিস খাও, আমি আরেক জিনিস খাই। আমার চেলা হলে তোমার অনেক কষ্ট হবে।’
কাকের মনে তো অনেক বুদ্ধি। সে বলল, ‘খাবারের ব্যাপারটা সত্যিই আলাদ। যখন আপনি আপনার খাবারের খোঁজে থাকবেন সেই ফাঁকে আমি খাবারটা জুটিয়ে নেব। শুধু আপনার সঙ্গে থাকার অনুমতি দিন।’
বোধিসত্ত্ব বললেন, ‘বেশ তাই হোক। তবে তোমাকে সাবধানে চলাফেরা করতে হবে।’

কাককে সাবধান করে দিয়ে বোধিসত্ত্ব ঘাসের বীজ খুঁটে খেতে লাগলেন। কাকও তখন পোকামাকড় ধরে খেতে লাগল। নিজের পেটটি ভরার পর সে বোধিসত্ত্বের কাছে এসে বলল, ‘প্রভু, আপনি অনেকক্ষণ ধরে খেয়ে যাচ্ছেন। বেশি খাওয়া ভাল নয়।’ যাই হোক এপর সন্ধাবেলা বোধিসত্ত্ব বাসায় ফিরছেন। সঙ্গে সেই অনুগত কাকটিও আছে।

তারা রান্নাঘরে ঢুকলে রাঁধুনি ভাবল, ‘পায়রাটা দেখছি একটা সঙ্গী জুটিয়েছে। তাহলে এর জন্যও একটা ঝুড়ি ঝুলিয়ে দেই।’ এই ভেবে সে আর একটি ঝুড়ি ঝুলিয়ে দিল। তারপর থেকে দুজনে ওখানেই রয়ে গেল।

একদিন বণিকের বাড়িতে মস্ত ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। রাঁধুনি রান্নাঘরের জায়গায় প্রচুর মাংস ঝুলিয়ে রেখেছিল। দেখে কাকের দারুণ লোভ হল। ‘যেভাবেই হোক এই মাংস খেতেই হবে,’ মনে মনে সে ঠিক করল।

তারপর সে সারারাত অসুখের ভান করে কাতরাতে লাগল। ভোরবেলা বোধিসত্ত্ব বরলেন,‘চল ভাই, এবার চরতে যাই।’ শুনে কাক বলল, ‘আজ আপনি একাই যান, আমার কাঁধে বড় ব্যাথা হয়েছে।’ শুনে বোধিসত্ত্ব বললেন,‘ভাই, কাকের যে কাঁধে ব্যাথা হয়, কোনদিন শুনিনি। মনে হচ্ছে রান্নাঘরের মাংসের লোভেই তুমি এসব বলছ। এসব বাদ দাও, মানুষের খাবার তোমার খাবার হতে পারে না। আমার সঙ্গে চল, নিজের খাবার খুঁটে খাবে।’

কাক বলল, ‘না প্রভু, আমার সত্যি চলার শক্তি নেই।’ তখন বোধিসত্ত্ব বলেলেন,‘ঠিক আছে, তোমার কাজেই তোমার পরিচয় পাওয়া যাবে। তবে লোভে পড়ে কিছু করতে যেও না।’

বোধিসত্ত্ব চলে গেলেন। রাঁধুনি মাংস রান্না করতে লাগল। ভাপ বের করে দেওয়ার জন্য কড়াইয়ের ডালাটা একটু ফাঁক করে দির। তারপর কড়াইতে ঝাঁঝড়ি বসিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে একটু বাইরে গেল। কাকাও তখন ঝুড়ি থেকে মাথা বের করে দেখল রাঁধুনি বাইরে গিয়েছে।

কাকা ভাবল, মাংস খাওয়ার এই হচ্ছে সুবর্ণ সুযোগ। বেশ বড় দেখে একটা মাংসের টুকরো খাওয়াই ভাল। এই ভেবে সে ঝাঁঝরির কাছে বসতে যেতেই ঝাঁঝরির শব্দ হল। রাঁধুনিও ছুটে এল সঙ্গে সঙ্গে।

কাকের কান্ড দেখে সে বেজায় রেগে গেল। কাকের সমস্ত পাল ছাড়িযে নিল সে। তারপর নূন-লঙ্কা বাটা তার সারা শরীরে মাখিয়ে ঝুড়ির মধ্যে ফেলে দিল।

বোধিসত্ত্ব ফিরে এসে দেখলেন কাক ছটফট করছে। কাছে গিয়ে তার হাল দেখে বুঝলেন, ‘অতি লোভেই কাকের এই অবস্থা।’তারপর ভাবলেন, ‘আমারও আর এইখানে থাকা উচিত নয়।’
বোধিসত্ত্ব চলে গেলেন। রাঁধুনি কাককে ঝুড়িসমেত ময়লার গাদায় ফেলে দিল।

এই জাতকের মর্মকথা: বেশি লোভ করলে তার ফল পেতেই হবে।

0 coment�rios: