সাধুতার জয়

হজরত মোহাম্মদ (সা.) যে সময় আরবে ধর্ম প্রচার করছিলেন, সেই সময়ে বহু লোক তাঁর কথায় বিশ্বাস করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু অপর এক দল লোক ছিল যারা তাঁর উপর দারুণ চটা ছিল। তাঁরা কেবলই তাঁর নিন্দা আর কুৎসা করতো। ইহুদিরা ছিল সেই দলে।

এইরূপ একটি ইহুদি-পরিবারের একটি মেয়ে হজরতের ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল। সংসারের কাজকর্ম শেষ করে রাতে অবসর সময়ে সে খোদার নাম করতো এবং কখনো কখনো একমনে কুরআন শরীফ পড়তো।

একথা একদিন মেয়েটির মা জানতে পারলো। ভয়ের তার আর সীমা রইল না। স্বজাতিরা জানতে পারলে একটা অনর্থ ঘটাবে। তাই মেয়েকে তিনি বারণ করতে লাগলেন। অনেক হিতোপদেশ দিলেন, বললেন : “তোমার পিতামাতার সনাতন ধর্মই তোমার ধর্ম। যারা জ্ঞানী তারা কখনো আপন ধর্মত্যাগ করে অপর ধর্ম গ্রহণ করে না। তুমি ইসলামের প্রতি অনুরাগিণী হয়েছ জানতে পারলে, তোমার পিতা খুব অসন্তুষ্ট হবেন। কাজেই এ বদখেয়াল তুমি ছাড়।”
মেয়েটির ব্যবহারে কিন্তু মাতার উপদেশ শুনবার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। সে পূর্বের মতোই খোদার নাম গান করতে লাগলো।

কথা কখনো চাপা থাকে না। ধীরে ধীরে বিষয়টা চারিদিকে রাষ্ট্র হয়ে পড়লো; ক্রমে পিতার কানেও গিয়ে পৌঁছলো। তিনি ক্রোধে আগুন হয়ে মেয়েকে খুব খানিকক্ষণ গাল-মন্দ তো দিলেনই অধিকন্তু আবার এরূপ আচরণ করলে কঠিন শাস্তি দেবেন বলে ভয় দেখালেন।

দু’চার দিন পর সকলে দেখতে পেলো, মেয়েটির কাছে সকল শাসনই নিষ্ফল হয়েছেÑ কোনো রকম ভয়কে সে গ্রাহ্যের মধ্যেই আনেনি।

ইহুদিটি ছিলেন সমাজের একজন মাতব্বর ব্যক্তি। তিনি সমাজের আর পাঁচজনের ভালো-মন্দের বিচার করতেন। কিন্তু তাঁর নিজের ঘরেই আপনার কন্যা সনাতন নিয়ম ভঙ্গ করে অপর ধর্ম পালন করছে,এর কোনো রকম প্রতিকারই তিনি করতে পারছেন না। এ যেন বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা আর কি!

তিনি এবার কন্যাকে ডেকে খুব ভর্ৎসনা করলেন, আর ভয় দেখালেন যে, আবার যদি খোদার নাম করে,অথবা কুরআন শরিফ পড়ে, তবে মারতে মারতে তাকে বাড়ি থেকে দূর করে দেয়া হবে।

কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। ইহুদিটি দেখলেন, মেয়েটি তার সমাজের এবং গৃহের কলঙ্ক। একে অবিলম্বে দূর করা প্রয়োজন। কর্তব্যে নিকট আত্মীয় পরভেদ নেই। আপনার কন্যা বলে মমতা করলে চলবে না। একে গৃহ থেকে চিরতরে বিদায় করে দিতে হবে।

সমাজের অন্যান্য মাতব্বরদের সহিত তিনি এ বিষয়ে পরামর্শ করতে লাগলেন। তারা নানা জনে নানা রকম যুক্তি দিলেন। বহু তর্ক-বিতর্কের পর স্থির হলোÑ মেয়েটির নিকট তার পিতা একটি আংটি রাখতে দেবেন। তারপর মেয়েটি যেন টের না পায় এমন ভাবে চুপি চুপি আংটিটা তার কাছ থেকে নিয়ে নদীর মধ্যে ফেলে দেয়া হবে।

পরের দিন বাড়িতে বহু মাতব্বর ও ভদ্র ব্যক্তিকে নিমন্ত্রণ করা হবে। নিমন্ত্রিত লোকদের সম্মুখে মেয়েটির কাছে আংটি ফেরত চাইলে সে যখন দিতে অপারগ হবে, তখন সেই অপরাধে তার প্রাণ বধ করা হবে।

পরামর্শ মতো মেয়েটির নিকটে একটি আংটি রাখতে দেয়া হলো এবং তার পিতা নিজেই গোপনে সেই আংটি নিয়ে নদীতে ফেলে দিলেন।

পরদিন প্রাতঃকালে ইহুদি কয়েকটা বড় বড় রুই মাছ এনে হাজির করলেন। স্ত্রী এবং মেয়েকে বললেন : “আজ আমার কয়েকজন বিশিষ্ট বন্ধু এখানে আহার করবেন। তাঁদের জন্য আজ বিশেষভাবে আয়োজন করতে হবে।”

মাতা রান্না করতে লাগলেনÑ মেয়েটি মাছ কুটতে বসলো। হঠাৎ একটি মাছের পেটের মধ্য থেকে একটি আংটি বেরিয়ে পড়লো। মেয়েটি আংটিটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে দেখলেন, তার পিতা গতকল্য যেটি রাখতে দিয়েছিলেন ঠিক সেইটিই- কারণ এর ওপরে তার পিতার নাম লেখা রয়েছে। আংটিটা নিয়ে সে লুকিয়ে রাখলো। নিমন্ত্রিত লোকেরা যথাসময়ে এলেন এবং সকলের চর্ব-চোষ্য ভোজন সমাপ্ত হলো।

পূর্বের পরামর্শ মতো ইহুদি কন্যাকে বললেন : ‘গতকল্য যে আংটিটা তোমার কাছে রাখতে দিয়েছি, সেটা এখনই এনে দাও।

কন্যা আংটি এনে পিতার হাতে দিল।

ইহুদি রীতিমতো বিস্মিত হয়ে বললো : ‘তুমি নিশ্চয়ই জাদুকরী, নইলে এ আংটি কাল আমি নিজের হাতে নদীর মধ্যে ফেলে দিয়েছি। কি করে এটা ফিরিয়ে পেলে বল।

মেয়েটি জবাব দিলো : ‘সব খোদার ইচ্ছা? আমি আজ একটা রুই মাছের পেটের মধ্যে আংটিটা পেয়েছি’। মেয়ের কথায় ও আদর্শে পিতার মন ইসলাম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হলো! তিনি এবং নিমন্ত্রিত লোকেরা একবাক্যে বলতে লাগলেনÑ খোদা যাকে রক্ষা করে তাকে কেউ বধ করতে পারে না।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য