কৃষ্ণ জাতক

ব্রহ্মদত্তের আমলে বোধিসত্ত্ব একবার গরু হয়ে জন্মালেন। যে গেরস্থের গোয়োলে তাঁর জন্ম হয় তাদের অবস্থা খুব ভাল ছিল না। তারা এক বৃদ্ধার বাড়িতে ভাড়া থাকত। পরে ভাড়া দিতে না পারায় ভাড়ার বদলে বৃদ্ধার হাতে বোধিসত্ত্বকে তুলে দেয়। বৃদ্ধা তাঁকে ছেলের মতো ভালোবাসতো। ভাত, ফ্যান ছাড়াও ভালো ভালো জিনিস খেতে দিত।

বোধিসত্ত্ব একটু ডাগর হতেই গায়ের রং হল কাজল কালো। গাঁয়ের গরুদের সঙ্গে বোধিসত্ত্বও মাঠে চরতে যেতেন। তাঁর মেজাজ ছিল খুব ঠান্ডা। বাচ্চারা তার শিং ধরে টানত, কান ধরে টানত, গলা ধরে ঝুলে পড়ত। কিন্তু তিনি কখনো তাদের আঘাত করতেন না।

বোধিসত্ত্বের সঙ্গে ঐ বৃদ্ধার সম্পর্কটা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল মা ছেলেন। একদিন বোধিসত্ত্ব ভাবলেন, ‘আমার মা কত কষ্ট করে। আমি ছেলে হয়ে কিছুই করতে পারছি না। যদি টাকা রোজগার করতে পারি, মার দুঃখ কমে যাবে।’ এই ভেবে তিনি কাজের খোঁজ করতে লাগলেন।
একদিন বোধিসত্ত্ব দেখলেন নদীর ধারে পাঁচশ গোরুর গাড়ি নিয়ে একজন লোক হিমসিম খাচ্ছে।
বোধিসত্ত্ব তখন মাঠে চরছিলেন। নদী পর্যন্ত এসে গাড়িগুলো আর নড়ছে না। হাজার গোরু একসঙ্গে যুতেও কোন লাভ হচ্ছে না। সবাই মিলে টেনেও একখানা গাড়ি অবধি নড়াতে পারছে না। আশপাশ যেসব গরু চরে বেড়াচ্ছিল লোকটা তাদের খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। সে গরু চিনত। এক নজর দেখেই বুঝতে পারল কোন গরুটা ভাল জাতের, কোনটা খারাপ জাতের।

বোধিসত্ত্বকে দেখেই বুঝতে পারল, ‘এ বেশ ভাল জাতের গরু। গায়ে জোর আছে। একে দিয়েই আমার কাজ হবে।’ তখন সে রাখালকে জিজ্ঞেস করলঃ ‘এই গরুটা কার? একে গাড়িতে যুতে গাড়ি পার করতে পারলে ভাল মজুরি দেব।’

রাখাল বলল, ‘গরুর মালিক এখানে নেই। আপনি ইচ্ছা করলেই একে গাড়িতে যুতে দিতে পারেন।’
কিন্তু লোকটা যখন বোধিসত্ত্বকে নাকে দড়ি লাগিয়ে তাঁকে টানতে গেল, সে এক পা-ও নড়ল না। বোধিসত্ত্ব মনে মনে ঠিক করেছিলেন, ‘মজুরি ঠিক না হলে নড়ছি না।’ লোকটি তাঁর মনের ভাব বুঝে বলল, ‘আপনি এই পাঁচশ গাড়ি পার করে দিলে গাড়ি প্রতি ২ টাকা করে দেব। মানে সবশুদ্ধ হাজার টাকা দেব।’ বোধিসত্ত্ব তখন নিজে থেকেই গাড়িগুলোর দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁকে একেবার একেকটা গাড়ির সঙ্গে যুতে দেওয়া হতে লাগল আর তিনি টেনে টেনে সেগুলো পার করে দিতে লাগলেন। এভাবে পাঁচশ গাড়িই পার করা হযে গেল।

লোকটি বণিক। সে ভাবল দু টাকার একটাকা করে দিলে পাঁচশ টাকা বাঁচে। তাই সে পাঁচশ টাকা একটা ছোট থলেয় পুরে বোধিসত্ত্বের গলায় ঝুলিয়ে দিল। তখন বোধিসত্ত্ব ভাবলেন, লোকটা দেখছি এক নম্বরের ঠগ, চুক্তিমত মজুরি দিচ্ছে না। তাহলে আমিও একে যেতে দেব না।’ যেমন ভাবা তেমন কাজ। বোধিসত্ত্ব গাড়িগুলো আগলে দাঁড়ালেন। তাঁকে এক চুলও নড়ানো গেল না।

বণিক বুঝতে পারলেন, ‘আমি যে চুক্তিমত টাকা দেই নি সেটা বোধ হয় গরুটি টের পেয়েছে।’ তখন সে বোধিসত্ত্বকে থলেটিতে আরো পাঁচশ টাকা দিয়ে বলল, ‘এই নিন, আপনার মজুরির পুরো টাকা দিয়ে দিলাম।’

বোধিসত্ত্ব হাজার টাকা তার মাকে দিলেন। বৃদ্ধা টাকা পেয়ে অবাক। ‘কোথায় পেলি বাবা’ বলে সে বোধিসত্ত্বের দিকে তাকাল। অত কষ্ট করে বোধিসত্ত্ব তখন বেশ কাহিল। রাখালের মুখে সব শুনে বৃদ্ধা বলল, ‘আহারে বাছা, তোর রোজগার খাব। আমি কোন দিন তো তাকে কিছু বলিনি, কেন তুই অত খাটতে গেলি।’ তারপর সে বোধিসত্ত্বের শরীরে হাত বোলাতে লাগল। গরম জলে তাঁকে স্নান করাল। খেতে দিল।

এই গল্পের নীতিকথা: মায়ের সেবার করা সকল সন্তানের ধর্ম।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য