অশ্ব জাতক

বারাণসীতে তখন রাজত্ব কেরছেন ব্রহ্মদত্ত। সেই সময় বোধিসত্ত্ব একবার ঘোড়া হয়ে জন্মান। ভাল হাতের এবং যেথেষ্ট সুলক্ষণযুক্ত ছিলেন বলে রাজা তাকে মঙ্গলাম্ব করে নেন।
বোধিসত্ত্বকে আর পাঁচটি ঘোরার সঙ্গে সাধারন ঘোড়াশালে না রেখে সুন্দর ঘর দেওয়া হয়েছিল। এক লাখ দোমের সোনার থালায় তাকে দামী পুরনো চালের ভাত খেতে দেওয়া হত। তাছাড়া ঘরটি সুগন্ধি ভরিয়ে রাখা হত। মাথার ওপর সোনার তারা আঁকা চাঁদোয়া। গন্ধ তেলের প্রদীপ জ্বলত।

বারাণসীর আশেপাশের রাজাদের অনেক দিনের লোভ বারাণসী দখল করা। একবার সাত রাজা একজোট হয়ে ব্রহ্মদত্তের কাছে একটি চিঠি পাঠাল। তাতে লিখা ছিল, ‘আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে যদি নিজের রাজ্য রাখতে পার তো ভাল, না হলে রাজ্য ছেড়ে দাও। আত্মসমর্পন কর।’
ব্রহ্মদত্ত রাজসভা ডাকলেন। মন্ত্রী, কোটাল, সেনাপতি সবাই এল। চিঠিটা সবাইকে দেখিয়ে রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এখন কি করা উচিত বলুন।’ শলা পরামর্শ করে সবাই একযোগে বলল, ‘মহারাজ, প্রথমেই আপনি নিজে যুদ্ধি যাবেন না। বরং আপনি আমাদের বীর আশ্বারোহীকে যুদ্ধে পাঠান। যেস যদি না পারে তখন দেখা যাবে কি করা যায়।
ব্রহ্মদত্ত সেই ঘোড়াসওয়ারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘দেখ বাছা, তুমি কি সাত রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারবে?’ ঘোড়াসওয়ার বলল, ‘মহারাজ, যদি মঙ্গলাশ্বে চড়ে যুদ্ধ কিরি তাহলে জম্বু দ্বীপের সব রাজা একজোট হয়ে লড়লেও আমার সাথে এঁটে উঠবে না।’ রাজা বললেন, ‘তোমার পছন্দমত যে কোন ঘোড়া বেছে নিয়ে যুদ্ধে যেতে পার। ঘোড়াসওয়ার তখন নিচু হয়ে রাজাকে প্রণাম করে বলল, ‘ আপনার আজ্ঞা শিরোধার্য।’

তারপর সে বোধিসত্ত্বকে ঘরে বাইরে নিয়ে এল। তাকে বর্ম পরিয়ে দিল। নিজেও সব রকম অস্ত্র গুছিয়ে নিয়ে বোধিসত্ত্বের পিঠে চড়ে বসল। তলোয়ার খুলে ঝড়ের বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে সে বেরিয়ে গেল। বোধিসত্ত্ব বিদ্যুৎ গতিতে রাক রাজার সৈন্য ডিঙ্গিয়ে তার মুখোমুখি হলেন। ঘোড়াসওয়ার সেই রাজাকে বন্ধী করে এক পলকে বারাণসীতে ফিরে এল।

এভাবে পরপর পাঁচ রাজা বন্দী হল কিন্তু ছ নম্বর রাজাকে বন্ধী করার সময় বোধিসত্ত্ব আঘাত পেলেন। যদিও তিনি সেই রক্তাক্ত অবস্থাতেই ছ নম্বর রাজাতে ঘায়েল করে রারাণসেীতে ফিরে  এলেন। কিন্তু ফিরে আসার পর মাটিতে পড়ে গেলেন।

ঘোড়াসওয়ার তখন বোধিসত্ত্বের সাজ ও বর্ম খুলে আরেকটি ঘোড়াকে সাজাল্। বোধিসত্ত্ব চোখ খুলে এই দৃশ্য দেখে ভাবলেন, ‘ঘোড়াসওয়ার আবার ঘোড়া সাজাচ্ছে। কিন্তু সাত নম্বর রাজাকে ঘায়েল করে ধরে আনা তার সাধ্যে কুলবে না।’

তখন তিনি শুয়ে শুয়েই ঘোড়াসওয়ারকে ডেকে বললেন, ‘ওহে বীর শোন, আমি ছাড়া আর কেউ শত্রুর শিবিরে ঢুকে সাত নম্বর রাজাকে বন্দী করে আনতে পারবে না। এত কষ্ট করে আমি যে কাজটা প্রায় সেরে এনেছি তা নষ্ট হয়েত দেব না। তুমি এক কাজ কর, আমাকে কোন মতে দাঁড় করিয়ে দাও। তারপর আমাতে আবার যুদ্ধসাজে সজিয়ে দাও।’

একথা শুনে ঘোড়াসওয়ার বোধিসত্ত্বের চোটজখমের জায়গাগুলো বেঁধে দির। তাঁকে আবার সাজিয়ে দিল। আর  এবারও বোধিসত্ত্ব সাত নম্বর রাজাকে ধরে নিয়ে এলেন বারাণসীতে।

আহত ঘোড়াকে রাজার কাছে নিয়ে যাওয়া হল। তিনি রাজাকে বললেন, ‘মহারাজ, এই সাত রাজাকে হত্যা করবেন না। এদের প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিন যাতে আর কখনও হিংসার কবলে না পড়ে। আমি আর ঘোড়াসওয়ার যে কাজ করলাম তার পুরষ্কার এই বীর যোদ্ধাকেই দেবেন। আপনি নিজে দান-ধ্যান করবেন। শান্তির পথে থাকবেন। সুবিচার করবেন।’
বোধিসত্ত্ব তখন মরণাপন্ন। রাজার লোকজন এক এক তাঁর  সাজ খুলে ফেলতে লাগল। তবে তাদের কাজ মেষ হবার আগেই বোধিসত্ত্ব পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছেন।

রাজা বোধিসত্ত্বের শেষ কাজ মর্যদার সঙ্গে করলেন। বীরকে অনেক পুরষ্কার দিলেন। অহিংসার পথে চলার জন্য শপথ করিয়ে রাজাদের ছেড়ে দিলেন। আর নিজে শান্তিতে রাজ্যশাসন করে একদিন লোকান্তরে গেলেন।

এই জাতকের শিক্ষা: জ্ঞাণী বিপদের মধ্যেও দিশেহারা হন না বরং প্রাণ দিয়েও কর্তব্য পালন করেন।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য