মহিলামুখ জাতক

বোধিসত্ত্ব এক সময় রাজা ব্রহ্মদত্তের মন্ত্রী ছিলেন। তখন রাজার হাতিশালে সুলক্ষণযুক্ত একটি হাতি ছিল। তার নাম মহিলামুখ। হাতিটি এত শান্ত ও ভব্য ছিল যে রাজা তাকে মঙ্গলহস্তী করেন।
রাক রাতে হাতিশালার পাশে কয়েকটি চোর এসে আলাপ করতে বসে। চুরি-চামারির ব্যাপারে তারা শলা পরামর্শ শুরু করল। তারা এই সব কথা বলাবলি করতে লাগল:
‘সিঁদ কাটতে হবে ঠিক এই খানটায়। পাঁচিলের এই জায়গায় ফোকর বানিয়ে ঢুকতে হবে। চুরির মাল নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে ফোকরটা আরো বড় করে নিতে হবে। চুরি করার সময় যদি দরকার হয় তাহলে খুন পর্যন্ত করতে হবে। তাহলে আর কারো সাধ্যি হবে না বাধা দেওয়ার। চোরের অত ভদ্র শান্ত হলে চলে না। তাদের হতে হবে দয়ামায়াহীন।

এইসব পরামর্শ করে সে রাতের মত তারা চলে গেল। তারপর আবার পরের রাতে  এল। কথাবার্তা সেই এক। ভোর হওয়ার আগে আবার চলে গেল। এভাবে রাতে পর রাত চলতে লাগল।
রোজ রাতেই এইসব পরামর্শ শেুনে মহিলামুখ হাতির মাথা গেল বিগড়ে। সে ভাবল, ‘এরা আমাকেই উপদেশ দিচ্ছে। আমাকে দয়ামায়া ছাড়তে হবে। খুনটুন করতে হবে।’ পরের দিন সকালেই সে একেবারে ভিন্নমূর্তি ধারণ করল। প্রথমে ভোরবেলা মাহুত আসা মাত্র তাকে শুঁড়ে জড়িয়ে তুলে এক আছাড় মারল। সে বেচারার ভবলীলা সাঙ্গ হল। তারপর যে এল হাতি তাকেই আছড়ে মারতে লাগল।

মহিলামুথ পাগল হয়ে গেছে শুনে ব্রহ্মদত্ত খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। মন্ত্রী বোধিসত্ত্বকে বললেন, ‘আপনি একার দেখে আসুন না হাতিটার কি হল, হঠাৎ কেন মাথাটা বিগড়ে গেল।’

বোধিসত্ত্ব নানাভাবে মহিলামুখকে খুঁটিয়ে দেখলেন। শরীরে রোগের কোন চিহ্ন পেলেন না। তখন ভাবতে লাগলেন হঠাৎ এমন কি হল যে, শান্ত সুন্দর মহিলামুখ এমন দুর্দান্ত হয়ে উঠল। বোধিসত্ত্ব জানতেন হাতি খুব অনুকরণপপ্রিয় জীব। ফলে তাঁর মনে হল, নিশ্চয়ই বদমায়েশ লোকজন এর ধারেকাছে বসে খারাপ কথা আলোচনা করেছে। হাতি ভেবেছে তাকেই ঐসব করতে বলা হচ্ছে।

হাতিশালের লোকটিকে যেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইদানিং হাতিশালের কাছে কোন বদমায়েশ লোকদেরকে ঘুরঘুর করতে দেখেছ কি?’
সে বলল, ‘হ্যাঁ কর্তা, কদিন ধরেই কয়েকটা চোর এসে কিসব ফিসফিস করত।’
বোধিসত্ত্ব তখন রাজাকে বললেন, “মহারাজ হাতির শরীরে কোন রোগ নেই। চোরের কথা শুনে তার মাথা বিগড়েছে।’
শুনে রাজা বললেন, ‘এখন  কি উপায় বলুন?’
বোধিসত্ত্ব বললেন, ‘জ্ঞাণী ব্রাহ্মণদের ডাকিয়ে আনুন, তাঁরা কয়েদিন হাতিশালের পাশে ভালো ভালো কথা আলোচনা করলেই মহিলামুখ আবার শান্ত হয়ে যাবে।’।
ব্রহ্মদত্ত বললেন, ‘আপনিই তার বন্দবস্ত করুন।’

বোধিসত্ত্ব সেরকম ব্যবস্থা করলেন। ব্রাহ্মণরা আলোচনায় বসে বলতে লাগলেন, ‘কাউকে মারধোর করা খুবই খারাপ। সবাইকে ভালোবাসতে হবে। ক্ষমা করতে হবে। তবেই না স্বর্গে যাওয়া যাবে।’

এইসব উপদেশ শুনে মহিলামুখ আগের মতই ভাবল, ‘এরা আমাকেই উপদেশ দিচ্ছে। এখন থেকে আমি শান্ত সভ্য হয়ে চলব।’ আর সত্যি মহিলামুখ আবার আগেকার মতই ভালো হয়ে গেল।

ব্রহ্মদত্ত এই কান্ড দেখে অবাক। ভাবলেন, সত্যি বোধিসত্ত্বের শুণের কোন শেষ নেই। জীবজন্তুর ভাষাও জানেন। রাজা তখন বোধিসত্ত্বকে খুবই সম্মান দেখালেন।

এই জাতকের নীতিকথা হচ্ছে: বিচার বিবেচনা না করে অন্ধ অনুকরণ উচিত নয়।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য