হারিয়ে যাওয়া

আমাদের ছোট শহরের এক প্রান্তে ছিল বিশাল এক জমিদারের প্রাসাদ। আমরা বলতাম, রাজবাড়ি। রথের সময়, সপ্তাহ ধরে বিরাট মেলা জমত সেই রাজ বাড়ির উঠোনে। চারপাশের গ্রাম থেকে নদী-নালা বেয়ে কয়েকশো নৌকোয় করে দোকানিরা এসে ভিড় জমাত সেই মেলায়। আসল রথের দিন লোকসমাগম হত খুব। চারদিকে জল বলে আমরা মেলার মাঠে নৌকায় করে যেতাম। ঝমঝম বৃষ্টির মধ্যে নৌকায় করে রথের মেলায় বাড়িসুদ্ধ সকলে মিলে যাওয়া ছিল বছরের সবচেয়ে বড় মজা।

মেলার ভিড়ে অল্প বয়সী ছেলে-মেয়েরা হারাত আবার খুঁজেও পাওয়া যেত জাদুকরের তাঁবুর পিছনের ভিড়ে কিংবা জিলিপির দোকানের পাশে। বেশিক্ষণ কাউকে খুঁজে না পেলে, বাড়ির লোকেরা যখন তল্লাশ শুরু করত তখন পুরো মেলাতেই একটা সাড়া পড়ে যেত, অমুক গ্রামের বা তমুক বাড়ির বাচ্চা হারিয়েছে। কখনও কখনও ছেলেধরার গুজবও রটত।

এই রকম এক বছর মলোয় পৌছে আমি আর দাদা বাড়ির লোকদের আলাদা হয়ে মেলা ঘুরে দেখতে দেখতে শোরগোল শুনলাম, কাদের দুটো ছেলে হারিয়ে গেছে। সে বছর ভরা বর্ষা, মেলার চারপাশের খালগুলোতে যেমন স্রোত, তেমন জল। ছেলে দুটো জলে ডুবে বা ভেসে যেতে পারে এই আশঙ্কায় একদল লোক মেলার চারপাশে খাল পাড় ধরে ধরে খুঁজতে লাগল তাদের।

আমি আর দাদাও, কৌতুহল বশত, সেই অনুসন্ধানরত দলের সঙ্গে যোগ দিলাম, যথাসাধ্য চেষ্টা করতে লাগলাম হারিয়ে যাওয়া ছেলে দুটোকে খুঁজে পাওয়ার। খালের পাশে পিছল কাদা, হাঁটা কঠিন, এদিকে ঝোপঝাড় বর্ষা পড়ে বেড়ে উঠেছে, দুটো চার আনা দামের রঙিন কাঠি কিনে আমরা দু’ভাই অন্য সকলের সঙ্গে সেই ঝোপঝাড় পিটিয়ে হারিয়ে যাওয়াদের খুঁজতে লাগলাম। আমারা যখন বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে দেখি আমাদের মুহুরিবাবু। তিনি বললেন, ‘তোমাদের জন্যে কান্নাকাটি পড়ে গেছে। এত লোক তোমাদের খুঁজছে। এতক্ষণ তোমরা কোথায় ছিলে?’

আমি আর দাদা এবার একটু চোখ চাওয়াচাওয়ি করে বুঝে গেলাম, আসলে আমরাই সেই দু’জন যাদের সবাই খুঁজছে এবং সকলের সঙ্গে আমরা নিজেদেরই খুঁজছিলাম্।

**দাদা সমগ্র**
[তারাপদ রায়]
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য