আইসিস ও সাতটি বিছের গল্প মিশরীয় উপকথা

দাদা ওসিরিস কে হত্যা করার পর তার সদ্যোজাত শিশুপুত্র হোরাস এবং বৌদি আইসিস কে কারাগারের গোপন কুঠুরিতে বন্দী করে তার চক্রান্তকারী হিংসুক ভাই সেথ। লক্ষ্য একটাই সেই বহু কাঙ্খিত রাজসিংহাসন। কারাগারে থাকাকালীন দেবী আইসিসের সঙ্গে দেখা করতে আসেন অন্তর্যামী ভগবান থোথ । তিনি আইসিসকে এই প্রচন্ড বিপদে শান্ত থাকা এবং নিজেকে সংহত রাখার পরামর্শ দেন। একদিন তিনি আইসিস কে বলেন, “এখন দুঃখ বা কান্নাকাটি করার সময় নয় আইসিস ,তোমাকে তোমার পরবর্তী কর্তব্য নির্ধারণ করতে হবে দ্রুত ।এমন কিছু কর যাতে ওসিরিস এর আত্মা শান্তি পায়,তোমার প্রাথমিক কর্তব্য হল হোরাস কে সেথের কুনজর থেকে আগলে রাখা ও তাকে বড় করে তোলা,যাতে সে সঠিক সময় তার পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে পারে এবং রাজসিংহাসনে তার নিজের ন্যায্য অধিকার কায়েম করতে পারে। তুমি বরং পালিয়ে যাও,এমন কোন জায়গায় পালাও যেখানে হোরাস থাকবে সম্পুর্ণ সুরক্ষিত এবং নিরাপদ”।

আইসিসের ভয়ার্ত পাংশু মুখের দিকে তাকিয়ে থোথ তাকে আশ্বাস দেন,

“ভয় পেওনা,সত্যের জয় হবেই ,নাও আর দেরী নয়,পালাও আইসিস পালাও !! আর সময় নেই,হোরাস কে বাঁচাতেই হবে আমাদের”।

থোথ এরপর মন্ত্রবলে কারাগারের বন্ধ দরজা খুলে দেন এবং সেই সঙ্গে সাতটি বিষাক্ত বিছে ছেড়ে দেন তাদের সাথে।

বলেন, “আইসিস তুমি নিশ্চিন্ত থাকো এই সাতটি বিছে অতন্দ্র প্রহরীর মতন তোমার রক্ষনাবেক্ষন করবে এবং ছায়ার মতন তোমার সঙ্গে থাকবে”।

আইসিস থোথ কে বিদায় জানিয়ে যাত্রা শুরু করলেন অনিশ্চিতের পথে।শুরু হল তাঁর দীর্ঘ,দূর্গম পথে একাকী চলা।পদে পদে বাধা বিপত্তির অন্ত নেই। উপরন্তু সেথ কোনভাবেই তাদের ধরে ফেলার চেষ্টার ত্রুটি রাখছেনা ফলে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হল আইসিসকে । বিছের দল অবশ্য সবদিক দিয়ে আইসিসকে সহায়তা করে চলেছে।অন্ধকারে বিপদসঙ্কুল পথে চলার সময়ে সাতটি বিছে রীতিমত সামনে পেছনে সতর্কভাবে প্রহরা দিয়ে নিয়ে চলে তাঁকে এবং শিশুপুত্র হোরাসকে। কখনো বা বেশী শব্দ হলে আইসিস তাদের সতর্ক করে দেন,কারন সেথের চর ছড়িয়ে রয়েছে সর্বত্র ।

এইভাবে চলতে চলতে একদিন তারা নীলনদের মোহনার ধারে এক ছোট্ট নগরীতে পৌঁছল।

“উফফ্‌, মাগো !! আর যে পারিনা...”আইসিসের স্বরে ক্লান্তি।“দেখি কোন দয়ালু যদি আজকের রাতটুকু আমাদের আশ্রয় দেন”।

সামনে একটি বড় বাড়ি দেখে আইসিস দরজায় কড়া নাড়েন।

এক সুসজ্জিতা ধনী মহিলা দরজা খুললেন কিন্তু সাতটি বিছেকে দেখেই ভ্রূকুঞ্চিত হল তার...।“কি চাই?”রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করলেন তিনি।

“আমাদের আজকের রাতটুকু একটু আশ্রয় দেবেন?সামান্য কিছু খাবার,পানীয় জল আর আশ্রয়,কাল ভোর হলেই আমরা চলে যাব”- অনুনয় করে বললেন আইসিস।

“আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে?এই জঘন্য জীবগুলকে নিয়ে আপনি আশ্রয়ের খোঁজে বেরিয়েছেন?কেউ আশ্রয় দেবেনা আপনাকে ,যান এই মুহুর্তে বিদেয় হোন”-এই বলে সশব্দে ধড়াম করে আইসিসের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলেন তিনি। 

আইসিস বড় ক্লান্ত,শরীরে যেন তাঁর আর বিন্দুমাত্রও শক্তি বাকী নেই,চলার চেষ্টা করেও পারলেননা তিনি আর,অদূরেই একটা বড় পাথরের ওপর প্রায় অর্ধচেতন অবস্থায় বসে পড়লেন তিনি। কথা বলার ও শক্তি নেই আর,গলা শুকিয়ে কাঠ।

বিছের দল ঘিরে ধরল তাকে,কোলে অবুঝ শিশু হোরাস ও সমানে কেঁদে চলেছে,চিন্তায় পরল সাতটি বিছে,কি করা যায় !!

হঠাৎ‌ ই পাশ থেকে কেউ মিষ্টি গলায় বলে উঠল “আপনি কি অসুস্থ বোধ করছেন মা?যদি মনে করেন আমার সঙ্গে আমার কুঁড়েতে গিয়ে বিশ্রাম নিতে পারেন,আপনাকে দেখে বোধ হচ্ছে আপনার পেটে দীর্ঘ সময় খাবার পরেনি।আমি গরীব মেছুনী,আমার কুটিরে যেতে যদি আপত্তি না থাকে মা তাহলে চলুন,আমি যা খাব আপনাকেও তাই দেব,খেয়ে একটু জিরিয়ে নেবেন”।

-“আমার সাথে আমার এই সাতটি সাথীও যাবে কিন্তু,তোমার কোন আপত্তি নেইত?”জানতে চাইলেন আইসিস।

“ওরাও তো ঈশ্বরের ই জীব মা,না আমার কোন আপত্তি নেই”-বলল মেছুনী।

এরপর সেই গরীব মেছুনীর বাড়িতে গিয়ে খাবার জল পেয়ে প্রাণ বাঁচল আইসিস,হোরাস আর সাতটি বিছের ।মেছুনী যত্ন নিয়ে মাটিতেই বিছানা পেতে দিল।ক্লান্তিতে চোখ বুজে এল আইসিসের,হোরাস ও শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পরল শুধু জেগে রইল বিছের দল।তারা তখন পরিকল্পনা করতে লাগল কিভাবে সেই ধনী মহিলাকে শায়েস্তা করা যায়,আইসিসের অপমান তারা মেনে নিতে পারছিলনা মন থেকে।

রাতের অন্ধকারে তারা চুপিসারে গেল সেই ধনীর বাড়ি,একতলায় একপাশে মাটির ফাটল খুঁজে তারা ঢুকে পড়ল  বাড়ির ভেতর,দেখল সোনার  খাটে সেই মহিলার পাশে শুয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে তার শিশুপুত্র।বিছেদের মধ্যে সবচাইতে বড় ছিল তেফেন,সব বিছে তেফেন কে তাদের বিষ ধার দিল,তেফেন এরপর গিয়ে কামড়াল সেই শিশুপুত্রের পায়ে,সজোরে কেঁদে উঠল সে।ছেলের কান্না শুনে চকিতে উঠে বসল সেই মহিলা ।এদিকে ছেলে তার তখন যন্ত্রনায় নীল হয়ে উঠেছে।মহিলার আর্ত চিৎকারে আশেপাশের সব লোক ছুটে এল,কিন্তু কেউই জানেনা কিভাবে বাঁচাবে সেই শিশুকে,সবাই অসহায়ের মতন দাঁড়িয়ে রইল।মহিলা পাগলের মতন রাস্তায় বেড়িয়ে চিৎকার করতে থাকলেন, “বাঁচাও বাঁচাও কে আছো,বাঁচাও আমার চোখের মণিকে”। মহিলার আর্তনাদে ঘুম ভেঙ্গে গেল আইসিসের,আকস্মিকতা কাটিয়ে বাইরে এসে তিনি দেখলেন ভোর প্রায় হয় হয় ।প্রথমে তাঁর মনে হল,উপযুক্ত শাস্তিই পেয়েছেন মহিলা কিন্তু পরমূহুর্তেই তাঁর মনে হল শিশুটির তো কোন দোষ নেই তাহলে সে কেন শাস্তি পাবে অযথা !আইসিস এরপর সেই ধনীর বাড়িতে এসে শিশুটির সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে হাতজোড় করে প্রথমে একটা মন্ত্র বললেন এবং এর ঠিক পরেই তিনি সাতটি বিছের নাম ধরে ডেকে তাদের প্রত্যেককে নিজের নিজের বিষ সেই শিশুটির শরীর থেকে উঠিয়ে নিতে আদেশ দিলেন,বিছের দল বিনাবাক্যব্যযে অক্ষরে অক্ষরে তাঁর আদেশ পালন করল । সপ্তম বিছেটি বিষ উঠিয়ে নেবার পরেই শিশুটি চোখ কচলাতে কচলাতে বিছানায় এমন উঠে বসল যেন কিছুই হয়নি। আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন সেই ধনী মহিলা। শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। এরপর নতজানু হয়ে ক্ষমা চাইলেন আইসিসের কাছে এবং আইসিসকে আশ্রয় দেবার সুবাদে সেই মেছুনীকে সোনা দানা হীরে জহরত দিয়ে ভরিয়ে দিলেন ।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য