শীলবান জাতক

বোধিসত্ত্ব একবার হিমবন্ত প্রদেশে হাতি হয়ে জন্ম নেন। রুপোর মত সাদা শরীর। মুখটি রক্ত কম্বলের মতো লাল। এছাড়া তার পা দেখলে মনে হত যেন লঙ্কা দিযে পা রাঙানো হয়েছে। বড় হলে হিমালয় অঞ্চলের সব হাতি তাঁকে দলপতি করল। ষাট হাজার হাতির তিনি নেতা হলেন। তবু যখন দেখলেন দলের মধ্যে পাপ ঢুকেছে তখন দল ছেড়ে বনের মধ্যে একা থাকতে লাগলেন।

একবার বারাণসীর এক কাঠুরে বনে কাঠ কাটতে এসে রাস্তা হারিয়ে ফেলে। শেষে হতাশ হয়ে দু হাত ওপরে তুলে কাঁদতে শুরু  করে। তার কান্না শুনে বোধিসত্ত্ব তার কাছে এলেন। কিন্তু কাঠুরে তাঁকে দেখে পালাতে শুরু করল। বোধিসত্ত্ব তখন থমকে দাঁড়ালেন। কাঠুরে খানিক দুরে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তখন বোধিসত্ত্ব আবার তার দিকে এগোতে লাগলেন। তা দেখে কাঠুরে আবার দৌড়তে লাগল।
বারকয়েক এরকম হওয়ার পর কাঠুরে বুঝল, এই হাতিটি তাকে আক্রমন করতে চাইছে না। হয়ত উপকারই করতে চায়। তখন সে সাহস করে দাঁড়িয়ে থাকল। বোধিসত্ত্ব তাঁর কাছে এগিয়ে গেলেন।
‘তুমি কাঁদছিলে কেন?’
‘প্রভু, আমি রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি, প্রাণের ভয়ে কাঁদছিলাম।’
বোধিসত্ত্ব তাকে তার ডেরায় নিয়ে গেলেন। নানারকম ফল খেতে দিলেন তাকে। তরপর বললেন, ‘ভয় নেই, আমি তোমাকে বনের বাইরে পৌছে দিয়ে আসব।’ বোধিসত্ত্ব যখন তাকে পিঠে করে লোকালয়ের দিকে যাচ্ছিল। কাঠুরে তখন রাস্তাঘাট খুঁটিযে দেখে নিতে লাগল। বন শেষ হলে বোধিসত্ত্ব তাকে বললেন, ‘এই রাস্তা ধরে সোজা চলে যাও, সামনেই আছে গ্রাম, তবে আমার ডেরার কথা কাউকে বল না।’ বিদায় নিয়ে বোধিসত্ত্ব ফিরে গেলেন।

সেই কাঠুরে একদিন হাড়ের কারিগরদের পাড়ায় ঢুকে পড়ে। সে যখন দেখল মরা হাতির দাঁত থেকে তারা নানারকম জিনিস বানাচ্ছে, তখন একটু অবাক হল।
‘আচ্ছা, জ্যান্ত হাতি কেনো তোমরা?’
‘কিনি বৈকি, মরা হাতির চেয়ে জ্যান্ত হাতির দাঁতের দামও বেশি।’
‘ঠিক আছে, আমি জ্যান্ত হাতির দাঁত এনে দেব।’
এই বলে সে একটা করাত আর খানিকটা খাবার নিয়ে জঙ্গলের দিকে রওনা হল। খুঁজে খুঁজে ঠিক বোধিসত্ত্বের কাছে উপস্থিত।
বোধিসত্ত্ব তাকে দেখে বললেন,‘ ফিরে এলে কেন ভাই?’
সে বলল, ‘প্রভু, আমি খুব গরিব, আপনার কাছে আপনার দাঁতের খানিকটা টুকরো ভিক্ষে চাইছি। যদি তা বেচে খাওয়া- পরার একটা ব্যবস্থা করতে পারি।

বোধিসত্ত্ব বললেন, ‘তোমার কাছে করাত আছে?’
কাঠুরে বলল, ‘হ্যাঁ প্রভু।’
বোধিসত্ত্ব তখন পা মুড়ে মাটিতে বসে বললেন, ‘বেশ, তাহলে দুটো দাঁত থেকেই কেটে নিয়ে যাও।’
কাটা শেষ হলে বোধিসত্ত্ব শুঁড় দিয়ে টুকরো দুটো তুলে নিয়ে একটু দেখলেন। তারপর বললেন, ‘দেখ ভাই, দাঁত দুটোর ওপর আমার কোন মমতা নেই ভেব না। তবে সর্বজ্ঞতার জন্য আমি এটুকু ছাড়তে রাজি।’
কাঠুরে তা নিয়ে চলে গেল। বিক্রি করে সে টাকা কড়ি ভালোই পেল। একদিন সে টাকাও ফুরিয়ে গেল। তখন সে আমার বোধিসত্ত্বের কাছে  গেল।  কান্নাকাটি করে আবার দাঁতের খানিকটা চাইল। বোধিসত্ত্ব এবারও ফিরিয়ে দিলেন না। এখন তাঁর দাঁত বলতে রইল স্রেফ গোড়াটুকু। দিনকতক পরে সে আবার ফিরে এল। এবার সে ঐ গোড়াটুকুও কেটে নিতে চাইল।

বোধিসত্ত্ব বললেন, ‘বেশ নাও।’ এবার কেটে নেওয়ার কাজটা একটু কষ্টকর। লোভী কাঠুরে বোধিসত্ত্বের মুখের ভেতরে এক পা রেখে, মাংসের টুকরো সমেত হাড়টুকু ছিঁড়ে নিল।

ফিরতি পথে এক মহা দুর্যোগ দেখা দিল্ বোধিসত্ত্ব দেখতে পেলেন কাঠুরের পাপে পৃথিবী দু টুকরো হল। সেই ফাটল থেকে আগুন উঠে আসছিল। লাল কম্বলের মতো সেই আগুন কাঠুরেকে পেঁচিয়ে নিয়ে তলিয়ে গেল।

এই জাতকের শিক্ষা: অকৃতজ্ঞ লোভী লোককে কিছুতেই সন্তুষ্ট করা যায় না।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য