তৈলপাত্র জাতক

বোধিসত্ত্ব একবার বারাণসীরাজ ব্রহ্মদত্তের ছেলে হয়ে জন্মান। অবম্য রাজার ছেলে ছিল একশটি। বোধিসত্ত্ব সকলের ছোট। আস্তে আস্তে তিনি বড় হলেন। তাঁর বিচারবুদ্ধিও প্রখর হল।
বোধিসত্ত্ব একদিনমনে মনে ভাবলেন, ‘আমার এত ভাই, ফলে এদেশে আমার রাজা হবার বোধ হয় কোন সম্ভাবনাই নেই। তবু  একবার ভিক্ষুকদের জিজ্ঞাসা করে দেখি।’ পরের দিন ভিক্ষুকরা রাজ বাড়িতে এলেন। হাত-পা ধুয়ে খেতে বসলেন তাঁরা। খাওয়ার পর যখন বিশ্রাম করছেন বোধিসত্ত্ব তখন তাঁদের কাছে গেলেন। পাশে বসে কথাটা জিজ্ঞাসা করলেন।

ভিক্ষুরা বললেন, ‘দেখ, রাজকুমার, সত্যি কথা বলতে কি এখানে তুমি কোনদিনই রাজা হতে পারবে না। তবে এখান থেকে দুহাজার যোজন দূরে তক্ষশিলা। তুমি যদি সাত দিনের মধ্যে ওখানে যেতে পার তাহলে সাত দিনের মাথায় তুমি সেখানকার রাজা হবে।

ভিক্ষুরা তারপর বোধিসত্ত্বকে সতর্ক করার জন্য আরো খুলে বলেলেন: ‘রাস্তায় এক ঘোর বন আছে। সে বন বড় মারাত্মক। তবে ঘুরপথেও যাওয়া যায় কিন্তু তাতে বেশি সময় লাগবে। ঐ বনে যক্ষদের আড্ডা। যক্ষিনীরা রাস্তার ধারে মায়াবলে গ্রাম বানিয়ে রেখেছে। পথিকদের মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে তাদের খুন করে রক্ত খেয়ে ফেলে। তাদের হাত এড়িয়ে যাওয়া খুবই কঠিন। মানুষ যা যা ভালোবাসে, মায়া দিয়ে তারা সে সবই তৈরী করতে পারে। যাই হোক যদি তাদের দিকে না তাকাও তাহলেই বাঁচতে পারবে।’

বোধিসত্ত্ব বললেন‘ নিশ্চয়ই পারব। তবু আপনারা এমন মন্ত্র পড়া আমাকে দিন যাতে মনের জোর ধরে রাখতে পারি।’ ভিক্ষুরা তাঁকে মন্ত্রপূত বালি আর সূত দিলেন। বোধিসত্ত্ব বাবা-মাকে প্রণাম করলেন। তারপর সঙ্গী আর অনুচরদের বললেন, ‘রাজ্য পাওয়ার জন্য আমি এখন তক্ষশিলায় যাচ্ছি। তোমরা এখানেই থাক।; সে কথা শুনে তাঁর পাঁচজন অনুচর বলল, ‘রাজকুমার, আমরাও যাব।’
বোধিসত্ত্ব বললেন, ‘তোমরা পারবে না।’
অনুচরেরা জবাব দিল, ‘কেন প্রভু?’
বোধিসত্ত্ব যক্ষিনীদের ব্যাপারটা তাদের বুঝিয়ে বললেন। কিন্তু তাতেও তাদের উৎসাহে ভাঁটা পড়ল না। তখন বোধিসত্ত্ব বললেন, ‘বেশ চল, তবে ভুল করলেই মারা যাবে মনে থাকে যেন।’

রাস্তায় যক্ষিনীদের মায়া গ্রাম। তারা বোধিসত্ত্বের সঙ্গীদের একে একে লোভের ফাঁদে ফেলল। বোধিসত্ত্ব এখন একা। সঙ্গীরা যক্ষিনীদের মোহে প্রাণ হারিয়েছে। এক যক্ষিনী কিন্তু বোধিসত্ত্বকে ছাড়ল না। সে তাঁর পিছু পিছু যেতে লাগল। একদল কাঠুরে সুন্দরী যক্ষিনীকে জিজ্ঞেস করল, ‘ঐ লোকটা তোমার কে?’ যক্ষিনী বলল, ‘উনি আমার স্বামী।’ কাঠুরেরা তখন বোধিসত্ত্বকে ডেকে বলল, ‘তুমি কেমন লোক হে, পরমা সুন্দরী স্ত্রীকে ফেলে ঘোড়ার মত ছুটছ!’ বোধিসত্ত্ব বললেন, ‘এ মোটেই আমার স্ত্রী নয়, এ রাক্ষুসী, আমার পাঁচ বন্ধুকে খেয়েছে, এখন আমাকে খেতে চায়।’ শুনে তারা বলল ‘সত্যি, পুরুষের  রাগ বড় সাংঘাতিক না হলে নিজের বৌকে রাক্ষুুসী বলে!’

যেতে যেতে যক্ষিনী মায়াবলে মা হল।  কোলে কচি শিশু নিয়ে সে বোধিসত্ত্বের পিছু পিছু চলল। রাস্তায় আরোও কয়েকজন লোক বোধিসত্ত্বকে একই প্রশ্ন করল। আর তিনি সেই এক জবাবই দিলেন। এভাবে তক্ষশিলায় পৌছে বোধিসত্ত্ব এক পান্থশালায় উঠলেন। বোধিসত্ত্বের শক্তিকে অমান্য করতে না পারায় যক্ষিনী ভেতরে ঢুকতে পারল না। সে ছেলে কোলে করে বাইরে বসে রইল।

তক্ষশিলার রাজা তখন বাগান বিহারে যাচ্ছিলেন। যক্ষিনীকে দেখে তিনি মুগ্ধ হলেন। লোক পাঠিয়ে খোঁজ নিলেন তার স্বামী আছে কি না। যক্ষিনী বলল, ‘ঐ যে আমার স্বামী।’ কিন্তু বোধিসত্ত্ব বললেন ,‘ এ যক্ষিনী, আমার পাঁচ সঙ্গীকে কেয়েছে।’ যক্ষিনী তখন বলল, ‘হায়, রাগের মাথায় পুুরুষ কি না বলে।’ রাজা লোক মারফৎ সব শুনে বললেন, ‘তাহলে ওকে নিয়ে এস।’

যক্ষিনী রাজার পাটবাণী হল। আর রাতে যক্ষপুরে গিয়ে সমস্ত যক্ষদের ডেকে আনল। পরের দিন সকাল কেটে যাওয়া পরও রাজপ্রাসাদের দরজা খোলে না। প্রজারা তখন দরজা ভেঙ্গে ফেলল। ভেতরে ঢুকে শুধু হাড়ের স্তুপ দেখতে পেল। তখন তাদের বোধিসত্ত্বের কথা মনে পড়ল। ‘তাহলে তো সে ঠিকই বলেছিল। রাজা রূপের মোহে রাক্ষুসীকে এনে সব শেষ করল, ‘নিজেও শেষ হল’।

সবাই মিলে আলোচনা করে ঠিক করল, ঐ নির্লোভ মানুষটিই আমাদের রাজা হওযার উপযুক্ত। পান্থশালায় গিয়ে তারা বলল, ‘প্রভু, আপনিই আমাদের রাজ্যের রাজা হোন।’

Previous
Next Post »
0 মন্তব্য