শিশিরের রূপকথা

অনেক অনেক দিন আগের কথা। আমাদের পরিচিত সভ্যতা থেকে বহু দূরের এক গহীন অরণ্যে এই গল্পের শুরু। চির হরিৎ বৃক্ষের এই বনে সারা বছর জুড়েই নানা রংয়ের ফুল ফোঁটে। বন জুড়ে পাখির কলতান আর বনের ঠিক বুক চিড়ে বেরিয়ে যাওয়া স্বচ্ছ নদীর কুল কুল শব্দ, একটি ছেলে আর তার মা, এই নিয়েই তাদের ছোট্ট সংসার। সংসার না বলে জগৎ বলা ভালো। কারণ আমাদের এই বনে আর কোনো মানুষই ছিলনা। কি করে যে মা-ছেলে এই জন-মানব শূণ্য মায়াবী বনে এসে পড়লো তা আমাদের জানা নেই। গল্পের প্রয়োজনে সেটা না জানলেও খুব একটা অসুবিধা হবে বলে মনে করিনা। প্রকৃতির অবিরাম ছন্দময় ভাষা আর সুনিবিড় একাকিত্ব ছেলেটিকে কবি ছাড়া আর কিছু হওয়ার পথ খোলা রাখেনি। সে কবিতা লিখতো। সারা দিন। সারা সময়। কখনও মাটিতে, কখনও গাছের পাতায়, কখনও বা শুধুই মনে মনে। শ্রোতা নিয়েও তাকে খুব একটা ভাবতে হয়নি। কারণ পুরো প্রকৃতিই ছিল তার একনিষ্ট শ্রোতা।
সময় তার দায়িত্ব পালন করে নিয়ম না ভেঙ্গে। মা’র মৃত্যু সময় ঘনিয়ে এলো। এক বিষন্ন সন্ধায় মা ছেলেটিকে ডেকে বললেন, “আমার যাবার সময় হলো বাছা। আমি যাওয়ার পর এই বনে তুমি আর থেকো না। বন থেকে বেরিয়ে লোকালয়ে চলে যেয়ো। আর আমার জন্য মন খারাপ করোনা। আমি ভালো থাকবো।’’ মা তার আচঁল খুলে একটা গোলাকার ছোট আয়না বের করলেন। “তোমার যখন আমার জন্য খুব মন খারাপ হবে, তখন এক মনে এই আয়নার দিকে তাকিয়ে তিন বার বলবে, আয়না আমার মন ভালো করে দাও – আয়না আমার মন ভালো করে দাও – আয়না আমার মন ভালো করে দাও, দেখবে আয়না তোমার মন ভালো করে দেবে। যাই…বাছা। ভালো থেকো….’’ মা চির বিদায় নিলেন। বাকি রাত গভীর আবেগে ছেলেটি মাকে জড়িয়ে ধরে বসে রইল। সকালে মাকে কবরে শায়িত করে শূণ্য ঘরে ফিরেই এক রাশ বেদনা আর কষ্ট ছেলেটিকে আঁকড়ে ধরলো। সে পাগলের মতো কাঁদতে লাগলো। সে কান্না যেনো থামার জন্য জন্ম নেয়নি। তীব্র বেদনার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার আশায় ছেলেটি মেলে ধরল মায়ের দেয়া আয়না। ” আয়না আমার মন ভালো করে দাও – আয়না আমার মন ভালো করে দাও – আয়না আমার মন ভালো করে দাও’’………. কিছুক্ষনের স্থবিরতা। এরপর সচল হলো আয়নার ছবি। প্রথমে কেমন অস্পষ্ট, তারপর ধীরেই স্পষ্ট এবং জীবন্ত। এই প্রথম বারের মতো ছেলেটি তার মা এবং নদীর জলে নিজের প্রতিকৃতি ছাড়া অন্য কোনো মানুষের চেহারা দেখতে পেলো। সে চেহারা অসম্ভব মায়াবী। চোখ জুড়ে ভাষা আর ভালোবাসা। ছেলেটি ততোক্ষণে বুঝে গেছে এই অসম্ভব মায়াবতী মেয়েটিকে খুঁজে বের করার জন্যই তার জন্ম হয়েছে। সংগে নেয়ার মতো তেমন কিছু তার ছিলনা। ছোট্ট একটা ঝোলা কাঁধে নিয়ে পথে নামল সে। এরপর পথ চলা। বন পেরিয়ে উপত্যকা। উপত্যকা পেরিয়ে পাহাড়ী পথ। পাহাড়ী পথ পেরিয়ে কখনও লোকালয়। ছেলেটি পেরিয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন।

শহরটি খুব বড় নয়। হাজার দুয়েক লোকের বসবাস। এই দেশের রাজধানী। বাইরের শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পেতে পুরো শহর উচু দেয়ালে ঘেরা। চারদিক থেকে শহরে প্রবেশের চারটি তোরণ। তোরণে থাকে সশস্ত্র প্রহরা। তবে আজকে প্রহরীদের বাড়াবাড়ী কম। কারণ আজ শহরবাসীরা মেতে আছে উৎসবে। আজ এই দেশের রাজকন্যার জন্মদিন। মধ্যরাত থেকে উৎসবে মেতে আছে শহরবাসী। নগর প্রহরীরাও আছে খোস্ মেজাজে। আর তাই ছিন্ন বস্ত্র, মলীন চেহারার ছেলেটিকে এই পড়ন্ত বিকেলে কোন রকম বাধা না দিয়েই তারা শহরে ঢুকতে দিলো। ছেলেটি আসলে সন্ধান করছে কিছু খাবারের। লোকালয় দেখে এগিয়ে এসেছে। এক সময় সে আবিষ্কার করল একটা খাবারের দোকান। পকেটে পয়সা নেই। ঢুকতে দ্বিধা করছিল। দোকানী হাসিমুখে এগিয়ে এলো, “নতুন বুঝি? নির্ভয়ে যা খুশি খাও। পয়সা লাগবেনা। আজ উৎসব। রাজকন্যার জন্মদিন। সব খাবারের দাম দেবেন রাজা। শহরের সকল মানুষ আজ রাজার অতিথি। যে যেখানে খুশি যা খুশি খেয়ে নাও বিনা পয়সায়। তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। একটু পরেই উৎসবের শেষ আয়োজনে পশ্চিম দিকের রাজ ময়দানে রাজকন্যা নিজ হাতে শহরের সকল মানুষকে মোহর উপহার দেবেন। বছরের এই একটি দিনেই শুধু তিনি দেখা দেন। তাড়াতাড়ি করো..আমাকে যেতে হবে…’’ পেট পুড়ে খাওয়া শেষে হাসিখুশি দোকানদারের সংগেই কৌতুহলী ছেলেটিও পশ্চিম দিকের রাজ ময়দানে উপস্থিত হলো। তাকে যে যেতেই হবে। আশাকরি সকল পাঠক এতোক্ষণে বুঝে গেছেন ছেলেটির প্রতিক্ষার প্রহর শেষ হতে চলেছে। আসলে জীবনের গল্পগুলো এমনই হয়। যখন শেষ হওয়ার কথা, তখন সবে শুরু হয়।

সকলের সংগে সারি বেঁধে অবশেষে ছেলেটি যখন রাজকন্যার সামনে এলো হাত পেতে মোহর নিতে, ঠিক তখনই আয়নায় দেখা মানুষটি জলজ্যান্ত আবিস্কৃত হলো। রাজকন্যার মুখজুড়ে তখন শেষ বিকেলের আলো। ছেলেটি মোহর নিয়ে আবার কী মনে করে রাজকন্যার পায়ের কাছে রেখে পরের জনকে জায়গা দিয়ে ঘুরে রওনা দিলো। রাজকন্যা কিছুটা অবাক হলেন। কিন্তু এর চেয়ে ঢের অবাক করা ঘটনা তার জীবনে ঘটে। তাই এ নিয়ে খুব একটা ভাবার ইচ্ছা বা সময় পেলেন না। আরো অনেককে মোহর দিতে হবে। বেলা পরে আসছে।

ছেলেটি এই শহরে রয়ে গেলো এবং দু-একদিনের মধ্যেই অসম্ভব সাধন করলো। রাজবাড়ীর বাগানের মালীর কাজ জুটিয়ে ফেললো। বালকটি তার অতি পরিচিত বৃক্ষের জগত ফিরে পেলো আর কবিতা লেখার অভ্যাসটাও রয়ে গেলো।

রাজকন্যা দিনে একবারই বাগানে আসতেন। খুব ভোরে। নগ্ন পায়ে ঘাস মাড়িয়ে আলতো পায়ে বাগানময় কিছু সময় হেটে বেড়ানো ছিল তার দিনের প্রথম বিলাসিতা। বালকের এটি জানা ছিল না। জানলেও লাভ হতো না। কারণ সেময় অন্য যে কারো বাগানে প্রবেশে বাধা দিতে সান্ত্রীরা ছিল সদা সচেষ্ট। তাদের উপর সেরকমই নির্দেশ ছিল। আর তাই আমাদের বালক রাজ প্রাসাদে প্রবেশাধিকার পেয়েও বাস্তব রাজকন্যাকে চোখের দেখা থেকে বঞ্চিত রইল। তবে আয়না তাকে বঞ্চিত করত না। রাত নিশুতি হলেই বালক আয়না নিয়ে বসত। আয়নার রাজকন্যার প্রতিচ্ছবিকে সে অনেক সময় নিয়ে কি কি বলত তা আমরা জানতে পারিনি।

কাজের ফাঁকে সময় পেলে বালক বাগানে বসেই কবিতা লিখত গাছের পাতায় পাতায়। লেখা শেষ হলে ছিড়েও ফেলত। একদিন ভূলে গেলো। গাছের পাতায় রয়ে গেলো-

“কিশোরী তোমার সাগরের মতো রূপ
চোখে দেখিনি উনোনে তাঁতানো রোদ,
ঘামে ভিজে তবু সপসপে হয় দেহ
রোদহীন রোদে আমি এক নির্বোধ।
কিশোরী তোমার নাবালক সারা দেহ
দূর্বা চুলে মাধবীর সৌরভ,
আহ! কেটে যায় অস্থির রাত্তির
বিনিদ্র রাতে কুকুরের গৌরব।
কিশোরী তোমার উথাল-পাথাল মন
ঝরে অবিরাম বর্ষার ঝোরো ধারা,
হাঁটু জলে খোঁজো জ্যোৎস্নার ছিটেফোঁটা
ধ্রুবতারা খুঁজে আমি হই দিশেহারা।
কিশোরী তুমি ফিনফিনে বেড়ে ওঠো
বৃষ্টি শেষে রেশমী রশ্মি রাত,
হৃদয়, হৃদয়, হৃদয়ে যখন গান
আলগোছে ধোরো আমার সবুজ হাত।।’’

আমাদের এই গল্পটির রচয়িতা প্রকৃতি। সেই রচয়িতা ফেলে যাওয়া কবিতা-পাতাটি পরদিন সাত-সকালে রাজকন্যার হাতে তুলে দিলো। রাজকন্যা কবিতাটি পড়ে গম্ভির হলেন। মুগ্ধ না বিরক্ত হলেন তা আপাততঃ বোঝা গেলোনা। তিনি বাগানের পাইক-পেয়াদা ও সকল মালীকে ডেকে পাঠালেন। 

“আমি জানতে চাই গাছের পাতায় এই কবিতাটি কে লিখেছে?’’
“আমাকে ক্ষমা করবেন…আমি লিখেছি…আমাকে ক্ষমা করবেন’’ আমাদের ভীত বালক।
“আমি প্রতিদিন ভোর বেলা বাগানে এসে সুর্যোদয় দেখি। তুমি প্রতিদিন সেময় একটি করে কবিতা দিয়ে যাবে। এর অন্যথা হলে তা আমার ভালো লাগবে না।’’ রাজকন্যা চলে গেলেন। তার স্নানের সময় বয়ে যাচ্ছে।

বালক প্রতিদিন ভোরে বাস্তব রাজকন্যাকে দেখার সুযোগ পেলো।

এভাবে একদিন বালক কবিতা হাতে বাগানে এসে ক্রন্দনরত রাজকন্যাকে আবিষ্কার করল। রাজকন্যাকে কাঁদতে দেখে বালক ব্যথায় স্থবির হয়ে গেলো। রাজকন্যা বালককে দেখে অতি দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন।

“মালী, আমাদের এই বাগানে তো কতো পাখিই দেখি..কিন্তু তুমি কি কখনও আগুনে পাখি দেখেছো? আমার খুব সখ একটা আগুনে পাখি পোষার।’’ রাজকনা যেনো স্বগোতক্তি করে চলে গেলেন।  আমাদের বালক ভেবেইে নিলো রাজকন্যা আগুনে পাখির জন্যই কাদঁছিলেন। সে পথে নামল আগুনে পাখির খোঁজে।

পাঠকদের জানিয়ে রাখা ভালো যে আসলে রাজকন্যা কেনো কাঁদছিলেন। গল্পের জন্য এটা প্রয়োজন আছে। রাজকন্যা ভালোবাসেন প্রতিবেশী রাজ্যের একমাত্র রাজপুত্রকে। রাজপুত্রও প্রান দিতে প্রস্ত্তত রাজকন্যার জন্য। তাদের বিয়েও ঠিক হয়ে আছে। হতে পারছেনা যুদ্ধের জন্য। রাজপুত্রের দেশ শত্রু আক্রান্ত। বীর রাজপুত্র মহা বিক্রমে দেশ মাতৃকা রক্ষায় যুদ্ধরত। রাজকন্যা এই ভোরে কাঁদছিলেন রাজপুত্রের অমঙ্গল চিন্তায়।

আমাদের বালকের এতো কিছু জানার উপায় নেই। তাই সে ছুটেছে আগুনে পাখির আশায়. রাজকন্যা কাঁদবে কেনো!!

সারাদিন পথ চলে ঠিক সন্ধায় সন্ধায় অচীন পাহাড়ের গুহায় বালক এক সন্ন্যাসীর সন্ধান পেলো।

“সন্ন্যাসী বাবা, তুমি কি বলতে পারো আমি কীভাবে আগুনে পাখি পেতে পারি?’’

সন্ন্যাসী বালকের সব কথাই জানতেন। সন্ন্যাসীদের অনেক কিছু জানতে হয়। তিনি বললেন, “সে পাখি পাওয়া তো ভারী কঠিন কাজ। তোমাকে তোমার সবচেয়ে প্রিয় কিছু চির তরে ত্যাগ করতে হবে। পারবে কী তুমি তা? তাহলে আমি তোমাকে দিতে পারি আগুনে পাখি।’’

বালক চিন্তায় পরে গেলো। “বাবা আমি অতি দরিদ্র। আমার তো কিছুই নেই। আমি আর কি ত্যাগ করব?’’

“খুঁজে দেখো…’’ সন্ন্যাসী বললেন।

হঠাৎ বালকের চোখে খুশির ঝিলিক বয়ে গেলো – “পেয়েছি আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস..আমার মায়ের দেয়া আয়না…যাতে আমি রাজকন্যার মুখ দেখতে পাই। আপনি সেটা নিন আর তার বিনিময়ে আমাকে আগুনে পাখি দিন।’’ সন্ন্যাসীর মন আর্দ্র হলো। বললেন, “কিন্তু আমি জানি যে আয়নাটি তোমার মায়ের শেষ উপহার আর ঐ আয়নাতেই তুমি রাজকন্যাকে যখন খুশি দেখতে পাও।’’ বালক এক মুহুর্ত দ্বিধা না করে বলল, “আমি রাজকন্যার কান্না মুছে দিতে চাই।’’

সন্ন্যাসী বললেন, “তথাস্ত্ত।’’

পরদিন ভোরে বালক আগুনে পাখি নিয়ে রাজকন্যার সামনে হাজির হলো। রাজকন্যা আনন্দে আত্মহারা হলেন। আগুনে পাখি সংগে নিয়ে তৎক্ষনাত অন্দর মহলে রওনা হলেন। এ পাখির জন্য এখনই একটা সোনার খাঁচা বানাতে দিতে হবে।

এ ঘটনার ঠিক তিনদিন পরে ভোরে বালক আবারো রাজকন্যার চোখে জল দেখতে পেলো। রাজকন্যা বালককে দেখে নিজেকে সামলে নিলেন।

“মালী আমাদের এই বাগানে তো কতো ফুলই ফোঁটে..কিন্তু তুমি কি কখনও জ্যোৎস্নার ফুল হাতে নিয়ে দেখেছো? আমার খুব সখ আমি আমার খোপায় জ্যোৎস্নার ফুল গুজবো।’’ রাজকনা যেনো স্বগোতক্তি করে চলে গেলেন।  আমাদের বালক আবারও ভেবেই নিলো রাজকন্যা জ্যোৎস্নার ফুলের জন্যই কাদঁছিলেন। সে পথে নামল জ্যোৎস্নার ফুলের খোঁজে।

পাঠকদের আবারও জানিয়ে রাখি রাজকন্যার কান্নার প্রকৃত কারন। রাজকন্যা শুনেছেন যুদ্ধে রাজপুত্র বাহিনীর অবস্থান ভালো না। যুদ্ধ চলছে মরণপন। ভালোবাসার মানুষটির এ বিপদে পাশে না থাকতে পেরে কাদঁছিলেন রাজকন্যা।

বালক ছুটে চলেছে আগুনে পাখি দেয়া সন্ন্যাসীর উদ্দেশ্যে।

“সন্ন্যাসী বাবা, আমার জ্যোৎস্নার ফুল চাই। এবার তোমার শর্ত কী?’’ সন্ন্যাসী সস্নেহে বালাকের দিকে তাকালেন, “প্রকৃতির কাছে মনোবাঞ্ছা পূরনের একটাই পথ। ত্যাগ। এবারও তোমার সবচয়ে প্রিয় কিছু ত্যাগ করতে হবে।’’

বালক চিন্তায় পরে গেলো। আর কি দেয়ার আছে তার? ক্ষনিকেই তার মুখে হাসি ফুটলো। “বাবা..পেয়েছি… আমার কবিতা…তুমি আমার কবিতা লেখার ক্ষমতা কেড়ে নাও…আর আমাকে জ্যোৎস্নার ফুল দাও..’’ সন্ন্যাসী মুগ্ধ হলেন।

“বালক, তুমি কি জানো না যে তুমি আর কবিতা লিখতে না পারলে প্রতিদিন ভোরে রাজকন্যার দেখা পাবে না? রাজকন্যার আর তোমাকে প্রয়োজন হবেনা?’’

বালক মাথা নিচু করলো “জানি, কিন্তু আমি জ্যোৎস্নার ফুলের জন্য রাজকন্যার চোখে জল চাই না।’’

সন্ন্যাসী বললেন, “তথাস্ত্ত।’’

পরদিন ভোরে রাজকন্যা জ্যোৎস্নার ফুল পেয়ে আত্মহারা হলেন। কিন্তু রাজকন্যারা কখনও অধিনস্তঃ কর্মচারীদের সামনে আবেগ প্রকাশ করেন না। আমাদের রাজকন্যাও করলেন না। তিনি তাড়াতাড়ি প্রাসাদে ফিরে গেলেন। ফুলটিকে পানিতে রাখতে হবে। যুদ্ধজয়ী রাজপুত্রের হাতে তিনি এই ফুল খোঁপায় পরবেন।

সেদিন রাতে বালকের চোখে ঘুম এলোনা। তাকে একটি কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হলো। সে সিদ্ধান্ত নিলো ভোরে রাজকন্যাকে আড়াল থেকে  একবার দেখেই সে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে চলে যাবে। রাজকন্যা কবিতা না পেয়ে ক্ষুব্ধ হওয়ার আগেই তাকে চলে যেতে হবে দূরে..বহু দূরে…

সে রাতটি আমাদের রাজকন্যাও র্নিঘুম কাটালেন। তবে সম্পূর্ন ভিন্ন কারনে। রাজপুত্র যুদ্ধ জয়ী হয়েছেন। কিন্তু মারাত্মক আহত হয়েছেন তিনি। দেশ-বিদেশের সেরা হেকিমরা বসে আছেন সৃষ্টিকর্তার কৃপা দৃষ্টির আশায়। রাজকন্যা প্রার্থনায় সারা রাত্রি অতিবাহিত করে ভোরের কোমল আলোতে বাগানে এসে ভেঙ্গে পড়লেন আকাশ ভাঙ্গা কান্নায়। সে কান্নার উৎস চোখে নয়। অন্য কোথাও…অন্য কোনোখানে…. রাজকন্যা শত চেষ্টা করেও সে কান্না থামাতে পারছিলেন না।

বালক আড়াল থেকে রাজকন্যাকে দেখতে এসে রাজকন্যার উথাল-পাথাল কান্না দেখতে পেলো। সে হঠাৎ বুঝতে পারলো আসলে সে এতোদিন রাজকন্যার জন্য ভূল জিনিস চেয়েছে। তার আসলে চাওয়া উচিৎ ছিলো রাজকন্যার জীবন থেকে কান্নার সমাপ্তি….রাজকন্যাকে যেনো আর কখনও কাঁদতে না হয়। বালক সন্ন্যাসীর কাছে হাজির হলো।

“বাবা, তুমি রাজকন্যার জীবন থেকে সকল কান্না মুছে দাও…রাজকন্যার জীবনে কোনো কান্না থাকবে না…আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ত্যাগ করতে প্রস্ত্তত আছি। তুমি জানো আমি আমার জীবন বিসর্জনের কথাই বলছি। এটি ছাড়া আর আমার দেয়ার কিছু অবশিষ্ট নেই।’’

সন্ন্যাসী বালকের ভালোবাসার প্রতি সম্মানে মাথা নিচু করলেন। আর্দ্র গলায় বললেন “ইচ্ছা পূরনের নিয়ম পরিবর্তন করার ক্ষমতা আমার নেই। কিন্তু বালক আমি তোমার আত্ম ত্যাগের ক্ষমতা দেখে বিস্মিত হয়েছি। আমি আমার এতোদিনের সাধনায় প্রাপ্ত ক্ষমতা বলে তোমার এক ত্যাগের প্রতিদানে দুটি ইচ্ছা পূরনের দাবী সৃষ্টিকর্তার কাছে করতে চাই। তোমার মৃত্যুর পর রাজকন্যার জীবন থেকে সকল কান্না মুছে দেওয়া হবে। এবার তুমি তোমার দ্বিতীয় ইচ্ছাটা আমাকে বলো। আমি আশা এবং অনুরোধ করবো এই শেষ ইচ্ছাটা তুমি তোমার নিজের জন্য করবে….’’

“তোমাকে ধণ্যবাদ সন্নাসী বাবা’’ বালক সন্ন্যাসীর চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিলো। নিচু স্বরে বলল, “আমার ইচ্ছে ছিলো একবার রাজকন্যাকে ছুঁয়ে দেখার….আমি জানিনা রাজকন্যাকে না জানিয়ে আমার সে ইচ্ছা পুরন সম্ভব কিনা…’’

সন্ন্যাসী বললেন, “তথাস্তু।’’

রাজপুত্র খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠলেন। তার পরপরই মহা ধুমধামে রাজকন্যার সংগে তার বিবাহ হলো। সাত দেশের অগুন্তি মানুষ সে বিয়ের আনন্দে শরিক হলো। রাজকন্যা ও রাজপুত্রের বিবাহিত জীবনও হলো অতি আনন্দের। রাজকন্যা এখনও ভোরে একা একা বাগানে নগ্ন পায়ে ঘাসের মখমলে হাটতে ভালোবাসেন। এবছর শীত কাল থেকে একটি মজার ব্যাপার ঘটছে। যা আগে কেউ কখনও পৃথিবীতে ঘটতে দেখেনি। ভোরের ঘাসে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলের কনা জমে থাকছে। স্বচ্ছ, শীতল জল কনাগুলোর স্পর্শে রাজকন্যার নগ্ন পা বেয়ে অদ্ভুত এক আনন্দের শির শিরে অনুভুতি সারা শরীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে। রাজকন্যা তাই এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জল কনাগুলোর নাম দিয়েছেন “শিশির’’। সেই থেকে পৃথিবীতে শীতকালে শিশির পরা শুরু।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য