কুকুর কেন বিড়ালকে অপছন্দ করে চীনের উপকথা

এক সকালে যখন তার ছেলে কাজের খোঁজে বেরচ্ছিল, তখন বুড়ি ওয়াং তাকে বলল, "আগামিকাল আমরা কি খাব, আমি ভেবেই পাচ্ছি না।"
"ওহ, ঈশ্বর সে ব্যবস্থা করবেন। আমি কিছু টাকা আনার চেষ্টা করি", হাসিমুখে বলল তার ছেলে, যদিও সে নিজেও মনে মনে জানত না কি ভাবে কি হবে।
শীতকাল খুব খারাপ কেটেছেঃ প্রচন্ড ঠান্ডা, পুরু বরফ, আর তীব্র হাওয়া। ওয়াং দের বাড়ির অবস্থা শোচনীয়। পুরু বরফের ভারে ছাদ ভেঙ্গে পড়েছে। তারপরে এক বিরাট ঝড়ে একটা দেওয়াল ভেঙ্গে পড়েছে, আর ওয়াং দের ছেলে, মিং-লি, সারারাত ঠান্ডা বাতাসে জেগে বসে থেকে, সর্দিজ্বর বাঁধিয়েছে। অনেকদিন অসুস্থ ছিল সে, তার ওষুধ কেনার জন্য খরচা হয়ে গেছে জমানো টাকা। যেটুকু টাকা পয়সা ছিল সব শেষ হয়ে গেছে, আর মিং লি যে দোকানে কাজ করত, সেখানে অন্য লোক কাজ করছে। যখন সে শেষ অবধি বিছানা ছাড়ল, তখনো ভারি কাজ করার পক্ষে তার শরীর খুব দুর্বল, আর আশেপাশের গ্রামে তার করার মত কোন কাজ ছিল না। রাতের পর রাত সে বাড়ি ফিরে আসত, চেষ্টা করত ভেঙ্গে না পড়তে, কিন্তু তার মা'কে খাবার এবং পোষাকের জন্য কষ্ট পেতে দেখে এই ভাল ছেলের মন দুঃখে ভরে যেত।
"ঈশ্বর ওকে রক্ষা করুন!" ছেলের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে তার মা বলল।" কোন মায়ের এত ভাল ছেলে হয় না। ওর কথা সত্যি হোক যে ঈশ্বর আমাদের যোগান দেবেন। গত কয়েক সপ্তাহে যা খারাপ অবস্থা গেছে তাতে মনে হচ্ছে আমার পেটটা যেন একটা ধনী লোকের মাথার মতই ফাঁকা। ইঁদুরগুলি পর্যন্ত আমাদের কুঁড়েঘর ছেড়ে চলে গেছে, পুষির জন্য কিচ্ছু নেই, আর বুড়ো ভুলুর তো না খেতে পেয়ে মরমর দশা।"

যখন বুড়ি তার পোষ্যদের দুঃখের কথা বলছিল, তার কথায় সায় দিয়ে ঘরের কোণ থেকে একটা করুণ মিউ মিউ আর হতাশ ঘৌ ঘৌ ডাক ভেসে এল, যেখানে পুষি আর ভুলু ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচতে একসঙ্গে কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে ছিল। 
ঠিক তখনি বাগানের দরজায় একটা জোরে আওয়াজ শোনা গেল। ওয়াং বুড়ি ডেকে উঠল, "ভেতরে এস!" সে অবাক হয়ে দেখল, দরজায় একজন বুড়ো টাক মাথা পুরুত দাঁড়িয়ে আছে। এই অতিথি কিছু চাইতে এসেছে সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে সে বলতে থাকল, "মাপ কর বাছা, কিন্তু আমার কাছে দেওয়ার মত কিছু নেই। আমরা গত দুই সপ্তাহ ধরে কোনমতে খেয়ে থাকছি - তলানি, টুকরো -টাকরা খেয়ে - আর এখন খালি বসে ভাবি আমার স্বামী বেঁচে থাকার সময়ে আমরা কত খেতাম। আমাদের বিড়ালটা এত মোটা ছিল যে চাল বেয়ে উঠতে পারত না। এখন ওকে দেখ একবার। ও কত রোগা হয়ে গেছে। না, আমাকে মাপ কর পুরুতমশাই, আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারব না, তুমি বুঝতেই পারছ কেন।"

"আমি ভিক্ষা চাইতে আসিনি, " তার দিকে দয়ালু চোখে তাকিয়ে সেই মানুষটি বললেন, "আমি দেখতে এলাম তোমাকে কি ভাবে সাহায্য করতে পারি। দেব-দেবীরা তোমার অনুগত ছেলের নিরন্তর প্রার্থনা শুনেছেন। তাঁরা তাকে সম্মান করেন, কারণ সে তোমার জন্য ত্যাগ স্বীকার করবে বলে, তোমার মরে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করেনি। তাঁরা দেখেছেন, অসুখের পর থেকে সে কিভাবে তোমার সেবাযত্ন করেছে, আর এখন, যখন সে দুর্বল আর কাজ করতে অক্ষম, তাঁরা ঠিক করেছেন তার সুকৃতির জন্য তাকে পুরষ্কৃত করবেন। তুমিও একজন ভাল মা, আর তাই আমি যে উপহারটা এনেছি সেটা তুমি পাবে।"

"কি বলতে চাইছ তুমি?" ওয়াং বুড়ি তোতলাতে থাকল। সে নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারল না যে একজন পুরুত তাকে আশীর্বাদ করছেন।"তুমি কি আমাদের দুর্ভাগ্যে হাসতে এসেছ?"

"একদমই না। এই যে আমি আমার হাতে ধরে আছি একটা ছোট্ট সোনালি গুবরে পোকা, যেটার জাদু শক্তির সম্পর্কে তুমি ভাবতেই পারবে না। আমি এই দারুণ জিনিষটাকে তোমার কাছে রেখে যাব, এটা একটা ভাল উপহার, যেটা তোমাদের উপহার পাঠিয়েছেন সু-সম্পর্কের দেবতা।"

"হ্যাঁ, এটা ভাল দামে বিক্রি হবে," ছোট্ট গয়নাটাকে ভাল করে দেখে বুড়ি বিড়বিড় করে বলল, " আর আমাদের অনেকদিনের  যবের যোগান দেবে। ধন্যবাদ, পুরুতমশাই, আপনার দয়ার জন্য।"

"কিন্তু তুমি কোনভাবেই এই সোনালি গুবরে-পোকাটিকে বিক্রি করতে পারবে না, কারণ এটার শক্তি আছে সারা জীবনের মত তোমাদের পেট ভরে রাখার।"

পুরুতের অবাক করা কথা শুনে বুড়ির মুখ হাঁ হয়ে গেল।

"হ্যাঁ, তুমি আমাকে সন্দেহ কর না, বরং আমি যা বলছি, মন দিয়ে শোন । যখনি তোমার খাবার লাগবে, তুমি এই ছোট্ট গয়নাটাকে এক কেটলি ফুটন্ত জলে ফেলে দেবে, আর যা খেতে চাও , সেই খাবারের নাম আওড়াতে থাকবে। তিন মিনিটের মাথায় ডাকনা খুলে দিও, আর তোমার গরমাগরম খাবার তৈরি পাবে, যা অন্য যেকোন খাবারের থেকে অনেক বেশি সুস্বাদু।"

"আমি কি এখন চেষ্টা করতে পারি?" বুড়ি উতসুক ভাবে জিজ্ঞাসা করল।

"আমি চলে গেলেই পারবে।"

দরজা বন্ধ করে দিয়ে, বুড়ি তাড়াতাড়ি আগুন জ্বালালো, জল ফুটাল , আর তার মধ্যে সোনালি গুবরে-পোকাটাকে ছেড়ে দিয়ে আওড়াতে লাগলঃ

"ওলো পোলাও, ওলো পোলাও, আয়রে আমার কাছে,
না খেয়ে খেয়ে বাছা আমার রোগা হয়ে গেছে,
গরম গরম পোলাও, আয়রে তাড়াতাড়ি
শিগগির এসে ভর্তি কর আমার ফাঁকা হাঁড়ি"

সেই তিন মিনিট সময় কি আর কাটে ? পুরুত কি সত্যি কথা বলেছিল? কেটলির ভেতর থেকে ধোঁয়া বেরোতে দেখে উত্তেজনায় তার তো মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার যোগাড়। ঢাকনাটা খুলে এল! সে আর অপেক্ষা করতে পারল না। ওহ, কি অবাক করা দৃশ্য! তার অবিশ্বাসী চোখের সামনে, পাত্রভর্তি সুগন্ধযুক্ত পোলাও - তেমন পোলাও সে জীবনে কোনদিন চেখে দেখেনি! সে হামলে পড়ে খেতেই থাকল, যতক্ষণ না তার লোভি পেট একদম ভরে গেল, আর তারপরে সে কুকুর আর বেড়ালটাকে এত খাওয়াল যে তাদের পেট ফেটে যাওয়ার যোগাড়।

" অবশেষে ভাগ্য ফিরল,"  বাইরে রোদে শুয়ে ফিসফিস করে পুষি বেড়ালকে বলল ভুলু কুকুর। "আমি বোধ হয় খাবারের খোঁজে না বেরিয়ে আর এক সপ্তাহও টিকে থাকতে পারতাম না। আমি জানিনা ঠিক কি হল, তবে দেব দেবীদের মতি বোঝা ভার।"

ছেলে ফিরে এলে তাকে কেমন ভোজ খাওয়াবে, সেটা ভাবতে ভাবে ওয়াং বুড়ি মনে আনন্দে প্রায় নেচেই ফেলল।

"আদরের ছেলে আমার, সে আমাদের ভাগ্য দেখে কতই না অবাক হবে - আর সবই কিনা হয়েছে সে তার বুড়ি মা'কে যত্ন আত্তি করেছে বলে।"

যখন মিং-লি ফিরে এল, মুখ গম্ভীর করে,তার মা তার মুখ দেখেই বুঝল খবর ভাল নয়।

"  এস, এস বাছা!" সে ডেকে উঠল, " হাত মুখ ধুয়ে নাও, আর মুখে হাসি আন, কারণ দেবতারা আমাদের প্রতি সদয় হয়েছেন আর আমি খুব দ্রুত তোমাকে দেখাব আমার প্রতি তোমার ভালবাসার জন্য তুমি কেমন পুরষ্কৃত হয়েছ।" এই বলে , সে ফুটন্ত জলের মধ্যে সোনালি গুবরেপোকাটাকে ফেলে দিয়ে আগুণ খোঁচাতে লাগল।

মিং-লি গম্ভীরভাবে তার দিকে তাকিয়ে ভাবল, মা নিশ্চয় খিদের চোটে পাগল হয়ে গেছে। এই দুঃখও দেখার ছিল। সে কি তার নিজের পরণের শেষ পোষাকটি বিক্রি করে কয়েক পয়সা যোগাড় করে মায়ের জন্য যব কিনে আনবে?

ভুলু এসে তার হাত আদর করে চেটে দিল, যেন বলতে চাইল, " আর দুঃখ কর না তুমি, আমাদের ভাগ্য এবার খুলেছে।" পুষি এক লাফে বেঞ্চে উঠে পড়ে মনের আনন্দে মিউমিউ করতে লাগল।

মিং-লিকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। পলক ফেলতে না ফেলতেই সে শুনতে পেল তার মা ডাকছে-

" টেবিলে এসে বস বাবা, আর এই পোলাওটা গরম থাকতে থাকতে খেয়ে ফেল। "

সে কি ঠিক শুনছে? সে ভুল কিছু শুনল না তো? না, ওই তো টেবিলের ওপর এক বিশাল থালা ভর্তি সুস্বাদু পোলাও, যা পৃথিবীর মধ্যে সে সবথেকে বেশি ভালবাসে, অবশ্যই, তার মা'কে ছাড়া।

"খেয়ে নাও, আর কোন প্রশ্ন কর না" বুড়ি ওয়াং বলল। "তোমার খেয়ে পেট ভরলে আমি তোমায় সব কিছু বলব।"

ভাল কথা! ছেলের হাত পোলাওএর থালার ওপর দ্রুত চলতে থাকল। সে মনের খুশিতে অনেক খেল, আর তার মা তাকে অবশেষে পেট ভরে খেতে দেখে সত্যিই খুশি হল। কিন্তু সেই বুড়ি তার ছেলেকে এই অসাধারণ রহস্যটা জানানোর জন্য এতই উতলা ছিল,  সে তো আর ধৈর্য্য ধরে রাখতেই পারেনা ।

"শোন, বাছা!" সে আর থাকতে না পেরে ছেলের খাওয়া শেষ হওয়ার আগেই বলল- "এই দেখ আমার গুপ্তধন!" আর সে তার চোখের সামনে সোনালি পোকাটাকে তুলে ধরল।

"আমাকে আগে তুমি বল কোন দেবদূতের মত দয়ালু ধনী ব্যক্তি আমাদেরকে এত টাকা দিলেন?"

"সেটাই তো আমি তোমায় বলতে চাইছি," তার মা হেসে বলল, " আজ দুপুরে এখানে সত্যিই একজন দেবদূর এসেছিলেন, শুধু তাঁকে দেখতে ছিল টাকমাথা পুরোহিতের মত। এই সোনালি পোকাটাই একমাত্র জিনিষ যা উনি আমাকে দিলেন, কিন্তু এর ক্ষমতা হাজার হাজার টাকার থেকে বেশি। 

ছেলে পোকাটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল, নিজেই নিজেকে সন্দেহ করল, আর অধৈর্য্যভাবে নিজের সুস্বাদু খাবারের কথা ভাবতে থাকল।"কিন্তু, মা, এই পিতলের খেলনাটার সাথে এই অসাধারণ পোলাও এর সম্পর্ক কি? এত ভাল খাবার যা জীবনে খাইনি?"

"খেলনাই বটে! পিতল! ছিঃ ছিঃ বাছা! তুমি জান না তুমি কি বলছ। শুধু শোন আর এমন এক গল্প শুনবে যা তোমার চোখ খুলে দেবে।"

তার মা তাকে খুলে বলল কি কি হয়েছে, আর গল্পের শেষে , বাকি পড়ে থাকা পোলাও সবটুকু ভুলু আর পুষির জন্য মাটিতে ছড়িয়ে দিল, যেমনটা তার ছেলে আগে কোন দিন করতে দেখেনি, কারণ তারা এতই গরিব ছিল যে পরে খাওয়ার জন্য সবকিছু চেঁছে-পুঁছে জমিয়ে রাখত।

এরপর শুরু হল এক অফুরন্ত সুখের সময়। মা, ছেলে, কুকুর আর বিড়াল - সবাই মনের আনন্দে পেট ভরে খেতে লাগল। সেই ছোট্ট পোকাটাকে দিয়ে তারা  আগে কোনদিন না খাওয়া নানারকমের লোভনীয় খাবার আনাত। মাংসের কালিয়া, বিরিয়ানি, পায়েস আর আরো নানারকমের দারুণ সব খাবার চাইলেই এসে হাজির হত, আর খুব দ্রুত মিং-লির তার সব হারানো শক্তি ফিরে পেল, কিন্তু, মনে হয়, সে একটু অলস হয়ে পড়ল, কারণ তার আর কাজ করার প্রয়োজন ছিল না। আর কুকুর আর বিড়ালটা আরো মোটা হয়ে পড়ল, তাদের গায়ের লোম গুলি লম্বা আর চকচকে হয়ে উঠল।


কিন্তু হায়! যেমন কিনা চীনা প্রবাদে বলে, গর্ব ডেকে নিয়ে আসে দুঃখকে। এই ছোট্ট পরিবার তাদের সৌভাগ্যে এত গর্বিত হয়ে পড়ল যে তারা তাদের বন্ধু এবং আত্মীয়দের ঘনঘন খেতে ডাকতে থাকল নিজেদের ভাল খাবার দেখানোর জন্য। একদিন সুদূর গ্রাম থেকে নিমন্ত্রণ খেতে এল চু পরিবারের কত্তা-গিন্নী। তারা ওয়াংদের বাড়ির অবস্থা দেখে বেশ অবাক হল। তারা ভেবে এসেছিল গরিবের মত খেতে পাবে, কিন্তু তার বদলে পেট পুরে খেয়ে ফিরে গেল।

"এ আমার খাওয়া সেরা ভোজ" , নিজেদের ভাঙ্গা বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে চু কত্তা বলল।

"হ্যাঁ, আর আমি জানি ওগুলি কোথা থেকে এসেছে", তার গিন্নী বলল। "আমি দেখেছি বুড়ি ওয়াং তার রান্নার হাঁড়ি থেকে একটা ছোট্ট সোনার গয়না বার করে একটা দেরাজে তুলে রাখল। ওটা নিশ্চয় জাদুর কিছু হবে, কারণ আমি শুনতে পাচ্ছিলাম আগুন উসকাতে উসকাতে ও পোলাও-কালিয়া নিয়ে কি সব যেন বিড়বিড় করছিল।

"একটা জাদু মন্ত্র, অ্যাঁ? সবসময়ে অন্য লোকেরাই সব সৌভাগ্য পায় কেন? মনে হচ্ছে আমাদের সারা জীবন গরীবই থেকে যেতে হবে।"

"এক কাজ কেন করিনা- ওয়াং বুড়ির জাদুমন্ত্রটাকে আমরা কিছুদিনের জন্য ধার নিই না কেন, যদ্দিন না আমাদেরও গায়ে একটু গত্তি লাগে? এ তো কিছু অন্যায় নয়, আর হ্যাঁ, আমরা ওটাকে কিছুদিন পরে ফেরতও দিয়ে দেব।
"

"ওরা নিশ্চয় জিনিষটাকে খুব যত্নে রাখে। ওদের এখন কোন কাজ করতে হয়না, তাই ওদের বাড়ি ফাঁকা পাবে কখন? আর ওদের বাড়িতে একটা ঘর, সেটাও আমাদের ঘরের মতই, আর তাই ঐ সোনালি জাদুর জিনিষটাকে খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিণ। কথায় বলে, রাজার ঘরে চুরি করার থেকে ভিখিরির ঘরে চুরি করা বেশি শক্ত।

"আমাদের ভাগ্য আমাদের সহায়," হাত চাপড়ে বলে উঠল চু গিন্নী।" ওরা আজকেই মন্দিরের মেলায় যাচ্ছে। আমি শুনেছি ওয়াং গিন্নী তার ছেলেকে বলছে সে যেন মনে করে তাকে দুপুরবেলা নিয়ে যায়। আমি সেই সময়ে ফিরে গিয়ে ওই জাদুর জিনিষটাকে ওর দেরাজ থেকে বার করে নিয়ে আসব।

"তোমার ভুলুকে ভয় নেই?"

"ধুস্‌! ও ব্যাটা এত মোটা হয়েছে যে খালি গড়ায়। যদি বুড়ি হটাত করে ফিরে আসে, আমি তাহলে বলব আমি নিজের বড় চুলের কাঁটাটা খুঁজতে এসেছি, যেটা আমি খেতে গিয়ে হারিয়ে ফেলেছিলাম।"

"বেশ ভাল, তাহলে যাও, কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা জিনিষটা খালি ধার নিচ্ছি, চুরি করছি না, কারন ওয়াংরা আমাদের ভাল বন্ধু, আর তাছাড়াও, আমরা ওদের বাড়ি থেকে সবে খেয়ে ফিরলাম।"

চু গিন্নী গেল আর এক ঘন্টার মধ্যে বাড়ি ফিরে এসে আনন্দে গদগদ হয়ে তার স্বামীকে সেই পুরোহিতের উফার দেখাল। একটা মানুষও তাকে ওয়াংদের বাড়ি ঢুকতে দেখেনি। কুকুরটা সাড়াশব্দ করেনি, আর বিড়ালটা খালি একবার চোখ খুলে দেখে, বাড়িতে অতিথি দেখে একটু অবাক হয়ে আবার তার দিবানিদ্রায় ফিরে গেছে।

ওদিকে মেলা থেকে ফিরে গরমাগরম খাবার খাবে এই ভেবে এসে, ওয়াং বুড়ি তার জাদুপোকা খুঁজে না পেয়ে মহা কান্নাকাটি জুড়ে দিল। সে সত্যিটা বিশ্বাসই করতে চাইছিল না। সে দেরাজের ভেতরে অন্তত দশবার খুঁজল, আর তারা মায়ে-ছেলেতে মিলে ঘরে ভেতর এমন খোঁজা খুঁজল যে মনে হল ঝড় বোয়ে গেছে।

তারপরে এল ক্ষুধার্ত থাকার দিন, যা আরো কষ্টকর হয়ে উঠল, কারণ তারা এ ক'দিনে ভালমন্দ খেয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আহা, তাদের যদি এহেন অভ্যাস না হত! আবার সেই খুঁটে খুঁটে খাওয়ার দিনে ফিরে যেতে কি কষ্টই না হল।

কিন্তু, ভাল খাবার না পেয়ে,  বুড়ি আর তার ছেলের থেকেও বেশি কষ্ট হল পোষ্য দুটির। তাদের অবস্থা আবার আগের মত হল আর রোজ তাদের রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে থাকা হাড়গোড় খুঁজতে হত, যাঅন্য বড়লোকের বাড়ির কুকুর বিড়ালেরা ছুঁয়েও দেখত না।

 এরকম কিছুদিন চলার পরে, একদিন পুষি হটাত উত্তেজনায় ফোঁসফোঁস করে উঠল।

"তোর হলটা কি?" ধমক দিল ভুলু।" তুই কি খিদেয় পাগল হলি, নাকি আবার এটা মাছি ধরেছিস?"

"আমি আমাদের দুরবস্থার কথা ভাবছিলাম, আর এখন আমি বুঝতে পারছি সব সমস্যার কারণ কি।"

"তুই জানিস?" বিদ্রুপের সুরে বলল ভুলু।

"হ্যাঁ, আমি জানি, আর তুই আমাকে তাচ্ছিল্য করার আগে দু'বার ভাব, কারণ তোর ভবিষ্যত আমার হাতের মুঠোয়, সেটা তুই কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারবি।"

"আচ্ছা , আচ্ছা, শুধুমুধু রাগ করিস না। কি এবন অসাধারণ আবিষ্কার তুই করেছিস - যে সব ইঁদুরদের একটা করে লেজ আছে?"

"সবার আগে বল, তুই কি আমাদের পরিবারের সৌভাগ্য ফিরিয়ে আনতে আমাকে সাহায্য করতে চাস?"

"অবশ্যই চাই। বোকার মত কথা বলিস না, " আবার ভালমন্দ খাওয়ার আশায় কুকুরটা লেজ নেড়ে ডেকে উঠল। "নিশ্চয়! নিশ্চয়! যদি তুমি ভাগ্যদেবীকে ফিরিয়ে আনতে পারিস, তাহলে তুই যা বলবি সব করব।"

"ঠিক আছে। তাহলে শোন। আমাদের বাড়িতে চোর ঢুকে গিন্নীর সোনালি পোকাটাকে চুরি করেছে। তোর মনে আছে আমরা কিরকম ভালমন্দ খাবার পেতাম হাঁড়ির থেকে। শোন তাহলে, প্রতি দিন আমি দেখতাম আমাদের গিন্নী ওই দেরাজ থেকে একটা ছোট্ট সোনালি পোকা বার করে হাঁড়িতে ফেলত। একদিন আমার সামনে সেটাকে তুলে ধরে বলেছিল, 'দেখ পুষি, এইটাই আমাদের সব আনন্দের মূলে। তুই নিশ্চই ভাবছিস এটা তোর হলে কেমন হত?' এই বলে হেসে আবার সেটাকে দেরাজে ঢুকিয়ে রাখল।"

"সত্যি বলছিস?" জিজ্ঞাসা করল ভুলু।"কই আমাকে তো এর আগে এটা নিয়ে আমাকে কিছু বলিস নি।

" তোর মনে আছে যেদিন চু কত্তা আর চু গিন্নী এখানে এসেছিল, আর কিভাবে চু গিন্নী আবার ফিরে এসেছিল যখন আমাদের গিন্নীমা আর দাদাবাবু মেলায় গেছিল? আমি ওকে দেখেছিলাম, চোখের কোণ দিয়ে। আমার একটু অবাক লেগেছিল, কিন্তু আমি স্বপ্নেও ভাবিনি ও চোর হবে। হায়! আমি কি ভুল করেছিলাম। ও পোকাটাকে নিয়ে চলে গেল, আর আমি যদি ভুল না করি, এখন ওরা সেইসব ভালমন্দ খাচ্ছে যা আসলে আমাদের।"

" এখনি ওদের ধরি চল," দাঁত কিড়মিড় করে গর্জে উঠল ভুলু।

"সেটা করে লাভ নেই, " পুষি বলল, " কারণ শেষ অবধি ওরাই জিতে যাবে। আমাদের ওই পোকাটাকে দরকার- সেটাই আসল। প্রতিশোধ নিতে হলে মানুষেরা নিক; ওতে আমাদের কোন কাজ নেই।"

"তুই কি করতে বলিস?" ভুলু বলল।" আমি তোর সাথে সবসময়ে আছি।"

"চল আমরা চু দের বাড়িতে গিয়ে পোকাটাকে নিয়ে পালিয়ে আসি।"

"হায়রে, আমি তো বিড়াল নই!" মনের দুঃখে বলল ভুলু। " আমরা ওখাণে গেলে আমি ভেতরে ঢুকতে পারব না, কারণ চোরেরা সব সময়ে তাদের দরজা ভাল করে এঁটে রাখে। তোর মত হলে আমি দেওয়ালে চড়তে পারতাম। জীবনে এই প্রথমবার আমি একটা বিড়ালকে হিংসা করছি।"

"আমরা একসঙ্গে যাব, " বলল পুষি, " নদী পেরোবার সময়ে আমি তোর পিঠে চেপে যাব, আর তুই আমাকে অজানা প্রাণীদের হাত থেকে রখা করবি। যখন আমরা চু দের বাড়িতে পৌঁছাব, আমি দেওয়ালে চড়ে যাব, আর বাকি কাজটা নিজে করব। শুধু তোকে বাইরে অপেক্ষা করতে হবে যাতে আরা পোকাটাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারি।"

কথাবার্তা সব ঠিক হয়ে গেল। দুই সঙ্গীতে মিলে সেই রাতেই অভিযানে বেরোল। পুষির বুদ্ধিমত তারা নদী পেরোল, আর ভুলু সাঁতার কেটে বেশ মজা পেল, কারণ, সে জানাল, তার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। আর পুষির গায়ে এক ফোঁটাও জল লাগল না। মাঝরাতে তারা চু দের বাড়ি পৌঁছাল।

"আমার আসা অবধি অপেক্ষা কর," ভুলুর কানে ফিসফিস করে বলল পুষি।

সজোরে এক লাফ দিয়ে সে মাটির দেওয়ালের ওপরে উঠে পড়ল, আর তারপরে এক লাফে ভেতরের উঠোনে। ছায়ায় দাঁড়িয়ে সে ঠিক করতে লাগল কিভাবে কি করবে, এমন সময়ে অল্প একটু সড়সড় আওয়াজ আর ব্যস! এক বিশাল লাফ দিয়ে, থাবা বাগিয়ে, সে একটা ইঁদুরকে ধরে ফেলল, যে কিনা সবে তার গর্ত থেকে মাঝরাতে একটু হাওয়া খেতে বেরিয়েছিল।

এখন, পুষির এতই খিদে পেয়েছিল, যে সে এই লোভনীয় শিকারকে এখনি কপাত করে গিলে ফেলত, যদি না ইঁদুরটা মুখ খুলে , তাকে অবাক করে দিয়ে, বিড়ালদের ভাষায় কথা বলতে শুরু করত।

" ভাল পুষি, রক্ষে কর, তোমার দাঁত বসিও না! নখ গুলিকে আমার থেকে একটু দূরে রাখ। তুমি কি জাননা এখন নিয়ম হয়েছে বন্দীদের সম্মান জানানোর? আমি কথা দিচ্ছি আমি পালাব না।"

"যাঃ! ইঁদুরের আবার সম্মান কিসের র‍্যা?"

" এটা ঠিক, যে বেশিরভাগেরই নেই, কিন্তু আমার পরিবার কিনা বেড়ে উঠেছে কনফুসিয়াসের (প্রাচীন চীনের দার্শনিক) ছাদের তলায়, আর সেখানে আমাদের এত জ্ঞান লাভ হয়েছে যে আমরা হলুম গিয়ে নিয়মের মধ্যে ব্যতিক্রম।তুমি যদি আমাকে ছেড়ে দাও, আমি তোমাকে সারা জীবন মেনে চলব, আমি তোমার দাস হয়ে থাকব। " তারপরে, দ্রুত এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সে বলল, "দেখ, আমি ছাড়া পেয়ে গেছি, কিন্তু আমার আত্মসম্মান আমাকে এখানে ধরে রেখেছে, তাই আমি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব না।"

"না করলেই ভাল," নিজের শরীরে মোচড় দিয়ে বলল পুষি, জিভ তার ইঁদুরের মাংসের লোভে লকলক করছে। "আমার এখন তোকে কিছু প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করছে। প্রথমে, আমার কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর দে, আর আমি দেখি তুই সত্যি কথা বলিস কিনা। তোর কত্তা গিন্নী আজকাল কেমন খাবার খাচ্ছে, যে তুই এত মোটাসোটা গোলগাল, আর আমি রোগা শুঁটকে?"

"ওহ, আমাদের এখন ভাগ্য খুব ভাল বলতে হবে। কত্তা-গিন্নী সারা দেশের সব থেকে ভাল ভাল খাবার খাচ্ছে, আর আমরা তার থেকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে পাচ্ছি বইকি।"

"কিন্তু এটা একটা পুরোনো ভাঙ্গাচোরা বাড়ি। ওরা কি করে ভাল খাবার পেতে পারে?"

"সে এক বড় রহস্য, কিন্তু আমি তোমাকে সত্যি কথা বলতে বাধ্য, তাই বলছি। আমাদের গিন্নী কোনরকমভাবে একটা মন্ত্রপূত জিনিষ পেয়েছে..."

"সে আমাদের বাড়ি থেকে ওটা চুরি করেছে," ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল পুষি, " আমি ওকে বাগে পেলে ওর চোখ খুবলে ফেলব। আমরা ওই পোকাটাকে ছাড়া না খেয়ে মরতে বসেছি। আর তোর গিন্নী আমাদের বাড়ি নেমন্তন্ন খেয়ে এসেই ওটা চুরি করেছে! এই বিষয়ে তোর কি বলার আছে রে ইঁদুর ব্যাটা? তোর মনিবের পূর্বপুরুষেরাও কি সেই মহাত্মার কথা শুনে চলত?"

"ওহ ওহ ওহ! এতদিনে বুঝলাম!" ইঁদুর চেঁচিয়ে বলল, "আমি অনেকবার ভেবেছি ওরা ওই সোনালি পোকাটাকে কোথায় পেল, যদিও আমি প্রশ্ন করার সাহস পাইনি।"

"সে বেশ করেছিস! কিন্তু এখন শোন, ইঁদুর-বন্ধু - তুই আমাকে সোনালি পোকাটাকে এনে দিবি, আর আমি তোকে নিঃশর্তে ছেড়ে দেব। তুই জানিস, ওটাকে কোথায় লুকিয়ে রাখে?"

"হ্যাঁ, ভাঙ্গা দেওয়ালের গায়ে একটা ফাটলের মধ্যে। আমি সেটাকে এক মূহুর্তের মধ্যে তোমার কাছে নিয়ে আসতে পারি, কিন্তু আমাদের কাছ থেকে ওটা চলে গেলে আমরা বেঁচে থাকব কি করে? আবার খাবারের অভাব হবে , আবার আমাদের ভাগ্যে জুটবে ভিখিরির খাদ্য।"

"নিজের ভাল কাজের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকিস", গরগর করে বলল পুষি। "বুঝলি, একজন সৎ ভিখিরি হয়ে থাকা দারুণ ব্যাপার। এখন যাঃ! আমি তোকে বিশ্বাস করছি কারণ তোরা কনফুসিয়াসের বাড়িতে থাকতিস। আমি এখানে তোর ফেরার জন্য অপেক্ষা করব। আহা!" সে নিজের মনে হাসল," ভাগ্যদেবী মনে হচ্ছে সদয় হচ্ছেন।"

পাঁচ মিনিট পরে ইঁদুরটা বেরিয়ে এল, পোকাটাকে মুখে নিয়ে। সে বিড়ালটার দিকে পোকাটাকে এগিয়ে দিল, আর দিয়েই এক দৌড়ে পালাল। তার সম্মান রক্ষা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু  সে পুষিকে ভয় পেয়েছিল। সে পুষির সবুজ চোখে লোভ দেখেছিল, আর সে বিড়াল তার কথা রাখত কিনা সন্দেহ আছে, যদি না তার বাড়ি ফিরে যাওয়ার অত তাড়াহুড়ো থাকত, যেখানে গেলে তার মনিব গিন্নী আবার দারুণ খাবার আনার জন্য হাঁড়িটাকে বলতে পারবে।

পূব্দিকের পাহাড়ের কোলে যখন সূর্য উদয় হচ্ছিল, তখন দুই অভিযাত্রী নদীর ধারে গিয়ে পৌঁছাল।

"সাবধান," বলল ভুলু, যখন বিড়ালটা তার পিঠে লাফ দিয়ে উঠল , নদী পার হবে বলে, "সাবধান, জাদু জিনিষটা ভুলে যাসনা। মোদ্দা কথা, মনে রাখিস, যদিও তুই একটা মেয়ে, কিন্তু ওপারে পৌঁছান অবধি তোর মুখ বন্ধ রাখা দরকার।"

"ধন্যবাদ, আমার মনে হয়না আমার তোর উপদেশের প্রয়োজন হবে," পুষি জবাব দিল, মুখে পোকাটাকে তুলে নিয়ে ভুলুর পিঠে লাফ দিয়ে উঠতে উঠতে।

কিন্তু হায়! ঠিক যখন তারা অন্যদিকের পাড়ের কাছে এসে পৌঁছেছে, উত্তেজিত বিড়ালটার বুদ্ধি লুপ্ত হল। একটা মাছ হটাত করে ওর নাকের ঠিক নিচ দিয়ে লাফ দিল। সেই লোভ সামলানো মুশকিল। তার চোয়াল দুটি নিমেষে হাঁ হল মাছটাকে ধরার জন্য, আর তার ফলে সোনালি পোকাটা নদীর তলায় ডুবে গেল।

"হল তো!" কুকুরটা রেগে বলল, " তোকে আমি কি বলেছিলাম? এক কষ্ট সব জলে গেল - তোর বোকামোর জন্য।"

কিছুক্ষণের জন্য খুব বাজে ঝগড়া হল, আর দুই সঙ্গীতে মিলে একে অপরকে অনেক বাজে কথা বলল। তারপরে ঠিক যখন তারা নদীর পাড় ছেড়ে চলে যাচ্ছে, হতাশ এবং নিরাশ হয়ে, একটা ব্যাং, যে কিনা তাদের কথা শুনতে পেয়েছিল, এসে বলল যে সে নদীর তলার থেকে পোকাটাকে খুঁজে এনে দেবে। সে পোকাটাকে খুঁজে এনে দিলে, দুজনে মিলে তাকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে বাড়ির পথে হাঁটা দিল।

যখন তারা বাড়ি পৌঁছাল, তারা দেখল দরজা বন্ধ আছে। ভুলু অনেক করে ডাকাডাকি করল, যাতে মনিব দরজাটা খুলে দেয়, কিন্তু দরজা খুলল না। ভেতর থেকে জোরে কান্নাকাটির শব্দ ভেসে আসছিল।

"গিন্নীমার মন খারাপ", পুষি ফিসফিস করে বলল।" আমি গিয়ে ওনাকে খুশি করে দেব।"

এই বলে, সে এক লাফে জানালার একটা ফুটো দিয়ে ভেতরে লাফ দিল। কিন্তু হায়! সেই ফুটো মাটির থেকে অনেক উঁচুতে ছিল আর অনেক ছোটও ছিল, তাই বিশ্বাসী ভুলু ঢুকতে পারল না।

পুষি ভেতরে ঢুকে দেখল, বিছানায় বুড়ির ছেলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে, ক্ষুধায় কাতর হয়ে, আর তার মা, হতাশ হয়ে বসে মাথা ঝাঁকাচ্ছে, তার কুঁচকে যাওয়া হাত দুটো কচলাচ্ছে, আর জোরে জোরে কেঁদে ডাকছে যাতে তাদের কেউ এসে সাহায্য করে।

"আমি এসে গেছি, গিন্নীমা, " বলল পুষি, " আর এই তোমার সেই জিনিষ যার জন্য তুলি কাঁদছ। আমি এটাকে উদ্ধার করে তোমার কাছে নিয়ে এসেছি।"

পোকাটাকে দেখে বুড়ি এতই খুশি হল যে বিড়ালটাকে তার কোলে তুলে নিয়ে বুকে চেপে ধরল।

" জলখাবার, বাছা, জলখাবার! জেগে ওঠ বাছা! ভাগ্য আবার ফিরে এসেছে। আমাদের আর না খেয়ে থাকতে হবে না।"

একটু পরেই একটা দারুণ গরম ধোঁয়াওঠা খাবার তৈরি হয়ে গেল। আর তুমি বুঝতেই পারছ, কিভাবে বুড়ি আর তার ছেলে, পুষির প্রশংসা করতে করতে, তার থালায় ভাল ভাল খাবার ভরে দিল, কিন্তু কুকুরটার সম্পর্কে কিছুই বলল না, কারণ এই পুরো সময়েটাতে চালাক বিড়াল এই সোনালি পোকা উদ্ধারের ব্যাপারে ভুলুর ভূমিকা নিয়ে একটাও কথা বলেনি। সে বেচারা দুঃখে অবাক হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে ভাল ভাল খাবারের গন্ধ শুঁকতে লাগল।


অবশেষে, যখন জলখাবার খাওয়া শেষ হল, তখন পুষি আবার জানালার গর্ত দিয়ে বেরিয়ে এল।

"ওরে ভুলুরে, " সে হেসে হেসে বলল, " তোর ভেতরে এসে দেখা উচিত ছিল আমাকে ওরা কত কি খাওয়াল! আমি পোকাটা ফিরিয়ে নিয়ে আসায় গিন্নীমা এত খুশি হয়েছে যে আমাকে খেতে দিয়ে দিয়ে আর আমার সম্পর্কে ভাল ভাল কথা বলে আর শেষ করতে পারে না। সত্যি রে, তুই একটুও পেলিনা, আর এখনো না খেয়ে আছিস। তুই বরং রাস্তায় গয়ে দেখ হাড়গোড় কিছু পাস কিনা।"

এই লজ্জাজনক বিশ্বাসঘাতকতা দেখে ভুলু এত রেগে গেল যে, রেগে গিয়ে সে বিড়ালটার ওপরে লাফিয়ে পড়ল, আর কয়েক মূহুর্তের মধ্যে তাকে মেরে ফেলল।

" যে একজন বন্ধুকে ভুলে যায়, আর নিজের কথার দাম রাখে না, তাকে এভাবেই মরতে হয়," সে চিৎকার করে বলল।

দৌড়ে রাস্তায় বেরিয়ে গিয়ে, সে অন্যান্য কুকুরদের কাছে পুষির বিশ্বাসঘাতকতার কথা বলল, আর সবাইকে সাবধান করে দিল যেন তারা বিড়ালদের সাথে কখনই বন্ধুত্ব না পাতায়।

আর এই কারণেই, ভুলুর বংশধরেরা, সে চীনেই হোক, বা অন্যান্য দেশে, সর্বদা পুষির বংশধরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। তারা কখনই আর একে অপরে সাথে বন্ধুত্ব পাতায় না।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য