বোকা বণিক জাতক

বারাণসীতে তখন রাজত্ব করছেন ব্রহ্মদত্ত। ব্রহ্মদত্তের আমলে বোধিমত্ত্ব জন্ম নেন এক বণিক পরিবারে। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য শিখলেন। বাণিজ্যে বোধিসত্ত্বের বুদ্ধি বেশ ধারাল হয়ে উঠতে রাগল। এক এক করে পাঁচশটি গরুর গাড়ি করেছেন। আজ এদেশ, কাল ওদেশে যাচ্ছেন ব্যবসা করতে।
বোধিসত্ত্বের সময়ে বারাণসীতে আর একজন বণিক থাকতেন। তবে তাঁর মগজ তত সাফ নয়। শ পাঁচেক গরুর গাড়ি অবশ্য তাঁরও ছিল।
একদিন বধিসত্ত্ব ঠিক করলেন সমস্ত গরুর গাড়ি নানারকম মালে বোঝাই করে দূর দেশে বেচতে যাবেন। হঠাৎ খবর পেলেন, সেই দ্বিতীয় বণিকও ঠিক করেছে সেখানে ব্যবসা করতে যাবে।
বোধিসত্ত্ব ভাবলেন দুজনের একসঙ্গে যাওয়াটা ঠিক হবে না। এক হাজার গরুর গাড়ি, এতসব লোকলষ্কর এক সঙ্গে গেলে বেশ অসুবিধা হবে। একে তো লোকের খাবার দাবার জল চোটানো বেশ কঠিন হবে তারপর অতগুলো গোরুর খাবারও সব জায়গায় না পাওয়া যেতে পারে। আর দুজনের যাওয়ার মাঝখানে মাসখানেক, মাস দেড়েক ফারাক থাকাই ভালো। যাই হোক, বোধিসত্ত্ব সেই বণিককে ডেকে সব কথা বুঝিয়ে বললেন। সব শুনে বণিকটি বলল সে আগে যেতে চায়। বোধিসত্ত্ব তাতে কোন আপত্তি করলেন না।

ঐ বণিকটি ভেবেছিল আগে গেলে খাবারদাবার জোগাড় করতে সুবিধা হবে। তাছাড়া, বাণিজ্য করতেও অসুবিধা হবে না। সে আগে যাবে, তখন কোন প্রতিযোগীতা থাকবে না। ফলে মালপত্তর চড়া দামে বেচা যাবে।
আর বোধিসত্ত্ব ভাবলেন, ওর পাঁচশ গোরুর গাড়ির চাকায় অসমান রাস্তা সমান হয়ে যাবে সুতরাং পরে যখন বোধিসত্ত্ব যাবেন তাঁর কোন অসুবিধা হবে না। রাস্তায় যেতে যেতে জলের জন্য ওদের কুঁয়ো খুড়তেই হবে। বোধিসত্ত্ব ও তাঁর লোকজনকে জলের জন্য হাঙ্গামা পোহাতে হবে না। বণিকের গোরুগুলো রাস্তার দুপাশে ঘাস খেতে খেতে যাবে। বোধিসত্ত্বের দলটি যখন ঐসব জায়গায় পৌঁছবে, ততদিনে সেখানে ঘাস জন্মাবে। বোধিসত্ত্বের গোরুগুলো তরতাজা ঘাস খেয়ে চাঙ্গা হতে পারবে। এছাড়াও এম মস্ত সুবিধা হল বণিক আগে যাওয়াতে মালপত্তরের দাম-দর বাঁধা হয়ে যাবে। বোধিসত্ত্বের বেচাকেনা খুব সহজ হয়ে যাবে এতে।
দ্বিতীয় বণিক শুভ দিনে যাত্রা শুরু করল। কয়েকদিন পরে তারা এক গহীন বনের কাছে এসে পড়ল। ঐ বনে যক্ষদেব বাস। তারা মায়া যাদু জানে। ইচ্ছে করলেই মানুষ বা জীবজন্তুর রূপ ধারণ করতে পারে। বিপদ আরো আছে, ঐ বনের ত্রিসীমানার মধ্যে এক ফোঁটা জল নেই।
বণিক তার দলবল সমেত কাছাকাছি আসা মাত্র যক্ষদেব রাজা এক ফন্দি করল। সে ভাবল বণিককে যদি বোঝানো যায় যে বনের মধ্যে বস্তির জল আছে, তাহলে বণিক জলের জালাগুলো ফেলে দেবে। আর তাহলেই কেল্লাফতে। কেননা জলের অভাবে তারা খিদেতেষ্টায় কাতর হয়ে পড়বে। তখন ওদের ঘায়েল করতে বেগ পেতে হবে না।
যক্ষরাজা তখন মায়াবলে ধবধবে সাদা দুটো গরু তৈরী করল। সুন্দর একটা গোরুর গাড়ি বানাল। নিজে চমৎকার পোশাকে সেজে গাড়ি ছুটিয়ে দিল। যক্ষ রাজার দশ-বারো জন অনুচর ছুটল গাড়ির পিছু পিছু। অনুচরদের গলায় ঝুলছে নীল ও শ্বেত পদ্মের মালা। হাতে পদ্মের ডাঁটা। পায়ে কাদা।
বণিকের কাছে এসে যক্ষরাজ বলল, ‘মহাশয় কোখা থেকে আসা হচ্ছে?”
আমরা তো আসছি বাণারসি থেকে। কিন্তু আপনার গাড়ির চাকায় কাদা এলো কোথা থেকে? লোকজনের পায়েই বা কাদা কেন? পদ্শফুল, পদ্মের ডাঁটা এসব পেলেন কোথায়?’
‘পদ্মদিঘী থেকে ওরা তুলে নিয়েছে, আর ওদিক তো তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে।’
‘কোথায়?’


‘ঐ যে দেখছেননা দূরের গাছগুলো, ওখানে নীল ও শ্বেতপদ্মে ভরা কত সরোবর, কাজলকালো জল সেখানে, তার উপর টানা বৃষ্টি চলেছে।’
যক্ষরাজের সঙ্গীরা বণিকের লোকজনকে জিজ্ঞেস করল, ‘হাঁ মশায়, আপনাদের পেছনের দিকের গাড়িগুলো এত ভারি কেন?’
বণিকের সঙ্গীরা বলল, ‘ওগুলোতে জলের জালা আছে।’
শুনে যক্ষরাজ বলল, ‘খামোখা আর কেন ওগুলো বয়ে নিয়ে যাবেন, সামনে জলের কোন অভাব নেই। তাছাড়া গাড়ি হাল্কা করলে তাড়াতাড়ি যেতে পারবেন।’
যক্ষরাজ তো তারপর গাড়ি চালিয়ে যক্ষপুরীতে ফিরে গেল। এদিকে বোকা বণিক ভাবল, সত্যিইতো, খামোকা আর জালা গুলো বয়ে দিয়ে যাই কেন। দলের লোকদের হুকুম করল জল ফেলে দিতে।
জল ফেলে দিয়ে তারা চলছে তো চলছে। কোথায় সরোবর। কোথায় বৃষ্টি। ক্লান্ত হয়ে রাতে গাড়ি থামনো হর। কিন্তু রান্না হবে কি করে। এক ফোঁটা জল নেই যে। এই অবস্থায় তারা যখন ধুঁকছে তখন যক্ষরা হামলে পড়ল। বণিক, বণিকদের লোকজন ও গোরুগুলো সব যক্ষদের পেটে গেল। অক্ষত থেকে গেল গোরুর গাড়িগুলো। আর বিজন বরে পড়ে রইল ওদের হাড়গোড়।
দেরমাস পড়ে বোধিসত্ত্ব তাঁর লোকজন সমেত এসে পড়লেন সেই ভয়ঙ্কর বনের কোছে। তিনি জানতেন এই বনের মধ্যে কোথাও এক ফোঁটা জল নেই। তাই আগেই জালা জালা জল ভরে রেখেছেন। বনে ঢ়োকার আগে সঙ্গীদের সাবধান করে দিয়েছেন এই বলে, ‘আমাকে না জানিয়ে এ বনের কোন ফৗ্র খেও না, এখানে অনেক বিষাক্ত গাছ আছে।’
বোধি সত্ত্ব বনের মধ্যে একটু এগাতেই দক্ষরাজা আগের মতই চাতুরি করতে এল। বোধিসত্ত্ব দেখলেন যক্ষরাজের চোখ রক্তের মত লাল। মাটিতে তার ছায়া পড়ছে না। বুঝলেন, এ মানুষ নয়, অপদেবতা। যক্ষরাজ বলল, ‘বনের মধ্যে প্রচুর জল, কেন খামোকা জল বয়ে দিয়ে যাচ্ছেন। তুছাড়া তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে।’
শুনে বোধিসত্ত্ব বললেন, ‘ যা ভাগ এখান থেকে। পাপী কোথাকার! আমি বণিক বুঝলি। যা করব নিজের বুদ্ধিতেই করব। নিজের চোখে সরোবর দেখলে তখন ভাবতাম। তোর কথায় জল ফেলে তেষ্টায় মরতে রাজি নই, বুঝলি।’
যক্ষরাজ হাড়ে হাড়ে বুঝল এ পাত্র টলবে না। সুতরাং সে ফন্দি ফিকির ছেড়ে ফিরে গেল।
বোধিসত্ত্বের দলের লোকজন কিন্তু এতে একটু বিগড়েই গেল। তারা ভাবল, সত্যি জল ফেলে দিলে বেশ তাড়াতাড়ি যাওয়া যেত। অভিযোগের বহর দেখে বোধিসত্ত্ব সবাইকে ডাকলেন।
‘এ বনে জল আছে এমন কথা কেউ আগে শুনেছে কি?’
তারা বলল,‘ না।’
‘ঐ দূরের বনে যদি সত্যি সত্যি বৃষ্টি হত তাহলে এখানে বৃষ্টিতে ভেজা ঠান্ডা বাতাস বইত নিশ্চয়?’
সকলে মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ, তা ঠিক।’
‘যে মেঘে বৃষ্টি হয় সেই মেষ ধুর থেকে দেখা যায় কিনা?’
সকলে বলল, ‘হ্যাঁ যায়’।
‘তোমরা কি সে মেঘ দেখতে পাচ্ছো?’
তারা বলল, ‘না।’
‘মেঘের গর্জন দূর থেকে শোনা যাচ্ছে কিনা?’
তারা স্বীকার করল, হ্যাঁ, শোনা যায়।’
‘তোমরা কি সেরকম কোন আওয়াজ শুনতে পায়েছ?’
সকলে একবাক্যে বলে উঠল, ‘না।’


বোধিসত্ত্ব এরপর ব্যাখ্যা করে বললেন, দেখ, প্রমাণ না পেলে কোন কিছু বিশ্বাস করা ঠিক নয়। আসলে যে লোকটা এত কথা বলে গেল সে মানুষ নয়, যক্ষ। ওর কথা শুনে আমরা জল ফেলে দিলে পরে জলের অভাবে বিপদে পড়তাম। খিদে-তেষ্টায় কাহিল হেয়ে পড়লে তখন যক্ষের দল আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শেষ করে দিত। মনে হচ্ছে সামনের দিকে এগোলে দেখতে পাবো ওরা আগের বণিকের দফা গয়া করেছে কিভাবে।’
আর কিছু দূর এগোনোর পর দেখলও তাই। গোরুর গাড়িগুলো পড়ে আছে কিন্তু গোরুর পাত্তা নেই। লোকজন নেই। একটু তফাতে পড়ে আছে বণিকও তার দলের লোকদের হাড়গোড়।
বোধিসত্ত্বর কয়েকটা গাড়ি বস্তার ধকল সমলাতে না পেড়ে একটু-আধটু বেঙেছিল। তিনি বণিকের গাড়ি তেকে কয়েকখানা ভাল গাড়ি বেছে নিলেন। কম দামী মাল ফেলে বণিকের কিছু দামী মাল গাড়িতে তুলে নিলেন।


শেষকালে গন্তব্যস্থলে পৌছে কেনাবেচা করলেন। বোধিসত্ত্বের কোন প্রতিযোগী  না থাকায় চড়া দাম পেলেন। সব কিছুই শুভ হল।
উপদেশ : বিবেচনা করে কাজ কর।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য