লোককাহিনী: কাক ও চড়ুই

এক চড়ুই আর এক কাক-এ দোস্তি। দুজনের মধ্যে বেশ মিলমিশ। একদিন কাকের মনে দুষ্টবুদ্ধি জাগিল-বলিল, চল দুই দোস্তে বাজি ধরি কে বেশি মরিচ খাইতে পারে। চড়ুই ভয়ে রাজি হইল। দু’জনে এক গৃহস্থের উঠানে গিয়া মরিচ খাইতে লাগিল। কাক টপাটপ অনেকগুলো মরিচ গিলিয়া ফেলিল। চড়ুই ততক্ষণে একটাও না। কাক বাজিতে জিতিয়া চড়ুইকে বলিল- দোস্ত, আমি তোমার বুকের গোস্ত খাইব।

চড়ুই কাকের কথা শুনিয়া হতবুদ্ধি হইল না। সে একটু বুদ্ধি করিয়া বলিল- আমার বুকের গোস্ত খাইবে তাতে কোন আপত্তি নাই, তবে তোমার ঠোঁটের ঝালটুকু নদীর পানি দিয়া ধুইয়া আসিতে হইবে।

কাক বুঝিল চড়ুই ফাঁকি দিয়া ভাগিবার মতলব করিতেছে। তাই কাক বলিল- তবে তুমি আমার সাথে চলো। চড়ু্ই বেজার মুখে রাজি হইয়া কাকের সাথে সাথে চলিল। কাক নদীর পাড়ে গিয়া বলিল-

গাংরে গাং দিতে পানি-ধুইতাম ঠোঁট
তবে খাইতাম চড়ুই-র বুক।

গাং ফেনাইয়া উঠিয়া কাককে বলিল- আমার পানিতে তোমার ঠোঁট লাগাইতে দিবো না। তুমি এই ঠোঁটে কত গু-গোবর খাও, তোমার ঠোঁট অপবিত্র।পাত্র দিয়া পানি লইয়া যাইতে পারবে। কাকে পাত্রের জন্য কুমারবাড়ি গিয়া বলিল-

কুমার রে কুমার! দিতে পাত্র
আনতাম পানি, ধুইতাম ঠোঁট
তবে খাইতাম চড়ুই-র বুক।

কুমার বলিল- পাত্র পুড়িবার লাকড়ি আমার নাই। যদি তুমি লাকড়ি দিতে পারো তবে পাত্র দিতে পারি। কুমার আরও বলিল, আমার গায়ে জোর নাই। যদি দুধ আনিয়া দিতে পারো তবে দুধ খাইয়া পাত্র বানাইয়া দিতে পারি। কাক তখন কাবলি গাইয়ের নিকট ছুটিয়া গয়িা বলিল-

কাবলীরে কাবলী! দিতে দুধ
খাইতো কুমার-বানাইতো পাত্র
আনতাম পানি, ধুইতাম ঠোঁট
তবে খাইতাম চড়ুই-র বুক।

কাবলী বলিল- আমাকে তাজা ঘাস আনিয়া দাও তবেই দুধ পারিব। কাক ঘাসের কাছে গিয়া বলিল-

ঘাসরে ঘাস। দিতে ঘাস
খাইতো কাবলী-দিতো দুধ
খাইতো কুমারে হইতো জোর
বানাইতো পাত্র আনতাম পানি
ধুইতাম ঠোঁট
তবে খাইতাম চড়ুই-র বুক।

ঘাস বলিল- কামার বাড়ি থেকে কাঁচি লইয়া আসো। তবেই ঘাস দিতে পারি। কাক কামারবাড়ি গিয়া বলিল-

কামার রে কামার! দিতে কাঁচি
কাটতাম ঘাস--খাইতো কাবলী
বানাইতো পাত্র,
আনতাম পানি, ধুইতাম ঠোঁট
তবে খাইতাম চড়ুই-র বুক।

কামার বলিল- আমার লাকড়ি নাই, যদি জঙ্গল হইতে লাকড়ি আনিয়া দিতে পারো তবে কাঁচি বানাইয়া দিতে পারি। কাক নিরুৎসাহিত না হইয়া জঙ্গলের নিকট গিয়া বলিল-

জঙ্গলরে জঙ্গল, দিতে লাকড়ি
পুড়তো পাত্র,
আনতাম পানি, ধুইতাম ঠোঁট
তবে খাইতাম চড়ুই-র বুক।

জঙ্গল বলিল- কামার বাড়ি হইতে যাদি কুড়াল আনিয়া দিতে পারো তবে লাকড়ি দিতে পারি। কাক ইহাতেও দমিল না। সে চড়ুইকে সাথে লইয়া কামারবাড়িতে গিয়ে বলিল-

কামার রে কামার! দিতে কুড়াল
আনতাম লাকড়ি পুড়তো পাত্র
আনতাম পানি, ধুইতাম ঠোঁট
তবে খাইতাম চড়ুই-র বুক।

কামার বলিল- আমার হাপরে আগুন নাই। তুমি যদি আগুন আনিয়া তে পারো তবে কুড়াল বানাইয়া দিতে পারি। কাক আগুনের জন্য ছুটিল এক গৃহস্থের বাড়ি, গিয়ে বলিল-

গেরস্থরে গেরস্থ! দিতে আগুন
বানাইতো কুড়াল, আনতাম লাকড়ি
পুরতো পাত্র,
আনতাম পানি, ধুইতাম ঠোঁট
তবে খাইতাম চড়ুই-র বুক।

গেরস্থ কাককে আগুন দিল। কাক কাক উৎসাহে ঠোঁটে জ্বলন্ত অঙ্গারের টুকরা লইয়া উড়িয়া চলিল। কাক আগুনের তেজ সহিতে না পারিয়া ঠোঁট হইতে ডান পাখায় লইল। ডান পাখা পুরিয়া যায় দেখিয়া উহা বাম পাখায় লইল। একবার ডান পাখায় আবার বাম পাখায় আগুন লইয়া কিছুদূর গেল। অল্পক্ষনে দুইটি পাখা পুড়িয়া কাককি ধপাস করিয়া মাটিতে পড়িয়া গেল। কাক মরণ-যন্ত্রনায় চিৎকার করিয়া উঠিল--
কা-কা-কা

মোদ্দা কথা: অন্যের ক্ষতি করিবার নিমিত্তে যে সর্বদা তৎপর থাকে সে নিজের অজান্তেই নিজের ক্ষতি করিয়া থাকে।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য