সাদা হাতি ও বাদুরের গল্প ত্রিপুরা উপজাতির উপকথা

বহু প্রাচীন কালের কথা। উপজাতিদের পাহাড়ি গ্রামে ছিলেন দূর্দান্ত প্রতাপশালী রাজা। রাজ্য শাসনে তার মস্তবড় নাম ডাক। কথিত আছে তার হুকুমে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেত। ফলে রাজ্যে সচারচর তেমন কোনও বড় ধরনের অন্যায় ঘটত না। যদি কখনও কোন অন্যায় ঘটত, রাজা বিচারাসনে বসে খামখেয়ালি কোনও শাস্তি দিতেন না। সাধারন ভাবে তদন্তের গভীরে গিয়ে সত্য উদঘাটন করে, দোষীদের খেঁজে তারপর সাজা দিতেন।

তাঁর রাজ্যের এক বাসিন্দা তেনতিয়া একদিন সকাল থেকে ঘর-বার করে এক সময় ঠিক করলেন তিনি কাজে বের হবেন। কাজ বলতে জঙ্গলে কাঠ কাটতে যাবেন। ঘরে ঢুকে বের করলেন টাক্কাল। হাত দিয়ে দেখলেন, টাক্কালে ধার নেই। কিন্তু কাজ করব বলে ঘর থেকে বের হওয়ার পর তো ঘরে ফিরে আসা যায় না। তখন কি করবেন ভাবতে ভাবতে তিনি দেখতে পেলেন নদীর জলেই একটি নৌকা নোঙর করা আছে। টাক্কার হাতে সটান তিনি সেখানে চলে গেলেন। তারপর নৌকার গলুইয়ে টাক্কার ধার দিতে শুরু করলেন। ধার দিচ্ছেন তো দিচ্ছেন। এক মনে তিনি টাক্কাল ধার দেওয়ার কাজ করে চলেছেন। নৌকার গলুইয়ে বসে তেনতিয়া পা দুটি ঝুলিয়ে দেন জলের মধ্যে। এক সময় হটাৎ তিনি নিম্নাঙ্গে প্রচন্ড ব্যাথ্যা পেয়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দেখতে পেলেন একটি চিংড়ি মাছ পালিয়ে যাচ্ছে।
কিছু বুঝে ওঠোর আগে লাফ দিয়ে উঠে পড়লেন তেনতিয়া। তারপর হাতের টাক্কাল সজোরে বসিয়ে দিল সামনের তাইবাই (এক ধরনের লতানো গাছ) গাছের উপর। টক্কালের আঘাতে পড়ে গেল থাইবাই গাছের ফল। পড়বি তো পড়ল একেবারে সইল মাছের মাথায়। হঠাৎ মাথায় আঘাতে সইল মাছ লাফিয়ে উঠল একেবারে জলের উপরে। তার পরেই প্রচন্ড শব্দ এসে পড়ল জলে। নদীর পাশের জঙ্গলে কচু খাচ্ছিল একটা নাদুস নুদুস শূকর। সইল মাছের বিশাল লাফ এবং প্রচন্ড শব্দে ভয় পেয়ে শূকর দিলো ছুট। জঙ্গলের ভিতর একটি গাছের উপর ছিল এক বাদুড়ের বাসা। বিশাল বপু শূকর দৌড়াতে দৌড়াতে সেই গাছে মারল ধাক্কা। তাতে গাছের পড়ো পড়ো অবস্থা। শেষ পর্যন্ত গাছ না পড়লেও বাদুড়ের বাসা গেল মাটিতে পড়ে। ভ্যাবচ্যাকা বাদুড় উড়তে শুরু করল দুচোখ বুজে। উড়তে উড়তে কোন ফাঁকে বাদুড় সরাসরি এসে ঢুকে পড়ে রাজার সাদা হাতির শুঁড়ের ভিতর। তারপর থেকেই সাদা হাতি খাওয়া বন্ধ করে দিল। রাজার হাতি-রক্ষীরা বহু চেষ্টা করেও হাতিকে খাওয়াতে পারল না। দিনের পর দিন না খেয়ে সাদা হাতি শুকিয়ে যেতে লাগল

এই ঘটনায় রাজা তথা রাজ্যবাসী পড়লেন এক বিষম সমস্যায়। তাঁর সাদা হাতি হঠাৎ খাওয়া বন্ধ করে দিল। ওই হাতিটা ছিল রাজার অত্যন্ত প্রিয়। মাহুতরা বহু চেষ্টা করলেন হাতিটিকে খাওয়াতে কিন্তু কিছুই হল না। যাক পড়ল রাজবৈদ্যের। চলল ওষুধ-পাতি। কিন্তু কোনও ফল হয় না। যাক পড়ল গুনিনের। তিনি রাজাকে জানালেন, তাঁর হাতির শুঁড়ে একটা বাদুড় ঢুকে আছে। সেটি বের করতে না পারলে হাতির অসুখ সারবে না। সে খাওয়া দাওয়া শুরু করবে না। হাতির শুঁড়ে বাদুর ঢুকল কি করে? কেউ কিছু বুঝতে পারে না।

রাজার হাতির শুঁড়ে বাদুর ঢুকেছে শুনে রাজা গেলেন বেদম চোটে। কিন্তু তা দিয়ে তো কিছু হবে না। শুঁড় থেকে বাদুড় বের করতে না পারলে হাতিকে আর বাঁচানো যাবে না। তাই প্রথমেই রাজা ডাকলেন তাঁর পরামর্শদাতাদের। বসল রাজসভা। কীভাবে হাতির শুঁড় তেকে বাদুড় বের করা যায় তার পরামর্শ চাইলেন সভাসদদের কাছে। সভাসদরা এ ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। কিন্তু কোনও পরামর্শ দিতে পারলেন না। সভাসদদের অবস্থা দেখে রাজা বেজায় ক্ষেপে উঠলেন। তারপর এক হাঁক মারলেন। শব্দ শুনেই মন্ত্রী-শান্ত্রীদের অবস্থা বেগতিক। তাঁরা ভয় পেয়ে গেলেন। রাজা ডাক ছাড়লেন ‘লম্বা রড নিয়ে আয়। উনুন জ্বালা।’

রড এল। উনুন জ্বলল। রাজা বললেন, “লোহার রড পোড়া আগুনে।”

পোড়া রড যখন গনগনে লাল হল, রাজা হাতির শুঁড়ের কাছে দাঁড়িয়ে বাদুড়ের উদ্দেশ্যে বললেন- “বাদুড়, তুমি হাতির শুঁড় থেকে বের হবে কিনা বল?”

শুঁড়ের ভেতর থেকেই বাদুড় বলল- “বের হব কোন দিক দিয়ে?”

রাজা বললেন, “হাতির মুখ দিয়ে বের হয়ে যাও।”

বাদুড়ের উত্তর -“আমি তো বমি নই যে মুখ দিয়ে বের হয়ে যাব।”

রাজা বললেন- “মলদ্বার দিয়ে বের হও।”

বাদুড়ের উত্তর -“আমি তো মল নই।”

কথা বলার মতো ধৈর্য্য আর রাজার ছিল না। তিনি রেগে গেলেন। তার পরেই হুমকির সুরে বললেন- “যে দিক দিয়ে হাতির শুঁড়ে ঢুকেছ সেই পথ দিয়েই বেরিয়ে যাও। আর কথা বলবে না। না হরে গরম লোহার রড ঢুকিয়ে তোমাকে পুড়িয়ে মারব।”
বেচারা বাদুড় আর কী করে। রাজার হুকুম। তার উপর প্রাণের ভয়। তাকে বেরিয়ে আসতেই হলো। হাতির শুঁড় থেকে বেরিয়ে রাজার সামনে পড়ে গেল। পারিষদ-বেষ্টিত রাজা। তাঁর চোখ মুখে রাগের স্পষ্ট ছাপ। বাদুর ভয় পেয়ে গলে। সে বুঝতে পারল, সুযোগ পেলে তার অপকর্মের ফিরিস্তি দিতে হবে গুছিয়ে। না হলে সমূহ বিপদ। গরম লোহার ছ্যাঁকায় প্রাণ যাবে। কয়েক মুহুর্ত ভেবে সে সবিনয়ে দুরুদুরু বুকে রাজাকে প্রণঅম করে বলতে শুরু করল- ‘আমি আমার নিজের বাসায় বাচ্চাদের নিয়ে ঘুমাচ্ছিলাম। এমন সময় নাদুস নুদুস শূকরটা গাছে ধাক্কা মেরে আমার বাসা ভেঙে দিল। সে গাছে এত জোড়ে ধাক্কা মারল যে আমার বাসা ছিটকে মাটিতে পড়ল। বাচ্চাগুলোও। তারা আছাড়ের ধাক্কা সামলাতে না পেরে সেখানেই মরে গেল। আমি ভয় পেয়ে চোখ বন্ধ করে উড়তে লাগলাম। হাতির কাছে আসতেই মনে হল শুঁড়ের ভিতর ঢুকে পড়তে পারলেই নিরাপদ। আর কেউ কিছু করতে পারবে না। তাই সেখানেই ঢুকে পড়লাম।”

রাজা বাদুড়ের সব কথা শুনে বুঝলেন, সে বেচারি প্রাণ ভয়েই এই কাজ করেছে। তার কোনও দোষ নেই। তাই আদেশ দিলেন শূকরকে ধরে আনো। লোক ছুটলো শূকর ধরতে। শূকর তখন কচুবনে এক মনে কচু খাচ্ছিল। রাজার লোক গিয়ে তাকে ধরে আনল। রাজা তার কাছে জানতে চাইলেন- সে বাদুড়ের বাসা কেন ভেঙেছে?

উত্তরে শূকর বলল- সে তখন আপন মনে কচু খাচ্ছিল। হঠাৎ সইল মাছের বিশাল লাফ এবং তার আবার জলে পড়ার শব্দ শুনে ভয় পেয়ে যে দিক দু’চোখ যায় সে দিকেই ছুট দিয়েছি। তার যাওয়ার পথে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগার ফলেই বাদুড়ের বাসা ভাঙার মতো বিপত্তি ঘটে গিয়েছে তার অজান্তেই।

সব শুনে রাজার সইল মাছকে ডাকতে হবে। আবার ছুটল পাইক সইল মাছকে ডাকতে। সইল মাছ এল রাজার ডাকে সাড়া দিয়ে। সে জানাল, তার মাথায় হঠাৎ থাইবাই ফল পড়াতে সে আকঙ্কিত হয়ে বিরাট লাফ দেয়। তখন ডাক পড়ল থাইবাই ফলের। থাইবাই ফল রাজাকে জানিয়ে দিল, তার কোনও দোষ নেই। কারণ তেনতিয়ার টক্কালের ঘা পড়ে তার উপরে। স্বভাবতই সে পড়ে যায় গাছ থেকে। সেখানে তার কোন নিয়ন্ত্রন ছিল না। তা সে গিয়ে পড়েছে সইল মাছের মাথায়। একের পর একজনের কথা শুনে রাজার ধৈর্যে টাল খাচ্ছে। কিন্তু রাজার নীতিই হল নিরাপরাধকে কোনও শাস্তি নয়। দোষীকে খুঁজে বের করে তাকেই শাস্তি দিতে হবে।

অতএব রাজার নির্দেশে পেয়াদা গিয়ে ডেকে নিয়ে এর তেনতিয়াকে। রাজার জেরার মুখে তেনতিয়া জানিয়ে দিল, কাজে বের হবার জন্য সে নৌকার গলুইয়ে বসে ঠাক্কালে ধার দিচ্ছিল। এমন সময় একটি চিংড়ি মাছ তার নিম্নাঙ্গে সজোরে কামড়ে দেয়। তাই সে ভয়ে এবং রাগে সে দিশাহারা হয়ে থাইবাই ফলে টাক্কালের কোপ বসিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত রাজা ডাকলেন চিংড়ি মাছকে। রাজা তাকেও সুযোগ দিলেন নিজের কথা বলার। কিন্তু সে কোন তেনতিয়ার নিম্নাঙ্গে কামড়ে দিল তার কোনও ব্যাখ্যা দিতে পারল না। রাজা চিংড়ি মাচকেই দোষী সাবস্ত করলেন। রাজা চিংড়িকে ছেড়ে দিল টগবগে গরম জলে। ফলে চিংড়ির রং লাল হয়ে উঠল। রাজার আদেশ হল আরও সিদ্ধ করতে হবে। চিংড়ি যত সিদ্ধ হতে লাগল সে তত গাঢ় লাল হয়ে উঠল।
Previous
Next Post »
0 মন্তব্য