দুইবোন ও নোয়াই পাখি ত্রিপুরা উপজাতির উপকথা

পাহাড়ি টিলার কাছে জুম চাষি এক পরিবার বসবাস করত। পরিবারের সদস্য বলতে চাষির বাবা, মা, চাষি, চাষি-বৌ এবং তাদের শিশু কন্যা কাশমতি। সে এতটাই বাচ্চা যে মায়ের কোল ছাড়েনি। এই অবস্থাতে একদিন চাষি বৌ মারা গেল। এই পরিস্থিতিতে চাষী দ্বিতীয় বিয়ে করতে বাধ্য হয়। তাঁর দ্বিতীয় বৌয়েরও একটি কন্যা সন্তান হল এক বছরের মধ্যেই। তার দেহের রঙ হল হলুদ। তাই তার নাম রাখা হল লাজন্তি। এক চাষি পরিবারের দুই মেয়ে, কাশমতি এবং লাজন্তি দুই বোন, বাবা মা এবং দাদু দীদার স্নেহে বড় হতে লগল। দু’জনে একই সঙ্গে বড় হতে থাকে। একই সঙ্গে জুম চাষের মাঠে এবং বাড়িতে কাজ করে। দেখতে দেখতে দু’জনেরই বিয়ের বয়স হয়ে গেল।

বড়বোন কাশমতির গায়ের রং কালো। আর লাজন্তির পীতবর্ণা। তবে কাশমিত নোংরা মানসিকতার মেয়ে। সে ঘরের কাজে, মা জুমের কাজে, এমনকি সবসময়েই লাজন্তিকে অন্য চোখে দেখে। রাজন্তির প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই কাশমতি ঈর্ষাণ্বিতা এবং হিংসাপরায়ণ।

তার যখন বিয়ের বয়সে পৌছালো সেই সময় এক বছর জুম কাটার সময় এসে পড়ল। জুমের ফসল কেটে এবার ঘরে আনার পালা। এক দিন দুই বোন মাথায় লঙ্গা বেঁধে জুমের মাঠে গেল ফসল তুলতে। ছোট বোন জুমের ক্ষেতে গিয়েই সব্জি তুলে নিজের লুঙ্গা ভর্তি করতে লাগল। আর বড় বোন কাশমতি নিজের ইচ্ছামত জুমের মাঠের পাকা ফল তার ফল তোলার ধারালো দা দিয়ে কাটতে লাগল। যেগুলি খেতে তার পছন্দ হল সেগুলির কিছু কামড়ে খেল। কিছু আধ খাওয়া অবস্থায় মাঠময় যত্রতত্র ছিটিয়ে ফেলল। একটি ফসলও সে তার আনা লুঙ্গাতে রাখল না। এ দকে লাজন্তি কিন্তু মাঠে একটিও ফসল খায়নি। সব রেখেছে নিজের লুঙ্গায়। স্বভানতই কিছুক্ষনের মধ্যে তার লঙ্গা ফসলে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠল। সেই সঙ্গে জুমের মাঠ ছেড়ে বাড়ি ফেরার সময়ও গয়ে গেল।

লাজন্তি দিদিকে বলল- ‘দিদি আমার লুঙ্গা ভর্তি হয়ে গিয়েছে। তোর কি অবস্থা? চল একার আমরা বাড়ি যাই।’

কাশমতির উত্তর - ‘বোন, দেখ এখানে কোনও সবজই পাচ্ছি না। কী করে আমার লুঙ্গা ভর্তি হবে? আমি দেখতে পাচ্ছি তোর লুঙ্গা উপচে পড়ছে। এক কাজ কর, তোর লুঙ্গা থেকে কিছু ফসল আমার লুঙ্গায় দিয়ে দে। বল, তুই না দিলে আমি বাড়িতে দিয়ে কি কলব?’

দিদির এই হেন উত্তরে লাজন্তি বিরক্ত হল। সে সারসরি বলে দিল- ‘তোকে আমি একটি ফসলও দিব না। তুমি হাতের কাছে কাঁচা পাকা যে ফসলই পেয়েছিস তা কামড়ে কেয়েছিস। যা খেতে পারিস নি তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়েছিস। এরকম করলে তোর লুঙ্গা ভর্তি হবে কি করে? বাড়ির সবার সঙ্গে খাব বলে আমি কিন্তু এখানে একটি ফসলও খাইনি।’

বোনের কথা শুনে কাশমতি বলে- ‘তুই রাগছিস কেন! তোর লুঙ্গা তেকে কিছু ফসল আমার লুঙ্গায় দিয়ে দিলে তোরই সুবিধা,তোর লুঙ্গা হালকা হবে।’

দিদির কথায় ক্ষুদ্ধ লাজন্তি মুখ ঝামটা দিয়ে বলে ওঠে- ‘ এমন ভার বওয়ার ক্ষমতা আমার আছে। প্রতিদিনই তো এমন বোঝা বয়ে নিয়ে যাই। আজও পারব। তুই যাই বল আজ আমি একটি ফসলও তোকে দেব না। দেখছি তোর স্বভাবই হয়ে গেছে নিজের লুঙ্গা না ভরে তোলা ফসল নিয়ে নিজের লুঙ্গা ভরা। আজ তা কিছুতেই হতে দোব না।’

ছোট বোনের এ হেন কথায় কাশমতির খুব রাগ হল। কিন্তু বোনের কথায় কোনও প্রতিবাদ করল না। তার পর দুই বোন বাড়ির পথে হাঁটা দিল। জুমের মাঠ থেকে তাদের বাড়ির ফেরার পথে একটি নদী পড়ে। নদী পেরিয়েই তাদের বাড়ি ফিরতে হয়। নদী থেকে তাদের বাড়ি বেশি দূরে নয়। প্রতিদিন তারা এই নদীতে স্নান করতে আসে। পানীয় জল নিয়ে যায় এখান থেকেই। মাঠ ছেড়ে নদীর কাছে আসতেই কাশমতি ছোট বোন লাজন্তির উদ্দেশে বলে ওঠে- ‘এখানে কিছুক্ষন বিশ্রাম করা যাক।’

লাজন্তি দিদির প্রস্তাব মেনে নিল। একটি গাছের নীচে নিজেদের লুঙ্গা রেখে দুই বোন পা ছড়িয়ে বসে পড়ল সসেখানেই। যে গাছের তলায় দুই বোন পা ছড়িয়ে বসল সেটি একটি বট গাছ। গাছটা নদীর এতটাই কাছে ছিল যে কার ডালপালা ঝুঁকে পড়েছিল নদীর জলের উপর। বটগাছের একটা ডাল জলের উপর ঝুলে আছে। সেটা দেখতে পেয়ে কাশমতি বোনের উদ্দেশে বলে ওঠে- ‘দেখ দেখ লাজন্তি, ডালটা কেমন জলের উপর ঝুলছে। ঐ ডালে দুলতে দারুন মজা লাগবে। চল দেখি কেমন লাগে। চল দু’জনে ,মিলে লম্বা লতা জোগার করে আনি।’

দিরি কথায় একমত হল লাজন্তি। তার পর দু’জনের কাছাকাছি জায়গায় খুঁজতে গেল লতা। কাছাকাছি জঙ্গল তেকে লাজন্তি একটা লতানে গাছের একটি লম্বা লতা সংগ্রহ করে নিয়ে এল। সেটি জলের উপর বটগাছের ঝুলন্ত ডালের সঙ্গে খুব ভালো করে বেঁধে একটি দোলনা তৈরী করল। নতুন তৈরী দোলনার প্রথমেই দোল খেতে চাইল কাশমতি। দিদির প্রস্তাব মেনে নিল লাজন্তি। কাশমতি দোলনায় চেপে বোনকে বলে-- ‘দোলা দে কিন্তু আস্তে আস্তে। না হলে আমি পড়ে যেতে পারি।’

লাজন্তি দিদিকে আস্তে আস্তে দোলা দিতে রাগর। কিছুক্ষন দোল খাওয়ার পর এল লাজন্তির পালা। কিন্তু কাশমতি নিজে থেকে কিছুই বলে না। বাধ্য হয়ে লাজন্তি বলে-‘ দিদি তুই অনেক্ষণ দোল খেয়েছিস। এবার তুই নাম- আমাকে দোল খেতে দে।’

বোনের কথা শুনে কাশমতি দোলনা তেকে নামে। লাজন্তি চড়ে বসে দোলনায়। কাশমতি দোলনা দোলাতে থাকে। কিন্তু সে এক জোরে দোল দিতে থাকে যে লাজন্তি ভয় পেয়ে যায়। লাজন্তি চিতকার করতে থাকে- ‘দিদি, আস্তে দোল দে। আমি পড়ে যাব।’

কাশমতি তার কথায় কান দেয় না। সে তখন মনে মনে ভাবছে--‘জুমের মাঠে তাকে বলে ছিলাম আমার লুঙ্গাতে ফসল দে কিন্তু সে কিছুই দেয়নি।’ যেই এই ভাবনা তার মনে এল, তেমনি মনে ভাবল, এবার আমার পালিা, তোকে উচিত শিক্ষা দিচ্ছি। তার পরেই কাশমতি আরও জোরে দোলনা দোলাতে লাগল। লাজন্তি ভয়ে চিৎকার করে ওঠে।--‘ দিদি অত জোরে দোলাস না, আমি পড়ে যাচ্ছি।’

কাশমতি লাজন্তির কথায় কান দিয়ে বরং আরো জোরে হেচকা দোলা দিল দোলনায়। আচমকা এমন ঝটকা দোলা লাজন্তি সামলাতে পারে না। সে নদীর জলে পড়ে যায়। দোলনা থেকে ছিটকে সে নদীর জলের যে জায়গায় পড়ে যেখানে একটি বিশাল বড় ‘শিট’ মাছ বসে ছিল। প্রায় মুখের কাছে লাজন্তি এসে পড়ায় মাছটি খাদ্য হিসেবে বিশাল হাঁ করে তাকে কামড়ে ধরল। এমন পরিস্থিতিতে পড়ে লাজন্তি কিছুতেই নিজেকে বাঁচানোর কোনও সুযোগ পেল না।

পীত বর্ণের লাজন্তি জলে পড়তেই নদীর জল হয়ে উঠল হলুদ। লাজন্তির জলে পড়ে যাওয়ার ঘটনার আকস্মিকতায় কাশমতিও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। সে বুঝতে পারে না এখন কি করা? কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে কাশমতি। কিন্তু লাজন্তির দেখা না পেয়ে কাশমতি খুব দ্রুত নিজের লুঙ্গা তুলে নেয়। রাজন্তির লুঙ্গা খালি করে তার তোলা ফসল ভরে নয়ে নিজের লুঙ্গায়। তার পর সে হাটা দেয় বাড়ির উদ্দেশ্যে। কিছুক্ষনের মধ্যে সে বাড়ি পৌছে যায়। মা তাকে দেখেই জিজ্ঞাসা করে- ‘তুই ফিরে এলি- লাজন্তি কোথায়?’

কাশমতি নিরাসক্ত ভাবে উত্তর দেয় - ’ও আসছে পিছনে। দীরে সুস্থে। আমার প্রচন্ড খিদে পেয়েছে তাই আমি দ্রতি চলে এলাম।’ কেথাগুলি কাশমতি বলেই খেতে বসে পড়ে। দুপুর বেলা কাশমতির ঠাকুরমা নদীতে স্নান করতে গিয়ে জলে পা দিয়েই দেখেন জলের রং হলুদ হয়ে গিয়েছে। বৃদ্ধা সারা জীবন এই নদীর জলেই জীবণ ধারণ করলেন। কিন্তু কখনও তিনি জলের রঙ এমন গলুদ দেখেননি। মনে মনে তিনি বলে ওঠেন- ‘এই নদীর জলের এমন রং কখনও দেখিনি। মনে হচ্ছে, কেউ জলে হলুদ মিশিয়েছে?’ এই ভাবতে ভাবতে বৃদ্ধা সিজের হাতে আঁজলা ভরে নদীর জল তকুলে ধররেন। হাত চুঁয়ে সব জল নদীতেই পড়ে গেল। বৃদ্ধা নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন- ‘কই হলুদ রঙে কিছুই তো আমার হাতে অবশিষ্ট খাকল না।’ তিনি আবার একই পদ্ধতিতে জল তুলে নিলেন। কিন্তু একই অবস্থা। এতে বৃদ্ধা ভয় পেলেন না বরং তিনি স্নান সারতে জলে নামলেন। তার আগে শুরু করলেন কাপড় কাচতে। যেই না তিনি ভিজে কাপড় আছাড় মারলেন ঘাটে রাখা কাঠের তক্তায়, অমনি বৃদ্ধা লাজন্তির ভীতসংক্রান্ত করুণ কন্ঠস্বর শুনতে পেলেন। লাজন্তি যে বলে উঠছে ‘ ও ঠাকুমা- তুমি আমার পায়ে মারছ কেন?’

নাতনির এই আতঙ্কিত আওয়াজ শুনে বৃদ্ধা থমকে গেলেন। তিনি এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলেন কেউ কোথাও আছে কি না। কিন্তু তিনি কাউকেই দেখতে পেলেন না। তখস তিনি তাঁর ভিজে কাপড়টি কাঠের পাটাতনের উপর আরও জোরে আচাড় মারলেন। আর তিনি আবার শুনতে পেলেন - ‘ও ঠাকুরমা, তুমি আমার বুকে মারছ কেন?’

আতঙ্কে এবং বিষ্ময়ে বৃদ্ধা থমকে গেলেন। তিতি সেখানে বেশ কিছুটা সরে গিয়ে নতুন জায়গায় আবার কাপড় কাচা শুরু করলেন। কাঠের পাটাতনে কাপড় আছড়াতেই বৃদ্ধা করুণ আর্তনাদ শুনতে পেলেন। কেউ যে বলছে - ‘ও ঠাকুর মা, তুমি আমার মাথায় মারছ কেন?’ বৃদ্ধা ব্যাপারটা শেষ দেখতে করুণ আর্তনাদে ভ্রুক্ষেপ না করেই বার বার কাপড় আছড়াতে লাগলেন। যতবারই আছাড় মারেন ততবারই একই করুণ স্বরের আর্তনাদ শুনতে পান তিনি। বিভ্রান্ত বৃদ্ধা কাপড় কাচা থামিয়ে আবার এদিক ওদিক চেয়ে দেখেন কছে পিঠে বা দূরে কাউকে দেখতে পাওয়া যায় কি না। কিন্তু তিনি কাউকেই দেখতে পান না। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারেন, ওই কন্ঠস্বর লাজন্তি ছাড়া কর কারও নয়। বৃদ্ধা একটু ভয় পেয়ে যান। তার পরেই মিনতির সুরে তিনি বলে ওঠেন- ‘লাজন্তি তুই কোথায়? কোথো থেকে কথা বলছিস? আমি বুঝতে পারছি না।’

লাজন্তি ক্ষীণ স্বরে উত্তর দেয় - ‘ঠাকুরমা আমি এখানে, আমি একটি শিট মাছের পেটের মধ্যে রয়েছি। মাছটি রয়েছে তোমার সামনে ভাসমান বড় নৌকার নিচে। আমি সেখান থেকেই কথা বলছি।’

নাতনির কথা শুনে ঠাকুমা নৌকার কাঠ সরাতে শুরু করলেন এবং দেখতে পেলেন বিশালাকৃতির শিট মাছটি রয়েছে। তার নড়া চড়া করার ক্ষমতাও নেই। আসলে একটি আস্ত সোমত্ত মহিলাকে গিরতে গিয়ে সে নিজেই হিমসিম খাচ্ছে। খাবে বলে মাছিটি লাজন্তিকে গিলে ফেলার চেষ্টা করছে। কিন্তু সম্পূর্নভাবে তা করে উঠতে পারে নি। লাজন্তির মাথাট এখনও তার মুখগহ্বরের বাইরে রয়ে গিয়েছে। বৃদ্ধা তাঁর সর্বশক্তি দিয়ে কোনও রকমে টেনে হিঁচড়ে মাছটিকে নদীর পাড়ে তুললেন। দেখলেন লাজন্তি মৃতপ্রায়। উদ্ভ্রান্তের মতো বৃদ্ধা এদিক ওদিক তাকাতে লাগলেন। যদি কাছাকাছি কাউকে পাওয়া যায়। তিনি দেখতে পেলেন নদীর পাড়েই দূরে এক বৃদ্ধ কি যেন করছেন।

বৃদ্ধা চিৎকার করে তাঁকে ডাকতে লাগলেন। সঙ্গে বৃদ্দ হুক হাতে ছুটতে ছুটতে সেখানে গিয়ে পৌছালেন। তার পর খুব যত্নে বৃদ্ধ তাঁর কাটারি জাতীয় হুক দিয়ে মাছের পেট মাছের পেট কাটলেন। রাজন্তি তখনও মাছের পেটে শুয়ে আছে। অর্ধমৃত। তারম মুখে চোখে চল ছিটানোর কিচুক্ষনের মধ্যেই লজিন্তির জ্ঞান ফিরল। তখন সে ঠাকুরমাকে সমস্ত বৃত্তান্ত জানাল। কাশমতি কান্ড শুনেই ক্ষেপে উঠলেন ঠাকুমা। রাগ সামলাতে নাপেরে তিনি বলে উঠেন- ‘শয়তানীকে চূড়ান্ত শান্তি দিতে হবে। সে আজ লাজন্তিকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। ভাগ্য ভালো আমি স্নান করতে এসেছিলাম। না হলে মাছের পেটেই মেয়েটা মরে যেত।’ ক্রুদ্ধ বৃদ্ধা রাজন্তির হাত চেপে ধরে হাঁটা দিলেন বাড়ির উদ্দেশে। কিন্তু বয়সের বারে হাঁটার সেই দ্রুততা তিনি পেলেন না। বাড়িতে পা দিতেই বৃদ্ধা চিৎকার করে তাঁর ছেলে এবং বড় নাতনি কাশমেতিকে পাকতে শুরু করলেন। ছেলে আসতেই বৃদ্ধা বলতে শুরু করছেন। ছেলে আসতেই বৃদ্ধা বলতে শুরু করলেন -‘ তোর দুর্মতি মেয়েকে জিজ্ঞেস করে আয় সে কী করেছে। ভাগ্যিস আমি ঠিক সময়ে নদীতে চান করতে গেছিলাম। না হলে লাজন্তি আজ মরেই যেত।’

জুমের মাঠ থেকে এ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা তাঁর ছেলেকে জানালেন। সব শুনে কাশমতির বাবতো বটেই, বাড়ির সবাই কাশমতির উপর প্রচন্ড রেগে গেল। তাকে সবাই বকাঝকা চড় খাপ্পর দিতে শুরু করল। ভয় পেয়ে কাশমতি বাড়ির এক কোণে গিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

এই ঘটনায় কাশমতির বাবা প্রচন্ড রেগে গেলেন। কিন্তু মেয়েকে কিছুই বললেন না, বরং যাঁরা কাশমতিকে বকাঝকা চড় থাপ্পর দিচ্ছিল তাঁদের তিনি ওই সব করতে মানা করলেন। তিনি মনে মনে ঠিক করলেন কাশমতিকে প্রচন্ড শাস্তি দেবেন। কিন্তু কাউকে কিছু বললেন না।

পরের দিন ভেঅরে কাশমরি বাবা বাঁশ দিয়ে শক্তপোক্ত একটি খাঁচা তৈরী করলেন। তার উচ্চতা এতটা যে, যে কোনও লোকে সেখানে নিশ্চিন্তে দাঁড়াতে পারে। কাজ শেষ হতেই তিনি কাশমতিকে ডেকে পাঠালেন। বাবার ডাক পেয়ে কাশমতি আসতেই তিনি কাশমতিকে বললেন, ‘তুমি ওই খ৭াচার ভিতরে গিয়ে দেখ তো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পার কি না?’

কাশমতি বাবার মনের কথা কিছুই না বুঝে খিতরে প্রবেশ করতেই তার বাবা খাঁচার দরজা শক্ত করে আটকে দিলেন। হটাৎ বাবার এই আচরণে কাশমতি কান্নাকাটি জুড়ে দিল। কিন্তু সেই ক্ন্না বাবার হৃদয়ে কোনও প্রভাব ফেলতে পারল না। উল্টে কাশমতির কান্নার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তার বাবা খাঁচার দরজা আরও শক্ত করে দড়ি দিয়ে বেধে দিলেন। সেই দড়ির একটি অংশ বেঁধে দিলেন গাছের ডারের সঙ্গে। খাঁচা তেকে তাকে মুক্ত দেওয়ার জন্য কাশমতি কান্নাকাটি করতে লাগল বাবার কাছে। বাবা তো তার কথা শুনলেনই না বরং বলে উঠলেন- ‘শয়তানী, তুই আমার লাজন্তিকে মারার চক্রান্ত করেছিলি। এখন শাস্তি ভোগ কর। আমি তোকে না কেতে দিয়ে দীরে ধীরে মেরে ফেলব। দেখি তোকে কে বাঁচায়।’

শুধু বাবাই নয় সেখানে হাজির কেউই কাশমতির কান্নাকে গুরুত্ব দিল না। খাঁচার ভিতরে কাশমতির দিন কাটতে লাগল দিনে রোদে পুড়ে, রাতে ঠান্ডায় জমে।লাজন্তি দিদির এই অসহনীয় কষ্ট সহ্য করতে পারছিল না। তাই খাঁচা থেকে দিদিকে মুক্ত করে দেওয়ার জন্য মা, ঠাকুমা থেকে শুরু করে সবার কাছেই অনুরোধ করেছে। কিন্তু কাশমতির বাবার ভয়ে কেউ তার কথায় কান দেয়নি। এমন কী খাঁচার ভিতরে থাকা কাশমতিকে ক্ষুধার অন্ন তৃষ্ণার জলও দেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিদিনই সে ক্ষীণ ক্ষীণতর হয়ে যাচ্ছে। তেষ্টায় তার বুক ফেটে যাচ্ছে। এই রকমই এক ভোরে লাজন্তি বাদে বাড়ির সবাই চলে গিয়েছে জুমের মাঠে। এই সুযোগে কাশমতি বোনকে ডেকে বলে- ‘লাজন্তি, জলের তেষ্টায় আমি মরে যাব। তুই দয়া করে আমাকে একটু জল দে। এটা ঠিক, আমি তোর প্রতি অন্যায় করেছি বোন। তুই আমাকে ক্ষমা করে দে।’

এমনিতেই লাজন্তি দিদিকে খুবই ভালোবাসে। কিন্তু বাবার ভয়ে সে কিছুই করতে পারে না। তার উপর দিদির এই কাতর অনুনয় তার হৃদয়ে মমতা এনে দেয়। এই দিন বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগ পুরা কাজে লাগিয়ে লাজন্তি একটি পাতে কিছু ভাত-তরকারি আর একটু জল নেয়। সেটি একটি লম্বা বাঁশের ডগায় বেঁধে আস্তে করে পৌঁছে দেয় দিদির খাঁচার মধ্যে। সেই সঙ্গে দিদির উদ্দেশে বলে- ‘দি িআমি যে তোকে খাবার এবং জল দিলাম সে কথা কিন্তু কাউকে বলিস না। তা না হলে আমার অবস্থাও তোরই মত হবে।’

ক্ষুধার্ত এবং তৃষ্ণাক্লিষ্ট কাশমিত বলে ওঠে- ‘না,না, আমি বলব না। আমি দুর্ভাগা, তাই আমার এই কষ্ট। কোনও মতেই আমি চাই না তোর এই দশা হোক।’

বেশ কিছুদিন পর জল এবং খাদ্য পেয়ে কাশমতি একটু সজীব হয়ে ওঠে। এর পর তেকে সময় সুযোগ পেলেই লাজন্তি কাশমতিকে জল ও খাবার দেয় বাড়ির লোকজনের চোখ এড়িয়ে।

ভরদুপুরে যখন বাড়ির সবাই চলে যায় জুমের মাঠে, কাশমতি তাকিয়ে থাকে নীল আকাশের দিকে। আর দেখে, নোয়াই পাখিরা কেমন আকাশে উড়ে বেড়ায়। তাদের দেখে কাশমতির মনে হয়, সেও যদি নোয়াই পাখির মতো আকাশে উড়তে পারতো তা হলে কতই না ভাল হত। আর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করত -‘হে ঈশ্বর, ওই পাখিদের মতো আমাকে ডানা দাও। আকাশে উড়ার শক্তি দাও।’

একদিন কাশমতি তার খাঁচার মধ্যে বসে নোয়াই পাখির দিকে তাকিয়ে আছে। এমন সময় তার অজান্তেই তার কন্ঠ থেকে রোদনভরা গানের কলি উচ্চারিত হল। সেই গান আকাশের উড়ন্ত পাখিদের উদ্দেশে বলছে,

‘ও রোয়াই পাখি আমার দিকে তাকাও।
আমি আকাশে উড়তে চাই
তোমরা আমাকে ডানা দাও।’


কাশমতির করুণ সুরে গাওয়া গান আকাশের নোয়াই পাখিদের মন ভিজিয়ে দিল। পাখিরা আকাশ থেকে দল বেঁধে নেমে এল কাশমতির খাঁচার কাছে। তার পর প্রতি পাখি নিজেদের ডানা তেকে একটি করে পাখনা খুলে দিয়ে দিল কাশমতিকে। কাশমতি সেগুলি নিয়ে যত্ন করে একটার পর একটা সাজিয়ে রেখে দিল খাঁচার এক কোণে। পরের দিন নির্জন দুপুরে কাশমতি রোদনভরা কন্ঠে নোয়াই পাথিদের আবার গান গেয়ে উঠল। তার বক্তব্য-

‘ও নোয়াই পাখি আমার জন্য
তোমাদের মত ঠোঁট এনে দাও।
আমাকে তোমাতের কাছে নিয়ে যাও।’


নোয়াই পাখিরা আগের দিরেন মত এ দিনও কাশমতির ডাকে সারা দিল। তারা দল বেঁধে এসে একটি করে ঠোঁটের অংশ দিয়ে গেল। পরের দুপুরে আবার কাশমতি গান গেয়ে রোয়াই পাখিদের বলল-

‘ও আমার প্রিয় নোয়াই পাখি
আমি নীল আকাশে
তোমাদের সঙ্গে উড়তে চাই
তোমরা আমার জন্য কিছু
নখ এনে দাও।’


নোয়াই পাখিরা এদিনও কাশমতির অনুরোধে মেনে প্রত্যেকেই একটি করে নখ দান করল। কাশমতি সেগুলো পর পর সাজিয়ে রাখল। এখন কাশমতি কিছু সুতোর দরকার। সে তার সৎ মাকে কিছু সুতো দিতে বলল। কিন্তু কাশমতির কোনও কথা শুনলেন না। এমনকী তার দিকে চেয়েও দেখলেন না। এরপর সে তার কাকিমাকে একই অনুরোধ করল। তিনিও কাশমতির কথা শুনলেন না। ‘তোর পিসিকে বল’ বলেই তিনি চলে গেলেন। তারপরেও কাশমতি অনেককেই একই কথা বললে। কিন্তু কেউই তাকে পাত্তা দিল না। কয়েকদিন চলে যাওয়ার পর এক দুপুরে কাশমতি তার ঠাকুমাকে একা পেয়ে তাকে অনুরোধ করল- ‘ঠাকুমা, আমাকে একটা সূচ আর কিছু সূতো দেবে?’

নাতনির কান্নাভরা আবেদনে ঠাকুমার হৃদয় কেঁদে উঠল। তিনি খুঁজে পেতে একটা ভাঙা সুচ আর কিছু সুতো এনে দিলেন তাকে। সেই সূতো এবং সূঁচ সিয়েই নোয়াই পাখিদের দেওয়া পাখনা, ঠোঁট, নখ গাঁথতে লাগল।একদিন তার সেলাই কাজ শেষ হতে নোয়াই পাখিদের মতো দেখতে সুন্দর একটা পোশাক তৈরী হয়ে গেল। ঠিক সেই দুপুরে বাড়ির সবাই যখন জুমের মাঠে যাওয়ার জন্য তৈরী, এমন সময় কাশমতি তার তৈরী নোয়াই পাখিদের পোশাকটা গায়ে চড়ালো। সেটি দেখতে খুব সুন্দর হয়েছে।

এখন সব প্রস্তুত। এবার খাঁচা থেকে পালিয়ে আকাশে ওড়ার পালা কাশমতির। একদিন সে নিজের তৈরী নোয়াই পাখির পোশাকটা পড়ে নিল। তারপর তার নখ, ঠোঁট দিয়ে খাঁচা কাটতে লাগল। এক সময় সেই কাজ সারা হতেই কাশমতি ডানা মেলে খোঁচা থেকে বেরিয়ে উড়ে গিয়ে বসল নিজেদের উঠানের একটি গাছে। এখন তার আকাশে উড়ার পালা। তাকে কে ধরবে। কাশমতির আনন্দ আর ধরে না। সে উড়ে গিয়ে এখানে সেখানে গিয়ে বসে। তারপর আবার গান ধরে নোয়াই পাখি-

‘এই নীল আকাশে একটিবার থমকে দাঁড়াও
এবং আমাকেও আকাশে তুলে নিয়ে যাও
আমার ডানায় শক্তি দাও,
যাতে আমিও তোমাদের সঙ্গে উড়তে পারি।
ওই নীল আকাশে আমিও উড়তে চাই।’


কাশমতি খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে উড়ে উড়ে এখানে সেখানে বসছে দেখে তাদের বাড়ির সবাই এক সঙ্গে ভির করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। কাশমতির বাবা-মা আকাশের দিকে তাকিয়ে বারবার নীচে নামার অনুরোধ করছে। তখন কাশমতি তাদের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে- ‘আমার ক্ষুধা তেষ্টার সময় তোমরা আমার কষ্ট অনুভব করনি। তেষ্টার একবিন্দু জল ও দেওনি। তখন শুধু কথা শুনিয়েছ। আর এখন যখন বুঝতে পারছ আমাকে আর খাঁচায় বন্দি করে রাখতে পারবে না, তখন তোমাদের কাছে ফিরে যেতে বলছ।’

‘ওই আকাশে যে পাখিরা উড়ছে, তারা আমার কাছে তোমাদের চেয়েও বেশি প্রিয়। আমি তাদের সঙ্গে থাকতে চাই। তোমরা জেনে রেখো, আমি লাজন্তিকে হত্যা করতে চাইনি। তার ভাগ্য খারাপ তাই জলে পড়ে গেলে শিট মাছ তাকে গিলে ফেলেছিল। ক্নিতু তোমরা সে কথা বোঝার চেষ্টা করনি।’

এরপর কাশমতি লাজন্তিকে দিকে চেয়ে বলল- ‘বোন লাজন্তি, আমার খিদের সময় খাবার তেষ্টায় জণ দিয়ে আমাকে বাঁচিয়েছিস- আমি সে কথা ভুলব না। আমি চাই খুব সুন্দর ছেলের সঙ্গে তোর বিয়ে হোক। তুই সুখী হ। তোর গায়ের রঙ হলুদ। তুই যখন নদীর জলে পড়ে গিয়েছিলি তখন তা পীতবর্ণের হয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে তো নদীর নামই হয়ে গেল তোর নামে। আমি চাই তোর সুখ।’

কাশমতির কাজে নোয়াই পাখিরাও উজ্জীবিত হয়ে উঠল। তারাও কাশমতির বাড়ির চারদিকে ওড়াউড়ি করতে লাগল। এক সময় ককাশমতি বোনকে ডেকে বলল- ‘লাজন্তি তুই এবার ঘরে যা। আমি এখন উন্মুক্ত আকাশে স্বাধীন ভাবে উড়ে বেড়াব।’

তারপর সে ক্রমশ উঁচু থেকে আরও উুঁচু আকাশে উড়তে লাগল। আর মেয়ের আকাশে ওড়ার দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে কাশমতির বাবা-মা এবং অন্যান্যদের দু’চোখ ভরে গেল কান্নায়। কাশমতিরও কান্নায় চোখ ভিজে গেল বাবা-মা আত্মীয়দের ছেড়ে যাওয়ার সময়। সেই বেদনার্ত মূহুর্তকে ভরিয়ে গেল গান গেয়ে-

‘ও গহন আকাশের নোয়াই পাখি
আমাকে আকাশের আর গভীরে নিয়ে চল
যারা নীচে দাঁড়িয়ে তাদের চোখ মুখ
অবয়ব ছাড়িয়ে সীমানার বহুদূরে।’
First
0 মন্তব্য