ড্রাকুলা - ব্রাম স্টোকার (রূপান্তর : রকিব হাসান) || পর্ব-০১

এক


জোনাথন হারকারের ডায়েরি থেকে
৩ মে, বিসট্রিজ।
মিউনিক ছেড়েছিলাম পয়লা মে, রাত আটটা পঁয়তিরিশে। সারা রাত একটানা চলেও পরদিন ভোরে ভিয়েনায় পৌঁছে দেখা গেল এক ঘণ্টা লেট করে ফেলেছে ট্রেন। আবার একটানা চলা। ট্রেনের কামরা থেকে এক নজর দেখে অপূর্ব লাগল বুদাপেস্ট। দানিয়ুব নদীর ওপর তুরস্কীয় কায়দায় গড়া পাশ্চাত্যের সবচে’ সুরম্য চওড়া ব্রিজটা পেরুবার সময়ই টের পেলাম পশ্চিম ইউরোপ ছেড়ে পুবের দিকে পাড়ি জমিয়েছি আমরা। বুদাপেস্টে নেমে খানিকক্ষণ ঘুরে ফিরে দেখলাম শহরটা। স্টেশন ছেড়ে বেশি দূর যেতে সাহস পেলাম না, কি জানি যদি ট্রেনটা আবার আমাকে ফেলে রেখেই চলে যায়। স্টেশনে ফিরে দেখলাম ট্রেন ছাড়ে ছাড়ে। আর কয়েক মিনিট দেরি হলেই মিস করতাম ট্রেন। যথাসময়েই অর্থাৎ সন্ধ্যের পরপরই ক্লাসেনবার্গে পৌঁছে গেল ট্রেন। রাত কাটাবার জন্যে স্টেশনের কাছেই একটা হোটেলে উঠলাম। কার্পেথিয়ানদের জাতীয় খাদ্য প্যাপরিকা— সাংঘাতিক ঝাল দেয়া মুরগির মাংস দিয়ে রাতের খাওয়া সেরেই শুয়ে পড়লাম। তুলতুলে নরম পালকের বিছানায় শুয়েও কিন্তু ঘুম এলো না। গত কয়েক দিনের কথা একসঙ্গে এসে ভিড় জমাল মনে। একটা বিশেষ কাজে কার্পেথিয়ান পর্বতমালার ঠিক হৃৎপিণ্ডে অবস্থিত ইউরোপের সবচেয়ে অখ্যাত আর দুর্গম এক জায়গায় চলেছি আমি। লন্ডন ছাড়ার আগেই ব্রিটিশ মিউজিয়ামে খুঁজে-পেতে এ পর্যন্ত ট্রানসিলভেনিয়া সম্পর্কে যে সমস্ত বই বা মানচিত্র বেরিয়েছে তা জোগাড় করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তেমন কিছু পাইনি। দেশটা সম্পর্কে বাইরের লোকে বিশেষ কিছু জানে না দেখে একটু অবাকই হয়েছিলাম। অনেক খোঁজ-খবর করে শুধু এটুকুই জানতে পেরেছিলাম, কাউন্ট ড্রাকুলার দুর্গ, অর্থাৎ যেখানে চলেছি আমি, সে জায়গাটা ট্রানসিলভেনিয়ার একেবারে পুব প্রান্তে। কোনো মানচিত্র বা বইপত্রের কোথাও কাউন্ট ড্রাকুলার দুর্গের কোনো উল্লেখই নেই। দু’একজন প্রাচীন লোকের মুখে জায়গাটার শুধু নামটা শুনেছি আমি।
ক্লাসেনবার্গে পৌঁছে দেখলাম কাউন্ট ড্রাকুলার পূর্বপুরুষদের আমলে প্রতিষ্ঠিত শহর বিসট্রিজ এখানকার লোকদের বেশ পরিচিত, কিন্তু কাউন্ট ড্রাকুলা সম্পর্কে কেউ কিছু বলতে চায় না, কেন বুঝলাম না। এসব ভাবতে ভাবতেই একটু তন্দ্ৰা মতো এলো। কিন্তু অদ্ভুত সব দুঃস্বপ্ন দেখে সে তন্দ্ৰাও ছুটে গেল বার বার। গ্লাসের পর গ্লাস পানি খেয়েও তৃষ্ণা নিবারণ করতে পারলাম না। পিপাসা যেন মিটছেই না। ভোর রাতের দিকে বোধহয় একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ঘুম ভাঙল কড়া নাড়ার তীক্ষ্ণ শব্দে। লাফ দিয়ে উঠে দরজা খুলে দিতেই পরিচারক জানালো আমার যাত্রার সময় হয়ে এসেছে।
হাত-মুখ ধুয়ে নাস্তা খেয়ে স্টেশনে পৌঁছতে পৌঁছতে সাতটা বেজে গেল। কিন্তু স্টেশনে এসে দেখলাম তখনও ট্রেন আসেনি, অর্থাৎ এ লাইনের যা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার— ট্রেন লেট। টের পাচ্ছি, যতই পুবে এগোচ্ছি ততই গড়বড় হয়ে যাচ্ছে ট্রেনের সময়-সূচী।
শেষ পর্যন্ত এলো ট্রেন, ছাড়লও এক সময়। জানালা দিয়ে বাইরের অপূর্ব দৃশ্যপট দেখতে দেখতে চললাম। কখনও চোখে পড়ল প্রাচীন চিত্রকরদের আঁকা ছবির মতো পাহাড়চূড়ায় ছোট্ট শহর কিংবা দুর্গ, কখনও দু’কূল ভাসিয়ে দিয়ে প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে চলা তীব্র স্রোতা পাহাড়ি নদী। চলার পথে প্রত্যেকটি স্টেশনে দেখলাম বিচিত্ৰ পোশাক পরা মানুষের ভিড়। অধিকাংশই গেঁয়ো চাষী। পুরুষদের পরনে খাটো কোর্তা আর ঘরে তৈরি পাজামা। মাথায় বিশাল ব্যাঙের ছাতার আকৃতির গোল টুপি। মেয়েদের কাপড়গুলো কিন্তু ভারি সুন্দর। পুরো-হাতা ঝলমলে সাদা পোশাক আর ঘেরওয়ালা লুটানো ঘাঘরা পরা মেয়েদেরকে দেখতে প্ৰাচীন থিয়েটারের নর্তকীর মতো মনে হলো।
সবচেয়ে আশ্চর্য হলাম স্লোভাকদের দেখে। বলতে কি, মনে মনে কিছুটা ভয়ও হলো। গরুর গাড়ির চাকার সাইজের বিশাল বারান্দাওয়ালা লোকগুলোর টুপি, ঢলঢলে নোংরা পাজামা, সাদা কোর্তা, আগাগোড়া পিতলের পেরেক আঁটা বিঘতখানেক চওড়া চামড়ার বেল্ট আর উঁচু বুট। ওদের কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা কোঁকড়ানো কালো চুল আর সেই সাথে পাল্লা দেয়া বিরাট গোঁফ দেখে প্রথম দর্শনেই ডাকাত বলে ভুল হয়। অথচ পাশের লোককে জিজ্ঞেস করে জানলাম এ এলাকার লোকদের মধ্যে নাকি ওরাই সবচেয়ে নিরীহ।
এত সব আশ্চর্য আর নতুন নতুন জিনিস দেখতে দেখতে দিনটা কিভাবে ফুরিয়ে গেল টেরই পেলাম না। সন্ধ্যার একটু আগে বিসট্রিজে এসে পৌঁছুলাম। গোধূলির স্নান আলোয় বুদাপেস্টের চেয়ে অনেক, অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হলো শহরটাকে। ট্রানসিলভেনিয়ার শেষ সীমান্তে, পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বিসট্রিজ। বোৰ্গো গিরিপথটা এখান থেকেই সোজা চলে গেছে বুকোভিনা পর্যন্ত। বিসট্রিজ শহরের চেহারা দেখলেই বোঝা যায় অতীতে বহু যুদ্ধের প্রচণ্ড ঝড় ঝাপটা বয়ে গেছে এর ওপর দিয়ে। শোনা যায় সপ্তদশ শতকের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাঁচ পাঁচবার যুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলার প্রকোপে পড়ে নিশ্চিহ্ন হতে হতে কোনো রকমে বেঁচে যায় বিসট্রিজ। প্রথম যুদ্ধের প্রথম তিন সপ্তাহেই মারা যায় প্রায় তেরো হাজার মানুষ, এছাড়া দুৰ্ভিক্ষ আর মড়ক তো আছেই। এ থেকেই অনুমান করা যায় পরের যুদ্ধগুলোতে কত লোক প্ৰাণ হারিয়েছিল।
গোল্ডেন ক্রোন হোটেলে ওঠার নির্দেশ দিয়েছিলেন আমাকে কাউন্ট ড্রাকুলা। প্রাচীন হোটেলটা দেখেই পছন্দ হলো আমার, যেন এটাকেই খুঁজছিলাম মনে মনে। হোটেলের সদর দরজার কাছে একজন মাঝবয়সী সুন্দরী মহিলাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। জায়গায় জায়গায় সাদা কাপড়ের ঝালর দেয়া আঁটসাঁট রঙিন পোশাক পরা মহিলার আর একটু কাছাকাছি পৌঁছতেই আমার দিকে এগিয়ে এলেন তিনি। জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু মনে করবেন না, আপনি ইংল্যান্ড থেকে আসছেন তো?”
“হ্যাঁ,’ উত্তর দিলাম, “আমি জোনাথন পারকার।”
মৃদু হেসে পাশ ফিরলেন ভদ্রমহিলা। সাথের ভদ্রলোককে মৃদুস্বরে কি যেন বললেন, বুঝতে পারলাম না। মাথা ঝাঁকিয়ে চলে গেলেন ভদ্রলোক, একটু পরই আবার ফিরে এলেন। হাতে একটা চিঠি। ওঁর হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে খুলে পড়তে শুরু করলাম।
বন্ধু,
কার্পেথিয়ানে স্বাগত জানাচ্ছি আপনাকে। বুঝতেই পারছেন, আপনার সাথে সাক্ষাতের আশায় অধীর হয়ে দিন গুনছি আমি। আজ রাতটা কোনোমতে হোটেলেই কাটিয়ে দিন। আগামীকাল তিনটের দিকে আবার যাত্রা শুরু হবে আপনার। একটা ভাড়াটে ঘোড়ার গাড়িতে আপনার জন্যে আসন সংরক্ষিত করা আছে। আগামীকাল তিনটায় বুকোভিনার উদ্দেশে রওনা দেবে গাড়িটা। নির্দ্বিধায় উঠে বসবেন তাতে। বোৰ্গো গিরিপথের কোনো এক জায়গায় ওই ঘোড়ার গাড়ি থেকে আপনাকে তুলে নেবে আমার নিজস্ব টমটম, পৌঁছে যাবেন আমার প্রাসাদ-দুর্গে। আশা করছি আপনার সাথে আমার নিঃসঙ্গ জীবনের ক’টা দিন অত্যন্ত আনন্দেই কাটবে।
প্রীতি ও শুভেচ্ছান্তে।
আপনার বন্ধু—
‘ড্রাকুলা।’
৪ মে।
হোটেলের মালিক অর্থাৎ যিনি আমাকে চিঠিটা পৌঁছে দিয়েছেন, তাকেও একটা চিঠি দিয়েছেন কাউন্ট ড্রাকুলা। আমার যাতে কোনো প্রকার অসুবিধা না হয় সেদিকে কড়া নজর রাখার নির্দেশ আছে সে চিঠিতে। হোটেলের মালিক বলতে গেলে কথা প্রায় বলেনই না। আমি স্থানীয় লোকদের কাছে শুনেছিলাম তিনি জার্মান ভাষা জানেন না। কিন্তু তাঁর সাথে কথা বলার পর বুঝলাম তার সম্বন্ধে স্থানীয় লোকদের ধারণাটা ভুল। কারণ তিনি এবং তাঁর স্ত্রী— সেই সুন্দরী ভদ্রমহিলা, আমার দু’একটা ছাড়া, বাকি সব প্রশ্নের উত্তরই যথাযথভাবে দিয়েছিলেন। তবে আমাকে দেখলেই কেমন একটা চাপা উত্তেজনা আর আশঙ্কার ছায়া পড়েছে ওঁদের চোখে-মুখে। প্রশ্ন করে জানলাম আমার রাহা খরচের টাকা আগেই ডাকযোগে হোটেলের মালিকের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন কাউন্ট ড্রাকুলা। কাউন্ট ড্রাকুলা আর তার প্রাসাদ-দুর্গ সম্পর্কে কি জানেন জিজ্ঞেস করতেই চমকে উঠে বুকে ক্রুশ চিহ্ন আঁকলেন স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই। মুখে যদিও বললেন সে সম্পর্কে ওঁরা কিছু জানেন না, কিন্তু আমার মনে হলো ইচ্ছে করেই কিছু গোপন করছেন তারা। দ্রুত এগিয়ে আসছে রওনা দেবার সময়। আর কারও সাথে পরিচিত হয়ে কাউন্ট ড্রাকুলা সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করবার আগেই যাত্রার সময় হয়ে গেল। মনে মনে একটা তীব্ৰ অস্বস্তি নিয়ে হোটেলের কামরা থেকে বেরোতে যাব, এমন সময় ঘরে এসে ঢুকলেন সুন্দরী ভদ্রমহিলা। কয়েক মুহূর্ত দ্বিধা করে শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেসই করে ফেললেন, “সত্যিই আপনি যাচ্ছেন তাহলে?”
“মানে?” অবাক হলাম আমি।
“না গেলেই কি নয়?”
“কেন যাব না? তাছাড়া খামোকা বেড়াতে তো আর সেখানে যাচ্ছি না আমি। অফিস থেকে রীতিমতো কাজ নিয়ে দেখা করতে যাচ্ছি কাউন্টের সাথে।”
“তা যান,” একটু যেন হতাশ হলেন ভদ্রমহিলা, “আমি বলছিলাম আজকের দিনে... জানেন না আজ চৌঠা মে?”
“জানব না কেন? আজ চৌঠা মে তো হয়েছে কি?”
“হয়নি, কিন্তু হবে। আজ সেন্ট জর্জ দিবস। মাঝ রাতের ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর যেখানে যত প্ৰেতাত্মারা আছে, সব জেগে উঠবে আজ। তাছাড়া, জানেন কার কাছে যাচ্ছেন?”
ব্যাপার কি? এবারে সত্যিই আশ্চর্য হলাম আমি। বোধহয় আমাকে কিছুটা টলিয়ে দিতে পেরেছেন ভেবে আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন ভদ্রমহিলা। হাত জোড় করে বললেন, “আমি আপনার কেউ না, আপনাকে জোর করতে পারি না আমি। তবু মিনতি করছি, আরও দুটো দিন অন্তত আপনি এ হোটেল ছেড়ে বেরোবেন না।”
এবারে দ্বিধায় পড়লাম। ভাবছি কি করা যায়। যাব, না থাকব। অনিশ্চয়তার দোলায় দুলতে দুলতে নিজের ওপরই খেপে গেলাম, এ কি ছেলেমানুষী হচ্ছে! এসব দুর্বোধ্য কথাবার্তা আর হেঁয়ালি শুনে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয়? ওদিকে কত কাজ পড়ে আছে। কথাটা মনে হতেই গম্ভীর হয়ে গেলাম। ভদ্রমহিলাকে বললাম, “মাফ করবেন। কাজটা অত্যন্ত জরুরি, আপনার অনুরোধ রাখতে পারছি না বলে দুঃখিত।”
আমাকে ঠেকানোর কোনো উপায় নেই বুঝতে পেরে উঠে দাঁড়ালেন ভদ্রমহিলা। নিজের গলায় ঝোলানো ক্রুশটা খুলে নিয়ে জোর করে গুঁজে দিলেন আমার হাতে। ধর্মের প্রতি কোনোদিনই আমার তেমন বিশ্বাস-টিশ্বাস নেই। কাজেই একবার ভাবলাম ফিরিয়ে দিই ওটা, কিন্তু ভদ্রমহিলার মুখের দিকে চেয়ে তা আর পারলাম না, আসলে মমতাময়ী ওই মহিলাকে আঘাত দিতে ইচ্ছে করল না আমার। মনে মনে ঠিক করলাম, মহিলা চোখের আড়াল হলেই টুপ করে ফেলে দেব কোথাও। বোধহয় আমার মনোভাব বুঝতে পেরে মৃদু হাসলেন মহিলা, তারপর আমার হাত থেকে ক্রুশটা নিয়ে আমার গলায় পরিয়ে দিতে দিতে বললেন, “যদি আপনার মা এটা গলায় পরিয়ে দিতেন, তাহলে কি ফেলে দিতে পারতেন?”
কথাটা বলেই ঘুরে দাঁড়িয়ে কামরা থেকে বেরিয়ে গেলেন ভদ্রমহিলা। কি জানি, আমার মনের ভুলও হতে পারে, ঘুরে দাঁড়ানোর আগে ভদ্রমহিলার চোখে অশ্রু টলমল করতে দেখেছিলাম।
গলা থেকে খুলে ফেলতে পারলাম না ক্রুশটা। চিন্তিতভাবে হোটেলের কামরা থেকে বেরিয়ে অপেক্ষমাণ গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। একটু পর চলতে শুরু করল গাড়ি। মিনা, তখনও কি জানতাম কতটা ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছি আমি!
৫ মে, প্রাসাদ-দুর্গ।
পুব আকাশে উঠি উঠি করছে সূৰ্য। ভোরের সূৰ্য আমার দারুণ ভালো লাগে, তা তো তুমি জানোই, মিনা, কিন্তু আজ ভালো লাগল না। কেমন যে রোগাটে মলিন দেখাচ্ছে সূৰ্যটাকে। বিছানায় বার দুয়েক গড়াগড়ি করে উঠে পড়লাম, ডায়েরিটা লিখে ফেলতে হবে।
গতকাল আমি গাড়িতে উঠে বসার পরও গাড়ি ছাড়তে কিছুক্ষণ দেরি করল কোচোয়ান। হোটেলের মালিকের সাথে উত্তেজিতভাবে কিছু বলছে সে, আর বার বার তাকাচ্ছে আমার দিকে। বুঝলাম কথা হচ্ছে আমার সম্পর্কেই। এতক্ষণ আশপাশে ঘোরাফেরা করছিল হোটেলের কয়েকজন বয় বেয়ারা। আস্তে আস্তে ওরাও হোটেলের মালিক আর কোচোয়ানের সাথে তর্কে যোগ দিল। ওরা কি বলছে ভালোমতো শুনতে পেলাম না। তবে যে কয়েকটা শব্দ শোনা গেল সেগুলোর মানে জানার জন্যে তাড়াতাড়ি ওই দেশি অভিধানটা বের করলাম। কয়েকটা শব্দের মানে সত্যি রহস্যজনক। যেমন— শয়তান, নরক, ডাইনী ইত্যাদি। আর দুটো শব্দ তো রীতিমতো অবাক করল আমাকে। শব্দ দুটো হলো নেকড়ে আর রক্ত চোষা বাদুড়। মনে মনে ঠিক করলাম, কাউন্টকে জিজ্ঞেস করে শব্দগুলোর তাৎপর্য জেনে নেব।
আরও কিছুক্ষণ কথা বলার পর গাড়িতে এসে উঠল কোচোয়ান। ততক্ষণে ছোটখাটো একটা ভিড় জমে গেছে হোটেলের গেটের সামনে। আমার দিকে করুণার দৃষ্টিতে চাইতে চাইতে বুকে ক্রুশ চিহ্ন আঁকছে সবাই। পাশের সহযাত্রীর দিকে ঝুঁকে মৃদুস্বরে জানতে চাইলাম, এসব কি হচ্ছে? প্রথমে প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল সে। আমার পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত জানাল, অশুভ আত্মার দৃষ্টি থেকে আমাকে বাঁচাবার উদ্দেশ্যেই অমন করছে ওরা। সম্পূর্ণ অজানা জায়গায় ঠিক তেমনি অচেনা একজন লোকের সাথে দেখা করতে যাবার আগে এ ধরনের কাজ কারবার দেখে মনটা ঘাবড়ে গেল আমার।
ঝাঁকড়া, সবুজ পাতাওয়ালা বাতাবি আর কমলালেবুর গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে হোটেল প্রাঙ্গণের ঠিক মাঝখানটায়। তার আশপাশে দাঁড়ানো লোকগুলো আমার মতো অচেনা একজন বিদেশির জন্যে আন্তরিক আশঙ্কা প্ৰকাশ করে যে হৃদ্যতা দেখাল তা জীবনে ভুলব না আমি।
কোনো রকম জানান না দিয়েই হঠাৎ ছুটতে শুরু করল গাড়ি। সহযাত্রীদের ভাষা আমার বোধগম্যের বাইরে বলে তাদের সাথে আলাপে অংশগ্রহণ করতে পারছি না। কিন্তু চারপাশের অপূর্ব প্রাকৃতিক শোভা দেখতে দেখতে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওদের কথা সম্পূর্ণ ভুলে গেলাম। বড় বড় গাছে আচ্ছন্ন হয়ে আছে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া পাহাড়ের গা। বনের ওপারে সবুজ ঘাসে ছাওয়া তেপান্তর, তারপরেই আবার চলে গেছে পাহাড়ের সারি। এখানে ওখানে জন্মে আছে অজস্র আপেল, পাম, নাশপাতি আর চেরিফলের গাছ। সব ক’টা গাছের গায়েই ভাবী সন্তানের আগমনের ইঙ্গিত, অর্থাৎ ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে গাছগুলো। সন্তান বরণ করার জন্যেই বোধহয় ওগুলোর গোড়ায় জন্মানো সবুজ ঘাসের ঘন জঙ্গলের ওপর আলপনা এঁকেছে ঝরা ফুলের পাপড়ি। পাশের সহযাত্রীকে জিজ্ঞেস করে জানলাম অপূর্ব এই জায়গাটার নাম ‘মিটেল ল্যান্ড’।
পাহাড়ের গা ঘুরে এঁকেবেঁকে নামতে নামতে হঠাৎ করেই মনে হবে দেবদারু বনের মাঝে গিয়েই শেষ হয়ে গেছে বুঝি পথটা, কিন্তু আসলে শেষ হচ্ছে না। পথটা অল্পবিস্তর অসমান, তবু ঢালু পথে ঝড়ের বেগে ছুটছে আমাদের গাড়ি। মুহূর্ত মাত্র সময় নষ্ট না করে বোৰ্গো গিরিপথে পৌঁছানোর জন্যে যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে কোচোয়ান। কারণ বুঝতে পারলাম না। সহযাত্রীকে জিজ্ঞেস করেও সন্তোষজনক উত্তর পেলাম না।
আরও সামনে এগিয়ে, মিটেল ল্যান্ডের সবুজ উপত্যকা পেছনে ফেলে কার্পেথিয়ানের বিশাল প্রান্তরের প্রান্তে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া অরণ্যের কাছে এসে পৌঁছুলাম। আমার ডাইনে-বাঁয়ে তখন শুধু ছোট বড় পাহাড়ের সারি। ওদিকে অস্ত যাচ্ছে সূর্য। অস্তগামী সূর্যের আলোয় দূরে পাহাড় চূড়াগুলোকে দেখাচ্ছে গাঢ় নীল, আর কাছেরগুলো কমলা। ঘাস প্রান্তর আর পাহাড়ের গোড়ার সঙ্গম স্থলের কোথাও সবুজ, কোথাও বাদামী। আর বহু দূরে, দিগন্তের একেবারে কাছাকাছি তুষার ছাওয়া চূড়াগুলোর সৌন্দর্য ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।
একটু পরই পাহাড়ের গা থেকে নেমে আসা ছোট ছোট ঝর্ণার দেখা পেলাম। বিদায়ী সূর্যের সোনালী আলো এসে পড়েছে ওগুলোর ওপর। এখন আর পানির ঝর্ণা বলে মনে হচ্ছে না ওগুলোকে। ঝিরঝির শব্দে পাহাড়ের গা থেকে বেরিয়ে আসছে যেন তরল সোনা।
পথটা হঠাৎ তীক্ষ্ণ একটা বাঁক নিতেই হুমড়ি খেয়ে আমার গায়ের উপর এসে পড়লেন পাশের সহযাত্রী। আঙুল দিয়ে বুকে ক্রুশ চিহ্ন আঁকতে আঁকতে চোখের ইঙ্গিতে আমাকে দেখালেন, “ওই, ও-ই-ই যে, ওখানেই বাস করেন ঈশ্বর।” কথাটার মানে বুঝতে পারলাম না। আঁকাবাঁকা সর্পিল পথে আমাদের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটন্ত সূৰ্য ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল বহু আগেই, এখন একেবারে ঝিমিয়ে পড়েছে। পাহাড়ের ওপারে ডুবছে এখন সে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সম্পূৰ্ণ চোখের আড়ালে চলে গেল সূর্য। এতক্ষণ সাহস পায়নি, কিন্তু সূর্য ডুবে যাওয়া মাত্র এদিক ওদিক চাইতে চাইতে মন্থর পায়ে এগিয়ে আসতে থাকল অন্ধকার। সূর্যের চিহ্নমাত্র দেখা যাচ্ছে না, অথচ আশ্চৰ্য, তুষার ছাওয়া পাহাড়গুলো তখনও সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়ে আছে। একটা সূর্য ডুবে গেছে, কিন্তু তুষার ছাওয়া চূড়াগুলো অসংখ্য সূৰ্য হয়ে আলো ছড়াচ্ছে চারদিকে। সেই আলোয় চোখে পড়ল রাস্তার দুধারে ঘাসে ছাওয়া জমির বুক ভেদ করে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য ক্রুশ। যতবার চোখে পড়ছে ক্ৰুশগুলো, ততবার বুকে ক্রুশ চিহ্ন আঁকছে আমার সহযাত্রীরা। কখনও কখনও দু’একটা ক্রুশের সামনে নতজানু হয়ে বসে প্রার্থনা করছে কিষাণী বধূ। বোধহয় অকালে হারিয়ে যাওয়া স্বামীর উদ্দেশ্যে জানাচ্ছে তার ব্যথা ভরা বুকের গোপন হাহাকার। এতই তন্ময় হয়ে বসে আছে যে আমাদের দিকে একবারের জন্যেও মুখ তুলে তাকাচ্ছে না। যেন আমরা নেই।
গিরিমুখে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে গোধূলির শেষ আলোটুকুও মিলিয়ে গেল। সাঁঝ ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে বাড়তে লাগল ঠান্ডা। গাঢ় কুয়াশা নেমে আসতে লাগল বার্চের অরণ্যের উপর। হালকা তুষারের পটভূমিকায় দাঁড়িয়ে আছে পাতাবাহারের কালো কালো ঝোপ। ঢাল বেয়ে দ্রুত নামার সময় মনে হচ্ছে এই বুঝি দেবদারুর গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে গাড়ি। সে ঢালটা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের গা বেয়ে আবার খাড়া উঠে গেছে পথটা। অতি ধীরে গাড়িটাকে টেনে টেনে এখন এগোতে হচ্ছে ঘোড়াগুলোকে। ওগুলোর পেছন পেছন হেঁটে যাব ভেবে কোচোয়ানকে বললাম কথাটা। সাথে সাথেই দারুণ চমকে উঠে আমাকে বাধা দিয়ে বলল সে, “বলছেন কি, সাহেব? এখানে নামামাত্রই ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়ে নেবে আপনাকে হিংস্ৰ কুকুরের দল।” আশপাশে তাকিয়ে একটা কুকুরও চোখে পড়ল না আমার। কানে এলো না কুকুরের একটা ডাকও। “কোথায় কুকুর?” কোচোয়ানকে জিজ্ঞেস করতেই অদ্ভুত ভাবে হাসল সে, কোনো উত্তর দিল না।
অন্ধকার গাঢ় হয়ে আসতেই আলো জ্বালবার জন্যে কয়েক সেকেন্ড থামল কোচোয়ান। হোটেল ছাড়ার পর এই প্ৰথমবারের জন্যে থামল সে। আঁধার হবার পরপরই কেন যেন একটু উত্তেজিত মনে হলো যাত্রীদের। বার বার কোচোয়ানকে আরও জোরে গাড়ি চালাবার জন্যে ধমকাতে লাগল ওরা। আর ওদের কথার প্রত্যুত্তরেই যেন নির্মম ভাবে হিশিয়ে উঠতে থাকল কোচোয়ানের চাবুক, জান বাজি রেখে ছুটে চলল ঘোড়াগুলো।
জমাট অন্ধকারে প্রায় অন্ধের মতো ছুটছে আমাদের গাড়ি। এবড়োখেবড়ো আর আঁকাবাঁকা পথে লাফাতে লাফাতে ছুটছে, স্থির হয়ে বসে থাকা যাচ্ছে না কিছুতেই। একটু পরই অপেক্ষাকৃত মসৃণ হয়ে এলো রাস্তা, সাথে সাথে দু’পাশ থেকে চেপে এসে আমাদের গিলে চাইল পাহাড়ের সারি। বুঝলাম, বোৰ্গো গিরিপথে প্রবেশ করেছি আমরা।
গিরিপথে প্রবেশ করতেই একটা স্বস্তির ভাব ফুটে উঠল সহযাত্রীদের মধ্যে, যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু আর একটু এগিয়ে যেতেই হঠাৎ কেন যেন আবার গম্ভীর হয়ে গেল ওরা। যেন ভয়ঙ্কর কিছু ঘটার অপেক্ষা করছে। কারণ জিজ্ঞেস করা সত্ত্বেও আমাকে কিছু জানাল না কেউ। উত্তেজিত নীরবতায় থমথম করছে গাড়ির ভিতরটা। গাড়ি আরও এগোতেই পুব দিকে খাঁড়ির মুখটা চোখে পড়ল। আবহাওয়ার পরিবর্তনও টের পেলাম। একে গাঢ় অন্ধকার, তার ওপর আকাশে মেঘ জমায় কালিগোলা অন্ধকারে ছেয়ে গেল চারদিক। থমথমে বাতাসে ঝড়ের সংকেত।
আর একটু এগোতেই দেখা গেল রাস্তাটা দু’ভাগ হয়ে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে দু’দিকে চলে গেছে। ডান পাশের পথটা বেছে নিল কোচোয়ান। বাঁ দিকের পথটা কোথায় গেছে জানতে চেয়েও উত্তর পেলাম না কারও কাছ থেকে। ইচ্ছে করেই আমার প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল সহযাত্রীরা। ক্ৰমেই বাড়ছে বাতাসের বেগ।
এদিকেরই কোনো এক জায়গা থেকে কাউন্টের টমটমে আমাকে তুলে নেবার কথা। উৎকণ্ঠিত ভাবে এদিক ওদিক চেয়ে তার খোঁজ করতে লাগলাম। প্রতি মুহূর্তে আশা করতে লাগলাম এখনই অন্ধকারের বুক চিরে দেখা দেবে কোনো লণ্ঠনের আলো। কিন্তু দুর্ভেদ্য অন্ধকারে আমাদের গাড়ির লন্ঠনের কাঁপা কাঁপা আবছা ভৌতিক আলো ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না। সে আলোয় ধাবমান ক্লান্ত ঘোড়াগুলোকে কেমন অদ্ভুত দেখাচ্ছে।
বালি বিছানো পথ বেয়ে দ্রুত সামনে এগিয়ে চললাম। এখনও চোখে পড়ছে না কাউন্টের টমটম। তবে কি ওটা আসবে না? যাত্রীদের অস্বস্তি আর উত্তেজিত ভাবটা যেন একটু কমে আসছে। আরও কিছু পর হাতঘড়ি দেখে সবচেয়ে কাছের যাত্রীকে নিচু গলায় কি যেন বলল কোচোয়ান। তেমনি নিচু গলায় উত্তর দিল যাত্রী ভদ্রলোক, “ঘণ্টাখানেক বাকি আছে এখনও।” কিসের ঘণ্টাখানেক বাকি আছে? সবটা ব্যাপারই কেমন অদ্ভুত আর রহস্যময় ঠেকল আমার কাছে।
আরও কিছুক্ষণ কেটে যাবার পর আমার দিকে ফিরে ভাঙা ভাঙা জার্মানিতে কোচোয়ান বলল, “আজ বোধহয় আর আসবে না কাউন্টের টমটম। তার চেয়ে এক কাজ করুন না, অযথা এই বুনো পথে টমটমের অপেক্ষা না করে আমাদের সাথে বুকোভিনায় চলুন। সেখান থেকে কাল, না-না, পরশু ফিরে আসবেন।”
কোচোয়ানের কথা শেষ হবার আগেই তীক্ষ্ণ হ্রেষা ধ্বনিতে চমকে উঠলাম। ভয়ঙ্কর কোনো কিছুর গন্ধ পেয়েছে বোধহয় আমাদের ঘোড়াগুলো। থমকে থেমে দাঁড়িয়ে, নাক তুলে বাতাসে কি যেন শুঁকছে আর চেঁচাচ্ছে ওগুলো। কোনো অজানা আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠতে গিয়ে থেমে গেল দু’একজন যাত্রী।
ঠিক সেই সময় গাড়ির চাকা আর ঘোড়ার খুরের শব্দে পিছন ফিরে চাইলাম। যেন মাটি ফুঁড়ে উদয় হয়েছে চার ঘোড়ায় টানা সুন্দর একটা ফিটন। আমাদের লণ্ঠনের আলোয় দেখলাম চারটে ঘোড়াই কুচকুচে কালো রঙের, আর আশ্চর্য বলিষ্ঠ এবং সুন্দর। ফিটনটা থেমে দাঁড়াতেই চালকের আসন থেকে নেমে এলো লম্বামতো একজন লোক। বাদামী দাড়িতে ঢাকা লোকটার মুখ মাথার বিশাল কালো টুপিটা সামনের দিকে টেনে দেয়া, তাতে মুখের প্রায় সবটাই ঢাকা পড়ে গেছে। সোজা আমার দিকে এগিয়ে এলো আগন্তুক। মুখ তুলে চাইতেই লণ্ঠনের আলোয় এক পলকের জন্যে দেখলাম লোকটার টকটকে লাল দুটো চোখ। কোচোয়ানের দিকে ফিরে ধরা গলায়, অনেকটা শাসনের সুরে বলল আগন্তুক, “আজ এত তাড়া কেন, গলায় কাঁটা আটকেছে নাকি?”
যেন ভয়ঙ্কর কোনো অপরাধ করে ধরা পড়ে গেছে, তাই দোষ ঢাকার চেষ্টা করছে এমন ভাবে উত্তর দিল কোচোয়ান, “না না, কি যে বলেন। আসলে ওই বিদেশি ভদ্রলোক দ্রুত চালাবার জন্যে কেবলই তাড়া লাগাচ্ছিলেন কিনা, তাই...”
“তাই তাকে বুকোভিনায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলে?” কোচোয়ানের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ধমকে উঠল আগন্তুক, “ফের আমার সঙ্গে চালাকির চেষ্টা করলে জ্যান্ত পুঁতে ফেলব। জানো না আমার শক্তি সম্পর্কে? আমার ওই ঘোড়ার সাথে দৌড়ে পারবে তোমার ঘোড়াগুলো?”
একটু অবাক হয়েই আগন্তুকের কথা শুনছি। লণ্ঠনের আবছা আলো এসে পড়েছে ওর চোখে মুখে। সে আলোয় দেখলাম রুক্ষ কঠিন লোকটার মুখ। কড়া করে লিপস্টিক লাগানো লাল টুকটুকে ঠোঁটের মতো দুটো ঠোঁটের ভেতর ঝিকমিক করছে মুক্তোর মতো সাদা তীক্ষ্ণ দাঁত। আগন্তুক কোচোয়ানকে শেষ প্রশ্নটা করতেই আমার কানের কাছে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল পাশের সহযাত্রী, “তা বটে, মৃত্যুর ঘোড়া একটু জোরেই ছোটে।”
এত আস্তে কথা বলল সহযাত্রী যে কোনো রকমে কথাটার মানে বুঝলাম আমি। কিন্তু চকিতে ঘাড় ফিরিয়ে আমাদের দিকে চাইল আগন্তুক। আমার মনে হলো কথাটা শুনতে পেয়েছে সে। কিন্তু কি করে শুনল? তার শ্রবণশক্তি কি এতই প্রখর? আমার পাশের সহযাত্রীর দিকে চেয়ে মুচকি হাসল আগন্তুক। সাথে সাথে চমকে বুকে ক্রুশ চিহ্ন আঁকল সহযাত্রী। পাত্তা দিল না আগন্তুক। সহযাত্রীর দিকে হাত বাড়িয়ে আমাকে দেখিয়ে বলল, “ভদ্রলোকের জিনিসপত্রগুলো দিন।”
সঙ্গে এনেছি শুধু একটা সুটকেস। সেটাই নিয়ে ফিটনে তুলে রাখল আগন্তুক। তারপর ফিরে এসে আমাকে নামার ইঙ্গিত করল। গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে ফিটনে উঠলাম আমি। ফিটনে উঠতে আমাকে সাহায্য করল আগন্তুক। তার হাতের ছোঁয়া লাগতেই যেন শির শির করে উঠল আমার গা। ইস্পাতের মতো কঠিন আগন্তুকের হাতের আঙুলগুলো। এ থেকেই লোকটার শরীরের আসুরিক শক্তি সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা হয়ে গেল আমার।
আমি ফিটনে উঠে বসতেই চালকের আসনে উঠে বসল আগন্তুক। সাপের মতো হিস হিস করে উঠল তার হাতের চাবুক। বিদ্যুতের মতো লাফিয়ে উঠে একপাক ঘুরে অন্ধকার গিরিপথের দিকে ছুটে চলল ঘোড়াগুলো। ফিটনটা ঘোরার সময়ই আগের গাড়িটার দিকে চোখ পড়েছিল আমার। প্রচণ্ড ভয়ে থর থর করে কাঁপছে ঘোড়াগুলো। আর সমানে বুকে ক্রুশ এঁকে চলেছে যাত্রীরা। ফিটনটা ঘুরে যেতেই ঘোড়ার পিঠে চাবুক মারল আগের গাড়ির কোচোয়ান। মুহূর্তে প্ৰাণ ফিরে পেল যেন ঘোড়াগুলো। বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে চলল বুকোভিনার পথ ধরে।
গাড়িটা অন্ধকারে মিলিয়ে যেতেই একটা একাকীত্ব আর অস্বন্তি চেপে বসল আমার বুকে। প্রচণ্ড শীতে কাঁটা দিচ্ছে গায়ে। অথচ আগের মতোই গায়ে গরম কোট আর গলা থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত গরম কম্বলে জড়ানো। কি করে যেন আমার শীত লাগার ব্যাপারটা টের পেল আগন্তুক। পরিষ্কার জার্মানিতে বলল, “প্ৰচণ্ড শীত পড়েছে আজ। কাউন্ট ড্রাকুলা আপনার সমস্ত সুখ-সুবিধের খেয়াল রাখতে বার বার আদেশ দিয়ে দিয়েছেন আমাকে। আপনার সিটের তলায় একটা দেশি মদের বোতল রাখা আছে, প্রয়োজন মনে করলে বের করে নিয়ে শরীরটা একটু গরম করতে পারেন।”
প্রয়োজন মনে করলাম না। তবু ওটা আছে জেনে মনে মনে খুশি হয়ে উঠলাম। আসলে ভয় করছে না আমার, কিন্তু তবু কেমন যেন একটা অস্বস্তির মতো ভাব থেকে থেকেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে মনের ভেতর। অত্যন্ত জরুরি কাজ না থাকলে ঝড়ের রাতে এভাবে অজানা বুনো পথে পাড়ি দেয়ার চেয়ে হোটেলের আরামদায়ক কামরায় নিজেকে আটকে রাখতেই বেশি পছন্দ করতাম আমি।
প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেতে খেতে এগিয়ে চলেছে ফিটন। একটু এগিয়ে যাবার পরই মোড় ঘুরে আর একটা পাহাড়ি পথে গাড়ি ছোটাল আগন্তুক। হঠাৎ একটা অদ্ভুত সন্দেহ জাগল আমার মনে। বাঁকের পর বাঁক ঘুরে মনে হলো একই পথে বার বার ঘুরে বেড়াচ্ছে গাড়িটা। সন্দেহটা জাগতেই সতর্ক হলাম। আবার বাঁক ঘুরতেই সেটার কয়েকটা বিশেষ চিহ্ন মনে গেঁথে নিলাম। একটু পরই আমার সন্দেহের নিরসন হলো, যা ভেবেছিলাম তাই, একই পথে বার বার ঘুরছে গাড়িটা। কেন? একবার ভাবলাম, ব্যাপারটা আগন্তুককে জিজ্ঞেস করে দেখি। কিন্তু পরক্ষণেই বাতিল করে দিলাম চিন্তাটা।
কোনো কারণে হয়তো ইচ্ছে করেই দেরি করছে সে। তাই যদি হয়, তাহলে জিজ্ঞেস করলেও সদুত্তর পাব না। পকেট থেকে দেশলাই বের করে জ্বেলে ঘড়ি দেখলাম। সময় দেখেই একটা কুসংস্কারের কথা মনে পড়ল। নিজের অজান্তেই ধক করে উঠল হৃদপিণ্ডটা। মাঝ রাত হতে আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। মাঝ রাতের পরপরই নাকি জেগে ওঠে সমস্ত অশুভ প্ৰেতাত্মা আর পিশাচেরা। একটু যে ভয় পেলাম না তা নয়, তবু যুক্তি তর্ক দিয়ে জোর করে ভয়টা তাড়াবার চেষ্টা করলাম।
আরও কয়েক মিনিট পরই দূরে কোথাও আর্তস্বরে ডেকে উঠল একটা কুকুর। সেটার প্রত্যুত্তরে আর একটা, তারপর আর একটা। হঠাৎ করেই জীবন্ত হয়ে উঠল যেন বুনো পাহাড়ি এলাকা। শত শত কুকুরের ক্রুদ্ধ চিৎকারে খান খান হয়ে ভেঙে গেল আশপাশের নিস্তব্ধতা। পাহাড়ে পাহাড়ে ধ্বনিত প্ৰতিধ্বনিত হয়ে শতগুণ বেড়ে গেল সেই শব্দ ঝংকার।
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ফিটনের ঘোড়াগুলো। আগন্তুকের শত আশ্বাস সত্ত্বেও আর এক পা এগোল না ওগুলো। মনে হলো প্ৰচণ্ড ভয় পেয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে বাঁধন ছিঁড়ে গাড়ি ফেলে পালাতে পারে। হঠাৎ থেমে গেল কুকুরের ডাক। তার পরিবর্তে শোনা গেল হাজার হাজার নেকড়ের রক্ত পানি করা চাপা গর্জন। ঘোড়াগুলোকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, আমারই ইচ্ছে করতে লাগল গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে ছুটে পালাই। কিন্তু পালাব কোথায়? ডাক শুনে মনে হচ্ছে আমাদেরকে ঘিরে এগিয়ে আসছে নেকড়ের দল। ঘোড়াগুলোকে আয়ত্তে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল আগন্তুক। ধীরে ধীরে একটু শান্ত হয়ে এলো ঘোড়াগুলো, কিন্তু শরীরের কাঁপুনি বন্ধ হলো না। ওগুলোর। লাফ দিয়ে চালকের আসন থেকে নেমে এলো আগন্তুক, ঘোড়াগুলোর কানে কানে কি যেন বলল। সাথে সাথেই স্বাভাবিক হয়ে এলো ঘোড়াগুলো। আবার চালকের আসনে উঠে বসে গাড়ি ছেড়ে দিল আগন্তুক।
আগের মতো আর একই জায়গায় ঘুরছে না এখন গাড়িটা। দ্রুত গিরিপথটা পার হয়ে এসে হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ মোড় নিলো ডাইনে। একটা অত্যন্ত সংকীর্ণ পথে এসে পড়ল গাড়িটা। দু’পাশ থেকে পথের ওপর এসে ঝুঁকে পড়েছে ঝাঁকড়া গাছ। গায়ে গায়ে লেগে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে গাছগুলো, আর ওগুলোর ডালপালা এমন ভাবে এসে পড়েছে রাস্তার ওপর, মনে হলো সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে এগোচ্ছি। ডালপালার ফাঁক ফোকর দিয়ে মাঝে মধ্যে চোখে পড়ছে এক আধটা পাহাড়ের চূড়ার আবছা অবয়ব। বাইরে তখন প্রচণ্ড বেগে ফুঁসছে ঝড়, আর প্রচণ্ড বেগেই পরস্পরের গায়ে বাড়ি খাচ্ছে গাছের ডালপালাগুলো। শীতের তীব্ৰতা আরও বেড়ে গেছে, তার ওপর কুয়াশার মতো হালকা তুষারপাতও শুরু হয়েছে। তুষারের চাদরে ঢাকা পড়ে আরও অন্ধকার হয়ে গেছে রাত। হিমেল হাওয়ায় ভয় করে বহু দূর থেকে ভেসে আসছে কুকুরের আর্ত চিৎকার। হঠাৎ আবার শোনা গেল নেকড়ের চাপা গোঙানি। ভেবেছিলাম চলে গেছে নেকড়েগুলো। কিন্তু যায়নি, বরং আমাদেরকে ঘিরে আরও কাছিয়ে এসেছে। প্ৰচণ্ড ভয় পেলাম এবার। কিন্তু বিন্দুমাত্র ভয় পেল না আগন্তুক। বোধহয় রোজ রাতেই নেকড়ের ডাক শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে।
ঠিক এমনি সময় ঘটল ঘটনাটা। আমার বাঁ দিকে দূরে দপ করে জ্বলে উঠল একটা নীলচে আলোর শিখা। আলোটা দেখেই রাশ টেনে ঘোড়া থামাল আগন্তুক। লাফ দিয়ে চালকের আসন থেকে নেমেই মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল সে গভীর অন্ধকারে। কোনদিকে যে গেল বুঝতে পারলাম না। ওদিকে ক্ৰমেই এগিয়ে আসছে নেকড়ের গর্জন।
কয়েক সেকেন্ড পরই আবার ফিরে এলো আগন্তুক। কোনো কথা না বলে চালকের আসনে উঠে বসে গাড়ি ছেড়ে দিল। একবার মনে হলো, ঘুমের ঘোরে দুঃস্বপ্ন দেখছি না তো? গায়ে চিমটি কেটে দেখলাম, না ঠিকই তো আছি! হঠাৎ আবার দেখা গেল সেই নীলচে আলোটা। এবার একেবারে গাড়ির পাশেই। তীব্র উজ্জ্বল আলোয় পরিষ্কার দেখা গেল চালক আর ঘোড়াগুলোকে। মুহূর্তে গাড়ি থেকে নেমে কয়েকটা পাথর কুড়িয়ে নিয়ে আলোটাকে তাড়া লাগাল আগন্তুক।
যে কোনো প্রকার আলোর সামনে কোনো মানুষ দাঁড়ালে তা তার শরীরের আড়ালে ঢাকা পড়ে যেতে বাধ্য, অথচ আশ্চৰ্য, এ ক্ষেত্রে কিন্তু তা ঘটল না। নীল আলোটার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল আগন্তুক, কিন্তু তার শরীরের আড়ালে ঢাকা পড়ল না আলোর শিখা। আগন্তুকের এপাশে বসে আগের মতোই পরিষ্কার আলোর শিখাটা চোখে পড়ছে আমার। আগন্তুক যেন রক্ত-মাংসের মানুষ না, হালকা কাঁচের তৈরি। এমন অদ্ভুত ব্যাপার দেখা তো দূরের কথা, কখনও কল্পনাও করিনি আমি। একটা শিরশিরে আতঙ্কে নিজের অজান্তেই শিউরে উঠলাম।
কয়েক সেকেন্ড পরই দপ করে নিভে গেল নীল আগুনের শিখা, আর জ্বলল না। ফিরে এসে গাড়ি ছেড়ে দিল আগন্তুক। ওদিকে চারদিক ঘিরে আরও এগিয়ে এসেছে নেকড়ের গর্জন। বেশ কিছুক্ষণ একভাবে চলার পর গাড়ি থেকে নেমে কোথায় যেন চলে গেল আগন্তুক। সে চলে যেতেই আতঙ্কে থর থর করে কাঁপতে লাগল ঘোড়াগুলো। কারণটা বুঝতে পারলাম না।
হঠাৎ খেয়াল করলাম নেকড়ের ডাক থেমে গেছে। দেবদারুর বন আর পাহাড়ের মাথার ওপরের কালো মেঘের ফাঁক থেকে হঠাৎ করেই বেরিয়ে এলো চাঁদ। জীবনে চাঁদের বহু রূপ দেখেছি, কিন্তু সেদিনের রূপের সাথে সম্পূর্ণ অপরিচিত আমি। অদ্ভুত এক ছায়া ছায়া ভৌতিক আলো ছড়িয়ে পড়েছে দেবদারুর মাথায় আর পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায়। সেই আবছা চাঁদের আলোতেই চোখে পড়ল জানোয়ারগুলো। ধূসর লোমশ শরীর, ঝকঝকে সাদা দাঁতের ফাঁক থেকে বেরিয়ে আসা টকটকে লাল জিভ আর পেশল শরীর নিয়ে আমাদের চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার নেকড়ে। ভাবভঙ্গি দেখে মনে হলো, যে কোনো মুহূর্তে আক্রমণ করে বসতে পারে ওরা। সত্যি কথা বলতে কি, জীবনে এত ভয় পাইনি আমি কখনও।
হঠাৎ কানে তালা লাগানো শব্দ করে একসঙ্গে ডেকে উঠল সব ক’টা নেকড়ে। আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল ঘোড়াগুলো। বহু আগেই গাড়ি ফেলে যে যেদিকে পারত ছুট লাগাত ঘোড়াগুলো, কিন্তু চারপাশ থেকে ঘিরে আছে নেকড়ের দল। কোনো দিকে যাবার পথ নেই, তাই যেতে পারছে না।
পাগলের মতো চেঁচিয়ে আগন্তুককে ডাকতে শুরু করলাম আমি। হঠাৎ রাস্তার একপাশে চোখ পড়তেই দেখলাম সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আগন্তুক। কোনো ভাবান্তর নেই তার মধ্যে। আরও কয়েক মুহূর্ত ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল আগন্তুক, তারপর দু’হাত সামনে বাড়িয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে নাড়াতে লাগল, বোধহয় দূর হয়ে যেতে বলছে হতচ্ছাড়া নেকড়েগুলোকে। চোখের সামনে দেখলাম লোকটার হাতের ইশারায় গর্জাতে গর্জাতেই পিছিয়ে যাচ্ছে নেকড়ের দল। আর ওদের সাথে তাল রেখেই বোধহয় যেমনি আচমকা বেরিয়ে এসেছিল তেমনি আবার মেঘের ফাঁকে ঢুকে গেল চাঁদ। আবার নিকষ কালো অন্ধকারে ঢেকে গেল চারদিক।
টের পেলাম গাড়িতে উঠে বসেছে আগন্তুক। চলতে শুরু করল গাড়ি। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ আগের অদ্ভুত ঘটনাটা মন থেকে তাড়াতে পারলাম না কিছুতেই। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তৃষ্ণায় ফেটে যাচ্ছে বুকের ছাতি। আতঙ্কে ঠক ঠক করে কাঁপছে হাত-পা। বিমূঢ়ের মতো বসে বসে আকাশ পাতাল ভাবতে থাকলাম।
এভাবে কতক্ষণ কেটে গেল বলতে পারি না। হঠাৎ গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়তেই চমক ভাঙল। বিশাল এক প্রাসাদ-দুর্গের আঙিনায় এসে দাঁড়িয়েছে গাড়ি। বিশাল প্রাসাদের তেমনি বিশাল সব জানালার কোথাও আলোর চিহ্নমাত্র চোখে পড়ল না। কখন যে আবার মেঘের ফাঁক থেকে বেরিয়ে এসেছে চাঁদ, খেয়াল করিনি। সেই চাঁদের আলোয় দুর্গের মাথায় প্রাচীন কামান বসানোর খাঁজ-কাটা ভাঙা ফোকরগুলো চোখে পড়ছে। কাউন্ট ড্রাকুলার প্রাসাদ-দুর্গে এসে পৌঁছুলাম শেষ পর্যন্ত।

বিশাল প্রাঙ্গণে এসে গাড়ি থামতেই লাফিয়ে নিচে নামল আগন্তুক। গাড়ির দরজা খুলে হাত ধরে আমাকে নামতে সাহায্য করল সে। দ্বিতীয় বারের মতো সেদিন অনুভব করলাম তার হাতের ইস্পাত কঠিন আঙুলের শক্তি। সুটকেসটা গাড়ি থেকে নামিয়ে আনল সে। তীক্ষ্ণ লোহার পেরেক গাঁথা ভারি প্রকাণ্ড দরজাটার সামনে দাঁড়িয়ে কালের কষাঘাতে জর্জরিত রুক্ষ পাথরের দেয়ালগুলো দেখতে লাগলাম। সুটকেসটা আমার পাশে নামিয়ে রেখে আবার গিয়ে গাড়িতে উঠল আগন্তুক, তারপর গাড়িটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকেই।
আবছা অন্ধকারে বিশাল এক ভৌতিক বাড়ির প্রাঙ্গণে ভূতের মতোই দাঁড়িয়ে থাকলাম আমি। কি করব বুঝতে পারছি না। ঘণ্টা জাতীয় কিছু নেই দরজায়, থাকলে তা বাজিয়ে লোকদের ডাকা যেত। চেঁচিয়েও লাভ নেই, কারণ সারা জীবন এখানে দাঁড়িয়ে চেঁচালেও এই নিরেট পাথরের দেয়াল ভেদ করে আমার কণ্ঠস্বর ওপারে গিয়ে পৌঁছুবে না। ক্রমেই নানা রকম সন্দেহ আর ভয় বাসা বাঁধতে শুরু করেছে মনে। এ কোথায় এসে পড়লাম? কি দরকার ছিল এই সৃষ্টিছাড়া অভিযানের? একজন আইনজীবীর অধীনস্থ কেরানির পক্ষে বহু দূরে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বাস করা একজন বিদেশির কাছে লন্ডনের সম্পত্তি কেনার ব্যাপারে আলাপ আলোচনা করতে আসা কি একটু বাড়াবাড়ি নয়? আসলে আমার এই কেরানিগিরিটাকে মিনা কোনোদিনই ভালো চোখে দেখতে পারেনি। প্রায় জোর করে আমাকে দিয়ে এল. এল. বি. পরীক্ষাটা দিইয়েছিল মিনা, এখানে আসার ঠিক আগের দিন জানতে পেরেছি ভালোমতোই পাস করেছি পরীক্ষায়। ইচ্ছে আছে, এখান থেকে ফিরে গিয়ে পুরোদস্তুর উকিল হয়ে বসব। কিন্তু যে ভূতুড়ে এলাকায় এসে ঢুকেছি, আদৌ কোনোদিন লন্ডনে ফিরে যেতে পারব কি না কে জানে।
কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সাত পাঁচ ভাবছিলাম জানি না। হঠাৎ দরজার ওপারে কার ভারি পায়ের শব্দে চমকে উঠে বাস্তবে ফিরে এলাম। কপাটের ফাঁক দিয়ে আসা অস্পষ্ট আলোও চোখে পড়ছে এখন। দু’এক সেকেন্ড পরই কপাটের ওপারে লোহার ভারি খিল খোলার শব্দ শোনা গেল। তারপর বহুদিনের না খোলা মরচে ধরা তালা খোলার শব্দ। পরক্ষণেই বিশ্ৰী ঘড় ঘড় আওয়াজ করে খুলে গেল ভারি লোহার পাল্লা।
গলা থেকে পা পর্যন্ত কালো আলখাল্লায় ঢেকে দাঁড়িয়ে আছেন একজন দীর্ঘকায় বৃদ্ধ। হাতে ধরা প্রাচীন আমলের চিমনিবিহীন রূপোর বাতিদানে বসানো মোমের আলোয় প্রথমেই চোখে পড়ল তাঁর নাকের নিচের ধবধবে সাদা পুরু গোঁফ আর পরিষ্কার কামানো চিবুক। ডান হাতটা সামনে বাড়িয়ে আন্তরিকতার সুরে পরিষ্কার ইংরেজিতে আমায় আমন্ত্রণ জানালেন বৃদ্ধ, “আপনার জন্যে সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি আমি। আসুন।”
সুটকেসটা তুলে নিয়ে এগিয়ে গেলাম। জোর করে আমার হাত থেকে সুটকেসটা নিয়ে নিলেন বৃদ্ধ, তারপর ইঙ্গিতে এগিয়ে যেতে বললেন। বলেই কি মনে করে, বোধহয় এতক্ষণ হাত মেলাতে মনে ছিল না বলে একটু লজ্জিত ভাবেই আমার ডান হাতটা চেপে ধরলেন তিনি। চমকে উঠলাম। বহুক্ষণ আগে মরে যাওয়া মানুষের মতো ঠান্ডা ওঁর হাত। আমার চমকে ওঠাটা বৃদ্ধের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। মৃদু হেসে বললেন তিনি, “দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। ওপরে চলুন।”
আমার হাত চেপে ধরা আর ঝাঁকুনি দেয়ার ভঙ্গি দেখে চকিতে আগন্তুকের কথা মনে পড়ে গেল আমার। সেই আগন্তুক ভদ্রলোক আর এই বৃদ্ধ একই লোক নয়তো? কথাটা কেন মনে এলো বুঝতে পারলাম না, কিন্তু কেন যেন মনে হতে লাগল দু’জন একই লোক। হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলাম, “আপনি কি কাউন্ট ড্রাকুলা?”
“ঠিক ধরেছেন,” বিনয়ে বিগলিত ভঙ্গিতে মাথা নোয়ালেন বৃদ্ধ, “আমিই কাউন্ট ড্রাকুলা।” বলেই সচকিত হয়ে উঠলেন কাউন্ট, “এখন চলুন তো। বাইরে এই প্ৰচণ্ড ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে না থেকে ঘরে চলুন, সেখানেই আপনার সব প্রশ্নের জবাব পাবেন। তাছাড়া পথশ্রমে নিশ্চয়ই আপনি ক্লান্ত। খাওয়া এবং বিশ্রামেরও দরকার আছে আপনার।”
বলতে বলতেই পাশের দেয়ালের তাকে বাতিদানটা রেখে দিয়ে চওড়া ঘোরানো সিড়ি বেয়ে তর তর করে ওপরে উঠতে শুরু করলেন কাউন্ট। কয়েক তলা উঠে লম্বা টানা বারান্দা। নিঝুম নিস্তব্ধ বারান্দায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আমাদের পায়ের ভারি শব্দ। বারান্দার শেষ প্রান্তে একটা ভারি দরজা ঠেলে খুলে আমাকে ভেতরে ঢুকতে আহ্বান জানালেন কাউন্ট। ঘরের ভেতরে ঢুকেই খুশি হয়ে উঠল মনটা। আলোয় ঝলমল করছে বিশাল কক্ষটা। বিশাল একটা ডাইনিং টেবিল রাখা আছে ঘরের মাঝখানে। ঘরের কোণের বিরাট ফায়ারপ্লেসে জ্বলছে গনগনে আগুন।
আমি ঢুকতেই সুটকেসটা নামিয়ে রেখে দরজা বন্ধ করে দিলেন কাউন্ট। এগিয়ে গিয়ে ঘরের অন্য পাশের দরজাটা খুললেন। দরজা খুলতেই চোখে পড়ল জানালাশূন্য ছোট্ট একটা আটকোনা ঘর, একটি মাত্র মোমবাতি জ্বলছে সে ঘরে। সে ঘরটাও পেরিয়ে গিয়ে অন্যপাশের দরজাটা খুললেন কাউন্ট, তারপর ইঙ্গিতে ডাকলেন আমাকে। তৃতীয় ঘরটায় গিয়ে ঢুকলাম। চমৎকার করে সাজানো ঘরটা। খাট, ফায়ারপ্লেস ইত্যাদি বেশ কায়দা করে জায়গামতো রাখা হয়েছে। নিজে গিয়ে প্ৰথম ঘরটা থেকে আমার সুটকেসটা বয়ে আনলেন কাউন্ট। সেটা জায়গামতো রাখতে রাখতে বললেন, “বাথরুমে গিয়ে ভালোমতো হাত-মুখ ধুয়ে নিন, চাইলে গোসলও সেরে নিতে পারেন। গরম পানি আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই আছে ওখানে। কাজ শেষ করে সোজা ডাইনিং রূমে চলে আসুন। আমি অপেক্ষা করব সেখানে,” বলেই দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে চলে গেলেন কাউন্ট।
কাউন্টের ব্যবহারে সন্দেহ ও আশঙ্কার আর লেশমাত্র থাকল না আমার মনে। মনটা স্বাভাবিক হয়ে আসতেই চেগিয়ে উঠল খিদে। তাড়াতাড়ি কাপড় বদলে হাত-মুখ ধুয়ে ডাইনিং রূমে গিয়ে ঢুকলাম। ফায়ারপ্লেসের একপাশে পাথরের দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কাউন্ট। আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই রাশি রাশি খাবার সাজানো ডাইনিং টেবিলের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “নিশ্চয়ই খেদে পেয়েছে খুব? আপনি আসার আগেই খেয়ে নিয়েছি আমি। সুতরাং অযথা দেরি না করে বসে পড়ুন।”
খাওয়ার টেবিলে বসে পড়ে প্রথমে মিস্টার হকিন্সের কাছ থেকে নিয়ে আসা চিঠিটা পকেট থেকে বের করে কাউন্টের দিকে বাড়িয়ে ধরলাম আমি। চিঠিটা আমার হাত থেকে নিয়ে খুলে পড়তে শুরু করলেন কাউন্ট। পড়া শেষ হতেই নিঃশব্দ হাসিতে ভরে গেল কাউন্টের মুখ। চিঠিটা পড়ে দেখার জন্যে আমার দিকে এগিয়ে এলেন তিনি। চিঠির শেষের খানিকটা পড়ে আমার মনটাও অত্যন্ত খুশি হয়ে উঠল। হকিন্স লিখেছেন, “...হঠাৎ বাতে আক্রান্ত হয়ে পড়ায় আমি নিজে আপনার সাহায্যে হাজির হতে পারলাম না বলে দুঃখিত। কিন্তু যাকে পাঠাচ্ছি তাকেও নির্দ্বিধায় আমার আসনে স্থান দিতে পারেন। আমার কাজের জন্যে ওর মতো যোগ্য লোক আর খুঁজে পাইনি আমি। আপনার প্রাসাদে থাকাকালীন আপনার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার নির্দেশ আমি দিয়ে দিয়েছি ওকে, অতএব কাজ উদ্ধারের ব্যাপারে যেভাবে খুশি ব্যবহার করতে পারেন...”
আমার পড়া শেষ হতেই এগিয়ে এসে প্লেটের ঢাকনা তুলে দিয়ে আমাকে খেতে তাড়া লাগালেন কাউন্ট। চমৎকার রান্না করা মুরগির রোস্ট, সালাদ, পনির আর এক বোতল পুরানো টোকয় মদ দিয়ে খাওয়া সেরে নিলাম। খাওয়ার পর আমার সাথে গল্প করতে বসলেন কাউন্ট। কাউন্টের অনুরোধেই চেয়ারটা ফায়ারপ্লেসের সামনে টেনে এনে তার মুখোমুখি বসলাম আমি। পকেট থেকে চুরুটের বাক্স বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলেন কাউন্ট। আমি একটা টেনে নিতেই বাক্সটা বন্ধ করে পুরো বাক্সটাই আমাকে দিয়ে দিলেন তিনি। আমি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চাইতেই মৃদু হেসে জানালেন ধূমপানে অভ্যস্ত নন কাউন্ট। তাঁর মেহমানদারীতে সত্যিই মুগ্ধ হয়ে গেলাম আমি। অতিথির আদর আপ্যায়নে কোনো দিকেই ত্রুটি রাখেননি তিনি।
চুরুটে টান দিতে দিতে কাউন্টের চেহারা ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম আমি। সম্ভ্রান্ত চেহারা, দেখলেই বোঝা যায় কাউন্ট হবার সম্পূর্ণ যোগ্যতা আছে এ লোকের। ভরাট মুখে রাজ্যের গাম্ভীৰ্য, বলিষ্ঠ চিবুক, ঈগলের ঠোঁটের মতো বাঁকানো নাক, চওড়া ঢালু কপাল যেন পাথর কুঁদে বের করে আনা হয়েছে। আশ্চর্য ঘন কালো ভুরু, আব মাথায় ঝাঁকড়া চুল। চুল আর ভুরু ঘন কালো অথচ গোঁফ সম্পূর্ণ সাদা, ভারি অদ্ভুত ব্যাপার তো!
টুকটুকে লাল ঠোঁটের প্রান্ত ঠেলে একটু সামনের দিকে বেরিয়ে এসেছে ঝকঝকে সাদা তীক্ষ্ণ দাঁত, এটাও কেমন যেন বেখাপ্পা লাগল আমার কাছে। পাতলা কানের আগাদুটো ছুঁচালো হয়ে উঠে গেছে। সব মিলিয়ে আমার মনে হলো এ পৃথিবীর মানুষ নন কাউন্ট, এখানে বাস করা যেন তাঁর সাজে না। কথাটা কেন মনে হলো বুঝতে পারলাম না।
হাঁটুর ওপর রাখা কাউন্টের হাতের বেঁটে রুক্ষ আঙুলগুলোর দীর্ঘ নখগুলো দু’পাশ থেকে কেটে তীক্ষ্ণ করা। হঠাৎ তাঁর হাতের তালু দুটো উল্টাতেই একটা জিনিস দেখে চমকে উঠলাম, দু’হাতের তালুতেই কয়েক গোছা করে চুল। ভারি অদ্ভুত তো! কথা বলার জন্যে আমার দিকে একটু ঝুঁকে আসতেই ওঁর দিক থেকে মুখ সরিয়ে নিলাম আমি। নিঃশ্বাসে ওঁর বোঁটকা পচা গন্ধ। কোনো মানুষের নিঃশ্বাসে অমন পচা গন্ধ থাকতে পারে ভাবিনি কখনও। আমার মুখ বাঁকানো দেখে মুচকে হাসলেন কাউন্ট। হাসার সময় স্পষ্ট দেখা গেল দু’পাশের ঠেলে বেরিয়ে আসা দাঁত।
হঠাৎ চারদিকের নিঃসীমা নিস্তব্ধতাকে খান খান করে দিয়ে উপত্যকার দিক থেকে ভেসে এলো হাজারো নেকড়ের চাপা হিংস্র গর্জন। নিজের অজান্তেই শিউরে উঠে জানালার দিকে চাইতেই দেখলাম বাইরে শেষ হয়ে আসছে রাত। ইতিমধ্যেই ফিকে হতে শুরু করেছে নিকষ কালো অন্ধকার। নেকড়ের গর্জন শুনে চাপা উত্তেজনায় জ্বলজ্বল করে উঠল কাউন্টের দু’চোখ। আবেগ জড়িত গলায় বললেন তিনি, “শুনেছেন কেমন সুন্দর গান গাইছে ওরা? গাইবেই তো, আসলে ওরা যে আঁধারের সন্তান।”
তাঁর কথায় আমার চোখে মুখে বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠতেই মৃদু হেসে বললেন কাউন্ট, “আসলে সবাই সব কিছু বোঝে না। তাছাড়া আপনারা শহুরে মানুষ, কিসে শিকারীর আনন্দ তা আপনাদের পক্ষে বোঝা অসম্ভব।” বলেই উঠে দাঁড়ালেন তিনি, “ভোর হয়ে আসছে। ভুলেই গিয়েছিলাম পথশ্রমে আপনি ক্লান্ত। যান, আর দেরি না করে, শুয়ে পড়ুনগে। একটা বিশেষ কাজে বাইরে যেতে হচ্ছে আমাকে। তাই সাঁঝের আগে দেখা পাবেন না আমার।” নিজেই এগিয়ে গিয়ে আমার শোবার ঘরের দরজা মেলে ধরলেন কাউন্ট। আমি ঘরে ঢুকতেই দরজাটা ভেজিয়ে দিলেন তিনি। হঠাৎ নিঃসীম একাকীত্বে পেয়ে বসল আমাকে। অকারণেই ছমছম করে উঠল গা। মন বলছে ভয়ঙ্কর কোনো ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছি আমি।
৭ মে।
জানালার দিকে চাইতেই দেখলাম অন্ধকার ফিকে হতে শুরু করেছে। ব্যাপার কি? একদিনে দু’বার ভোর হতে পারে না। হঠাৎ বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা। এক কাক ভোরে ঘুমিয়ে আরেক কাক ভোরে জেগে উঠেছি আমি। মাঝখানে পার হয়ে গেছে পুরো একটা দিন আর রাত। বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলাম। কাপড় জামা পাল্টে নিয়ে ডাইনিং রূমে এসে ঢুকতেই টেবিলে সাজানো নাস্তার দিকে চোখ পড়ল। এক পাশে ঢাকা দেয়া কফির পাত্র। এগিয়ে গিয়ে ঢাকনা খুলতেই বাষ্প বেরিয়ে এলো কফির পাত্র থেকে। বোধহয় মিনিট খানেকও হয়নি পাত্রটা রেখে গেছে কেউ। টেবিলে রাখা বাতিদানে মোমবাতি জ্বলছে। তার একপাশে পেপার ওয়েট দিয়ে চেপে রাখা এক টুকরো কাগজের দিকে চোখ পড়ল। তাতে কি যেন লেখা। এগিয়ে গিয়ে কাগজটা তুলে নিয়ে পড়লাম : “জরুরি কাজে বাইরে যেতে হচ্ছে আমাকে। আপনাকে একা একা নাস্তা সারতে হচ্ছে বলে দুঃখিত। —ড্রাকুলা।”
একা একাই নাস্তা সেরে নিলাম। একটা ব্যাপার বড় আশ্চর্য লাগল। এত বড় বাড়িটা এত নিঝুম কেন? চাকর-বাকর বা অন্য কোনো লোকজন নেই নাকি? চাকরদের ডাকার জন্যে ঘণ্টী-টন্টি জাতীয় কিছু পাওয়া যায় কিনা খুঁজতে শুরু করলাম, কিন্তু সে রকম কিছুই চোখে পড়ল না।
খুঁজতে খুঁজতে বাড়িটার অফুরন্ত প্রাচুর্য চোখে পড়ল। টেবিলে রাখা প্ৰত্যেকটা বাসন পেয়ালা খাঁটি সোনার তৈরি। এত সুন্দর কারুকাজ করা তৈজসপত্র আজকের দিনে দুর্লভ। আমার বেডরুমের দরজা জানালার পর্দা আর সোফার কভারগুলো অপূর্ব সুন্দর আর দুর্লভ মখমলের তৈরি। দেখেই বোঝা যায় কয়েক শতাব্দী আগে তৈরি হয়েছে এসব, অথচ এখনও কি আশ্চর্য সুন্দর আর ঝলমলে। ঘরের কোথাও আয়না জাতীয় কিছু চোখে পড়ল না। এটাও আশ্চর্য। এত বড় বাড়ি আর প্রাচুর্যের মধ্যে চাকর-বাকর না থাকার মতোই কাঁচ না থাকাও কেমন যেন বেমানান।
এখনও ভালো করে ভোরের আলো ফোটেনি। এসময় বাইরে বেরোনো যাবে না, আর কাউন্টের বিনা অনুমতিতে বাইরে বেরোনো উচিত হবে না।
পড়ার মতো বই-টই পাওয়া যায় কিনা খুঁজতে শুরু করলাম। ছোট্ট আটকোনা ঘরের তৃতীয় দরজা ঠেলা দিতেই খুলে গেল। দরজার ওপাশে বেশ বড় একটা ঘর। হ্যাঁ, পড়ার ঘরই। দেয়াল-জোড়া ব্লক-কেসগুলো চামড়ায় বাঁধানো অজস্র বইয়ে ঠাসা। প্ৰায় সব বিষয়ের ওপরেই বই আছে সেখানে। অধিকাংশই ইংরেজি। আর আছে আইনের বই। বইগুলো দেখে খুশি হয়ে উঠল মনটা। ডুবে গেলাম বইগুলোর মধ্যে। বাড়ছে বেলা।
গভীর মনোযোগের সাথে বইগুলো দেখছি, এমন সময় দরজা ঠেলে ঘরে এসে ঢুকলেন কাউন্ট। বইয়ের প্রতি আমার আগ্রহ দেখে বললেন, “চমৎকার, মি. হারকার। আপনিও দেখছি আমার মতোই বইয়ের পোকা।” একটু থেমে আবার বললেন, “একটা জিনিস খেয়াল করেছেন? বইগুলোর বেশিরভাগই ইংরেজি। আসলে ইংরেজি আর ইংরেজদের আমার দারুণ ভালো লাগে। আমার জীবনের একটা বড় ইচ্ছা লন্ডনে বাড়ি করে স্থায়ীভাবে সেখানে বসবাস করব, তাই ইংরেজিটা মোটামুটি ভালোই আয়ত্ত করে নিয়েছি...”
বাধা দিয়ে বললাম, “মোটামুটি বলছেন কি, কাউন্ট? আপনি তো ইংরেজদের মতোই ইংরেজি বলতে পারেন।”
“আসলে বাড়িয়ে বলছেন আপনি। তবে হ্যাঁ, গ্রামারটা ভালো মতোই আয়ত্ত করে নিয়েছি। আর কাজ চালানো যায় এমন কিছু ইংরেজি শব্দও জানা আছে আমার।”
“খামোকা বিনয় দেখাচ্ছেন, কাউন্ট। আমার মতো যে কেউই বলবে চমৎকার ইংরেজি জানেন আপনি।”
“তবুও আপনার কাছে ভাষাটা আর একটু ঝালিয়ে নিতে চাই আমি।”
“অবশ্যই, আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করব আমি। তবে শেখার বাকি নেই খুব একটা।” বিষয়টাকে চাপা দেবার জন্যেই বললাম, “আচ্ছা, কাউন্ট, আপনার প্রাসাদের ঘরগুলো দেখতে কোনো অসুবিধে আছে কি?”
“অসুবিধে! কিসের অসুবিধে? স্বচ্ছন্দে প্রাসাদের ভেতরে যেখানে আপনার খুশি যেতে পারেন আপনি। তবে একটা কথা, তালা দেয়া ঘরগুলোতে ভুলেও ঢোকার চেষ্টা করবেন না। কারণটা ঠিক বোঝাতে পারব না আপনাকে। তবে এটুকু বলছি, অহেতুক কৌতূহল প্রকাশ করবেন না।”
মনে মনে আশ্চর্য হলেও মুখে বললাম, “তা আপনি যা বলেন।”
“আমার কথায় অবাক হবেন না। ট্রানসিলভেনিয়ায় যখন এসেছেন নতুন অনেক কিছুই দেখতে পাবেন, জানতে পারবেন। অবশ্য ইতিমধ্যেই অদ্ভুত অনেক কিছু নিশ্চয়ই দেখে ফেলেছেন আপনি।”
আরও আশ্চর্য হলাম। ইতিমধ্যেই কিছু দেখেছি তা কাউন্ট জানলেন কি করে? একটানা বকবক করে চললেন কাউন্ট। প্রাসাদ-দুর্গ এবং আশেপাশের এলাকা সম্পর্কে তাকে কিছু প্রশ্ন করলাম, অনেক প্রশ্নের জবাবই কৌশলে এড়িয়ে গেলেন তিনি। দ্বিধায় ভুগতে ভুগতে এক সময় জিজ্ঞেসই করে ফেললাম, “একটা কথা কিছুতেই মন থেকে তাড়াতে পারছি না, কাউন্ট। সেদিন রাতে ঘোড়ার গাড়িতে করে আসার সময় একটা অদ্ভুত নীল আলো চোখে পড়েছিল আমার। এ সম্পর্কে আপনার কিছু জানা আছে কি?”
“আছে,” মুচকি হাসলেন কাউন্ট, “এখানকার লোকদের ধারণা বছরের বিশেষ একটা দিনে মাঝ রাতের পর সমস্ত প্ৰেতাত্মারা জেগে ওঠে। ধন-রত্নের পাহারাদার প্ৰেতাত্মারা যেখানে থাকে সেখানে জ্বলতে শুরু করে ওই অদ্ভুত নীল আলো। আসলে ওদের গা থেকেই বেরোয় ওই আলোর ছটা।”
“আশ্চর্য!”
“হ্যাঁ, তাই। গতকালই গেছে সেই বিশেষ দিনটি। যেসব এলাকা পার হয়ে এসেছেন আপনি, সেসব এলাকার মাটির নিচে প্রাচীন ধন ভাণ্ডার চাপা পড়ে থাকা খুবই স্বাভাবিক। যুদ্ধের আগে ট্রানসিলভেনিয়ার সমস্ত ধনী ব্যক্তিরা ওই এলাকার পাশেই বসবাস করত।”
“ওই নীল আলো সম্পর্কে এখানকার লোকেরা জানে, বোধহয় দেখেও থাকবে কেউ কেউ। তা সত্ত্বেও ওই গুপ্তধন এতদিন অনাবিষ্কৃত থাকল কি করে?”
জোরে শব্দ করে হাসলেন কাউন্ট। আলোর ছটা ঝিক করে উঠল দু’পাশের তীক্ষ্ণধার দাঁত দুটোয়। হাসিটা স্তিমিত হয়ে এলে বললেন, “আগেই বলেছি, নীলচে আলো দেখা যায় শুধু বছরের বিশেষ একটা রাতে। ওই রাতে দরজায় শক্ত করে খিল এঁটে ঘরে বসে ইষ্ট নাম জপ করতে থাকে এ এলাকার ভীত গেঁয়ে মানুষের দল। ভুলেও ঘরের বাইরে পা বাড়াতে সাহস করে না ওরা। আর যদি ঘরের ফাঁক ফোকর দিয়ে কেউ দেখেও ফেলে ওই আলো তাহলেও চোখের ভুল বলে ভুলে যেতে চেষ্টা করে। আসলে আলো দেখা যাওয়া জায়গার ত্রিসীমানায় দিনের বেলাতেও ঘেঁষতে চায় না কেউ।”
“বুঝলাম।”
প্রসঙ্গ বদলে অন্য কথায় চলে গেলেন কাউন্ট। বললেন, “যে জন্যে আপনার এখানে আসা সে সম্পর্কেই তো এখন জানা হলো না কিছু। আমার কেনার জন্যে নির্দিষ্ট করা বাড়িটা সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?”
“আসছি,” বলে সোজা নিজের ঘরে চলে এলাম। সুটকেস থেকে প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্ৰ বের করে নিয়ে আবার পড়ার ঘরে এসে ঢুকলাম। ছোট্ট টেবিলটার সামনের সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে এখন ব্রাডসর গাইডের পাতা উল্টাচ্ছেন কাউন্ট। তার পাশে একটা সোফায় বসে পড়ে দলিলের নকল, টাকার হিসেব-পত্র সব বুঝিয়ে বললাম। বাড়ির পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং প্রতিবেশীদের সম্পর্কে আমাকে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করলেন তিনি। মনে হলো সব শুনে সন্তুষ্ট হয়েছেন কাউন্ট। স্পষ্টই বোঝা গেল চারধারে উঁচু পাথরের দেয়াল দিয়ে ঘেরা কুড়ি একর জমির ওপর গাছপালায় ছাওয়া আর গির্জাওয়ালা বহু পুরানো লন্ডনের ওই নির্জন বাড়িটা কিনতে পেরে খুশি হয়েছেন তিনি। কাউন্টের কথায় মনে হলো নিৰ্জনতা আর ছায়া ছায়া অন্ধকারে একা বসে বসে ভাবতে ভালো লাগে ওঁর। কারণটা কি? সাংঘাতিক কোনো মানসিক আঘাত পেয়েছেন জীবনে? কাউন্টকে দেখার পর থেকে ওঁর কথা বলার ধরন-ধারণ মোটেই ভালো লাগছে না আমার, আর ওঁকে হাসতে দেখলেই চমকে উঠি, কেমন যেন ভয়ঙ্কর মনে হয় হাসিটা। বুঝতে পারছি না কিসের সাথে এর তুলনা করা চলে।
কি মনে হতেই হঠাৎ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন কাউন্ট, যাবার আগে পেছন থেকে টেনে দরজা বন্ধ করে দিয়ে গেলেন। সেদিকে একবার চেয়ে আবার বইগুলোর দিকে মনোনিবেশ করলাম আমি। একটা পাতলা কিন্তু বড় আকারের বইয়ের দিকে হঠাৎ চোখ পড়ল আমার। দেখে মনে হলো গত কিছুদিন ধরে বইটা বড় বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। তাক থেকে টেনে নিলাম বইটা। একটা ওয়ার্ল্ড ম্যাপ। বইয়ের এক জায়গায় পাখির পালক গুঁজে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। পালক গোঁজা পাতাটা খুলে দেখলাম সেটা ইংল্যান্ডের মানচিত্র। মানচিত্রের গায়ে কয়েকটা জায়গায় লাল-নীল পেন্সিল দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম জায়গাগুলো। লন্ডনের পুবদিকে যেখানে ওঁর নতুন বাড়িটা কেনার কথাবার্তা চলছে তার কাছাকাছিই একটা জায়গা চিহ্নিত করা। দ্বিতীয়টা এগজিটার এবং তৃতীয়টা ইয়র্কশায়ার উপকূলের হুইটবি এলাকার কাছাকাছি কোনো এক জায়গায়।
কয়েক ঘণ্টা পর আবার ফিরে এলেন কাউন্ট। বললেন, “সেরেছে, সারা রাত এভাবেই কাটাবেন নাকি! কখন রাত হয়ে গেছে খেয়াল নেই বুঝি? খেতে যেতে হবে না? আসুন, জলদি খেয়ে নিন।’
কাউন্টকে অনুসরণ করে ডাইনিং রূমে এসে ঢুকলাম। হাত ধরে ডাইনিং টেবিলের সামনে একটা চেয়ারে আমাকে বসিয়ে দিয়ে ফায়ারপ্লেসের কাছের চেয়ারটায় বসলেন কাউন্ট। বিনীত ভঙ্গিতে বললেন, “আজও একাই খেতে হচ্ছে আপনাকে। আমি বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি।”
আমার খাওয়া শেষ হলে গত রাতের মতোই একটানা বকবক করে চললেন কাউন্ট। সময় সম্পর্কে আমাদের কারোরই কোনো খেয়াল থাকল না। হঠাৎ হিমেল হাওয়ায় ভর করে দূরের কোথাও থেকে ভেসে এলো মোরগের ডাক। ভোর হয়ে আসছে তার জানান দিচ্ছে ওরা। রীতিমতো চমকে উঠলেন কাউন্ট। লাফ দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “ছিঃ ছিঃ, ভোর হয়ে গেছে। সারাটা রাত আপনাকে আটকে রাখা আমার সত্যিই অন্যায় হয়েছে। আসলে ইংল্যান্ডের কথা এসে পড়ায়ই এমনটা ঘটল। ইংল্যান্ড সম্পর্কে আলোচনা করতে দারুণ ভালো লাগে আমার। যান, আর দেরি না করে শুয়ে পড়ুনগে,” বলেই দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন কাউন্ট।
নিজের ঘরে ফিরে এলাম। জানালার ভারি পর্দাটা সরিয়ে ফেলতেই খোলা আকাশের দিকে চোখ পড়ল। দ্রুত রং বদলাচ্ছে রাতের আকাশ। ইতিমধ্যেই আঁধার কেটে গিয়ে ধূসর হতে শুরু করেছে চারদিক। সারাটা রাত কেটে গেল অথচ এখনও ঘুমের লেশমাত্র নেই আমার চোখে। তাই আবার পর্দাটা টেনে দিয়ে এসে লিখতে বসলাম।
৮ মে।
কাউন্টের প্রাসাদ-দুর্গের কিছু কিছু জিনিস অত্যন্ত রহস্যময় বলে মনে হচ্ছে আমার। প্রাসাদে পৌঁছে কাউন্টের সৌজন্যতায় প্রথমে মনে হয়েছিল এখানে আমি নিরাপদ, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তা নয়। সারাটা প্রাসাদে একমাত্র কাউন্ট ছাড়া এ পর্যন্ত অন্য কোনো মানুষের ছায়াও চোখে পড়েনি আমার। কাউন্টের ব্যবহারও কেমন যেন অদ্ভুত। দিনের বেলায় ভুলেও দেখা পাওয়া যায় না তাঁর। কোথায় যান, কি করেন বুঝতে পারছি না।
অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটেছে আজ। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একটানা ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। সন্ধ্যার পর ঘুম থেকে উঠে সঙ্গে করে আনা ছোট আয়নাটা আর দাড়ি কামাবার সরঞ্জাম বের করে নিয়ে জানালার সামনে বসে দাড়ি কামাবার জোগাড় করছি। সবে কামাতে শুরু করেছি এমন সময় কাঁধের ওপর কারও হাতের কঠিন চাপ অনুভব করলাম। ঘুরে তাকাতে যাব এমন সময় কনের কাছে বেজে উঠল কাউন্টের ভারি গলার আওয়াজ, “গুড ইভনিং, মি. হারকার।”
ঠিক আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন কাউন্ট, অথচ আয়নায় তার প্রতিবিম্ব দেখতে পাচ্ছি না আমি। ঘরে ঢোকার সময় তার পায়ের শব্দও আমার কানে যায়নি। ব্যাপারটা কি করে সম্ভব?
আয়নায় কাউকে দেখতে না পেয়ে ফিরে চাইলাম। যা ভেবেছিলাম, ঠিক আমার পেছনেই দাঁড়িয়ে আছেন কাউন্ট। সারাটা ঘর এবং ঘরের সমস্ত জিনিসপত্রের প্রতিবিম্ব পড়েছে আয়নায়, অথচ আমার পেছনে দাঁড়ানো কাউন্টকে দেখা যাচ্ছে না কেন? এমন অদ্ভুত কথা তো শুনিনি কখনও! একটা প্ৰচণ্ড অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। বুঝতে পারলাম না অস্বস্তিটা কিসের, কিন্তু খেয়াল করেছি, কাউন্ট যখনই আমার খুব কাছাকাছি আসেন তখনি এমন বোধ করতে থাকি আমি।
হঠাৎ এমন একটা কাণ্ড করলেন কাউন্ট যে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম আমি। কাউন্ট আমার কাঁধে হাত রাখার পর চমকে উঠে হাত ফসকে গিয়ে গালের খানিকটা জায়গা কেটে গেল আমার। সেখান থেকে বেরিয়ে গাল বেয়ে নিচের দিকে নেমে আসছে রক্ত, টের পাচ্ছি। ক্ষুরটা হাত থেকে নামিয়ে রেখে সেটা মুছতে যাব এমন সময় কাউন্টের চোখের দিকে চোখ পড়ল আমার। নিজের অজান্তেই শিউরে উঠলাম। অস্বাভাবিক ভাবে জ্বলছে কাউন্টের দুটো চোখ। কয়েক মুহূর্ত একভাবে রক্তের দিকে চেয়ে থেকে আচমকা আমার গলাটা চেপে ধরলেন কাউন্ট, মুখটা নিয়ে এলেন চিবুকের খুব কাছে, যেখান থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে সেখানে। কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো লাফ দিয়ে পিছিয়ে এলাম। গলা থেকে কাউন্টের হাতটা সরে গিয়ে আমার বুকের ওপর ঝোলানো ক্রুশটায় ঘষা লাগল। এক লাফে তিন হাত পিছিয়ে গেলেন কাউন্ট। চোখের পলকে আবার স্বাভাবিক হয়ে এলো ওঁর অবস্থা।
মৃদু হেসে সাফাই গাইবার সুরে বললেন কাউন্ট, “দেখুন তো, গারের কতটা কেটে ফেলেছেন! এত অন্যমনস্ক হলে কি চলে?” বলেই দাড়ি কামাবার ছোট আয়নাটা তুলে নিলেন তিনি। “এসব আজেবাজে জিনিস রাখার কোনো মানে হয়? ফেলে দিন এটা,” বলে আমার অপেক্ষা না করে নিজেই খোলা জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন ওটা। এরপর আর একটাও কথা না বলে দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি।
মনে মনে দারুণ রেগে গেলাম কাউন্টের ওপর। আয়না ছাড়া দাড়ি কামাব কি করে? শেষ পর্যন্ত পিতলের তৈরি ঝকঝকে ক্ষুরের বাক্সের পিঠেই কোনোমতে মুখ দেখে দাড়ি কামানোটা সারলাম। দাড়ি কামিয়ে, বাথরুম সেরে কাপড় পাল্টে নিয়ে ডাইনিংরূমে এসে ঢুকলাম। টেবিলে যথারীতি খাবার সাজানো রয়েছে, কিন্তু কাউন্ট নেই। অতএব একাই খাওয়া সেরে নিলাম। এখানে আসা অবধি কাউন্টকে কিছু খেতে দেখিনি। খাওয়ার পর একা একা এক জায়গায় ঠায় বসে না থেকে বাতিদান সহ মোমবাতি নিয়ে প্রাসাদটা একটু ঘুরে দেখতে চললাম।
সিঁড়ি বেয়ে অল্পক্ষণেই দক্ষিণমুখো একটা ঘরে এসে পৌঁছুলাম। এ ঘরের জানালার কাছে দাঁড়ালে বাইরের প্রকৃতির অপূর্ব সব দৃশ্য চোখে পড়ে। ওদিকে চাঁদ উঠেছে। জানালার কাছে চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে বাইরের সেই দৃশ্যই দেখতে লাগলাম।
প্রায় খাড়া একটা পাহাড় চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে কাউন্টের প্রাসাদ-দুর্গ। এই জানালা থেকে কোনো কিছু ফেললে কোনো জায়গায় ঠেকা না খেয়েই পড়বে গিয়ে হাজার ফুট নিচের পাথুরে উপত্যকায়। তারপর থেকে যদ্দূর চোখ যায় বন আর বন। চাঁদের আলোয় ওই বনকে মনে হলো ঢেউ খেলানো উত্তাল সাগর। আসলে অত ওপর আর দূর থেকে ছোট বড় গাছের মাথাগুলোকেই ওরকম দেখাচ্ছে। ওই অদ্ভুত, ধূসর গাছের সাগরের বুক চিরে মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে চকচকে রূপালি ফিতে। ওগুলো পাহাড়ি নদী। চাঁদের আলোয় ওদের সৌন্দৰ্য বেড়ে গেছে শতগুণ। সে সৌন্দৰ্য ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।
বেশ কিছুক্ষণ সে দৃশ্য দেখে জানালার কাছ থেকে সরে এসে অন্যান্য কক্ষগুলো ঘুরে দেখতে লগলাম। প্রাসাদ-দুর্গের ভেতরে অজস্র ঘর আর তার দরজা। প্রায় সব ক’টা ঘরের দরজাতেই তালা মারা। জানালাগুলোতে গরাদ নেই, কিন্তু এমন জায়গায় যে তা গলে বাইরে বেরিয়ে নিচে নামা যাবে না। আর অত ওপর থেকে নিচে নামাটাও সম্পূর্ণ অসম্ভব। হঠাৎ করে বুঝতে পারলাম লোকালয় থেকে বহু দূরে, নির্জন এক রহস্যময় প্রাসাদ-দুর্গে আসলে বন্দী করে রাখা হয়েছে আমাকে। মিনা, সত্যি বলতে কি, ভয় পেয়েছি আমি, টের পাচ্ছি ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে আমাকে ঘিরে।

E-Book Created By
---> Md. Ashiqur Rahman <---

চামচিকে আর টিকিট চেকার - নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়

—বুঝলি প্যালা, চামচিকে ভীষণ ডেঞ্জারাস!...

একটা ফুটাে শাল পাতায় করে পটলডাঙার টেনিদা ঘুগনি খাচ্ছিল। শালপাতার তলা দিয়ে হাতে খানিক ঘুগনির রস পড়েছিল, চট করে সেটা চেটে নিয়ে পাতাটা তালগোল পাকিয়ে ছুঁড়ে দিলে ক্যাবলার নাকের ওপর। তারপর আবার বললে, হুঁ হুঁ, ভীষণ ডেঞ্জারাস চামচিকে।

—কী কইর‌্যা বোঝলা—কও দেখি?—

বিশুদ্ধ ঢাকাই ভাষায় জানতে চাইল হাবুল সেন।

—আচ্ছা, বল চামচিকের ইংরেজি কি?

আমি, ক্যাবলা আর হাবুল সেন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম।

—বল না!

শেষকালে ভেবে-চিন্তে ক্যাবলা বললে, স্মল ব্যাট। মানে ছােট বাদুড়!

—তোর মুণ্ডু।

—আমি বললাম, তবে ব্যাটলেট। তা-ও নয়? তা হলে? ব্যাটস সান—মানে, বাদুড়ের ছেলে? হল না? আচ্ছা, ব্রিক ব্যাট কাকে বলে?

টেনিদা বললে থাম উল্লুক! ব্রিক ব্যাট হল থান ইট! এবার তাই একটা তোর মাথায় ভাঙব।

হাবুল সেন গভীর মুখে বললে, হইছে।

—কী হল?

—স্কিন মোল।

—স্কিন মোল?...টেনিদা খাঁড়ার মতো নাকটাকে মনুমেন্টের মতো উঁচু করে ধরল, সে আবার কী?

—স্কিন মনে হইল চাম— অর্থাৎ কিনা চামড়া। আর আমাগো দ্যাশে ছুঁচারে কয় চিকা— মোল। দুইটা মিলাইয়া স্কিন মোল।

টেনিদা খেপে গেল : দ্যাখা হাবুল, ইয়ার্কির একটা মাত্রা আছে, বুঝলি? স্কিন মোল। ইঃ—গবেষণার দৌড়টা দেখ একবার।

আমি বললাম, চামচিকের ইংরেজী কী তা নিয়ে আমাদের জ্বালাচ্ছ কেন? ডিক্সনারি দ্যাখো গে!

—ডিক্সনারিতেও নেই। —টেনিদা জয়ের হাসি হাসল।

—তা হলে?

—তা হলে এইটাই প্রমাণ হল চামচিকে কী ভীষণ জিনিস। অর্থাৎ এমন ভয়ানক যে চামচিকাকে সাহেবরাও ভয় পায়! মনে কর না— যারা আফ্রিকার জঙ্গলে গিয়ে সিংহ আর গরিলা মারে, যারা যুদ্ধে গিয়ে দমদম বোমা আর কামান ছোড়ে, তারা সুদ্ধ চামচিকের নাম করতে ভয় পায়। আমি নিজের চোখেই সেই ভীষণ ব্যাপারটা দেখেছি।

কী ভীষণ ব্যাপার?—গল্পের গন্ধে আমরা তিনজনে টেনিদাকে চেপে ধরলাম: বলো এক্ষুনি।

—ক্যাবলা, তাহলে চটপট যা। গলির মোড় থেকে আরও দুআনার পাঁঠার ঘুগনি নিয়ে আয়। রসদ না হলে গল্প জমবে না।

ব্যাজার মুখে ক্যাবলা ঘুগনি আনতে গেল। দু’আনার ঘুগনি একাই সবটা চেটেপুটে খেয়ে, মানে আমাদের এক ফোঁটাও ভাগ না দিয়ে, টেনিদা শুরু করলে : তবে শোন—

সেবার পাটনায় গেছি ছোটমামার ওখানে বেড়াতে। ছোটমামা রেলে চাকরি করে— আসার সময় আমাকে বিনা টিকিটেই তুলে দিলে দিল্লি এক্সপ্রেসে। বললে, গাড়িতে চ্যাটার্জি যাচ্ছে ইনচার্জ— আমার বন্ধু। কোনও ভাবনা নেই-সেই-ই তোকে হাওড়া স্টেশনের গেট পর্যন্ত পার করে দেবে!

নিশ্চিন্ত মনে আমি একটা ফাঁকা সেকেন্ড ক্লাস কামরায় চড়ে লম্বা হয়ে পড়লাম।

শীতের রাত। তার ওপর পশ্চিমের ঠাণ্ডা— হাড়ে পর্যন্ত কাঁপুনি ধরায়।

কিন্তু কে জানত— সেদিন হঠাৎ মাঝপথেই চ্যাটার্জির ডিউটি বদলে যাবে। আর তার জায়গায় আসবে—কী নাম ওর— মিস্টার রাইনোসেরাস।

ক্যাবলা বললে, রাইনোসেরাস মানে গণ্ডার।

—থাম, বেশি বিদ্যে ফলাসনি। ...টেনিদা দাঁত খিঁচিয়ে উঠল, যেন ডিক্সনারি একেবারে। সায়েবের বাপ-মা যদি ছেলের নাম গণ্ডার রাখে— তাতে তোর কী র‌্যা? তোর নাম যে কিশলয় কুমার না হয়ে ক্যাবলা হয়েছে, তাতে করে কী ক্ষেতি হয়েছে শুনি?

হাবুল সেন বললে, ছাড়ান দাও— ছাড়ান দাও। পোলাপান!

—হুঁ, পোলাপান! আবার যদি বকবক করে তো জলপান করে ছাড়ব! যাক— শোন। আমি তো বেশ করে গাড়ির দরজা-জানালা এঁটে শুয়ে পড়েছি। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না। একে দুখানা - কম্বলে শীত কাটছে না, তার ওপরে আবার খাওয়াটাও হয়ে গেছে বড্ড বেশি। মামাবাড়ির কালিয়ার পাঠাটা যেন জ্যান্ত হয়ে উঠে গাড়ির তালে তালে পেটের ভেতর শিং দিয়ে ঢুঁ মারছে। লোভে পড়ে অতটা না খেয়ে ফেলেই চলত।

পেট গরম হয়ে গেলেই লোকে নানা রকম দুঃস্বপ্ন দেখে— জানিস তো? আমিও স্বপ্ন দেখতে লাগলাম, আমার পেটের ভেতরে সেই যে বাতাপি না ইল্বল কে একটা ছিল— সেইটে পাঁঠা হয়ে ঢুকেছে। একটা রাক্ষস হিন্দি করে বলছে : এ ইল্বল— আভি ইসকো পেট ফাটাকে নিকাল আও—

—বাপরে— বলে আমি চেঁচিয়ে উঠলাম। চোখ চেয়ে দেখি, গাড়ির ভেতরে বাতাপি বা ইম্বল কেউ নেই-— শুধু ফর-ফর করে একটা চামচিকে উড়ছে। একেবারে বোঁ করে আমার মুখের সামনে দিয়ে উড়ে চলে গেল-নাকটাই খিমচে ধরে আর কি!

এ তো আচ্ছা উৎপাত।

কোন দিক দিয়ে এল কে জানে? চারিদিকে তো দরজা-জানালা সবই বন্ধ। তবে চামচিকের পক্ষে সবই সম্ভব। মানে অসাধ্য কিছু নেই।

একবার ভাবলাম, উঠে। ওটাকে তাড়াই। কিন্তু যা শীত—কম্বল ছেড়ে নড়ে কার সাধ্যি। তা ছাড়া উঠতে গেলে পেট ফুঁড়ে শিং-টিং সুদ্ধু পাঁঠাটাই বেরিয়ে আসবে হয়তো বা। তারপর আবার যখন সাঁ করে নাকের কাছে এল, তখন বসে পড়ে আর কি। আমার খাড়া নাকটা দেখে মনুমেন্টের ডগাই ভাবল বোধ হয়।

আমি বিচ্ছিরি মুখ করে বললাম, ফর-র-ফুস! —মনে চামচিকেটিকে ভয় দেখলাম। তাইতেই আঁতকে গেল কি না কে জানে— সাঁ করে গিয়ে ঝুলে রইল একটা কোট-হ্যাঙ্গারের সঙ্গে। ঠিক মনে হল, ছােট একটা কালো পুটলি ছুলছে!

এত রাত্তিরে কে আবার জ্বালাতে এল? নিশ্চয় কোনও প্যাসেঞ্জার। প্রথমটায় ভাবলাম, পড়ে থাকি ঘাপটি মেরে। যতক্ষণ খুশি খটখটিয়ে কেটে পড়ুক লোকটা। আমি কম্বলের ভেতরে মুখ ঢোকালাম।

কিন্তু কী একটা যাচ্ছেতাই স্টেশনে যে গাড়িটা থেমেছে কে জানে! সেই যে দাঁড়িয়ে আছে—একদম নট নড়ন-চড়ন! যেন নেমন্তন্ন খেতে বসেছে! ওদিকে দরজায় খটখটানি সমানে চলতে লাগল। ভেঙে ফেলে আর কি!

এমন বেয়াক্কেলে লোক তো কখনও দেখিনি! ট্রেনে কি আর কামরা নেই যে এখানে এসে মাথা খুঁড়ে-মরছে! ভারি রাগ হল। দরজা না খুলেও উপায় নেই— রিজার্ভ গাড়ি তো নয় আর। খুব কড়া গলায় হিন্দীতে একটা গালাগাল দেব মনে করে উঠে পড়লাম।

ক্যাবলা হঠাৎ বাঁধা দিয়ে বললে, তুমি মোটেই হিন্দী জানো না টেনিদা!

—মানে।

—তুমি যা বলে তা একেবারেই হিন্দী হয় না। আমি ছেলেবেলা থেকে পশ্চিমে ছিলাম—

—চুপ কর বলছি ক্যাবলা!—টেনিদা। হুঙ্কার ছাড়ল ; ফের যদি ভুল ধরতে এসেছিস তো এক চাঁটিতে তোকে চাপাটি বানিয়ে ফেলব! আমার হিন্দী শুনে বাড়ির ঠাকুর পর্যন্ত ছাপরায় পালিয়ে গেল, তা জানিস?

হাবুল বললে, ছাইড়্যা দাও— চ্যাংড়ার কথা কি ধরতে আছে?

—চ্যাংড়া! চিংড়িমাছের মতো ভেজে খেয়ে ফেলব! আমি বললাম, ওটা অখাদ্য জীব— খেলে পেট কামড়াবে, হজম করতে পারবে না। তার চেয়ে গল্পটা বলে যাও।

—হুঁ, শোন! —টেনিদা ক্যাবলার ছ্যাবলামি দমন করে আবার বলে চলল : উঠে দরজা খুলে যেই বলতে গেছি— এই আপ কেইসা আদমি। হ্যায়— সঙ্গে সঙ্গে গাঁক গাঁক করে আওয়াজ!

—গাঁক—গাঁক?

—মানে সায়েব। মানে টিকিট চেকার।

—সেই রাইনোসেরাস? বকুনি খেয়েও ক্যাবলা সামলাতে পারল না।

—আবার কে? একদম খাঁটি সায়েব-পা থেকে মাথা ইস্তক।

সেই যে একরকম সায়েব আছে না? গায়ের রং মোষের মতো কালো, ঘামলে গা দিয়ে কালি বেরোয়— তাদের দেখলে সায়েবের ওপরে ঘেন্না ধরে যায়— মোটেই সে-রকমটি নয়। চুনকাম করা ফর্সা রঙ— হাঁড়ির মতো মুখ, মোটা নাকের ছাঁদায় বড় বড় লালচে লোম— হাসলে মুখ ভর্তি মুলো দেখা যায়, আর গলার আওয়াজ শুনলে মনে হয় ষাঁড় ডাকছে— একেবারে সেই জিনিসটি! ঢুকেই চোস্ত ইংরেজীতে আমাকে বললে, এই সন্ধেবেলাতেই এমন করে ঘুমোচ্ছ কেন? এইটেই সবচেয়ে বিচ্ছিরি হ্যাবিট।

—কী রকম চোস্ত ইংরেজী টেনিদা? আমি জানতে চাইলাম।

—সে-সব শুনে কী করবি?...টেনিদা উঁচু দরের হাসি হাসল! শুনেও কিছু বুঝতে পারবি না-সায়েবের ইংরেজী কিনা! সে যাক। সায়েবের কথা শুনে আমার তো চোখ কপালে উঠল রাত বারোটাকে বলছে সন্ধেবেলা। তা হলে ওদের রাত্তির হয়। কখন? সকালে নাকি?

তারপরেই সায়েব বললে, তোমার টিকিট কই?

আমার তো তৈরী জবাব ছিলই। বললাম, আমি পাটনার বাঁড়ুজ্যে মশাইয়ের ভাগনে। আমার কথা ক্রু-ইন-চার্জ চাটুজ্যেকে বলা আছে।

তাই শুনে সায়েবটা এমনি দাঁত খিঁচোল যে, মনে হল মুলোর দোকান খুলে বসেছে। নাকের

লোমের ভেতরে যেন ঝড় উঠল, আর বেরিয়ে এল খানিকটা গর-গরে আওয়াজ!

যা বললে, শুনে তো আমার চোখ চড়ক গাছ।

—তােমার বাড়ুজ্যে মামাকে আমি থোরাই পরোয়া করি! এসব ডাবলুটিরা ও-রকম ঢের মামা পাতায়। তা ছাড়া চাটুজ্যের ডিউটি বদল হয়ে গেছে— আমিই এই ট্রেনের ক্রু-ইন-চার্জ। অতএব চালাকি রেখে পাটনা-টু-হাওড়া সেকেন্ড ক্লাস ফেয়ার আর বাড়তি জরিমানা বের করো।

পকেটে সব সুদ্ধ পাঁচটা টাকা আছে— সেকেন্ড ক্লাস দূরে থাক, থার্ড ক্লাসের ভাড়াও হয় না ; সর্ষের ফুল এর আগে দেখিনি— এবার দেখতে পেলাম! আর আমার গা দিয়ে সেই শীতেও দরদর করে সর্ষের তেল পড়তে লাগল।

আমি বলতে গেলাম, দ্যাখো সায়েব—

সায়েব সায়েব বোলো না—আমার নাম মিস্টার রাইনোসেরাস। আমার গণ্ডারের মতো গোঁ। ভাড়া যদি না দাও— হাওড়ায় নেমে তোমায় পুলিশে দেব। ততক্ষণে আমি গাড়িতে চাবি বন্ধ করে রেখে যাচ্ছি।

—কী বলব জানিস প্যালা— আমি পটলডাঙার টেনিরাম— অমন ঢের সায়েব দেখেছি। ইচ্ছে করলেই সায়েবকে ধরে চলতি গাড়ির জানলা দিয়ে ফেলে দিতে পারতাম। কিন্তু আমরা বোষ্টুম— জীবহিংসা করতে নেই, তাই অনেক কষ্টে রাগটা সামলে নিলাম।

হাবুল সেন বলে বসল ; জীবহিংসা কর না, তবে পাঁঠা খাও ক্যান?

—আরে পাঠার কথা আলাদা। ওরা হল অবোলা জীব, বামুনের পেটে গেলে স্বর্গে যায়। পাঁঠা খাওয়া মানেই জীবে দয়া করা! সে যাক। কিন্তু সায়েবকে নিয়ে এখন আমি করি কী? এ তো আচ্ছা প্যাঁচ কষে বসেছে! শেষকালে সত্যিই জেলে যেতে না হয়!

কিন্তু ভগবান ভরসা!

পকেট থেকে একটা ছোট খাতা বের করে সায়েব কী লিখতে যাচ্ছিল পেনসিল দিয়ে হঠাৎ সেই শব্দ—ফর-ফর—ফরাৎ!

চামচিকেটা আবার উড়তে শুরু করেছে। আমার মতোই তো বিনাটিকিটের যাত্রী— চেকার দেখে ভয় পেয়েছে নিশ্চয়।

আর সঙ্গে সঙ্গেই সায়েব ভয়ানক চমকে উঠল। বললে, ওটা কী পাখি? জবাব দিতে যাচ্ছিলাম, চামচিকে— কিন্তু তার আগেই সায়েব হাইমাই করে চেঁচিয়ে উঠল। নাকের দিকে চামচিকের এত নজর কেন কে জানে— ঠিক সায়েবের নাকেই একটা ঝাপটা মেরে চলে গেল।

ওটা কী পাখি? কী বদখত দেখতে - সায়েব কুঁকড়ে এতটুকু হয়ে গেল! চুনকাম-করা মুখটা তার ভয়ে পানসে হয়ে গেছে।

আমি বুঝলাম এই মওক! বললাম, তুমি কি ও-পাখি। কখনও দ্যাখোনি?

—নো—নেভার! আমি মাত্ৰ ছমাস আগে আফ্রিকা থেকে ইণ্ডিয়ায় এসেছি। সিংহ দেখেছি— গণ্ডার দেখেছি— কিন্তু—

সায়েব শেষ করতে পারল না। চামচিকেটা আর একবার পাক খেয়ে গেল। একটু হলেই প্রায় খিমচে ধরেছিল সায়েবের মুখ। বোধহয় ভেবেছিল, ওটা চালকুমড়ো।

সায়েব বললে, মিস্টার— ও কি কামড়ায়?

আমি বললাম, মোক্ষম। ভীষণ বিষাক্ত! এক কামড়েই লোক মারা যায়। এক মিনিটের মধ্যেই।

—হােয়াট! —বলে সায়েব লাফিয়ে উঠল। তারপরে আমার কম্বল ধরে টানাটানি করতে লাগল।

—মিস্টার—প্লিজ—ফর গডস সেক— আমাকে একটা কম্বল দাও।

—তারপর আমি ওর কামড়ে মারা যাই আর কি ৷ ও সব চলবে না! —আমি শক্ত করে কম্বল চেপে রইলাম!

—অ্যাঁ? তা হলে!— বলেই একটা অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল সায়েব। বোঁ করে একেবারে চেন ধরে ঝুলে পড়ল প্ৰাণপণে। তারপর জানলা খুলে দিয়ে গলা ফাটিয়ে চ্যাঁচাতে লাগল। : হেলপ—হেলপ—আর খোলা জানলা পেয়েই সাহেবের কাঁধের ওপর দিয়ে বাইরের অন্ধকারে চামচিকে ভ্যানিস!

সায়েব খানিকক্ষণ। হতভম্ব হয়ে রইল। একটু দম নিয়ে মস্ত একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললে, যাক— স্যামসিকেটা বাইরে চলে গেছে। এখন আর ভয় নেইকী বলে?

আমি বললাম, না, তা নেই। তবে পঞ্চাশ টাকা জরিমানা দেবার জন্য তৈরি থাকো।

সাহেবের মুখ হাঁ হয়ে গেল : কেন?

—বিনা কারণে চেন টেনেছ— গাড়ি থামল বলে! আর শোনো সায়েব— চামচিকে খুব লক্ষ্মী পাখি। কাউকে কামড়ায় না—কাউকে কিছু বলে না। তুমি রেলের কর্মচারী হয়ে চামচিকে দেখে চেন টেনেছ— এ জন্যে তোমার শুধু ফাইন নয়— চাকুরিও যেতে পারে।

ওদিকে গাড়ি আস্তে আস্তে থেমে আসছে তখন। মিস্টার রাইনােসেরাস কেমন মিটমিট করে তাকাচ্ছে আমার দিকে। ভয়ে এখন প্রায় মিস্টার হেয়ার—মানে খরগোশ হয়ে গেছে।

তারপরই আমার ডান হাত চেপে ধরল দুহাতে। —শোনো মিস্টার, আজ থেকে তুমি আমার বুজুম ফ্রেণ্ড! মানে প্ৰাণের বন্ধু। তোমাকে আমি ফাস্ট ক্লাস সেলুনে নিয়ে যাচ্ছি— দেখবে তোফা ঘুম দেবে। হাওড়ায় নিয়ে গিয়ে কোলনারের ওখানে তোমাকে পেট ভরে খাইয়ে দেব। শুধু গার্ড এলে বলতে হবে, গাড়িতে একটা গুণ্ডা পিস্তল নিয়ে ঢুকেছিল, তাই আমরা চেন টেনেছি। বলো — রাজি?

রাজি না হয়ে আর কী করি! এত করে অনুরোধ করছে যখন।

বিজয়গর্বে হাসলে টেনিদা : যা ক্যাবলা— আর চার পয়সার পাঁঠার ঘুগনি নিয়ে আয়।

ভজহরি ফিল্ম কপোরেশন - নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়

বউবাজার দিয়ে আসতে আসতে ভীমনাগের দোকানের সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে গেল টেনিদা। আর নড়তে চায় না। আমি বললুম, রাস্তার মাঝখানে অমন করে দাঁড়ালে কেন? চলো।

—যেতে হবে? নিতান্তই যেতে হবে? —কাতর দৃষ্টিতে টেনিদা তাকাল আমার দিকে; প্যালা, তোর প্রাণ কি পাষাণে গড়া? ওই দ্যাখ, থরে-থরে সন্দেশ সাজানাে রয়েছে, থালার ওপর সোনালি রঙের রাজভোগ হাতছানি দিয়ে ডাকছে, রসের মধ্যে ডুব-সাঁতার কাটছে রসগোল্লা, পানতো। প্যালা রে—

আমি মাথা নেড়ে বললুম, চালাকি চলবে না। আমার পকেটে তিনটে টাকা আছে, ছোটমামার জন্যে মকরধ্বজ কিনতে হবে। অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে, চলো এখন—

খিদে পেয়েছে রে! আচ্ছা, দুটো টাকা আমায় ধার দে, বিকেলে না হয় ছোটমামার জন্যে মকরধ্বজ—

কিন্তু ও সব কথায় ভােলবার বান্দা প্যালারাম বাড়ুজ্যে নয়। টেনিদাকে টাকা ধার দিলে সে-টাকাটা আদায় করতে পারে এমন খলিফা লোক দুনিয়ায় জন্মায়নি। পকেটটা শক্ত করে ঢেকে ধরে আমি বললুম, খাবারের দোকান চোখে পড়লেই তোমার পেট চাঁই-চাঁই করে ওঠে— ওতে আমার সিমপ্যাথি নেই। তা ছাড়া, এ-বেলা মকরধ্বজ না নিয়ে গেলে আমার ছেঁড়া কানটা সেলাই করে দেবে কে? তুমি?

রেলগাড়ির ইঞ্জিনের মতো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল টেনিদা। —ব্রাহ্মণকে সক্কিলবেলা দাগ দিলি প্যালা— মরে তুই নরকে যাবি।

—যাই তো যাব। কিন্তু ছোটমামার কানমলা যে নরকের চাইতে ঢের মারাত্মক সেটা জানা আছে আমার। আর, কী আমার ব্ৰাহ্মণ রে! দেলখোসা রেস্তোরাঁয় বসে আস্ত-আস্ত মুরগির ঠ্যাং চিবুতে তোমায় যেন দেখিনি আমি!

—উঃ! সংসারটাই মরীচিকা-ভীমানাগের দোকানের দিকে তাকিয়ে শেষবার দৃষ্টিভোজন করে নিলে টেনিদা; নাঃ, বড়লোক না হলে আর সুখ নেই।

বিকেলে চাটুজ্যেদের রোয়াকে বসে সেই কথাই হচ্ছিল। ক্যাবলা গেছে কাকার সঙ্গে চিড়িয়াখানায় বেড়াতে, হাবুল সেন গেছে দাঁত তুলতে। কাজেই আছি আমরা দুজন। মনের দুঃখে দুঠোঙা তেলেভাজা খেয়ে ফেলেছে টেনিদা। অবশ্য পয়সাটা আমিই দিয়েছি। এবং আধখানা আলুর চাপ ছাড়া আর কিছুই আমার বরাতে জোটেনি।

আমার পাঞ্জাবি আস্তিনটা টেনে নিয়ে টেনিদা মুখটা মুছে ফেলল। তারপর বললে, বুঝলি প্যালা, বড়লোক না হলে সত্যিই আর চলছে না।

—বেশ তো হয়ে যাও-না। বড়লোক— আমি উৎসাহ দিলুম।

—হয়ে যাও-না! —বড়লোক হওয়াটা একেবারে মুখের কথা কিনা! টাকা দেবে কে, শুনি? তুই দিবি?— টেনিদা ভেংচি কাটল। আমি মাথা নেড়ে জানালুম, না আমি দেব না।

—তবে?

—লটারির টিকিট কেনো। — আমি উপদেশ দিলুম।

—ধ্যাত্তোর লটারির টিকিট! কিনে-কিনে হয়রান হয়ে গেলুম, একটা ফুটো পয়সাও যদি জুটত কোনও বার! লাভের মধ্যে টিকিটের জন্যে বাজারের পয়সা চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়লুম, বড়দা দুটো অ্যায়সা থাপ্পড় কষিয়ে দিলে। ওতে হবে না—বুঝলি? বিজনেস করতে হবে।

—বিজনেস!

—আলবাত বিজনেস। —টেনিদার মুখ সংকল্পে কঠোর হয়ে উঠল; ওই যে কী বলে, হিতোপদেশে লেখা আছে না, বাণিজ্যে বসতে ইয়ে— মানে লক্ষ্মী! ব্যবসা ছাড়া পথ নেই— বুঝেছিস?

—তা তো বুঝেছি। কিন্তু তাতেও তো টাকা চাই।

—এমন বিজনেস করবে। যে নিজের একটা পয়সাও খরচ হবে না। সব পরস্মৈপদী— মানে পরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে।

—সে আবার কী বিজনেস?—আমি বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলুম।

—হুঁ হুঁ, আন্দাজ কর দেখি? –চোখ কুঁচকে মিটমিটি হাসতে লাগল টেনিদা; বলতে পারলি না তো? ও—সব কি তোর মতো নিরেট মগজের কাজ? এমনি একটা মাথা চাই, বুঝলি?

সগৌরবে টেনিদা নিজের ব্ৰহ্মতালুতে দুটো টোকা দিলে।

—কেন অযথা ছলনা করছ? বলেই ফেলো না— আমি কাতর হয়ে জানতে চাইলুম।

টেনিদা একবার চারদিকে তাকিয়ে ভালো বরে দেখে নিলে, তারপর আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললে, ফিলিম কোম্পানি!

অ্যাঁ! —আমি লাফিয়ে উঠলাম।

—গাধার মতো চ্যাঁচাসনি— টেনিদা ষাঁড়ের মতো চেঁচিয়ে উঠল; সব প্ল্যান ঠিক করে ফেলেছি। তুই গল্প লিখবি— আমি ডাইরেকট —মানে পরিচালনা করব। দেখবি, চারিদিকে হইহই পড়ে যাবে।

—ফিলিমের কী জানো তুমি? আমি জানতে চাইলুম।

—কেইবা জানে? —টেনিদা তাচ্ছিল্যভরা একটা মুখ ভঙ্গি করলে; সবাই সমান— সকলের মগজেই গোবর। তিনটে মারামারি, আটটা গান আর গোটা কতক ঘরবাড়ি দেখালেই ফিলিম হয়ে যায়। টালিগঞ্জে গিয়ে আমি শুটিং দেখে এসেছি তো।

—কিন্তু তবুও—

—ধ্যাৎ, তুই একটা গাড়ল। —টেনিদা বিরক্ত হয়ে বললে, সত্যি-সত্যিই কি আর ছবি তুলব আমরা! ও-সব ঝামেলার মধ্যে কে যাবে!

—তা হলে?

—শেয়ার বিক্রি করব। বেশ কিছু শেয়ার বিক্রি করতে পারলে— বুঝলি তো? —টেনিদা চোখ টিপল; দ্বারিক, ভীমনাগ, দেলখোস, কে. সি. দাস—

এইবার আমার নোলায় জল এসে গেল। চুক চুক করে বললুম— থাক, থাক আর বলতে হবে না।

পরদিন গোটা পাড়াটাই পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেল।

 

“দি ভজহরি ফিলিম কর্পোরেশন”

আসিতেছে-আসিতেছে

রোমাঞ্চকর বাণীচিত্র

“বিভীষিকা”!

 

পরিচালনা : ভজহরি মুখোপাধ্যায়। (টেনিদা)

কাহিনী : প্যালারাম বন্দ্যোপাধ্যায়

তার নীচে ছোট ছোট হরফে লেখা:

 

সর্বসাধারণকে কোম্পানির শেয়ার কিনিবার জন্য অনুরোধ জানানো হইতেছে। প্রতিটি শেয়ারের মূল্য মাত্র আট আনা। একত্রে তিনটি শেয়ার কিনিলে মাত্র এক টাকা।

এর পরে একটা হাত এঁকে লিখে দেওয়া হয়েছে; বিশেষ দ্রষ্টব্য— শেয়ার কিনিলে প্রত্যেককেই বইতে অভিনয়ের চান্স দেওয়া হইবে। এমন সুযোগ হেলায় হারাইবেন না। মাত্ৰ অল্প শেয়ার আছে, এখন না কিনিলে পরে পস্তাইতে হইবে। সন্ধান করুন— ১৮ নং পটলডাঙা স্ট্রিট, কলিকাতা।

আর, বিজ্ঞাপনের ফল যে কত প্ৰত্যক্ষ হতে পারে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাতেনাতে তার প্রমাণ মিলে গেল। এমন প্ৰমাণ মিলল যে প্ৰাণ নিয়ে টানাটানি। অত তাড়াতাড়ি ব্যাপারটা আমরা আশা করিনি। টেনিদাদের এত বড় বাড়িটা। একেবারে খালি, বাড়িসুদ্ধ সবাই গেছে দেওঘরে, হাওয়া বদলাতে। টেনিদার ম্যাট্রিক পরীক্ষা সামনে, তাই একা রয়ে গেছে বাড়িতে, আর আছে চাকর বিষ্ট। তাই দিব্যি আরাম করে বসে আমরা তেতলার ঘরে রেডিয়ো শুনছি আর পাঁঠার ঘুগনি খাচ্ছি। এমন সময় বিষ্ট খবর নিয়ে এল মূর্তিমান একটি ভগ্নদূতের মতো।

বিষ্টুর বাড়ি চাটগাঁয়। হাঁইমাই করে নাকি সুরে কী যে বলে ভালো বোঝা যায় না। তবু যেটুকু বোঝা গেল, শুনে আমরা আঁত়্কে উঠলুম। গলায় পাঁঠার ঘুগনি বেঁধে গিয়ে মস্ত একটা বিষম খেল টেনিদা।

বিষ্টু জানাল : আঁড়িত ডাঁহাইত হইড়ছে (বাড়িতে ডাকাত পড়েছে)।

বলে কী ব্যাটা! পাগল না পেট খারাপ! ম্যাড়া না মিরগেল! এই ভর দুপুর বেলায় একেবারে কলকাতার বুকের ভেতরে ডাকাত পড়বে কী রকম।

বিষ্টু বিবৰ্ণ মুখে জানাল : নীচে হাঁসি দেইক্যা যান (নীচে এসে দেখে যান)। —

আমি ভেবেছিলাম খাটের তলাটা নিরাপদ কিনা, কিন্তু টেনিদা এমন এক বাঘা হাঁকার ছাড়লে যে আমার পালাজ্বরের পিলেটা দস্তুর মতো হকচকিয়ে উঠল।

—কাপুরুষ! চলে আয় দেখি— একটা বোম্বাই ঘুষি হাঁকিয়ে ডাকাতের নাক ন্যাবড়া করে দি!— আমি নিতান্ত গোবেচারা প্যালারাম বাড়ুজ্যে, শিংমাছের ঝোল খেয়ে প্ৰাণটাকে কোনওমতে ধরে রেখেছি, ওসব ডাকাত-ফাকাতের ঝামেলা আমার ভালো লাগে না। বেশ তো ছিলাম, এসব ভজঘট ব্যাপার কেন রে বাবা। আমি বলতে চেষ্টা করলুম, এই—এই মানে, আমার কেমন পেট কামড়াচ্ছে—

—পেট কামড়াচ্ছে! টেনিদা গর্জন করে উঠল : পাঁঠার ঘুগনি সাবাড় করার সময় তো সে কথা মনে ছিল না দেখছি। চলে আয় প্যালা, নইলে তোকেই আগে—

কথাটা টেনিদা শেষ করল না, কিন্তু তার বক্তব্য বুঝতে বেশি দেরি হল না আমার। “জয় মা দুর্গা”—কাঁপতে-কাঁপতে আমি টেনিদাকে অনুসরণ করলুম।

কিন্তু না— ডাকাত পড়েনি। পটলডাঙার মুখ থেকে কলেজ স্ট্রিটের মোড় পর্যন্ত “কিউ!”

কে নেই সেই কিউতে? স্কুলের ছেলে, মোড়ের বিড়িওয়ালা, পাড়ার ঠিকে ঝি, উড়ে ঠাকুর, এমন কি যমদূতের মত দেখতে এক জোড়া ভীম-দৰ্শন কাবুলিওয়ালা।

আমরা সামনে এসে দাঁড়াতেই গগনভেদী কোলাহল উঠল।

—আমি শেয়ার কিনব—

—এই নিন মশাই আট আনা পয়সা—

ঝি বলল, ওগো বাছারা, আমি এক ট্যাকা এনেছি। আমাদের তিনখানা শেয়ার দাও— আর একটা হিরোইনের চান্স দিয়ো—

পাশের বোর্ডিংটার উড়ে ঠাকুর বললে, আমিও আষ্টো গণ্ডা পয়সা আনুচি—

সকলের গলা ছাপিয়ে কাবুলিওয়ালা রুদ্র কণ্ঠে হুঙ্কার ছাড়ল : এঃ বাব্বু, এক এক রূপায়া লায়া, হামকো ভি চান্স চাহিয়ে—

তারপরেই সমস্বরে চিৎকার উঠল; চান্স-চান্স। চিৎকারের চোখে আমার মাথা ঘুরে গেল— দুহাতে কান চেপে আমি বসে পড়লুম।

আশ্চৰ্য, টেনিদা দাঁড়িয়ে রইল। দাঁড়িয়ে রইল একেবারে শান্ত, স্তব্ধ বুদ্ধদেবের মতো। শুধু তাই নয়, এ-কান থেকে ও-কান পর্যন্ত একটা দাঁতের ঝলক বয়ে গেল তার— মানে হাসল।

তারপর বললে, হবে, হবে, সকলেরই হবে,—বরাভয়ের মতো একখানা হাত সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললে, প্রত্যেককেই চান্স দেওয়া হবে। এখন চাঁদেরা আগে সুড়সুড়ি করে পয়সা বের করো দেখি। খবরদার, অচল আধুলি চালিয়ো না,—তাহলে কিন্তু—

—জয় হিন্দ--জয় হিন্দ—

ভিড়টা কেটে গেলে টেনিদা দু হাত তুলে নাচতে শুরু করে দিলে। তারপর ধপ করে একটা চেয়ারে বসতে গিয়ে চেয়ারসুদ্ধই চিৎপাত হয়ে পড়ে গেল।

আমি বললুম, আহা-হা— কিন্তু টেনিদা উঠে পড়েছে ততক্ষণে। আমার কাঁধের ওপর এমন একটা অতিকায় থাবড়া বসিয়ে দিলে যে, আমি আর্তনাদ করে উঠলুম।

—ওরে প্যালা, আজ দুঃখের দিন নয় রে, বড় আনন্দের দিন। মার দিয়া কেল্লা! ভীমনাগ, দ্বারিক ঘোষ, চাচার হােটেল, দেলখোস-আঃ!

যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে আমিও বললুম, আঃ!

—মায় গুনে দেখি—এ কান থেকে ও কান পর্যন্ত আবার হাসির কলকা উলসে রোজগার নেহাত মন্দ হয়নি। গুনে দেখি, ছব্বিশ টাকা বারো আনা।

—বারো আনা? —টেনিদা ভ্রূকুটি করলে, বারো আনা কী করে হয়? আট আনা এক টাকা করে হলে— উহুঁ! নিশ্চয় ডামাডোলের মধ্যে কোনও ব্যাটা চার গণ্ডা পয়সা ফাঁকি দিয়েছে— কী বলিস?

আমি মাথা নেড়ে জানালুম, আমারও তাই মনে হয়। —উঃ—দুনিয়ায় সবই জোচ্চোর। একটাও কি ভালো লোক থাকতে নেইরে? দিলো সক্কালবেলাটায় বামুনের চার চার আনা পয়সা ঠকিয়ে। —টেনিদা দীর্ঘশ্বাস ফেলল : যাক, এতেও নেহাত মন্দ হবে না। দেলখোস, ভীমনাগ, দ্বারিক ঘোষ—

আমি তার সঙ্গে জুড়ে দিলুম, চাচার হােটেল, কে সি দাস—

টেনিদা বললে, ইত্যাদি— ইত্যাদি। কিন্তু শোন প্যালা, একটা কথা আগেই বলে রাখি। প্ল্যানটা আগাগোড়াই আমার। অতএব বাবা সোজা হিসেব— চৌদ্দ আনা—দু আনা।

আমি আপত্তি করে বললুম, অ্যাঁ, তা কী করে হয়?

টেনিদা সজোরে টেবিলে একটা কিল মেরে গর্জন করে উঠল, হুঁ, তাই হয়! আর তা যদি না হয়, তাহলে তোকে সোজা দোতালার জানালা গলিয়ে নীচে ফেলে দেওয়া হয়, সেটাই কি তবে ভালো হয়?

আমি কান চুলকে জানালুম, না সেটা ভালো হয় না!

—তবে চল— গোটা কয়েক মোগলাই পরোটা আর কয়েক ডিশ ফাউল কারি খেয়ে ভজহরি ফিলম কপোরেশনের মহরত করে আসি—

টেনিদা ঘর-ফাটানো একটা পৈশাচিক অট্টহাসি করে উঠল। হাসির শব্দে ভেতর থেকে ছুটে এল বিষ্টু। খানিকক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থেকে বললে, ছটো বাবুর মাথা হাঁড়াপ। (খারাপ) অইচে!——

কিন্তু—দিন কয়েক বেশ কেটে গেল। দ্বারিকের রাজভোগ আর চাচার কাটলেট খেয়ে শরীরটাকে দস্তুরমতো ভালো করে ফেলেছি দুজনে। কে. সি. দাসের রসমালাই খেতে খেতে দুজনে ভাবছি— আবার নতুন কোনও একটা প্ল্যান করা যায় কি না, এমন সময়—

দোরগোড়ায় যেন বাজ ডেকে উঠল। সেই যমদূতের মতো একজোড়া কাবুলিওয়ালা। অতিকায় জাব্বা-জোব্বা আর কালো চাপদাড়ির ভেতর দিয়ে যেন জিঘাংসা ফুটে বেরোচ্ছে।

আমরা ফিরে তাকাতেই লাঠি ঠুকল : এঃ বাব্বু— রূপেয়া কাঁহা—হামলোগ গা চান্স কিধর?

—অ্যাঁঃ! —টেনিদার হাত থেকে রসমালাইটা বুক-পকেটের ভেতর পড়ে গেল : প্যালা রে, সেরেছে!

—সারবেই তো! —আমি বললুম, তবে আমার সুবিধে আছে। চৌদ্দ আনা দু আনা। চৌদ্দ আনা ঠ্যাঙনি তোমার, মানে স্রেফ ছাতু করে দেবে। দু, আনা খেয়ে আমি বাঁচলেও বেঁচে যেতে পারি।

কাবুলিওয়ালা আবার হাঁকল :—এঃ ভজহরি বাব্বু— বাহার তো আও— বাহার আও—মানেই নিমতলা যাও! টেনিদা এক লাফে উঠে দাঁড়াল, তারপর সোজা আমাকে বগলদাবা করে পাশের দরজা দিয়ে অন্যদিকে।

—ওগো ভালো মানুষের বাছারা, আমার ট্যাকা। কই, চান্স কই? ঝি হাতে আঁশবটি নিয়ে দাঁড়িয়ে।

—আমারো চান্সো মিলিবো কি না?—উড়ে ঠাকুর ভাত রাঁধবার খুন্তিটাকে হিংস্রভাবে আন্দোলিত করল।

—জোচ্চুরি পেয়েছেন স্যার—আমরা শ্যামবাজারের ছেলে— আস্তিন গুটিয়ে একদল ছেলে তাড়া করে এল।

এক মুহুর্তে আমাদের চোখের সামনে পৃথিবীটা যেন ঘুরতে লাগল। তারপরেই —‘করেঙ্গে ইয়া মারেঙ্গে!’ আমাকে কাঁধে তুলে টেনিদা একটা লাফ মারল। তারপর আমার আর ভালো করে জ্ঞান রইল না। শুধু টের পেলুম, চারিদিকে একটা পৈশাচিক কোলাহল; চোট্টা—চোট্টা—ভাগ যাতা—আর বুঝতে পারলুম— যেন পাঞ্জাব মেলে চড়ে উড়ে চলেছি।

ধপাৎ করে মাটিতে পড়তেই আমি হিউমাউ করে উঠলুম। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি, হাওড়া স্টেশন। রেলের একটা ইঞ্জিনের মতোই হাঁপাচ্ছে টেনিদা।

বললে, হুঁ হুঁ বাবা, পাঁচশো মিটার দৌড়ে চ্যাম্পিয়ন— আমাকে ধরবে ওই ব্যাটারা! যা প্যালা- পকেটে এখনও বারো টাকা চার আনা রয়েছে, ঝট করে দুখানা দেওঘরের টিকিট কিনে আন। দিল্লি এক্সপ্রেস এখুনি ছেড়ে দেবে।

প্রভাতসঙ্গীত - নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়


অ-     অ+

টেনিদা। অসম্ভব গম্ভীর । আমরা তিনজনও যতটা পারি গভীর হওয়ার চেষ্টা করছি। ক্যাবলার মুখে একটা চুয়িং গাম ছিল, সেটা সে ঠেলে দিয়েছে গালের একপাশে—যেন একটা মার্বেল গালে পুরে রেখেছে। এই রকম মনে হচ্ছে। পটলডাঙার মোড়ে তেলেভাজার দোকান থেকে আলুর চপ আর বেগুনী ভাজার গন্ধ আসছে, তাইতে মধ্যে-মধ্যে উদাস হয়ে যাচ্ছে হাবুল সেন। কিন্তু আজকের আবহাওয়া অত্যন্ত সিরিয়াস-তেলেভাজার এমন প্রাণকাড়া গন্ধেও টেনিদা কিছুমাত্র বিচলিত হচ্ছে না ।

খানিক পরে টেনিদা বলল, পাড়ার লোকগুলো কী—বলদিকি ?

আমি বললুম, অত্যন্ত বোগাস।

খাঁড়ার মতো নাকটাকে আরও খানিক খাড়া করে টেনিদা বললে, পয়সা তো অনেকেরই আছে। মোটরওলা বাবুও তো আছেন ক’জন । তবু আমাদের একসারসাইজ ক্লাবকে চাঁদা দেবে না ?

না—দিব না।—হাবুল সেন মাথা নেড়ে বললে, কয়—একসারসাইজ কইর‌্যা কী হইব ? গুণ্ডা হইব কেবল !

হ, গুণ্ডা হইব !—টেনিদা হাবুলকে ভেংচে বললে, শরীর ভালো করবার নাম হল গুণ্ডাবাজি ! অথচ বিসর্জনের লরিতে যারা ভুতুড়ে নাচ নাচে, বাঁদরামো করে, তাদের চাঁদা দেবার বেলায় তো পয়সা সুড়সুড় করে বেরিয়ে আসে। প্যালার মতো রোগা টিকটিকি না হয়ে—

বাধা দিয়ে বললুম, আবার আমাকে কেন ?

ইউ শাটাপ । —টেনিদা বাঘাটে হুংকার ছাড়ল : ‘আমার কথার ভেতরে কুরুবকের মতো—খুব বিচ্ছিরি একটা বকের মতো বকবক করবি না—সে-কথা বলে দিচ্ছি তোকে । প্যালার মতো রোগা টিকটিকি না হয়ে পাড়ার ছেলেগুলো দুটাে ডাম্বেল-মুগুর ভাঁজুক, ডন দিক—এই তো আমরা চেয়েছিলুম। শরীর ভালো হবে, মনে জোর আসবে, অন্যায়ের সামনে রুখে দাঁড়াবে, বড় কাজ করতে পারবে। তার নাম গুণ্ডাবাজি ! অথচ দ্যাখ—দু-চারজন ছাড়া কেউ একটা পয়সা ঠেকাল না। আমরা নিজেরা চাঁদা-টাদা দিয়ে দু-একটা ডাম্বেল-টাম্বেল কিনেছি, কিন্তু চেস্ট একসপ্যান্ডার, বারবেল—ৎ

ক্যাবলা আবার চুয়িং গামটা চিবােতে আরম্ভ করল। ভরাট মুখে বললে, কেউ পাত্তাই দিচ্ছে না।

হাবুল মাথা নাড়ল : দিব না। ক্লাব তুইলা দাও টেনিদা।

‘তুলে দেব ? কভি নেহি—’ টেনিদার সারা মুখে মোগলাই পরোটার মতো একটা কঠিন প্রতিজ্ঞা ফুটে বেরুল : চাঁদা তুলবই । ইউ প্যালা ৷

আঁতকে উঠে বললুম, অ্যাঁ?

আমাদের নিয়ে তো খুব উষ্টুম-ধুষ্টুম গপ্পো বানাতে পারিস, কাগজে ছাপাটাপাও হয়। একটা বুদ্ধি টুদ্ধি বের করতে পারিস নে ?

মাথা চুলকে বললুম, আমি—আমি—

‘হাঁ-হাঁ, তুই-তুই।’—টেনিদা কটাং করে আমার চাঁদিতে এমন গাঁটা মারল যে ঘিলুটিলু সব নড়ে উঠল এক সঙ্গে। আমি কেবল বললুম, ক্যাঁক ৷

ক্যাবলা বললে, ও-রকম গােটা মারলে তো বুদ্ধি বেরুবে না, বরং তালগোল পাকিয়ে যাবে সমস্ত । এখন ক্যাঁক বলছে, এর পরে ঘ্যাঁক-ঘ্যাঁক বলতে থাকবে আর ফস করে কামড়ে দেবে কাউকে ।

গাঁট্টার ব্যথা ভুলে আমি চটে গেলুম।

ঘ্যাঁক করে কামড়াব কেন ? আমি কি কুকুর ?

টেনিদা বললে, ইউ শাটাপ-অকর্মার ধাড়ি ।

হাবুল বললে, চুপ কইর‌্যা থাক প্যালা—আর একখান গাঁট্টা খাইলে ম্যাও-ম্যাও কইর‌্যা বিলাইয়ের মতন ডাকতে আরম্ভ করবি । অরে ছাইড়া দাও টেনিদা । আমার মাথায় একখান বুদ্ধি আসছে।

টেনিদা ভীষণ উৎসাহ পেয়ে ঢাকাই ভাষা নকল করে ফেলল : কইয়্যা ফ্যালাও ৷

গানের পার্টি ? মানে—সেই যে চাঁদা দাও গো পুরবাসী ? আর শালু নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াব?’—টেনিদা দাঁত খিচিয়ে বললে, ‘আহা-হা, কী একখানা বুদ্ধিই বের করলেন । লোকে সেয়ানা হয়ে গেছে, ওতে, আর চিড়ে ভেজে ? সারা দিন ঘুরে হয়তো পাওয়া যাবে বত্ৰিশটা নয়া পয়সা আর দু:খানা ছেড়া কাপড়। দুদ্দুর!

ক্যাবলা টকাৎ করে চুয়িং গামটাকে আবার গালের একপাশে ঠেলে দিলে।

টেনিদা—দি আইডিয়া ।

আমরা সবাই একসঙ্গে ক্যাবলার দিকে তাকালুম। আমাদের দলে সেই-ই সব চেয়ে ছোট আর লেখাপড়ায় সবার সেরা— হায়ার সেকেন্ডারিতে ন্যাশনাল স্কলার । খবরের কাগজে কুশলকুমার মিত্রের ছবি বেরিয়েছিল স্ট্যান্ড করবার পরে, তোমরা তো সে-ছবি দেখেছি। সেই ই ক্যাবলা ।

ক্যাবলা ছোট হলেও আমাদের চার মূর্তির দলে সেই-ই সবচেয়ে জ্ঞানী, চশমা নেবার পরে তাকে আরও ভারিক্কি দেখায়। তাই ক্যাবলা কিছু বললে আমরা সবাই-ই মন দিয়ে তার কথা শুনি ।

ক্যাবলা বললে, আমরা শেষ রাত্ৰে-মানে এই ভোরের আগে বেরুতে পারি সবাই।

‘শেষ রাত্তিরে!’—হাবুল হাঁ করে রইল : শেষ রাত্তিরে ক্যান ? চুরি করুম নাকি আমরা ?

‘চুপ কর না হাবলা—’ ক্যাবলা বিরক্ত হয়ে বললে, ‘আগে ফিনিশ করতে দে আমাকে । আমি দেখেছি, ভোরবেলায় ছোট-ছোট দল কীর্তন গাইতে বেরোয় । লোকে রাগ করে না, সকালবেলায় ভগবানের নাম শুনে খুশি হয়। পয়সাটয়সাও দেয় নিশ্চয় ।

টেনিদা বললে, হুঁ, রাত্তিরে ঘুমিয়ে টুমিয়ে ভোরবেলায় লোকের মন খুশিই থাকে। তারপর যেই বাজারে কুমড়ো-কাঁচকলা আর চিংড়ি মাছ কিনতে গেল, অমনি মেজাজ খারাপ । আর অফিস থেকে ফেরবার পরে তো-ইরে বাবাস ।

আমি বললুম, মেজদা যেই হাসপাতাল থেকে আসে—অমনি সক্কলকে ধরে ইনজেকশন দিতে চায় ৷

হাবুল বললে, তর মেজদা যদি পাড়ার বড় লোকগুলারে ধইরা তাগো পুটুস-পুটুস কইর‌্যা ইনজেকশন দিতে পারত—

টেনিদা চেঁচিয়ে উঠল ; ‘অর্ডার-অর্ডার, ভীষণ গোলমাল হচ্ছে। কিন্তু ক্যাবলার আইডিয়াটা আমার বেশ মনে ধরেছে—মানে যাকে বলে সাইকোলজিক্যাল। সকালে লোকের মন খুশি থাকে—ইয়ে যাকে বলে বেশ পবিত্র থাকে, তখন এক-আধটা বেশ ভক্তিভরা গান-টান শুনলে কিছু না-কিছু দেবেই। রাইট । লেগে পড়া যাক তা হলে ৷

আমি বললুম, কিন্তু জিমন্যাস্টিক ক্লাবের জন্যে আমরা হরিসংকীর্তন গাইব ?

ক্যাবলা বললে, হরি-সংকীর্তন কেন ? তুই তো একটু-আধটু লিখতে পারিস, একটা গান লিখে ফ্যাল। ভীম, হনুমান—এইসব বীরদের নিয়ে বেশ জোরালো গান।

আমি—

‘হাঁ, তুই, তুই।’ —টেনিদা আবার গাঁট্টা তুলল : মাথার ঘিলুটা আর একবার নড়িয়ে দিই, তা হলেই একেবারে আকাশবাণীর মতো গান বেরুতে থাকবে ।

আমি এক লাফে নেমে পড়লুম। চাটুজ্যেদের রোয়াক থেকে ।

বেশ, লিখব গান। কিন্তু সুর দেবে কে ?

টেনিদা বললে, আরে সুরের ভাবনা কী—একটা কেত্তন-ফেক্তন লাগিয়ে দিলেই হল।

‘আর গাইব কেডা?’ হাবুলের প্রশ্ন শোনা গেল : আমাগো গলায় তো ভাউয়া ব্যাংয়ের মতন আওয়াজ বাইর অইব ।

‘হ্যাং ইয়োর ভাউয়া ব্যাং।’ —টেনিদা বললে, ‘এ-সব গান আবার জানতে হয় নাকি ?’ গাইলেই হল । কেবল আমাদের থান্ডার ক্লাবের গোলকিপার পাঁচুগোপালকে একটু যোগাড় করতে হবে, ও হারমোনিয়াম বাজাতে পারে—গাইতেও পারে-মানে আমাদের লিড করবে।

হাবুল বললে,“আমাগো বাড়িতে একটা কর্তাল আছে, লইয়া আসুম।

ক্যাবলা বললে, আমাদের ঠাকুর দেশে গেছে, তার একটা ঢোল আছে। সেটা আনতে পারি ।

‘গ্র্যান্ড !’—টেনিদা ভীষণ খুশি হল : ‘ওটা আমিই বাজাব এখন। দেন এভরিথিং ইজ কমপ্লিট । শুধু গান বাকি। প্যালা-হাফ অ্যান আওয়ার টাইম । দৌড়ে চলে যা—গান লিখে নিয়ে আয় । এর মধ্যে আমরা একটু তেলেভাজা খেয়েনি ৷

মাথা চুলকে আমি বললুম, আমিও দুটাে তেলেভাজা খেয়ে গান লিখতে যাই না কেন? মানে—দু-একটা আলুর চপ-টপ খেলে বেশ ভাব আসত।

আর আলুর চাপ খেয়ে কাজ নেই। যা-বাড়ি যা—কুইক । আধা ঘণ্টার মধ্যে গান লিখে না আনলে ভাব কী করে বেরোয় আমি দেখব। কুইক—কুইক—

টেনিদা রোয়াক থেকে নেমে পড়তে যাচ্ছিল। অগত্যা আমি ছুট লাগালুম। কুইক নয়—কুইকেস্ট যাকে বলে।

 

জাগো রে নগরবাসী, ভজো হনুমান

করিবেন তোমাদের তিনি বলবান ।

ও গাে—সকালে বিকালে যেবা করে ভীমনাম

সেই হয় মহাবীর—নানা গুণধাম ।

জাগো রে নগরবাসী—ডন দাও, ভাঁজো রে ডামবেল,

খাও রে পরান ভরি ছোলা-কলা-আম-জাম-বেলহ

ও রে সকলে বীর, হও ভীম, হাও হনুমান,

জাগিবে ভারত এতে করি অনুমান।

 

ক্যাবলা গান শুনে বললে, আবার অনুমান করতে গেলি কেন? লেখ-জাগিবে ভারত এতে পাইবে প্ৰমাণ ।

টেনিদা বললে, রাইট । কারেকটি সাজেসশন ৷

হাবুল বললে, কিন্তু মানুষরে হনুমান হইতে কইবা? চেইত্যা যাইব না ?

টেনিদা বললে, চটবে কেন? পশ্চিমে হনুমানজীর কত কদর। জয় হনুমান বলেই তো কুস্তি করতে নামে। হনুমান সিং—হনুমানপ্ৰসাদ, এ-রকম কত নাম হয় ওদের। হনুমান কি চাড্ডিখানা কথা রে । এক লাফে সাগর পেরুলেন, লঙ্কা পোড়ালেন, গন্ধমাদন টেনে আনলেন, রাবণের রথের চুড়োটা কড়মড়িয়ে চিবিয়ে দিলেন—এক দাঁতের জোরটাই ভেবে দ্যাখ একবার।

‘তবে কিনা—খাও রে পরান ভরি ছোলা-কলা-আম-জাম-বেল—’চুয়িং গাম খেতে খেতে ক্যাবলা বললে, এই লাইনটা ঠিক—

আমি বললুম, বারে, গানে রস থাকবে না? কলা-আম-জামে কত রস বল দিকি? আর দুটাে-চারটে ভালো জিনিস খাওয়ার আশা না থাকলে লোকে খামকা ডামবেল-বারবেল ভাঁজতেই বা যাবে কেন ? লোভও তো দেখাতে হয় একটু ৷

‘ইয়া!’—টেনিদা ভীষণ খুশি হল : ‘এতক্ষণে প্যালার মাথা খুলেছে। এই গান গেয়েই আমরা কাল ভোররাত্তিরে পাড়ায় কীর্তন গাইতে বেরুব । ডি-লা-গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস—

আমরা তিনজন চেচিয়ে উঠলুম। :“ইয়াক—ইয়াক ?

এবং পরদিন ভোরে—

শ্রদ্ধানন্দ পার্কের কাছে কাক ডাকবার আগে, ঝাড়ুদার বেরুনাের আগে প্রথম ট্রাম দেখা না দিতেই—

 

জাগো রে নগরবাসী, ভজো হনুমান—

 

আগে-আগে গলায় হারমোনিয়াম নিয়ে পাঁচুগোপাল। তার পেছনে ঢোল নিয়ে টেনিদা, টেনিদার পাশে কর্তাল হাতে ক্যাবলা। থার্ড লাইনে আমি আর হাবুল সেন। টেনিদা বলে দিয়েছে, তোদের দুজনের গলা একেবারে দাঁড়কাকের মতো বিচ্ছিরি, কোনও সুর নেই, তোরা থাক ব্যাক-লাইনে ।

আহা—টেনিদা যেন গানের গন্ধৰ্ব্ব । একদিন কী মনে করে যেন সন্ধ্যাবেলায় গড়ের মাঠে সুর ধরেছিল—‘আজি দখিন দুয়ার খোলা এসো হে, এসো হে, এসো হে।’ কিন্তু আসবে কে ? জন তিনেক লোক অন্ধকারে ঘাসের ওপর শুয়েছিল, দু লাইন শুনেই তারা তড়াক তড়াক করে উঠে বসিল, তারপর তৃতীয় লাইন ধরতেই দুড়দুড় করে টেনে দৌড় এসপ্ল্যানেডের দিকে—যেন ভূতে তাড়া করেছে!

আমি বলতে যাচ্ছিলুম, তোমার গলায় তো মা সরস্বতীর রাজহাঁস ডাকে—

কিন্তু হাবুল আমায় থামিয়ে দিলে বললে, চুপ মাইর‌্যা থাক। ভালোই হইল, তর আমার গাইতে হইব না। অরা তিনটায় গাঁ-গাঁ কইর‌্যা চ্যাঁচাইব, তুই আর আমি পিছন থিক্য অ্যাঁ-অ্যাঁ করুম।

সুতরাং রাস্তায় বেরিয়েই পাঁচুর হারমোনিয়ামের প্যাঁ প্যাঁ আওয়াজ, টেনদিার দুমদাম ঢোল আর ক্যাবলার ঝমাঝম কর্তাল। তারপরেই বেরুল সেই বাঘা কীর্তন:

 

“ওগো—সকালে বিকালে যেবা করে ভীমনাম—”

 

পাঁচুর পিনপিনে গলা, টেনিদার গগনভেদী চিৎকার, ক্যাবলার ক্যাঁ-ক্যাঁ আওয়াজ, হাবুলের সর্দি-বসা স্বর আর সেই সঙ্গে আমার কোকিল-খাওয়া রব । কোরাস তো দূরে থাক—পাঁচটা গলা পাঁচটা গোলার মতো দিগ্বিদিকে ছুটিল ;

 

“জাগো রে নগরবাসী, ডন দাও-ভাঁজো রে ডামবেল—”

 

ঘোঁয়াক ঘোঁয়াক করে আওয়াজ হলো, দুটো কুকুর সারা রাত চেঁচিয়ে কেবল একটু ঘুমিয়েছে—তারা বাঁইবাঁই করে ছুটল। গড়ের মাঠের লোকগুলো তো তবু এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত দৌড়েছিল, এরা ডায়মন্ড হারবারের আগে গিয়ে থামবে বলে মনে হল না ।

এবং তৎক্ষণাৎ—

দড়াম করে খুলে গেল ঘোষেদের বাড়ির দরজা। বেরুলেন সেই মোটা গিন্নী—যাঁর চিৎকারে পাড়ায় কাক-চিল পড়তে পায় না।

আমাদের কোরাস থেমে গেল তাঁর একটি সিংহগর্জনে ।

কী হচ্ছে অ্যাঁ ! এই লক্ষ্মীছাড়া হতভাগা টেনি-কী আরম্ভ করেছিস এই মাঝরাত্তিরে ?

অত বড় লিডার টেনিদাও পিছিয়ে গেল তিন পা !

মানে মাসিমা—মানে ইয়ে এই—ইয়ে—একসারসাইজ ক্লাবের জন্য চাঁদা—

চাঁদা ! অমন মড়া-পোড়ানো গান গেয়ে—পাড়াসুদ্ধ লোকের পিলে কাঁপিয়ে মাঝরাত্তিরে চাঁদা? দূর হ এখেন থেকে ভূতের দল, নইলে পুলিশ ডাকব এক্ষুনি ।

দড়াম করে দরজা বন্ধ হল পরক্ষণেই । কীর্তন-পার্টি শোকসভার মতো স্তব্ধ একেবারে ! হাবুল করুণ স্বরে বলল,“হইব না টেনিদা। এই গানে কারও হৃদয় গলব না মনে হইত্যাছে ৷

হবে না মানে ?—টেনিদা পান্তুয়ার মতো মুখ করে বললে, হতেই হবে। লোকের মন নরম করে তবে ছাড়ব ।

কিন্তু ঘোষমসিমা তো আরও শক্ত হয়ে গেলেন —আমাকে জানাতে হল ।

উনি তো কেবল চেঁচিয়ে ঝগড়া করতে পারেন, জিমন্যাস্টিকের কী বুঝবেন। অলরাইট—নেকসট হাউস। গজকেষ্টবাবুর বাড়ি ।

আবার পদযাত্ৰা । আর সম্মিলিত রাগিণী ;

 

“খাও রে পরান ভরি ছোলা-কলা-আম-জাম-বেল—

হও রে সকলে বীর, হাও ভীম, হাও হনুমান—”

 

পাঁচু, টেনিদা, ক্যাবলা তেড়ে কেবল ‘হও হনুমান’ পর্যন্ত গেয়েছে, আমি আর হাবলা ‘আম’ পর্যন্ত বলে সুর মিলিয়েছি, অমনি গজকেষ্ট হালদারের দোতালার ঝুলবারান্দা থেকে—

না, চাঁদ নয় ! প্রথমে একটা ফুলের টব, তার পরেই একটা কুঁজো । মেঘনাদকে দেখা গেল না, কিন্তু টবটা আর একটু হলেই আমার মাথায় পড়ত, আর কুঁজোটা একেবারে টেনিদার মৈনাকের মতো নাকের পাশ দিয়ে ধাঁ করে বেরিয়ে গেল ।

আমি চেঁচিয়ে বললুম, টেনিদা—গাইডেড মিশাইল।

বলতে-বলতেই আকাশ থেকে নেমে এল প্ৰকাণ্ড এক হুলো বেড়াল-পড়ল পাঁচুর হারমোনিয়ামের ওপর। খ্যাঁচ-ম্যাচ করে এক বিকট আওয়াজ— হারমোনিয়ামসুদ্ধ পাঁচু একেবারে চিৎ—আর ক্যাঁচ-ক্যাঁচাঙ বলে বেড়ালটা পাশের গলিতে উধাও !

ততক্ষণে আমরা উর্ধ্বশ্বাসে ছুটেছি। প্রায় হ্যারিসন রোড পর্যন্ত দৌড়ে থামতে হল আমাদের। পাঁচু কাঁদো-কাঁদো গলায় বললে, টেনিদা, এনাফ। এবার আমি বাড়ি যাব ৷

হাবুল বললে, হ, নাইলে মারা পোড়বা সক্কলে । অখন কুজা ফ্যালাইছে, এইবারে সিন্দুক ফ্যালাইব । অখন বিলাই ছুইর‌্যা মারছে, এরপর ছাত থিক্য গোরু ফ্যালাইব ।

টেনিদা বললে, শাট আপ—ছাতে কখনও গোরু থাকে না ।

না থাকুক গোরু—ফিক্যা মারতে দোষ কী । আমি অখন যাই গিয়া । হিস্ট্রি পড়তে হইব ।

এঃ—হিস্ট্রি পড়বেন !—টেনিদা বিকট ভেংচি কাটল : ‘ইদিকে তো আটটার আগে কোনওদিন ঘুম ভাঙে না। খবদার হাবলা—পালানো চলবে না। আর একটা চানস নেব । এত ভালো গান লিখেছে প্যালা, এত দরদ দিয়ে গাইছি আমরা—জয় হনুমান আর বীর ভীমসেন মুখ তুলে চাইবেন না ? এবং মহৎ কাজ করতে যাচ্ছি। আমরা—কিছু চাঁদা জুটিয়ে দেবেন না তাঁরা? ট্রাই—ট্রাই এগেন । মন্ত্রের সাধন কিংবা—ধর, পাঁচু—

পাঁচুগোপাল কাঁউমাউ করতে লাগল। : ‘একসকিউজ মি টেনিদা। পেল্লায় হুলো বেড়াল, আর একটু হলেই নাক-ফাক অাঁচড়ে নিত আমার । আমি বাড়ি যাব।

বাড়ি যাবেন?—টেনিদা আবার একটা যাচ্ছেতাই ভেংচি কাটল : ‘মামাবাড়ির আবদার পেয়েছিস, না ? টেক কেয়ার পেঁচো- ঠিক এক মিনিট সময় দিচ্ছি। যদি গান না ধরিস, এক থাপ্পড়ে তোর কান—

ক্যাবলা বললে, কানপুরে চলে যাবে।

আমি হাবুলের কানে-কানে বললুম, লোকে আমাদের এর পরে ঠেঙিয়ে মারবে, হাবলা । কী করা যায় বল তো ?

তুই গান লেইখ্যা ওস্তাদি করতে গেলি ক্যান ?

সংকীর্তন গাইবার বুদ্ধি তো তুই-ই দিয়েছিলি ৷

হাবুল কী বলতে যাচ্ছিল, আবার প্যাঁ-প্যাঁ করে হারমোনিয়াম বেজে উঠল পাঁচুর । এবং :

 

“জাগো রে নগরবাসী-ভজো হনুমান—”

 

ঢোলক-করতালের আওয়াজে আবার চারদিকে ভূমিকম্প শুরু হল। আর পাঁচটি গলার স্বরে সেই অনবদ্য সংগীতচর্চা ;

 

“করিবেন তোমাদের তিনি বলবান—

 

কোনও সাড়াশব্দ নেই কোথাও। কুঁজো নয়, বেড়াল নয়, গাল নয়, কিছু নয়। সামনে কন্ট্রাকটার বিধুবাবুর নতুন তেতলা বাড়ি নিথর ।

আমাদের গান চলতে লাগল। :

 

“ওগো—সকালে বিকালে যেবা করে ভীমনাম—”

 

‘ডামবেল’ পর্যন্ত যেই এসেছে, দড়াম করে দরজা খুলে গেল আবার । গায়ে একটা কোট চড়িয়ে, একটা সুটকেস হাতে প্রায় নাচতে-নাচতে বেরুলেন বাড়ির মালিক বিধুবাবু।

আমি আর হাবলা টেনে দৌড় লাগাবার তালে আছি, আঁক করে পাঁচুর গান থেমে গেছে, টেনিদার হাত থমকে গেছে ঢোলের ওপর। বিধুবাবু আমাদের মাথায় সুটকেস ছুড়ে মারবেন। কিনা বোঝবার আগেই—

ভদ্রলোক টেনিদাকে এসে জাপটে ধরলেন সুটকেসসুদ্ধ। নাচতে লাগলেন তারপর ।

বাঁচালে টেনিরাম, আমায় বাঁচালে । অ্যালার্ম ঘড়িটা খারাপ হয়ে গেছে, তোমাদের ডাকাত-পড়া গান কানে না এলে ঘুম ভাঙত না ; পাঁচটা সাতের গাড়ি ধরতে পারতুম না-দেড় লাখ টাকার কন্ট্রাকটিই হাতছাড়া হয়ে যেত। কী চাই তোমাদের বলো । শেষ রাতে তিনশো শেয়ালের কান্না কেন জুড়ে দিয়েছ। বলো—আমি তোমাদের খুশি করে দেব।

‘শেয়ালের কান্না না স্যার—শেয়ালের কান্না না !’—বিধুবাবুর সঙ্গে নাচতে-নাচতে তালে-তালে টেনিদা বলে যেতে লাগল। : ‘একসারসাইজ ক্লাব-ডামবেল-বারবেল কিনব-অন্তত পঞ্চাশটা টাকা দরকার—’

বেলা ন’টা। রবিবারের ছুটির দিন। চাটুজ্যেদের রোয়াকে বসে আছি আমরা। পাঁচুগোপালও গেস্ট হিসেবে হাজির আছে আজকে ।

মেজাজ আমাদের ভীষণ ভালো । পঞ্চাশ টাকা দিয়ে গেছেন বিধুবাবু। সামনের মাসে আরও পঞ্চাশ টাকা দেবেন কথা দিয়েছেন ।

নিজের পয়সা খরচ করে টেনিদা আমাদের আইসক্রিম খাওয়াচ্ছিল। আইসক্রিম শেষ করে, কাগজের গেলাসটাকে চাটতে-চাটিতে বলল, তবে যে বলেছিলি হনুমান আর ভীমের নামে কাজ হয় না ? হুঁ হুঁ—কলিকাল হলে কী হয়, দেবতার একটা মহিমে আছে না ?

পাঁচু বললে, আর হুলো বেড়ালটা যদি আমার ঘাড়ে পড়ত—

আমি বললুম, আর ফুলের টব যদি আমার মাথায় পড়ত—

হাবুল বললে, কুঁজাখান যদি দিমাস কইর‌্যা তোমার নাকে লাগত—

টেনিদা বললে, হ্যাং ইয়ের হুলো বেড়াল, ফুলের টব, কুঁজো ! ডি-লা-গ্র্যান্ডি মেফিস্টোফিলিস—?

আমরা চেঁচিয়ে বললু, ইয়াক ইয়াক।

কুট্টিমামার দন্ত-কাহিনী - নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়


অ-     অ+

আমি সগর্বে ঘোষণা করলাম, জনিস, আমার ছোট কাকা দাঁত বাঁধিয়েছে।

ক্যাবলা একটা গুলতি নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে একটা নেড়ী কুকুরের ল্যাজকে তাক করছিল। কুকুরটা বেশ বসে ছিল, হঠাৎ কী মনে করে ঘোঁক শব্দে পিঠের একটা এঁটুলিকে কামড়ে দিলে—তারপর পাঁই-পাঁই করে ছুট লাগল। ক্যাবলা ব্যাজার হয়ে বললে, দ্যুৎ! কতক্ষণ ধরে টার্গেট করছি—ব্যাটা পালিয়ে গেল!—আমার দিকে ফিরে বললে, তোর ছোট কাকা দাঁত বাঁধিয়েছে—এ আর বেশি কথা কী! আমার বড় কাকা, মেজ কাকা, রাঙা কাকা সবাই দাঁত বাঁধিয়েছে। আচ্ছা, কাকারা সকলে দাঁত বাঁধায় কেন বল তো? এর মানে কী?

হাবুল সেন বললে, হঃ! এইটা বোঝোস নাই। কাকাগো কামই হইল দাঁত খিঁচানি। অত দাঁত খিঁচালে দাঁত খারাপ হইব না তো কী?

টেনিদা বসে বসে এক মনে একটা দেশলাইয়ের কাঠি চিবুচ্ছিল। টেনিদার ওই একটা অভ্যেস—কিছুতেই মুখ বন্ধ রাখতে পারে না। একটা কিছু না-কিছু তার চিবোনো চাই-ই চাই। রসগোল্লা, কাটলেট, ডালমুট, পকৌড়ি, কাজু বাদাম—কোনওটায় অরুচি নেই। যখন কিছু জোটে না, তখন চুয়িংগাম থেকে শুকনো কাঠি—যা পায় তাই চিবোয়। একবার ট্রেনে যেতে যেতে মনের ভুলে পাশের ভদ্রলোকের লম্বা দাড়ির ডগাটা খানিক চিবিয়ে দিয়েছিল—সে একটা যাচ্ছেতাই কাণ্ড! ভদ্রলোক রেগে গিয়ে টেনিদাকে ছাগল-টাগল কী সব যেন বলেছিলেন।

হঠাৎ কাঠি চিবুনো বন্ধ করে টেনিদা বললে, দাঁতের কথা কী হচ্ছিল র‌্যা? কী বলছিলি দাঁত নিয়ে?

আমি বললাম, আমার ছোট কাকা দাঁত বাঁধিয়েছে।

ক্যাবলা বললে, ইস-ভারি একটা খবর শোনাচ্ছেন ঢাকঢোল বাজিয়ে! আমার বড় কাকা, মেজ কাকা, ফুলু মাসি—

টেনিদা বাধা দিয়ে বললে, থাম থাম বেশি ফ্যাচ-ফ্যাচ করিসনি। দাঁত বাঁধানোর কী জানিস তোরা? হুঁঃ! জানে বটে আমার কুট্টিমামা গজগোবিন্দ হালদার। সায়েবরা তাকে আদর করে ডাকে মিস্টার গাঁজা-গাবিন্ডে। সে-ও দাঁত বাঁধিয়েছিল। কিন্তু সে-দাঁত এখন আর তার মুখে নেই—আছে ডুয়ার্সের জঙ্গলে!

—পড়ে গেছে বুঝি?

—পড়েই গেছে বটে!—টেনিদা তার খাঁড়ার মতো নাকটাকে খাড়া করে একটা উঁচুদরের হাসি হাসল—যাকে বাংলায় বলে হাই ক্লাস। তারপর বললে, সে-দাঁত কেড়ে নিয়ে গেছে।

—দাঁত কেড়ে নিয়েছে? সে আবার কী? আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, এত জিনিস থাকতে দাঁত কাড়তে যাবে কেন?

কেন? টেনিদা আবার হাসল: দরকার থাকলেই কাড়ে। কে নিয়েছে বল দেখি?

ক্যাবলা অনেক ভেবে-চিন্তে বললে, যার দাঁত নেই।

—ইঃ, কী পণ্ডিত! টেনিদা ভেংচি কেটে বললে, দিলে বলে! অত সোজা নয়, বুঝলি? আমার কুট্টিমামার দাঁত যে-সে নয়-সে এক একটা মুলোর মতো। সে-বাঘা দাঁতকে বাগানো যার-তার কাজ নয়।

—তবে বাগাইল কেডা? বাঘে? হাবুলের জিজ্ঞাসা।

—এঃ, বাঘে! বলছি দাঁড়া। ক্যাবলা, তার আগে দু আনার ডালমুট নিয়ে আয়—

হাঁড়ির মতো মুখ করে ক্যাবলা ডালমুট আনতে গেল। মানে, যেতেই হল তাকে।

আমাদের জুলজুলে চোখের সামনে একাই ডালমুটের ঠোঙা সাবাড় করে টেনিদা বললে, আমার কুট্টিমামার কথা মনে আছে তো? সেই যে চা-বাগানে চাকরি করে আর একই দশজনের মতো খেয়ে সাবাড় করে? আরে, সেই লোকটা-যে ভালুকের নাক পুড়িয়ে দিয়েছিল?

আমরা সমস্বরে বললাম, বিলক্ষণ! ‘কুট্টিমামার হাতের কাজ’ কি এত সহজেই ভোলবার?

টেনিদা বললে, সেই কুট্টিমামারই গল্প। জানিস তো—সায়েবরা ডেকে নিয়ে মামাকে চা-বাগানে চাকরি দিয়েছিল? মামা খাসা আছে সেখানে। খায়-দায় কাঁসি বাজায়। কিন্তু বেশি সুখ কি আর কপালে সয় রে? একদিন জুত করে একটা বন-মুরগির রোস্টে যেই কামড় বসিয়েছে—অমনি ঝন-ঝনাৎ! কুট্টিমামার একটা দাঁত পড়ল প্লেটের ওপর খসে আর তিনটে গেল নড়ে।

হয়েছিল কী, জনিস? শিকার করে আনা হয়েছিল তো বন-মুরগি? মাংসের মধ্যে ছিল গোটাচারেক ছররা। বেকায়দায় কামড় পড়তেই অ্যাকসিডেন্ট, দাঁতের বারোটা বেজে গেল।

মাংস রইল মাথায়—ঝাড়া তিন ঘন্টা নাচানাচি করলে কুট্টিমামা। কখনও কেঁদে বললে, পিসিমা গো তুমি কোথায় গেলে? কখনও কঁকিয়ে ককিয়ে বললে, ইঁ-হি-হি-আমি গেলুম! আবার কখনও দাপিয়ে দাপিয়ে বললে, ওরে বনমুরগি রে—তোর মনে এই ছিল রে! শেষকালে তুই আমায় এমন করে পথে বসিয়ে গেলি রে।

পাকা তিন দিন কুট্টিমামা কিচ্ছুটি চিবুতে পারল না। শুধু রোজ সের-পাঁচেক করে খাঁটি দুধ আর ডজন-চারেক কমলালেবুর রস খেয়ে কোনওমতে পিত্তি রক্ষা করতে লাগল।

দাঁতের ব্যথা-ট্যথা একটু কমলে সায়েবরা কুট্টিমামাকে বললে, তোমাকে ডেনটিস্টের ওখানে যেতে হবে।

—অ্যাঁ।

সায়েবরা বললে, দাঁত বাঁধিয়ে আসতে হবে।

ডেনটিস্টের নাম শুনেই তো কুট্টিমামার চোখ তালগাছে চড়ে গেল। কুট্টিমামার দাদু নাকি একবার দাঁত তুলতে গিয়েছিলেন। যে-ডাক্তার দাঁত তুলেছিলেন, তিনি চোখে কম দেখতেন। ডাক্তার করলেন কী—দাঁত ভেবে কুট্টিমামার দাদুর নাকে সাঁড়াশি আটকে দিয়ে সেটাকেই টানতে লাগলেন। আর বলতে লাগলেন : ইস—কী প্ৰকাণ্ড গজদন্ত আর কী ভীষণ শক্ত! কিছুতেই নাড়াতে পারছি না!

কুট্টিমামার দাদু, তো হাঁই-মাই করে বলতে লাগলেন, ওঁটা—ওঁটা আমার আঁক। আঁক!—টানের চোটে নাক বেরুচ্ছিল না—“অাঁক৷ ”

ডাক্তার রেগে বললেন, আর হাঁক-ডাক করতে হবে না—খুব হয়েছে। আরও গোটাকয়েক টান-ফান দিয়ে নাকটাকে যখন কিছুতেই কায়দা করতে পারলেন না—তখন বিরক্ত হয়ে বললেন : নাঃ, হল না। এমন বিচ্ছিরি শক্ত দাঁত আমি কখনও দেখিনি! এ-রকম দাঁত কোনও ভদ্রলোক তুলতে পারে না।

কুট্টিমামার দাদু বাড়ি ফিরে এসে বারো দিন নাকের ব্যথায় বিছানায় শুয়ে রইলেন। তেরো দিনের দিন উকিল ডাকিয়ে উইল করলেন : “আমার পুত্র বা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে যে-কেহ দাঁত বাঁধাইতে যাইবে, তাহাকে আমার সমস্ত সম্পত্তি হইতে চিরতরে বঞ্চিত করিব। ”

অবশ্যি কুট্টিমামার দাদুর সম্পত্তিতে কুট্টিমামার কোনও রাইট নেই—তবু দাদুর আদেশ তো! কুট্টিমামা গাঁই-ঁগুই করতে লাগলেন। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে ‘মাই নোজ’-টোজও বলবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সায়েবের গোঁ-জনিস তো? ঝড়াং করে বলে দিলে, নো ফোকলা দাঁত উইল ডু! দাঁত বাঁধাতেই হবে।

কুট্টিমামা তো মনে মনে “তনয়ে তারো তারিণী” বলে রামপ্রসাদী গান গাইতে গাইতে, বলির পাঁঠার মতো কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে ডেনটিস্টের কাছে হাজির। ডেনটিস্ট প্রথমেই তাঁকে একটা চেয়ারে বসালে। তারপর দাঁতের ওপরে খুর খুর করে একটা ইলেকট্ৰিক বুরুশ বসিয়ে সেগুলোকে অর্ধেক ক্ষয় করে দিলে। একটা ছােট হাতুড়ি দিয়ে ঠুকে ঠুকে বাকি সবকটা দাঁতকে নড়িয়ে ফেললে। শেষে বেজায় খুশি হয়ে বললে, এর দু-পাটি দাঁতই খারাপ। সব তুলে ফেলতে হবে।

শুনেই কুট্টিমামা প্রায় অজ্ঞান। গোটা-তিনেক খাবি খেয়ে বললেন, নাকটাও?

ডাক্তার ধমক দিয়ে বললেন, চোপরাও!

তারপর আর কী? একটা পোল্লায় সাঁড়াশি নিয়ে ডাক্তার কুরুৎ-কুরুৎ করে কুট্টিমামার সবকটা দাঁত তুলে দিলে। কুট্টিমামা আয়নায় নিজের মূর্তি দেখে কেঁদে ফেললেন। কিছুটি নেই মুখের ভেতর—একদম গাঁয়ের পেছল রাস্তার মতো-মাঝে মাঝে গর্ত। ওঁকে ঠিক বাড়ির বুড়ি ধাই রামধনিয়ার মত দেখাচ্ছিল।

কুট্টিমামা কেঁদে ফ্যাক ফ্যাক করে বললেন, ওগো আমার কী হল গো—

ডাক্তার আবার ধমক দিয়ে বললে, চোপরাও! সাত দিন পরে এসো-বাঁধানো দাঁত পাবে।

বাঁধানো দাঁত নিয়ে কুট্টিমামা ফিরলেন। দেখতে শুনতে দাঁতগুলো নেহাত খারাপ নয়। খাওয়াও যায় একরকম। খালি একটা অসুবিধে হত। খাওয়ার অর্ধেক জিনিস জমে থাকত দাঁতের গোড়ায়। পরে আবার সেগুলোকে জাবর কাটতে হত।

তবু ওই দাঁত নিয়েই দুঃখে সুখে কুট্টিমামার দিন কাটছিল। কিন্তু সায়েবদের কাণ্ড জনিস তো? ওদের সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়—কিছুতেই তিনটে দিন বসে থাকতে পারে না। একদিন বললে, মিস্টার গাঁজা-গাবিণ্ডে, আমরা বাঘ শিকার করতে যাব। তোমাকেও যেতে হবে। আমাদের সঙ্গে।

বাঘ-টাঘের ব্যাপার কুট্টিমামার তেমন পছন্দ হয় না। কারণ বাঘ হরিণ নয়—তাকে খাওয়া যায় না, বরং সে উলটে খেতে আসে। কুট্টিমামা খেতে ভালোবাসে, কিন্তু কুট্টিমামাকেই কেউ খেতে ভালোবাসে—এ-কথা ভাবলে তাঁর মন ব্যাজার হয়ে যায়। বাঘগুলো যেন কী! গায়ে যেমন বিটকেল গন্ধ, স্বভাব-চরিত্তিরও তেমনি যাচ্ছেতাই।

কুট্টিমামা কান চুলকে বললে, বাঘ স্যার—ভেরি ব্যাড স্যার—আই নট লাইক স্যার—

কিন্তু সায়েবরা সে-কথা শুনলে তো! গোঁ যখন ধরেছে তখন গেলই। আর কুট্টিমামাকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে চলে গেল।

গিয়ে ডুয়ার্সের জঙ্গলে এক ফরেস্ট বাংলোয় উঠল।

চারদিকে ধুন্ধুমার বন। দেখলেই পিত্তি ঠাণ্ডা হয়ে আসে। রাত্তিরে হাতির ডাক শোনা যায়—বাঘ হুম হাম করতে থাকে। গাছের ওপর থেকে টুপটুপ করে জোঁক পড়ে গায়ে। বানর এসে খামোকা ভেংচি কাটে। সকালে কুট্টিমামা দাড়ি কামাচ্ছিলেন। —একটা বানর এসে ‘ইলিক চিলিক’ এইসব বলে তাঁর বুরুশটা নিয়ে গেল! আর সে কী মশা! দিন নেই—রাত্তির নেই-সমানে কামড়াচ্ছে। কামড়ানোও যাকে বলে! দু-তিন ঘন্টার মধ্যেই হাতে পায়ে মুখে যেন চাষ করে ফেললে।

তার মধ্যে আবার সায়েবগুলো মোটর গাড়ি নিয়ে জঙ্গলের ভেতর ঢুকল বাঘ মারতে |

—মিস্টার গাঁজা-গাবিন্ডে, তুমিও চলো।

কুট্টিমামা তক্ষুনি বিছানায় শুয়ে হাত পা ছুড়তে আরম্ভ করে দিলে। চােখ দুটােকে আলুর মতো বড় বড় করে, মুখে গ্যাঁজলা তুলে বলতে লাগল : বেলি পেইন স্যা—-পেটে ব্যথা স্যার—অবস্থা সিরিয়াস স্যার—

দেখে সায়েবরা ঘোঁয়া-ঘোঁয়া—ঘ্যাঁয়োৎ-ঘ্যাঁয়োৎ করে বেশ খানিকটা হাসল। —ইউ গাঁজা-গাবিন্ডে, ভেরি নটি—বলে একজন কুট্টিমামার পেটে একটা চিমটি কাটলে—তারপর বন্দুক কাঁধে ফেলে শিকারে চলে গেল।

আর যেই সায়েবরা চলে যাওয়া—অমনি তাড়াক করে উঠে বসলেন কুট্টিমামা। তক্ষুনি এক ডজন কলা, দুটাে পাউরুটি আর এক শিশি পেয়ারার জেলি খেয়ে, শরীর-টরির ভালো করে ফেললেন।

বাংলোর পাশেই একটা ছোট পাহাড়ি ঝরনা। সেখানে একটা শিমুল গাছ। কুট্টিমামা একখানা পেল্লায় কালীসিঙ্গির মহাভারত নিয়ে সেখানে এসে বসলেন।

চারদিকে পাখি-টাখি ডাকছিল। পেটটা ভরা ছিল, মিঠে মিঠে হাওয়া দিচ্ছিল—কুট্টিমামা খুশি হয়ে মহাভারতের সেই জায়গাটা পড়তে আরম্ভ করলেন—যেখানে ভীম বকরাক্ষসের খাবার-দাবারগুলো সব খেয়ে নিচ্ছে।

পড়তে পড়তে ভাবের আবেগে কুট্টিমামার চোখে জল এসেছে, এমন সময় গর্‌র—গর্‌র—

কুট্টিমামা চোখ তুলে তাকাতেই ;

কী সর্বনাশ! ঝরনার ওপারে বাঘ! কী

 রূপ বাহার! দেখলেই পিলে-টিলে উলটে যায়। হাঁড়ির মতো প্ৰকাণ্ড মাথা, আগুনের ভাঁটার মতো চোখ, হলদের ওপরে কালো কালো ডোরা, অজগরের মতো বিশাল ল্যাজ। মন্ত হাঁ করে, মুলোর মতো দাঁত বের করে আবার বললে, গর—র—র

একেই বলে বরাত! যে-বাঘের ভয়ে কুট্টিমামা শিকারে গেল না, সে-বাঘ নিজে থেকেই দোরগোড়ায় হাজির। আর কেউ হলে তক্ষুনি অজ্ঞান হয়ে যেত, আর বাঘ তাকে সারিডন ট্যাবলেটের মতো টপং করে গিলে ফেলত। কিন্তু আমারই মামা তো—ভাঙে তবু মাচকায় না। তক্ষুনি মহাভারত বগলদাবা করে এক লাফে একেবারে শিমুল গাছের মগডালে।

বাঘ এসে গাছের নীচে থাবা পেতে বসল। দু-চারবার থাবা দিয়ে গাছের গুড়ি আঁচড়ায়, আর ওপর তাকিয়ে ডাকে : ঘর-র ঘুঁ-ঘুঁ। বোধহয় বলতে চায়—তুমি তো দেখছি পয়লা নম্বরের ঘুঘু!

কিন্তু বাঘটা তখনও ঘুঘুই দেখেছে—ফাঁদ দেখেনি। দেখল একটু পরেই। কিছুক্ষণ পরে বাঘটা রেগে যেই ঝাঁক করে একটা হাঁক দিয়েছে—অমনি দারুণ চমকে উঠেছে কুটিমামা, আর বগল থেকে কালীসিঙ্গির সেই জগঝস্প মহাভারত ধপাস করে নিচে পড়েছে। আর পড়বি তো পড় সোজা বাঘের মুখে। সেই মহাভারতের ওজন কমসে কম পাক্কা বারো সের—তার ঘায়ে মানুষ খুন হয়—বাঘও তার ঘা খেয়ে উলটে পড়ে গেল। তারপর গোঁ-গোঁ-ঘেয়াং ঘেয়াং বলে বার-কয়েক ডেকেই—এক লাফে ঝরনা পার হয়ে জঙ্গলের মধ্যে হাওয়া!

কুট্টিমামা আরও আধা ঘন্টা গাছের ডালের বসে ঠিক-ঠক করে কাঁপল। তারপর নীচে নেমে দেখল মহাভারত ঠিক তেমনি পড়ে আছে— তার গায়ে আঁচড়টিও লাগেনি। আর তার চারপাশে ছড়ানো আছে। কেবল দাঁত—“বাঘের দাঁত। একেবারে গোনা-গুনতি বত্ৰিশটা দাঁত—মহাভারতের ঘায়ে একটি দাঁতও আর বাঘের থাকেনি। দাঁতগুলো কুড়িয়ে নিয়ে, মহাভারতকে মাথায় ঠেকিয়ে, কুট্টিমামা এক দৌড়ে বাংলোতে। তারপর সায়েবরা ফিরে আসতেই কুটিমামা সেগুলো তাদের দেখিয়ে বললে, টাইগার টুথ।

ব্যাপার দেখে সায়েবরা তো থ!

তাই তো—বাঘের দাঁতই বটে? পেলে কোথায়?

কুট্টিমামা ডাঁট দেখিয়ে বুক চিতিয়ে বললে, আই গো টু ঝরনা। টাইগার কাম। আই ডু বকসিং—মানে ঘুষি মারলাম। অল টুথ ব্রেক। টাইগার কাট ডাউন—মানে বাঘ কেটে পড়ল।

সায়েবরা বিশ্বাস করল কি না কে জানে, কিন্তু কুট্টিমামার ভীষণ খাতির বেড়ে গেল। রিয়্যালি গাঁজা-গাবিন্ডে ইজ এ হিরো! দেখতে কাঁকলাসের মতো হলে কী হয়—হি ইজ এ গ্রেট হিরো! সেদিন খাওয়ার টেবিলে একখানা আস্ত হরিণের ঠ্যাং মেরে দিলেন কুট্টিমামা।

পরদিন আবার সায়েবরা শিকারে যাওয়ার সময় ওকে ধরে টানাটানি ; আজ তোমাকে যেতেই হবে আমাদের সঙ্গে! ইউ আর এ বিগ পালোয়ান!

মহা ফ্যাসােদ! শেষকালে কুট্টিমামা অনেক করে বোঝালেন, বাঘের সঙ্গে বাকসিং করে ওঁর গায়ে খুব ব্যথা হয়েছে। আজকের দিনটাও থাক।

সায়েবরা শুনে ভেবেচিন্তে বললে, অল রাইট—অল রাইট।

আজকে কুট্টিমামা হুঁশিয়ার হয়ে গেছেন— বাংলোর বাইরে আর বেরুলেনই না। বাংলোর বারান্দায় একটা ইজি চেয়ারে আবার সেই কালীসিঙ্গির মহাভারত নিয়ে বসলেন।

—ঘেঁয়াও-—ঘুঁঙ—

কুট্টিমামািআঁতকে উঠলেন। বাংলোর সামনে তারের বেড়া—তার ওপারে সেই বাঘ। কেমন যেন জোড়হাত করে বসেছে। কুট্টিমামার মুখের দিকে তাকিয়ে করুণ স্বরে বললে, ঘেয়াং—কই! আর হাঁ করে মুখটা দেখল! ঠিক সেই রকম। দাঁতগুলো তোলবার পরে কুট্টিমামার মুখের যে-চেহারা হয়েছিল, অবিকল তা-ই! একেবারে পরিষ্কার—একটা দাঁত নাই! নির্ঘাত রামধনিয়ার মুখ।

বাঘাটা হুবহু কান্নার সুরে বললে—ঘ্যাং-ঘ্যাং—ভ্যাঁও! ভাবটা এই দাঁতগুলো তো সব গেল দাদা! আমার খাওয়া-দাওয়া সব বন্ধ! এখন কী করি?

কিন্তু তার আগেই এক লাফে কুট্টিমামা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করেছেন। বাঘাটা আরও কিছুক্ষণ ঘ্যাং-ঘ্যাং-ভ্যাঁ-ভ্যাঁ করে কেঁদে বনের মধ্যে চলে গেল।

পরদিন সকালে কুট্টিমামা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে, বাঁধানো দাঁতের পাটি দুটো খুলে নিয়ে, বেশ করে মাজছিলেন। দিব্যি সকালের রোদ উঠেছে—সায়েবগুলো ভোঁস ভোঁস করে ঘুমুচ্ছে তখনও, আর কুট্টিমামা দাঁড়িয়ে দাঁত মাজতে মাজতে ফ্যাক-ফ্যাক গলায় গান গাইছিলেন : “এমন চাঁদের আলো, মারি যদি সে-ও ভালো—

সকাল বেলায় চাঁদের আলোয় গান গাইতে গাইতে কুট্টিমামার বোধহয় আর কোনও দিকে খেয়ালই ছিল না। ওদিকে সেই ফোকলা বাঘ এসে জানলার বাইরে বসে রয়েছে ঝোপের ভেতরে। কুট্টিমামার দাঁত খোলা-বুরুশ দিয়ে মাজা—সব দেখছে এক মনে। মাজা-টাজা শেষ করে যেই কুট্টিমামা দাঁত দুপাটি মুখে পুরতে যাবেন—অমনি ; ঘোঁয়াৎ ঘালুম!

অর্থাৎ তোফা—এই তো পেলুম!

জানলা দিয়ে এক লাফে বাঘ ঘরের মধ্যে।

—টা-টাইগার—পর্যন্ত বলেই কুট্টিমামা ফ্ল্যাট!

বাঘ কিন্তু কিছুই করল না। টপাৎ করে কুট্টিমামার দাঁত দু-পাটি নিজের মুখে পুরে নিল—কুট্টিমামা তখনও অজ্ঞান হননি—জ্বলজ্বল করে দেখতে লাগলেন, সেই দাঁত বাঘের মুখে বেশ ফিট করেছে। দাঁত পরে বাঘা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বেশ খানিকক্ষণ নিঃশব্দে বাঘা হাসি হাসল, তারপর টপ করে টেবিল থেকে টুথব্রাশ আর টুথ-পেস্টের টিউব মুখে তুলে নিয়ে জানলা গলিয়ে আবার—

কুট্টিমামার ভাষায়—একেবারে উইন্ড! মানে হাওয়া হয়ে গেল।

টেনিদা থামল। আমাদের দিকে তাকিয়ে গর্বিতভাবে বললে, তাই বলছিলুম, দাঁত বাঁধানোর গল্প আমার কাছে করিাসনি! হুঃ!

বিষয় ভিত্তিক বিভাগ

লেখক তালিকা